মাদ্রিদের রাজা রিয়ালের কাছে চিরজীবনই অপমানের স্বীকার হয়ে আসছিল তাঁরা। উঁচু পাড়ার দল বলে নিচু সারির অ্যাটলেটিকোকে নিয়ে নাক সিটকাতো মাদ্রিদিস্তারা। এমন দিনও দেখা গেছে যেখানে নিজেদের সমমানের শক্তিশালী নগর প্রতিদ্বন্দী চেয়ে ব্যানার নিয়ে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে এসেছে মাদ্রিদ সমর্থকরা। অ্যাটলেটিকোর মাঠ এস্তাদিও ভিসেন্তে ক্যালদেরনের ৫৪ হাজার সিটের অর্ধেকও ভরত না কোনো লীগ ম্যাচে। ভরবেই বা কেন! পয়সা দিয়ে টিকেট কিনে কেই বা দলের একের পর এক হার দেখতে চাইবে? বার্সা-রিয়ালকে হারানো তখন সুখস্বপ্ন, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ তো দূরের কথা ইউরোপা লিগেই সুযোগ পাওয়া যেতো কালভেদ্রে। কোপা দেল রেতে সর্বোচ্চ কোয়ার্টার ফাইনাল, এই ছিল প্রতি মৌসুমে অ্যাটলেটিকোর দৌড়।

২১ ডিসেম্বর ২০১১, মাদ্রিদের মাঝারি মানের দল অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের তখন চরম দুর্দশা চলছে। ৩য় সারির দল আলবাকেতের কাছে দুই লেগেই হেরে তাঁরা বিদায় নিয়েছে কোপা দেল রে থেকে। এর জের ধরে বরখাস্ত হলেন কোচ গ্রেগেরিও মানজানো।

২৩ ডিসেম্বর ২০১১, ক্লাব অ্যাটলেটিকো দি মাদ্রিদ তাঁদের নতুন কোচ হিসেবে পরিচিত করাল এক পাগলা আর্জেন্টাইন ডিয়েগো পাবলো সিমিওনে কে। একসময় তিনি খেলে গেছেন এই অ্যাটলেটিকোতেই। এই ভিসেন্তে ক্যালদেরনের ঘাস তাঁর হাতের তালুর মতোই চেনা। যিনি এর আগে বছর পাঁচেক কোচিং করিয়েছেন আর্জেন্টাইন ক্লাব রেসিং, এস্তুদিয়ান্তেস, রিভার প্লেট, সান লরেঞ্জো, ইতালিয়ান ক্লাব কাতানিয়াকে। সাফল্য বলতে এস্তুদিয়ান্তেস এবং রিভারপ্লেট কে একবার করে আর্জেন্টাইন প্রিমেরা লিগ জেতানো। সেই সিমিওনেকে নিয়োগ দেয়ায় অনেকেরই কিছুটা হলেও আশা ফিরে এল।

সিমিওনে হলেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি কোচ মার্সেলো বিয়েলসার হুবহু জেরক্স কপি। ডাগ-আউটে বিয়েলসার পাগলামো, রেফারিকে প্রভাবিত করা, খেলোয়াড়দের দিকে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকানো, তাঁদেরকে হাতের মুঠোয় রাখা এসবকিছুতেই মাদ্রিদের ছোট দল অ্যাটলেটিকোর সমর্থকরা যেন একটু স্বপ্ন দেখতে শুরু করল। যাক, এবার অন্তত নিয়মিত ইউরোপা লিগে খেলার আশা করাই যায়! কিন্তু তারা স্বপ্নেও ভাবেনি তাদের সামনে কি অপেক্ষা করছে। কি জাদু নিয়ে এসেছেন ওই পাগল আর্জেন্টাইন ডিয়েগো পাবলো সিমিওনে। শুরু হল এক আশ্চর্য উপাখ্যান। এ উপাখ্যানের সাথে আরব্য রজনীর হাজার রাতের গল্পকেও তুলনা দেওয়া কঠিন।

মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে দায়িত্ব পাওয়ায় বেশ ঝামেলায় পড়তে হলো সিমিওনে কে। যদিও তখনো ইউরোপা লিগে টিকে আছে অ্যাটলেটিকো। লা লিগায় বেশ নাজেহাল অবস্থা। দলের মূল চার ডিফেন্ডার ডিয়েগো গডিন, মিরান্ডা, ফেলিপে লুইস, হুয়ানফ্রানের কেউই বিশ্বমানের নন। দলে বিশ্বমানের খেলোয়াড় বলতে একজনই, কলম্বিয়ান স্ট্রাইকার রাদামেল ফ্যালকাও। মিডফিল্ডও তেমন ভরসা জোগানোর মতো নয়।

কিন্তু সিমিওনে তাঁদের কানে কি মন্ত্র জপে দিলেন আর কোন জাদুমন্ত্রবলে তাঁরা বদলে গেলেন তা একমাত্র স্বয়ং আল্লাহ আর সিমিওনেই জানেন। চেলসি থেকে ধারে খেলতে আসা ১৯ বছর বয়সী থিবো কোর্তোয়া হয়ে উঠলেন চীনের প্রাচীর, গডিন, মিরান্ডা, লুইস, হুয়ানফ্রানরা হয়ে গেলেন দুর্ভেদ্য দেয়াল, গাবি, তুরান, টিয়াগো, কোকেরা রাতারাতি হয়ে গেলেন মাঝমাঠের সৈনিক, আর সামনে রাদামেল ফ্যালকাও তো আছেনই। শুরু হল অ্যাটলেটিকো বিপ্লব।

ডিয়াগো সিমিওনে, অ্যাথলেটিকো মাদ্রিদ, লা লীগা, চ্যাম্পিয়ন্স লীগ

লা লিগায় নিচ থেকে উঠে এসে ৫ম হলো তাঁরা। ইউরোপা লিগের দ্বিতীয় রাউন্ডে ইতালিয়ান ক্লাব ল্যাজিওকে তাঁদের মাঠে হারাল ৩-১ গোলে, নিজেদের মাঠে অ্যাটলেটিকোর জয় ১-০ তে। রাউন্ড অব সিক্সটিনে তুর্কি ক্লাব বেসিকতাসকে নিজেদের মাঠে ৩-১ এবং তাঁদের মাঠে ৩-১ গোলে হারিয়ে অ্যাটলেটিকো উঠল কোয়ার্টার ফাইনালে। সেখানে জার্মান ক্লাব হ্যানোভারকে দুই লেগেই ২-১ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনাল। সেমিতে আরেক স্প্যানিশ ক্লাব ভ্যালেন্সিয়াকে ভিসেন্তে ক্যালদেরনে ৪-২ আর মেস্তায়ায় ১-০ গোলে হারিয়ে বুখারেস্টের ফাইনালে পৌঁছে গেল তাঁরা। ফাইনালে প্রতিদ্বন্দী স্বদেশী অ্যাথলেটিক বিলবাও। রাদামেল ফ্যালকাওয়ের ৭, ৩৪ এবং ডিয়েগোর ৮৫ মিনিটের গোলে ৩-০ গোলে জিতে নিজেদের ইতিহাসের প্রথম ইউরোপা লিগ তথা ইউরোপিয়ান কোনো ট্রফি জিতল অ্যাটলেটিকো। সিমিওনে জাদুর প্রথম উপাখ্যান কেবল সেটি।

২০১২-২০১৩ মৌসুমের প্রথম ম্যাচ উয়েফা সুপার কাপ। মুখোমুখি আগের মৌসুমের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ী চেলসি এবং ইউরোপা লিগ জয়ী অ্যাটলেটিকো। সবাই ভাবল অ্যাটলেটিকো চেলসির সাথে আর কি খেলবে! কিন্তু খেলল অ্যাটলেটিকোই। মোনাকোর স্টাডিও সেন্ট লুইসে রাদামেল ফ্যালকাওয়ের হ্যাটট্রিক আর মিরান্ডার গোলে ৪-০ তে এগিয়ে গেল তাঁরা। চেলসির হয়ে সান্তনার একমাত্র গোলটি এল গ্যারি কাহিলের পা থেকে। ৪-১ এ জিতে উয়েফা সুপার কাপ জিতল অ্যাটলেটিকো। লা লিগাতেও নিজেদের শক্তিমত্তা দেখাতে শুরু করল লা রোজিব্লাঙ্কোস রা।

