যে দিনকাল পড়েছে, তাতে কোন মেয়ে বা নারীর ব্যাপারে স্রেফ মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করার চল বলতে গেলে উঠেই গেছে। ঘরে-বাইরে, কর্মস্থলে, কিংবা চলতি পথে কোথাও কোন নারীকে অন্যায়ের শিকার হতে দেখলে, সাথে সাথেই আমাদের বিবেকবোধ জাগ্রত হয় না, কেবল মানুষ হিসেবে তার অধিকারের কথা আমাদের মাথায় আসে না, যদি না আমরা সেই নারীটির জায়গায় নিজেদের মা, বোন, প্রেমিকা বা স্ত্রীকে কল্পনা করতে পারি (পুরুষদের ক্ষেত্রে), কিংবা সেই ভুক্তভোগী নারীটি যদি আমরা নিজেরাই, বা আমাদের খুব কাছের কেউ হয় (নারীদের ক্ষেত্রে)।

তাই পাঠক, নিছক কোন নারীর কথা নয়। চিন্তা করুন আপনার মা, বোন, প্রেমিকা বা স্ত্রীর কথা, কিংবা একদম আপনার নিজের কথাই, যিনি হয়ত রাস্তার পাশের ফুটপাত ধরে হেঁটে যাচ্ছেন, কিংবা কোন গণপরিবহণে যাত্রা করছেন। এমন সময়ে কোন মানুষরূপী জানোয়ার তাকে দেখে উত্যক্ত করতে শুরু করল। শুধু তা-ই নয়, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গিও করতে লাগল। তাও আবার যে-সে অঙ্গভঙ্গি নয়, সরাসরি পুরুষাঙ্গ মুঠোবন্দি করে হস্তমৈথুন করতে শুরু করল!

কী, ভাবতেই গা গুলিয়ে আসছে তো? প্রচন্ড ঘেন্নায় চোখমুখ বিকৃত হয়ে আসছে? ক্রোধে, আক্রোশে চারপাশের সবকিছু ভেঙেচুরে তছনছ করে ফেলতে ইচ্ছে করছে? তাহলে এবার ভেবে দেখুন তো, শুধু এই ব্যাপারটার কথা ভাবতেই যদি আপনার-আমার এমন মানসিক অবস্থা হয়, তবে যেই নারীরা প্রতিদিন বাস্তবিকই এই ধরণের অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন, তাদের মানসিক অবস্থা ঠিক কেমন হয়?

এবং দুঃখের বিষয় হলো, এমনই এক ঘুনে ধরা সমাজে আমাদের বসবাস যেখানে আমাদের চারপাশে এমন বিকৃত রুচির মানুষের অভাব নেই, যারা হয়ত সাহস করে রাস্তাঘাটে মেয়েদের ধর্ষণ করতে পারে না বা তাদের শরীর ছুঁয়ে দিতে পারে না, কিন্তু দূর থেকে তাদের দেখে ঠিকই বিকৃত অঙ্গভঙ্গি করে, এমনকি হস্তমৈথুন করেও নিজেদের তথাকথিত জৈবিক চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করে।

সম্প্রতি এরকমই কয়েকটা ঘটনার কথা প্রকাশ্যে এসেছে। প্রচলিত গণমাধ্যমে নয় অবশ্যই, বিকল্প গণমাধ্যম তথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এর মধ্যে শুধু গতকালই (১২ মে, শনিবার) ফেইসবুকে দেখা মিলেছে এমন দুইটি ঘটনার। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভাইরাল হওয়া ঘটনাটি বাংলাদেশে নয়, ঘটেছে পশ্চিমবঙ্গে।

প্রিয়াংকা দাস নামের এক তরুণী ও তার এক বান্ধবী গতকাল স্থানীয় সময় বারোটার দিকে ৩০ বি/১ নম্বরের একটি বাসে চড়ে নাগা হেদুয়া থেকে বাড়ির পথে ফিরছিলেন। হঠাৎ তারা দেখতে পান তাদের সিটের খানিকটা পিছনেই আরেকটি সিটে বসা একটি লোক তাদের দিকে তাকিয়ে প্যান্টের উপর থেকে পুরুষাঙ্গ চেপে ধরে হস্তমৈথুন করছে। আশেপাশে অনেকেই ঘটনাটি দেখে, কিন্তু কেউ কিচ্ছুটি বলেনি ওই জানোয়ারকে।

