মালিন্দো এয়ারওয়েজের ওডি-১৬২ ফ্লাইটটা মালয়েশিয়া থেকে ঢাকা আসছিল গত পরশু। মাটি থেকে কয়েক হাজার ফুট ওপরে, সেই বিমানের ভেতরেই চূড়ান্ত অভব্যতার পরিচয় দিয়েছেন এক যাত্রী। জাতীয়তায় তিনি বাংলাদেশী, সবুজ রঙের পাসপোর্টটা তাকে এই বঙ্গের সন্তান হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। আর সেটা নিয়েই গতকাল সারাদিন সরগরম ছিল বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়া, বিশেষ করে ফেসবুক।

অভিযুক্ত যুবকের নাম দিদার আল মাহমুদ। বিশ বছর বয়েসী এই তরুণ মালয়েশিয়ার সাইবারজায়ায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বলে জানা গেছে। গতকাল সেই বিমানের যাত্রী ছিল সে। বিমানটি উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পর থেকেই অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করে দিদার। প্রথমে বিমানের এয়ার হোস্টেসদের সঙ্গে অশালীন আচরণ করে সে। তারপর নিজের ল্যাপটপে উচ্চ শব্দে পর্নোগ্রাফি দেখতে শুরু করে দিদার। একটা পর্যায়ে নিজের সব জামাকাপড় খুলে ফেলেছিল এই ব্যক্তি।

আশেপাশের বাকী যাত্রীরা তখন মোটামুটি হতভম্ভ। তাদেরকে আরও বেশী চমকে দিতেই কিনা, নগ্ন অবস্থাতেই বিমানে ছুটোছুটি শুরু করেছিল দিদার। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, এই সময়ে প্রকাশ্যে হস্তমৈথুনও করেছে সে। বিমানে থাকা নিরাপত্তাকর্মীরা তাকে শান্ত করতে গেলে তাদের দিকে তেড়ে আসে দিদার। বিমানের নারী ক্রু’দের জড়িয়ে ধরার চেষ্টাও করেছিল সে। বিমানের যাত্রীদের তোলা ছবি ইতিমধ্যেই ভাইরাল হয়ে গেছে, সেসব ছবি ঘুরে বেড়াচ্ছে অন্তর্জালে।

ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মালয়েশিয়ান বিমানটি অবতরনের পরে বিমানের কর্মীরা দিদারকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করে। থানা হাজতেও বেশীরভাগ সময় সে অস্বাভাবি আচরণ করছিল বলে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নূরে আজম। যদিও দিদারের পরিবার দাবী করেছেন সে মানসিক বিকারগ্রস্থ।

মালিন্দো এয়ারলাইন্স, বিমানে নগ্ন বাংলাদেশী যুবক, নোয়াখালী, মালয়েশিয়া

অবশ্য, মাথায় সমস্যা না থাকলে এমন কাজ তো কোন ভালো মানুষ করবে না। অভিযুক্তের পরিচিত একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিবিসিকে জানিয়েছেন, মালয়েশিয়ার সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাওয়ার পর থেকেই তার মানসিক অসুস্থতা ধরা পড়ে। “বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার চাপ নিতে পারতো না সে। মাঝেমধ্যেই ভারসাম্যহীন আচরণ করতো”- বলে দাবী করেছেন তিনি। মালয়েশিয়ায় থাকা অবস্থায় দিদার দুইবার মানসিক চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছিলেন বলেও জানান তিনি। এমনকি ৩রা মার্চ মালয়েশিয়া ছাড়ার আগে নিজের বাসায় ভাংচুরও করেছিল সে।

এইটুকু তো গেল মানসিক বিকারগ্রস্থ দিদারের কথা, তবে এই পাগলের কল্যানে গতকাল থেকে অনলাইনে ‘মানসিকভাবে অসুস্থ’ অসংখ্য মানুষ চোখে পড়ছে, যারা দিদারের বাংলাদেশী পরিচয়টাকে উহ্য রেখে তার পাসপোর্টের ‘নোয়াখালী’ লেখাটাকেই বড় করে তুলে ধরতে চাইছেন, সেখানকার মানুষজনকে ছোট করার অদ্ভুত একটা প্রচেষ্টায় নেমেছেন। পাসপোর্টের ওপরে বড় করে লেখা ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ – People’s Republic of Bangladesh’ লাইনটা তারা সুকৌশলে এড়িয়ে যান। একটা আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে একজন বাংলাদেশী ব্যক্তি নগ্ন হয়ে হস্তমৈথুন করেছেন, সেটা যে কতবড় লজ্জা, এই জিনিসটা আমাদের মাথায় ঢোকে না, আমরা উল্লসিত হই অভিযুক্ত যুবকের ‘নোয়াখাইল্লা’ পরিচয় পেয়ে!