ধারাবাহিক পারফর্ম করে ৩য় হলো অ্যাটলেটিকো। পরের মৌসুমে সরাসরি সুযোগ পেল চ্যাম্পিয়ন্স লিগ খেলার। ইউরোপা লিগে যদিও রাউন্ড অব ৩২ তেই বাদ পড়ে গেল অ্যাটলেটিকো কিন্তু কোপা দেল রেতে ফাইনালে উঠে গেল তাঁরা। ফাইনালের প্রতিপক্ষ কারা ছিল জানেন? দ্যা মাইটি রিয়াল মাদ্রিদ। যাদের বিপক্ষে সর্বশেষ ১৪ বছরে কোনো প্রতিযোগিতায় জিততে পারে নি অ্যাটলেটিকো। সেই মাদ্রিদের বিপক্ষে মাদ্রিদেরই মাঠ সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে কোপা দেল রের ফাইনাল। অ্যাটলেটিকোর উড়ে যাবারই কথা।

১৭ মে ২০১৩, বার্নাব্যুর গ্যালারি গমগম করছে ৮৫ হাজার সমর্থকের গগনবিদারী চিৎকারে। পরিবেশটা এমন যেন রিয়াল কোনো প্রস্তুতি ম্যাচ খেলতে নেমেছে। ১৪ মিনিটে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর গোল এগিয়ে দিল রিয়ালকে। অ্যাটলেটিকোর মনে তখন ভয়ের কাঁপন, কি জানি হয়! কিন্তু একজন সিমিওনে যে ছিলেন। গোল খেয়ে যেখানে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলার কথা সেখানে সিমিওনের সৈন্যরা উল্টো ঝাঁপিয়ে পড়ল প্রতিপক্ষের উপর। এ যেন ক্ষুধার্ত নেকড়ের রক্ত পিপাসার নেশা, এ যেন আহত বাঘের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রবল উদ্যম। একের পর এক আক্রমণের ঢেউ বইতে লাগল রিয়ালের ডিফেন্সের মেরুদন্ডে। আচমকা ভেঙ্গেও গেল তা। রাদামেল ফ্যালকাও সমতা ফিরিয়ে আনলেন ৩৫ মিনিটে। দাঁতে দাঁত চেপে লড়তে লাগল দু’দল। ম্যাচ নির্ধারিত সময় পেরিয়ে অতিরিক্ত সময়ে গেল।

অতিরিক্ত সময়ের ৮ মিনিট অর্থাৎ ম্যাচের ৯৮ মিনিটে অ্যাটলেটিকোর মিরান্ডার গোল!!! স্তব্ধ বার্নাব্যুর তিন পাশ। এক পাশে তখন লাল-সাদার উচ্ছাস। অ্যাটলেটিকো সমর্থকদের অ্যাটলেট্টি, অ্যাটলেট্টি ধ্বনি। বাকি ২২ মিনিট পেরিয়ে গেল। ম্যাচ শেষের সংকেত রেফারির বাঁশিতে। ম্যাচ শেষ, জিতে গেছে অ্যাটলেটিকো। ১৪ বছর পর রিয়াল মাদ্রিদ নামক দানবটাকে বধ করা গেছে তাও তাঁদেরই রাজ্যে, তাঁদেরই সমর্থকদের সামনে, যা আবার একটি টুর্নামেন্টের ফাইনালে। আনন্দের মাত্রা ছিল না কোনো। ১৪ বছর আগে ১৯৯৯ সালে সর্বশেষ যেবার রিয়াল কে হারিয়েছিল অ্যাটলেটিকো সেবার তাঁদের কোচ ছিলেন বর্তমান লিস্টার সিটি কোচ ক্লদিও রানিয়েরি।

ট্রফি তুলে ধরলেন অ্যাটলেটিকো অধিনায়ক গাবি। শেষ হলো সমর্থকদের অপেক্ষার প্রহর। আগে তারা কেঁদেছে না পাওয়া, বঞ্চনা, স্টিম রোলারের নির্মম নিষ্পেষণের যন্ত্রণায়, এবার তারা ভাসল আনন্দাশ্রুতে। এভাবেই শেষ হল অ্যাটলেটিকোর আরেকটি রূপকথার মৌসুম। কিন্তু ওই যে কথায় আছে শেষ হইয়াও হইল না শেষ। পরের মৌসুমে আরো বড় কিছু অপেক্ষা করছিল তাঁদের জন্য।