হস্তমৈথুন, বাসে নারী নিপীড়ন

কাউকে কোন প্রতিবাদ করতে না দেখে তরুণী দুইটি প্রথমে কন্ডাক্টরকে ডেকে এ কথা জানালে কন্ডাক্টর বলে, ‘কী করব বলুন, কার মনে কী আছে কী করে বুঝব!’ তখন প্রিয়াংকা আরও একবার চিৎকার করে বলেন, ‘ওনাকে ধরুন, উনি আমাদের সাথে অভদ্রতা করছেন।’ কিন্তু এবারও কেউ একটিও প্রতিবাদ করেনি। তাই বাধ্য হয়ে প্রিয়াংকা ও তার বান্ধবী এক অভিনব পদ্ধতি বেছে নেয়। তারা ওই লোকের হস্তমৈথুনের দৃশ্য ভিডিও করে ফেইসবুকে ছেড়ে দেয়।

এখানে একটি কথা না বললেই নয়, তা হলোঃ হস্তমৈথুনের দৃশ্য মোবাইলে ভিডিও করা হচ্ছে তা বুঝতে পেরেও ওই লোক বিন্দুমাত্র ভয় পায়নি বা পুরুষাঙ্গের উপর থেকে হাত সরিয়ে নেয়নি। বরং তাকে এরপর দ্বিগুণ উৎসাহের সাথে কাজটি করতে দেখা যায়। তারচেয়েও ভয়ংকর বিষয় হলো, মোবাইলের ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে পৈশাচিক হাসি হাসতে থাকে সে, যা দেখলে যে কারও বিবমিষা হতে বাধ্য। এবং তার ওই হাসির দৃশ্য দেখে অনেক নারীই হয়ত ভয়ে কয়েক রাত ঘুমাতে পারবেন না।

যাইহোক, প্রিয়াংকা তার নিজের ব্যক্তিগত ফেইসবুক আইডি থেকে ভিডিওটি ও ওই লোকের কয়েকটি ছবি আপলোড করলে, খুব কম সময়ের মধ্যেই পোস্টটি ভাইরাল হয়ে যায়। মাত্র ১৮ ঘণ্টার মধ্যেই ভিডিওটি দেখা হয়েছে প্রায় ৪০ লক্ষ বার, পোস্টটিতে লাইক ও রিয়্যাকশন পড়েছে ৪১ হাজারের মত, আর পোস্টটি শেয়ার করেছে প্রায় ৪৪ হাজার মানুষ।

বলাই বাহুল্য, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে ফুঁসে উঠে প্রতিবাদ জানাতে দেখে হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারেনি কলকাতা পুলিশও। প্রিয়াংকার ফেইসবুক পোস্টের ভিত্তিতেই নিজেদের উদ্যোগে মামলা দায়ের করে তারা, এবং সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে শুরু হয় তদন্ত। শহর চষে ফেলে তারা লোকটিতে ধরার জন্য, এবং প্রিয়াংকা ফেইসবুকে পোস্ট দেয়ার মাত্র সাত ঘণ্টার মধ্যেই লোকটিকে শ্যামপুকুর থাকা থেকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় তারা। লোকটিকে ‘অসুস্থ মানসিকতার ব্যক্তি’ উল্লেখ করে নিজেদের অফিসিয়াল ফেইসবুক একাউন্ট থেকে একটি পোস্টও দেয় তারা। সেখানে জানানো হয় লোকটির নাম অসিত রায়, বৈদ্যবাটির বাসিন্দা, আর পেশায় সে একজন হকার। লোকটির সুষ্ঠু বিচারেরও আশ্বাস দেয় তারা।

এতক্ষণ যারা ভাবছিলেন ভারত হলো ‘মালাউনের দেশ’, ‘ধর্ষকের দেশ’, তাদের দেশে এরকম ঘটনা ঘটতেই পারে, তারা নিজেরা এবার নড়েচড়ে বসতে পারেন। কারণ লেখার শুরুতেই বলেছিলাম, গতকাল ফেইসবুকে এরকম দুইটি ঘটনার কথা উঠে এসেছে। এবং অপরটি ঘটেছে আমাদের বাংলাদেশেই। এবং তা রাজধানী ঢাকাতেই।

