আলো ঝলমলে রাতের সেই ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে যুবরাজ সিংকে মানা করে নিজেকে আপ দ্য অর্ডার তুলে এনে ক্রিজে যাওয়ার সিদ্ধান্ত যখন নিলেন, সারা দুনিয়ার সবার চোখ কপালে উঠলেও তিনি ছিলেন শান্ত! ৭৯ বলে ৯১ রানের অবিশ্বাস্য ইনিংস খেলে দলের ৪৮তম ওভারেই ইন্ডিয়ার জয় সীলগালা করে ফেলার পরেও তাঁর মুখে কোন তাপ-উত্তাপ নেই!

“Dhoni finishes off in style! What a magnificent blow! And india wins the world cup after 28 years!!!!”

১১৫ কোটি মানুষের উল্লাসের আগ্নেয়গিরির মহাবিস্ফোরণ ঘটান সেই লং অনের উপর দিয়ে নুয়ান কুলাসেকারাকে উড়িয়ে মারা ছক্কা! ইতিহাসের পাতায়, ক্রিকেটের হল অফ ফেইমে তাঁর নাম উঠে যাওয়া একপ্রকার সুনিশ্চিত, সমস্ত কিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে থেকেও তিনি নিরুত্তাপ! ছক্কার পোজটা ধরে রেখে এক দৃষ্টিতে সেদিকে দিকে তাকিয়ে আছেন! কি চিন্তা করছিলেন সেই সময়টা? বৈচিত্র্যময় বর্ণালীতে ভরা তাঁর পুরো ক্যারিয়ারটা? কে জানে!

তিনি মহেন্দ্র সিং ধোনী। “ক্যাপ্টেন কুল” মহেন্দ্র সিং ধোনী, একবিংশ শতাব্দীতে শচীন টেন্ডুলকারের পর ভারতের সবচাইতে আলোচিত ক্রিকেটীয় চরিত্র মহেন্দ্র সিং ধোনী! রাঁচির সেই টিকিটচেকার থেকে ভারতীয় দলের সর্বেসর্বাদের একজন হয়ে উঠা মহেন্দ্র সিং ধোনী! যিনি ভারতীয় দলের তাঁর সুদীর্ঘ ৯ বছরের গুরুদায়িত্বর ভার হতে অবসর চেয়ে নিয়েছেন গতকাল! “অধিনায়ক” মহেন্দ্র সিং ধোনী এখন “সাবেক” অধিনায়ক! 

১১৫ কোটি ভারতীয়দের “ধর্ম” ক্রিকেট! সেই ধর্মের “প্রতিনিধি” হবার চাপ সামলানো কি সহজ কথা??
উত্তরঃ হ্যাঁ সহজ কথা! যদি মহেন্দ্র সিং ধোনী হওয়া যায়! ২০০৭ থেকে ২০১৫, ধোনী ইন্ডিয়া টিমকে নেতৃত্ব দিয়েছেন একেবারেই নিজস্ব ধারায়, নিজস্ব স্টাইলে! যা শুধুমাত্র তিনঘণ্টার বোর্ড পরীক্ষা দুইঘন্টায় সেরে ব্যাটিং প্র্যাক্টিস করতে চলে যাওয়া রাঁচির সেই কিশোরের পক্ষেই সম্ভব!

অনেকেই বলেন “Ganguly is the best captain of the Indian team and Dhoni is the captain of the best Indian team“- কথা সত্য! কিন্তু এই বেস্ট ইন্ডিয়ান টিমের কেবল নামেমাত্র অধিনায়ক হয়েই কি এতো এতো অর্জন ঝুলিতে ভরেছেন ধোনী?? মোটেই না! বেস্ট টিম তিনি পেয়েছিলেন, কিন্তু সেই দলটাকে “বেটার দ্যান দা বেস্ট” বানিয়েছেন ধোনী সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েই।

খেলোয়াড়ি জীবনের শুরুতে সেই ঝাকড়া চুলের মোটরবাইক হাঁকানো ডাকাবুকো ধোনী যেমন নিজের অপ্রথাগত ব্যাটিং স্টাইলের সাথে কখনই আপোষ করেননি, আপোষ করেননি নিজের অধিনায়কত্বের খাতিরে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলির সাথেও! বয়স বেড়েছে, চুল কমেছে। কিন্তু কমেনি ধোনীর জেদ, ধোনীর দূরদর্শিতা, ১১৫ কোটির সমালোচনার জলোচ্ছ্বাসের সামনে দাঁড়িয়ে, সেই কথিত “বেস্ট টিমের” বিশ্বতারকা-সিনিয়র ক্রিকেটার সর্বস্ব ভারতীয় দলের “ক্যাপ্টেন কুল” হয়ে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকার কনভিকশন!

সেই ২০০৭ টি২০ বিশ্বকাপ ফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের বিপক্ষে যোগিন্দর শর্মা নামক এক অখ্যাত বোলারের হাতে শেষ ওভার তুলে দিয়ে ২৪ বছর পরে ভারতের বিশ্ব শিরোপা জয়ের সম্ভাবনাকে জুয়ার টেবিলে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে শুরু, জুয়াড়ি ধোনী এরপর সারাজীবন জুয়াই তো খেলে গেছেন, তাঁর ক্যারিয়ার, তাঁর ক্যাপ্টেনসী নিয়ে! “ফিল্ডিং খারাপ” অভিযোগে ২০০৮-এ পুরো দেশের সমালোচনার মুখে দ্রাবিড়-গাঙ্গুলী-লক্ষনদের ওয়ানডে ক্যারিয়ার শেষ করে দেওয়ার অসমসাহসী সিদ্ধান্ত!