২০১৩-২০১৪ মৌসুমের শুরুতে দল ছেড়ে গেলেন দলের সেরা অস্ত্র রাদামেল ফ্যালকাও। কিন্তু তাতে কি! সিমিওনে যে আছেন! মৌসুমের প্রথম শিরোপা স্প্যানিশ সুপার কাপে বার্সেলোনার কাছে হেরে শুরু করল অ্যাটলেটিকো। কিন্তু পরাজয়ে ডরে না বীর। পিছু হঠল না অ্যাটলেটিকোও। রিয়াল-বার্সার একের পর এক হোঁচট এবং নিজেদের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে লা লিগার শীর্ষে উঠে এল রোজিব্লাঙ্কোস রা। লা লিগা হয়ে গেল তিন ঘোড়ার রেস। অ্যাটলেটিকো জানিয়ে দিল এবার বার্সেলোনা-রিয়াল মাদ্রিদের সাথে তাঁদের নামও নিতে হবে স্প্যানিশ জায়ান্ট হিসেবে।

এবার লিগেও রিয়াল মাদ্রিদকে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে হারাল সিমিওনে বাহিনী। ৩৭ ম্যাচ শেষে লা লিগার পয়েন্ট টেবিল দাঁড়াল অ্যাটলেটিকো ৮৯, বার্সেলোনা ৮৬, রিয়াল মাদ্রিদ ৮৪। অর্থাৎ নিজেদের শেষ ম্যাচে রিয়াল জিতলেও চ্যাম্পিয়ন হবে না তাঁরা। অ্যাটলেটিকোর শেষ ম্যাচ আবার বার্সেলোনার বিপক্ষে। তাও আবার বার্সার দুর্গ ন্যু ক্যাম্পে। বার্সা জিতলে তাঁদের পয়েন্ট হবে অ্যাটলেটিকোর সমান ৮৯, কিন্তু মুখোমুখি লড়াইয়ে এগিয়ে থাকায় চ্যাম্পিয়ন হবে বার্সাই। আর ম্যাচ ড্র হলে বা অ্যাটলেটিকো জিতলে চ্যাম্পিয়ন অ্যাটলেটিকোই।

এমতাবস্থায় শুরু হল ম্যাচ। প্রতিপক্ষ বার্সার ১১ জন খেলোয়াড়, সেইসাথে ন্যু ক্যাম্পের ১ লাখ দর্শক। ম্যাচের ৩৩ মিনিটে সানচেজের গোল আশার আলো দেখালো বার্সেলোনাকে। প্রথমার্ধ শেষ হলো বার্সার ১-০ তে এগিয়ে থাকার মাধ্যমে। দ্বিতীয়ার্ধে শুরু থেকেই গোল শোধে আক্রমণ শানাতে লাগল অ্যাটলেটিকো। ফলও পেয়ে গেল দ্রুতই। কর্নার থেকে উড়ে আসা বলে ডিয়েগো গডিনের হেড ঢুকে গেল বার্সার জালে। গোল! ১-১ এ সমতা তখন ম্যাচে। এভাবে থাকলেই চ্যাম্পিয়ন হবে অ্যাটলেটিকো

ম্যাচ দেখতে আসা অ্যাটলেটিকোর হাজার তিনেক দর্শক কিংবা মাদ্রিদে নিজের টিভির সামনে বসে থাকা প্রত্যেকটা অ্যাটলেটিকো সমর্থকদের বুকে দুরুদুরু স্পন্দন। অ্যাটলেটিকো কি পারবে বাকিটা সময় এভাবে কাটিয়ে দিতে!! ম্যাচের ৬৪ মিনিটে বার্সার লিওনেল মেসির গোল! না, গোল হলো না, কারণ মেসি গোলটি করার সময় অফসাইডে ছিলেন। আতংকের চোরাস্রোত বয়ে গেল সবার মেরুদন্ডের শিরা দিয়ে।

এক সময় ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজালেন রেফারি। ন্যু ক্যাম্পের ৯৭ হাজার দর্শক তখন মৃতপ্রায়। বাকি ৩ হাজার দর্শক যেন পৃথিবীর সবথেকে সুখী মানুষ! হাজার হাজার অ্যাটলেটিকো সমর্থক রাস্তায় নেমে এল ঘর ছেড়ে। বার্সা-রিয়ালের লিগে কিনা চ্যাম্পিয়ন অ্যাটলেটিকো!! নিজেদের চোখ, কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না অ্যাটলেটিকোর কেউ। ১০ম বারের মতো লিগ চ্যাম্পিয়ন হল ক্লাব অ্যাটলেটিকো ডি মাদ্রিদ।

