বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে, বিগত বছরগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সড়ক নির্মাণে সবচেয়ে বেশি খরচ হয়েছে বাংলাদেশে। গত বছরের জুন মাসে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতি কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে প্রতিবেশি ভারত ও চীন, এমনকি ইউরোপের উন্নত দেশগুলোর চেয়ে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করে বাংলাদেশ।

বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, বাংলাদেশের সড়কগুলোতে চার লেনে কি.মি. প্রতি ব্যয় (ডলারে) ২৫ লাখ থেকে ১ কোটি ১৯ লাখ। অথচ চীনে তা ১৩ থেকে ১৬ লাখ, আর ভারতে মাত্র ১১ থেকে ১৩ লাখ। এমনকি ইউরোপের উন্নত দেশগুলোতেও এ খাতে ব্যয় মাত্র ২৫ থেকে ৩০ লাখের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।

এইসব পরিসংখ্যান থেকে মনে হতেই পারে, বাংলাদেশের সড়ক ব্যবস্থা বুঝি কত উন্নত! কিন্তু না। বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত। ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরামের সাম্প্রতিক এক জরিপ বলছে, এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সড়ক ব্যবস্থা সবচেয়ে খারাপ যেসব দেশের তার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। বাংলাদেশের নিচে অবস্থান করা এশিয়ার একমাত্র দেশটি নেপাল। জরিপে দেখা যাচ্ছে, উন্নত সড়ক ব্যবস্থার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে ১১৩তম।

তাহলে বুঝতেই পারছেন পাঠক, সড়ক নির্মাণ খাতে বাংলাদেশ কী পরিমাণ দুর্নীতি হয়ে থাকে।

এতক্ষণ তো জানলেন কেবল বিগত সময়ের গাণিতিক পরিসংখ্যান। এবার আপনাদেরকে জানাতে চাই একদম টাটকা কিছু খবর। তাহলে উপরের তথ্যগুলো আপনাদের জন্য হজম করা আরও সহজ হবে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে বলা হয়ে থাকে বাংলাদেশের অর্থনীতির লাইফলাইন। কারণ এই মহাসড়কের উপর দিয়েই পরিবহণ করা হয় দেশের আমদানী-রপ্তানীর ৯০% পণ্য। তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই মহাসড়কের গুরুত্ব অপরিসীম। এজন্যই ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বরে, বিএনপি সরকারের আমলে চার লেনে এই মহাসড়ক নতুন করে নির্মাণের মহাপরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়, যা শেষ হয় ২০১০ সালে, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় বসার এক বছর পর। এরপর শুরু হয় মাঠ পর্যায়ের কাজ। আর ছয় বছর লেগে যায় সে কাজ পুরোপুরি শেষ হতে।

২০১৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হয় ১৯২.৩০ কি.মি. দৈর্ঘ্যের এই মহাসড়ক নির্মাণের মহাযজ্ঞ। এতে খরচ হয় ৩৬০০ কোটি টাকা। যদিও প্রাথমিক বাজেট ছিল অর্ধেকেরও কম। এবং তিন বছরের মধ্যেই কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ ছিল এই মহাসড়কের নির্মাণকাজের সুষ্ঠু তত্ত্বাবধানে। বারবার নানা কারণে বন্ধ হয়ে যেতে থাকে কাজ, যার ফলে সময় ও অর্থ দুই-ই খরচ হয় দ্বিগুণেরও বেশি।

তারপরও অবশেষে ২০১৬ সালে চারলেনে উন্নীতকরণ প্রক্রিয়া শেষ হলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে দেশবাসী। কারণ এর ফলে বন্দর নগরী চট্টগ্রামের সঙ্গে রাজধানী ঢাকার সড়ক পথে যোগাযোগ সহজ, দ্রুত, যানজটমুক্ত ও উন্নততর হয়। কিন্তু দেশবাসীর সেই স্বস্তি খুব বেশিদিন দীর্ঘায়িত হয়নি। ছয় মাস যেতে না যেতেই বেহাল হয়ে পড়ে এই সড়কের অবস্থা। ২০১৭ সালের মাঝামাঝি থেকেই শুরু করতে হয় এই মহাসড়কের বিভিন্ন অংশের সংস্কার কাজ। এবং এখনও তা চলছে পুরোদমে।