দল খারাপ করতে থাকলে বিরেন্দর শেবাগ, গৌতম গম্ভীর, এমনকি শচীন টেন্ডুলকারকে পর্যন্ত ড্রপ করার আস্পর্ধা, ২০১১-এর সেই নিজে আপ দি অর্ডার উঠে আসা থেকে শুরু করে গত টি২০ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সাথে সেই ম্যাচটায় নিশ্চিত পরাজয়ের মুখে হার্দিক পান্ডিয়ার হাতে শেষ ওভার তুলে দেওয়া… ধোনীর মস্তিষ্কে কখন কি চলতো, তিনি কখন কোন ফাটকা খেলতেন… এটা তিনি ছাড়া কেউই জানতে পারতো না কখনো!

এবং ঠান্ডা মাথায় প্রায় প্রতিটা জুয়া, প্রতিটা ফাটকাই তিনি জিতেছেন কিভাবে? এটাই সবচেয়ে অবাক কান্ড! প্রতিবার তাঁর ক্যাপ্টেনসীর স্টাইল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে আর তিনি সমস্ত ঝড় শান্ত করিয়েছেন! কখনো টি২০ বিশ্বকাপ জিতে, কখনো বা ওয়ানডে বিশ্বকাপ জিতে, তো কখনো এশিয়া কাপ জিতে, তো কখনোবা ইংল্যান্ডের মাটিতে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জিতে নিয়ে! অধিনায়ক হিসেবে সম্ভাব্য সবকিছুই যখন আপনার জেতা হয়ে যায়… এটা শুধুমাত্র “লাক” বলা যায় না! সাবেকদের বানিয়ে দিয়ে যাওয়া প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ধোনী সমস্ত ক্রেডিট নিয়েছেন সেটা বলা যায় না! যদি তাই হতো, তাহলে ইন্ডিয়ার টেস্ট দল হিসেবে জয়যাত্রাটা গাঙ্গুলীর পরেই নেমে যেত! ধোনী শুধু গাঙ্গুলীর ম্যান্টলটা ধরেই রাখেননি, সেটিকে সমুন্নত করেছেন টেস্ট চ্যাম্পিয়নশীপের গদাটা নিজেদের বানিয়ে।

ভারতীয় অধিনায়ক হিসেবে সর্বাধিক ৯১ ওয়ানডে জয়, দেশে ও বিদেশের মাটিতে সর্বাধিক সংখ্যক টেস্ট জয়, সম্ভাব্য সমস্ত বৈশ্বিক শিরোপা জয় করেছেন, শচিন-দ্রাবিড়-লক্ষন-শেবাগদের মতো কিংবদন্তীদের উপর যেমন অধিনায়কত্ব করেছেন, তেমনি কোহলী-শর্মা-রাহানে-আশ্বিনদের মতো তরুণদের জন্যও আগামীর মঞ্চটা প্রস্তুত করে যাচ্ছেন! সবকিছুই ধোনী অর্জন করেছেন তাঁর নিজের যোগ্যতায়- নিজের ডাকাবুকো স্টাইলে, কারো সাথে কোন আপোষ না করে! যে স্মার্টনেস আর ক্যারিজমার সাথে তিনি ৯ বছর দলকে টেনেছেন, পরবর্তী দুই দশকে বিশ্ব ক্রিকেটে এমন অধিনায়ক আসবেন কিনা সন্দেহ!

সবশেষে সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া তাঁর বায়োপিক “MS Dhoni: an untold story” থেকে কয়েক লাইন উদ্ধৃত করা যায়! যেখানে রাঁচি রেলস্টেশনে তাঁর সিনিয়র তাঁকে বলেছিলেন,

“ক্রিকেটে বাউন্সার আসলে তুই কি করিস?? ডাক করিস না?? সেরকম জীবনেও অনেক বাউন্সার আসবে! সব ডাক করবি, আর বলের মেরিট অনুযায়ী খেলতে থাকবি… আর তোর জীবনটাও চলতে থাকবে! আর কারো কথায় নিজেকে চেঞ্জ করিস না, তোর প্লাস পয়েন্টটাই এতা যে তুই ন্যাচারাল। তোর মধ্যে প্রথাগত কিচ্ছু নেই!!”

মহেন্দ্র সিং ধোনী এমনই! সারাজীবন সমস্ত সমালোচনাকে দৃঢ়চিত্তে ডাক করেছেন, সমস্ত বাঁধা বিপত্তিকে জয় করেছেন তাঁর আনকনভেনশনাল “হেলিকপ্টার” শটে লং অনের উপর দিয়ে উড়িয়ে মেরে! তাঁর জীবন, তাঁর ক্যারিয়ারও তাই হয়েছে ইতিহাসের পাতায় চিরস্থায়ী হবার মতো! তিনি হয়েছেন তর্কযোগ্যভাবে ভারতের ইতিহাসের সর্বকাল সেরা অধিনায়ক! অধিনায়ক ধোনীকে বড্ড মিস করবে ক্রিকেটানুরাগীরা। নিশ্চিতভাবেই। 

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য লেখাগুলো