ফেইসবুক ভিত্তিক গ্রুপ ‘ডু সামথিং একসেপশনাল’-এ মাহফুজুর রহমান দীপু নামের এক ব্যক্তির দেয়া এক পোস্ট থেকে জানা যায়, গতকাল ভূঁইয়া পরিবহনে করে আসার সময় তিনি এক লোককে বাস থেকে দৌড়ে নেমে যেতে দেখতে পান। পরে ওই লোককে ধরে ফেলতে সক্ষম হন অপর দুই ব্যক্তি। জানা যায়, এক নারীর পাশে বসে নাকি সে ‘মাস্টারবেট’ করছিল। পোস্টদাতার ভাষ্যমতে, প্রমাণস্বরূপ তিনি নাকি ওই লোক যে সিটে বসেছিল, সেখানে গিয়ে জায়গাটি ভেজা দেখতে পান।

হস্তমৈথুন, বাসে নারী নিপীড়ন

দুইটি ঘটনাতেই অপরাধী শেষ পর্যন্ত ধরা পড়েছে। তাই অনেকেই বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখতে পারেন। কিন্তু সার্বিকভাবে বিবেচনা করলে, আসলেই কি বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখার কোন সুযোগ আছে? এতদিন আমরা রাস্তাঘাটে নারীদের উপর মৌখিক হয়রানির কথা শুনতাম, যৌন নির্যাতনের কথা শুনতাম। প্রকাশ্যে কোন নারীকে দেখে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি ও হস্তমৈথুনও অবশ্যই যৌন হয়রানি, তবে এটির ব্যাপারে এর আগে খুব একটা শোনা যায়নি। এবং এখন বিষয়টি দিনকে দিন কতটা জঘন্য পর্যায়ে চলে যাচ্ছে তা ভাবতেই ভয় লাগে।

আমাদের দেশের ঘটা ঘটনাটির ব্যাপারে আমরা বিস্তারিত কিছু জানি না, কিন্তু প্রিয়াংকা দাসের পোস্ট করা ভিডিওতে আমরা যে দৃশ্য দেখলাম, তা কি খুব সহজেই ভুলতে পারব? ইদানিং প্রায় প্রতিদিনই নারীদের রাস্তাঘাটে নানাভাবে হয়রানি বিষয়ক এক বা একাধিক পোস্ট দেখা যায়, যা দেখে অনেক নারীই মানসিকভাবে প্রচন্ড রকমের বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। একা একা রাস্তায় বেরোতে বা চলতে অনেকেই এখন আগের থেকে অনেক বেশি ভয় পান। তার উপর ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে হস্তমৈথুনরত অবস্থায় অসিত রায় নামক লোকটির যে জান্তব হাসির দৃশ্য দেখা গেল, তা দেখে নিশ্চিতভাবেই অনেক নারী মানসিক ট্রমার ভিতর দিয়ে যাচ্ছেন। আগামী দিনগুলোতে একা একা রাস্তাঘাটে চলা তাদের জন্য আরও অনেক বেশি কঠিন ও দুর্বিষহ হয়ে পড়বে।

এ কথা সত্য যে নারীরা ইতিমধ্যেই সাম্প্রতিক নানা ঘটনা দেখে মানসিকভাবে যেমন অনিরাপদ বোধ করছেন, তা হয়ত আমরা দূর করতে পারব না। কিন্তু তারা যাতে মানসিকভাবে আরও বিপর্যস্ত না হয়ে পড়েন, সেটি নিশ্চিত করার সুযোগ এখনও আমাদের সামনে রয়েছে। আসুন, উপরের দুইটি ঘটনা থেকে শিক্ষাগ্রহণ করি। আমাদের সামনে এমন কোন ঘটনা ঘটতে থাকলে আমরা যেন চুপ করে বসে না থাকি। নিজের সাথে, বা নিজের মা, বোন, প্রেমিকা বা স্ত্রীর সাথে ঘটছে না বলেই যেন আমরা দায় এড়িয়ে না যাই। আমাদের সামনে এমন কিছু ঘটতে দেখলে তখনই যেন আমরা অপরাধীকে হাতেনাতে ধরি, তাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে সোপর্দ করি। গতকালের ঘটনা দুইটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকুক। আর কোন জানোয়ার যেন রাস্তাঘাটে এমন ধৃষ্টতা প্রদর্শনের সাহস না পায়।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-