ডিয়াগো সিমিওনে, অ্যাথলেটিকো মাদ্রিদ, লা লীগা, চ্যাম্পিয়ন্স লীগ

কোপা দেল রেতে সেবার সেমিফাইনালে রিয়াল মাদ্রিদের কাছে হেরে বাদ পড়লেও সেই মৌসুমেই চ্যাম্পিয়ন্স লিগে জয়যাত্রা অব্যাহত থাকল তাঁদের। পোর্তো, জেনিত এবং র‌্যাপিড ভিয়েনার গ্রুপ থেকে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠল অ্যাটলেটিকো। দ্বিতীয় রাউন্ডে এসি মিলান কে সান সিরোতে ১-০ এবং ভিসেন্তে ক্যালদেরনে ৪-১ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টারে পৌঁছে গেল তাঁরা। সেখানে প্রতিপক্ষ স্প্যানিশ দৈত্য। বার্সেলোনা। কিন্তু মনে ভয় না থাকলে যা হয় আর কি! বার্সাকে টপকে সেমিতে উঠে গেল অ্যাটলেটিকোই।

সেখানে ইংলিশ প্রতিপক্ষ চেলসিকে তাঁদের মাঠ স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে ৩-১ গোলে হারিয়ে স্বপ্নের চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে জায়গা করে নিল অ্যাটলেটিকো। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে উঠল সেই অ্যাটলেটিকো, যারা দুই মৌসুম আগেও ইউরোপা লিগে খেলাকেই মনে করত চূড়ান্ত সাফল্য, সেই অ্যাটলেটিকো যাদের মাঠের গ্যালারি ভরত না, সেই অ্যাটলেটিকো যাদের কিনা বার্সেলোনা-রিয়াল মাদ্রিদ কে হারানোর স্বপ দেখাও ছিল বারণ, সেই অ্যাটলেটিকো যারা সাফল্য খুঁজতে গিয়ে ঘুরে মরত ব্যর্থতার কানাগলিতে। সেই অ্যাটলেটিকোই নগর প্রতিদ্বন্দী রিয়াল মাদ্রিদকে চ্যালেঞ্জ জানাতে নামবে লিসবনের স্টাডিও ডা লুজে।

২৪ মে ২০১৪, লিসবনে বেনফিকার মাঠ স্টাডিও ডা লুজে সেই মৌসুমে শেষবারের মতো বেজে উঠল উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের অ্যান্থিম। রক্তের স্পন্দন বাড়িয়ে দেয়া সেই সুর শুনে নিশ্চয় দু’দলের খেলোয়াড়েরা চিন্তা করছিলেন বিজয়ের মূহুর্তের কথা। ম্যাচের পরিস্কার ফেভারিট ছিল রিয়াল। কোথায় রেকর্ড ৯ বারের চ্যাম্পিয়ন রিয়াল মাদ্রিদ আর কোথায় এর আগে ১৯৭৪ সালে মাত্র একবারই ফাইনাল খেলে বায়ার্ন মিউনিখের কাছে হারা অ্যাটলেটিকো। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে ম্যাচের ৩৬ মিনিটে ডিয়েগো গডিনের গোলে এগিয়ে গেল অ্যাটলেটিকোই।

আবারো সেই উৎকন্ঠা, যেই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির উদ্রেক হয়েছিল বার্সা-অ্যাটলেটির লা লিগার শেষ ম্যাচে সেরকম আতংক আর ভয়ে কাটতে লাগল সময়। রেফারির ঘড়িতে তখন ৯০ মিনিট। আরো ৩ মিনিট যোগ করার সিগনাল দেখালেন চতুর্থ রেফারি। ম্যাচের ৯২ মিনিট। আর ১ মিনিট পেরোলেই ইতিহাস। পারবে কি অ্যাটলেটিকো লিড ধরে রাখতে। কর্নার পেল রিয়াল মাদ্রিদ। লুকা মড্রিচ এগিয়ে গেলেন। রিয়াল-অ্যাটলেটিকো দুদলের গ্যালরিতেই পিনপতন স্তব্ধতা।