কিন্তু এ ধরণের সংস্কার কাজের মাধ্যমে সাময়িকভাবে হয়ত মহাসড়কের অবস্থা কিছুটা হলেও সহনীয় রাখা যাচ্ছে, কিন্তু কয়েকদিন যেতে না যেতেই এর অবস্থা আবারও আগের মতই হয়ে যাচ্ছে। অথচ এই কাজেই খরচ হচ্ছে দশ কোটিরও বেশি টাকা। এবং আগামী পাঁচ বছরে এই মহাসড়কের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট ধরা হয়েছে ৯০০ কোটি টাকা।

উন্নত দেশগুলোতে একটি রাস্তা নির্মাণের পর অন্তত পাঁচ-ছয় বছর সেই রাস্তা নতুনের মত থাকে, নির্বিঘ্নে যান চলাচল করতে পারে। সেখানে ছয় বছর ধরে ৩৬০০ কোটি টাকা ব্যয় করে নির্মাণ করা একটি মহাসড়ক মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই এই অবস্থায় উপনীত হলো! অর্থাৎ এই মহাসড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে কী পরিমাণ দুর্নীতি করেছে সংস্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, তা সহজেই অনুমেয়।

এই প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্যতম প্রতিষ্ঠান, চীনের সিনো হাইড্রো করপোরেশনের কর্মকর্তা মোহাম্মদ বাচ্চু তাই বলেন, ‘আমি কোনদিন কল্পনাও করতে পারিনি এত অল্প সময়ের মধ্যে এই মহাসড়কের সংস্কারকাজ শুরু করতে হবে।’ বস্তুতই, দেশের খেটে খাওয়া মানুষে রক্ত জল করা করের টাকা দিয়ে নির্মিত একটি মহাপ্রকল্প যখন মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়, তখন সেটি বিশ্বাস করতে কষ্টই হয়। এবং হাতেনাতে প্রমাণ হয়ে যায় যে কেন বাংলাদেশ দুর্নীতিতে শীর্ষ দেশগুলির একটি।

এবার আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই আরও কিছু চমকপ্রদ তথ্য। ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা চার লেনের মহাসড়ক হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যয়বহুল মহাসড়ক, যেখানে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হচ্ছে ১৮৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। পুরো প্রকল্পটি শেষ করতে খরচ হবে অন্তত (এখন পর্যন্ত পাওয়া হিসাব অনুযায়ী) ১০ হাজার ৮৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা। ভবিষ্যতে যে এই অর্থের পরিমাণ আরও বাড়বে না, সে নিশ্চয়তা দিতে পারবে না কেউই।

এছাড়াও ২০১৬ সালে সংসদীয় কমিটিতে জমা দেওয়া সওজের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রস্তাবিত এলেঙ্গা-রংপুর চার লেন প্রকল্পে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। ২০১৫ সালে শুরু হওয়া জয়দেবপুর থেকে টাঙ্গাইল হয়ে এলেঙ্গা চার লেনে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হচ্ছে ৪৮ কোটি ৬ লাখ টাকা। এছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেনে কিলোমিটারপ্রতি গড় ব্যয় ১৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ চার লেন প্রকল্পে এই ব্যয় ২০ কোটি ৮২ লাখ টাকা।

আসলেই, সব সম্ভবের দেশ বাংলাদেশ। কেবল এই দেশেই সড়ক নির্মাণে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হতে পারে। অবশ্য প্রয়োজনের তুলনায় অধিক অর্থ ব্যয় হলেও খুব বেশি সমস্যা ছিল না, যদি বাস্তবে তার কোন প্রয়োগ দেখা যেত। যদি সাধারণ মানুষ কিছুটা হলেও উপকৃত হতো। কিন্তু বাস্তবে যদি দেখতে হয় যে এত টাকা খরচ করে, এতদিন বসে নির্মাণ করা সড়ক-মহাসড়কগুলো কয়েক মাস বা বছরের মধ্যেই চলাচলের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ছে, তখন সত্যিই ‘উন্নয়নের মহাসড়ক’ জাতীয় কথাগুলোকে খুব বড় ধরণের সারকাজম বলে মনে হয়!

তথ্যসূত্র- ডেইলি স্টার, বণিক বার্তা, ছবি কৃতজ্ঞতা- আনিসুর রহমান, ডেইলি স্টার 

Comments
Spread the love