অভিজিৎ অভি

ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক শহর ঢাকা এর চারশ বছরের ইতিহাসে প্রায় ২০০ বছর অর্থাৎ জীবনকালের অর্ধেক সময়ই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ঢাকার বিভিন্ন ঐতিহাসিক ভবনগুলোয় এখনও ব্রিটিশ স্থাপত্যের ছাপ লক্ষ্য করা যায়। আর ঢাকার বিভ্ন্নি রাস্তায় এখনও রয়ে গেছে ব্রিটিশ কর্তাদের নাম। এসব পুরনো রাস্তায় যেন নামের সঙ্গে সেই আমলের ইতিহাসও খানিকটা জড়িয়ে আছে। তেমন কিছু রাস্তার সম্পর্কে আজ আমরা জানব।

১। ওয়াল্টার রোড: সূত্রাপুরের এই রোডটি একসময় বেশ বড় ছিল। পরে এর একাংশের নাম হৃষিকেশ দাস রোড এবং আর এম দাস রোড রাখা হয়। ওয়াল্টার সাহেব এর নামে এই রাস্তাটির নাম রাখা হয়েছিল। তিনি ১৮২৩ সালে ওয়াল্টার ঢাকার কালেক্টর ছিলেন। তাঁর প্রচেষ্টায় লোহারপুল নির্মিত হয়।

২। ফুলার রোড: রমনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার এই রোডটি সবার কাছে কমবেশি পরিচিত। এটি স্যার জোসেফ ব্যামফিল্ড ফুলারের নামে রাখা হয়। ফুলার ছিলেন ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের ফলে সৃষ্ট নতুন প্রদেশ পূর্ববঙ্গ এবং আসামের প্রথম লেফটেন্যান্ট গভর্নর।

৩। হেয়ার রোড: ওয়ারীর হেয়ার রোডের নাম রাখা হয়েছে ল্যান সেল্ট হেয়ার এর নামানুসারে। হেয়ার পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের গভর্নর ও ১৮৯৩ সালে ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন।

৪। র‌্যাঙ্কিন স্ট্রিট: ওয়ারীর এই রাস্তাটির নাম করা হয়েছে জে টি র‌্যাঙ্কিন এর নামে। ঢাকা জেলার ম্যাজিস্ট্রেট র‌্যাঙ্কিন ১৯০১-০৫ পর্যন্ত ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান ছিলেন।

৫। লিয়াল স্ট্রিট: পাটুয়াটুলীর লিয়াল স্ট্রিটের নাম এসেছে ডি. আর. লিয়াল এর নাম হতে। ১৮৬৬ সালে ঢাকার কালেক্টর ও ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটির এক্স এফিসিও চেয়ারম্যান লিয়ালের নামানুসারে এ নাম রাখা হয়।

৬। জনসন রোড: লক্ষ্মীবাজার ও বাংলাবাজার এর মাঝে এই রোডটির নাম রাখা হয়েছে লাটম্যান জনসন এর নামানুসারে। তিনি ১৮৯৩ সালে জনসন ঢাকা জেলার ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। ১৯০৯-১০ সালে জনসন বিভাগীয় কমিশনার হন।

৭। মিন্টো রোড: শাহবাগের মিন্টো রোড এর নাম রাখা হয়েছে লর্ড মিন্টোর নামে। মিন্টো ১৯০৫ থেকে ১৯১০ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর জেনারেল ও ভাইসরয় ছিলেন।

৮। সিম্পসন রোড: সদরঘাটের এ ই রোডটি মি. সিম্পসন এর নামানুসারে নামকরণ করা হয়েছে। সিম্পসন ১৮৭১ সালে ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার ছিলেন।

৯। লারমিনি স্ট্রিট: ওয়ারীর লারমিনি স্ট্রিট, ডব্লিউ আর লারমিনি এর নামে রাখা হয়েছে। তিনি ১৮৮৭ সালে ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার ছিলেন।

১০। র‌্যাম্পিনি স্ট্রিট: আর এফ র‌্যাম্পিনির নামে এই রোডের নামকরণ। র‌্যাম্পিনি একজন বেসামরিক কর্মকর্তা, ১৮৮৪ সালে নির্বচন প্রথা চালুর আগে তিনি ঢাকা পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন।

১১। বেইলী রোড: শান্তিনগরের বেইলী রোড এর নাম নিয়ে একটু সংশয় আছে। এটি কর্নেল বেইলী অথবা জে এইচ বেইলী এর নামে রাখা হয়ে থাকবে। কর্নেল বেইলী টিপু সুলতানের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন আর জে এইচ বেইলী ছিলেন বেঙ্গল পুলিশের ডিআইজি যিনি ওহাবী আন্দোলন দমন করেন।

১২। ইংলিশ রোড: নয়াবাজারের ইংলিশ রোড, ইংরেজি ভাষার নামে রাখা হয়নি। এটি একজন ব্যক্তির নামে রাখা হয়েছে। মি. ইংলিশ ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার ছিলেন।

১৩। ফ্রেঞ্চ রোড: এফ. সি. ফ্রেঞ্চ এর নামানুসারে নয়াবাজারের ফ্রেঞ্চ রোডের নাম রাখা হয়েছে। ১৯১৮ সালে তিনি ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার ছিলেন।

১৪। হার্নি স্ট্রিট: আরমানীটোলার এই রোডের নাম রাখা হয়েছে মি. হার্নের নামানুসারে। মি. হার্নে ছিলেন একজন আর্মেনিয়ান। তিনিও ঢাকার একজন বিভাগীয় কমিশনার।

১৫। স্যাভেজ রোড: মি. স্যাভেজ এর নামে রোডের নাম। তিনি ১৮৯৯ সালে ঢাকা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কমিশনার ছিলেন।

১৬। ওয়্যার স্ট্রিট: ওয়ারীর এই রোডের নাম হয়েছে মি. অয়্যার এর নামে যিনি ১৮৮৪ সালে ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন।

১৭। নর্থব্রুক হল রোড: ১৮৭৪ সালে ভারতের গভর্নর জেনারেল জর্জ ব্যারিং নর্থব্রুক ঢাকায় এলে তাঁর সম্মানে একটি ভবন নির্মিত হয়। নর্থব্রুকের নামানুসারে ভবন ও ভবনসংলগ্ন সড়কের নাম যথাক্রমে নর্থব্রুক হল এবং নর্থব্রুক হল রোড রাখা হয়।

অন্যান্য: এছাড়াও ঢাকায় ইংরেজি ভাষার শব্দ দিয়ে অনেক রাস্তার নাম রয়েছে যেমন মিউনিসিপ্যালিটি রোড, টয়েনবি সার্কুলার রোড, সেক্রেটারিয়েট রোড, অরফানেজ রোড, ওয়াটার ওয়ার্ক্স রোড, ডিস্টিলারী রোড, ভিআইপি রোড, পার্ক রোড, নর্থসাউথ রোড প্রভৃতি।

তথ্যসূত্র : কিংবদন্তির ঢাকা, নাজির হোসেন

Comments
Spread the love