দিদারের মানসিক সমস্যার কথা তো তার পরিবার স্বীকার করেছে, কিন্ত এই মানুষগুলো যে চরমভাবে মস্তিস্ক বিকৃতিতে ভুগছে, সেটা কি এদের পরিবারের সদস্যেরা জানেন? তাদের যে অবিলম্বে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি হওয়া প্রয়োজন, সেটা তারা নিজেরাও বুঝতে পারছেন না হয়তো। কিছু উটকো অনলাইন পোর্টালকেও দেখেছি ‘নোয়াখালী’ শব্দটাকে নিয়ে মাতামাতি করতে। নোয়াখালী/বরিশাল কিংবা দেশের যেকোন অঞ্চল নিয়ে যে কারো অস্বস্তি থাকতেই পারে, কিন্ত সেটা সামাজিক একটা প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করার মানেই হলো ঘৃণার চাষাবাদ করা, এই ছোট্ট সহজ কথাটা যারা বুঝতে ভুল করেন, তাদের মাথার ভেতরে লবনের চামচে এক চামচ ঘিলু নেই দেখে আফসোস হয় খুব।

মালিন্দো এয়ারলাইন্স, বিমানে নগ্ন বাংলাদেশী যুবক, নোয়াখালী, মালয়েশিয়া

ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান যখন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার হন, তখন তো আমি কাউকে দেখি না তাকে ‘মাগুরার সাকিব আল হাসান’ নামে ডাকতে। প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনুস যখন নোবেল পুরস্কার জয় করেন, সেটা তো দলমত নির্বিশেষে সব বাংলাদেশীর জন্যেই গর্বের ব্যপার হয়েছিল। দিদার যেটা করেছেন, সেটা প্রত্যেকটা বাংলাদেশীর জন্যেই লজ্জার ব্যাপার। সেই লজ্জাটা আমাদের পাওয়া উচিত। অথচ কিছু মানুষকে দেখছি, লজ্জাটা নিতে না পেরে একটা অঞ্চলের মানুষের দিকে সেটাকে তারা ঠেলে দিচ্ছেন! দিদারের সবুজ রঙের পাসপোর্টে জাতীয়তার জায়গায় বড় হরফে যে শব্দটা লেখা আছে, সেটা ‘বাংলাদেশী’, ‘নোয়াখালী’ নয়।

বিদেশের মাটিতে বা এয়ারপোর্টে আগেও যে আমাদের খুব সুনাম ছিল, এমনটা নয়। দেশবিদেশের এয়ারলাইন্স গুলোতেও বাংলাদেশী যাত্রীদের খুব একটা সম্মানের সঙ্গে দেখা হয় না, সেটা আমাদের দোষেই। বিমানে উঠে আমাদের জাতভাইয়েরা সেটাকে লোকাল বাস বানিয়ে ফেলার চেষ্টায় রত হন, ‘ধূমপান নিষিদ্ধ’ লেখা দেখলেই তাদের সিগারেট ধরানোর খায়েশ জাগে, বাথরুমের সাবান-তোয়ালে চুরি করা তো নিত্যনৈমিত্যিক ব্যপার। মদ খেয়ে মাতাল হবার ঘটনাও অহরহই ঘটে। দিদারের এমন ন্যক্কারজনক নজিরের পর সেই অসম্মানটা আরেকটু বাড়বে।

দিদারের কাজটা নিয়ে সমালোচনা হওয়া উচিত ছিল, এই অমানুষটার অপকর্মের নিন্দা জানানোর কথা ছিল। সেটা না করে আমরা মেতে উঠেছি কে নোয়াখাইল্লা, কে বরিশাইল্লা এমন তর্কবিতর্কে। ছোট্ট একটা দেশ, এরমধ্যেও কত বিভাজন আমাদের! রবীন্দ্রনাথ আক্ষেপ করে বলেছিলেন, রেখেছো বাঙালী করে মানুষ করোনি! মানুষ তো দূরের কথা, আমরা ঠিকঠাক মতো বাংলাদেশীও হতে পারিনি এখনও, নোয়াখাইল্লা, বরিশাইল্লা কিংবা ঢাকাইয়া-ই রয়ে গিয়েছি!

Comments
Spread the love