রিয়াল সমর্থকদের কাছে এই ১ মিনিট তখন খুব খুব খুবই কম, কিন্তু অ্যাটলেটিকো সমর্থকদের কাছে এই ১ মিনিটের থেকে যেন বড় সময় আর হয়ই না! রিয়াল সমর্থকরা ঈশ্বরের কাছে শুধু একটি মিরাকল চাইছেন, অ্যাটলেটিকো সমর্থকদের চাওয়া এই ছোট্ট কিন্তু দীর্ঘ প্রহরটা যেন দ্রুতই শেষ হয়। কর্নার কিক নিলেন লুকা মড্রিচ, কিকটা ঠিকমতো নেয় হল না, কার কাছে যেন গেল বলটা। কিন্তু কোথা থেকে যেন উড়ে এলেন এল গ্লাডিয়েটর সার্জিও রামোস। তিনি যখন বলে মাথা ছোঁয়ালেন ঘড়ির কাঁটায় ঠিক ৯২ মিনিট ৪৭ সেকেন্ড, বলটা জালে যেতে লাগল ১ সেকেন্ড, ৯২ মিনিট ৪৮ সেকেন্ডে ম্যাচে ফিরল সমতা।

সেই যে ধাক্কা খেল অ্যাটলেটিকো আর ফিরতে পারল না সেটা থেকে। এরপর অ্যাঙ্গেল ডি মারিয়ার আঁকাবাঁকা ড্রিবলিং থেকে গ্যারেথ বেলের গোল, মার্সেলোর ডি বক্সের বাইরে থেকে করা গোল আর ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পেনাল্টি থেকে করা গোলে অসহায় আত্মসমর্পন করল অ্যাটলেটিকো। রিয়ালের লা ডেসিমা জয়ের উদযাপন ভঙ্গুর হৃদয় নিয়ে দেখলেন গডিন-কস্তা-গাবিরা। কিন্তু সেদিন হেরেও কাঁদেনি অ্যাটলেটিকোর সমর্থক কিংবা খেলোয়াড়েরা। কাঁদবেই বা কেন? কাঁদে তো ভীতু আর পরাজিতরা। অ্যাটলেটিকো তো হারেনি, যেখানে জেতার কথা সেই মানুষের মন জিতে নিয়েছে তাঁরা, তাঁরাই তো নায়ক।

যে ক্যালদেরনে ২০১১ সালেও গ্যালারির অর্ধেক ভরত না সেই ক্যালদেরনে এখন টিকেট সোনার হরিণ। মাঠের বাইরে বসে খেলা দেখতে হয় হাজার হাজার দর্শককে। যেই বার্সেলোনা-রিয়াল মাদ্রিদ অ্যাটলেটিকোকে হেলায় হারাতো, অ্যাটলেটিকোর সাথে ম্যাচকে নিজেদের প্রস্তুতি ম্যাচ মনে করত সেই বার্সেলোনা-রিয়াল মাদ্রিদ এখন সবথেকে ভয় এবং দুঃশ্চিন্তায় থাকে লাল-সাদা সৈন্যদের বিপক্ষে ম্যাচের আগে। যেই অ্যাটলেটিকো একসময় ইউরোপায় খেলার সুযোগ পেতে হাপিত্যেশ করত সেই অ্যাটলেটিকো আজ ইউরোপের জায়ান্ট। যেই অ্যাটলেটিকোর ডিফেন্স একসময় ছিল বেহুলার বাসরঘর সেই অ্যাটলেটিকোর ডিফেন্স আজ বিশ্বের সেরা।

সাফল্য তো সেটাই যা আপনাকে করে তুলবে নিজের কাছে তৃপ্ত। আর সবথেকে বড় সাফল্য হল মানুষের মনে জায়গা করে নেয়া, হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটে ঘরে ফেরা মানুষগুলোকে নতুন স্বপ্ন দেখিয়ে বাঁচতে সাহায্য করা। আর এসব সম্ভব হয়েছে ওই এক আর্জেন্টাইন, ডিয়েগো পাবলো সিমিওনে নামক এক বীরের জাদুকরি ক্ষমতায়।

অ্যাটলেটিকোর এই উপাখ্যান অব্যাহত থাকুক।

আপনাকে সালাম ডিয়েগো সিমিওনে।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-