সময়টা ১৯৪০। চারদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বাজছে। বিশ্বজুড়েই সংকেত দিচ্ছে এক ঝড় আসছে- ঝড়ে ঘরবাড়ি সবকিছু উড়িয়ে নিয়ে যাবে। গুজবপ্রিয় ঢাকা শহরে চায়ের ষ্টল আর আড্ডার প্রধান বিষয় যুদ্ধ। হিটলার সাব তখন তুমুল জনপ্রিয় ঢাকাই কৌতুক, সামাজিক দৈনন্দিন জীবনে। হিটলারের সঙ্গে যুদ্ধ করার সামরিক জোর ব্রিটিশদের তখন ভালোই ছিল। তারপরও চেম্বারলিন ১৯৩৩ সালে হিটলারের সঙ্গে দেখা করলেন। দু’জনের সমঝোতা হলো। হিটলার মেনে নিলেন চেম্বারলিনের শর্তাদি। কথা দিলেন চেকশ্লোভাকিয়াতে আর ভাগ বসাবেন না। ব্যাপারটা তখন আপিজমেন্ট পলিসি হিসেবে চিহ্নিত হল। কিছু দিন পর গদি উল্টালো চেম্বারলিনের। চার্চিল হলেন নয়া প্রধানমন্ত্রী। ভোজবাজির মতো পাল্টে গেল পুরো দৃশ্যপটই। হিটলার চেকশ্লোভাকিয়া দখল করে বসলেন। এক পা বাড়িয়ে ১৯৩৯ সালে ১লা ফেব্রয়ারী চেপে ধরলেন পোল্যান্ডের ঘাড়। বেঁজে উঠলো দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের ঘন্টি। লন্ডনের তখন ক্রাহি অবস্হা। একটা কথা সে সময় খুব প্রচলিত ছিল, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূর্য কখনো অস্ত যায় না। কিন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সেই সূর্য তখন অস্তাচলের পথে।

মহাযুদ্ধের ঢেউ এসে লাগলো আমাদের দেশেও। আমরা তখন মিত্রশক্তির অন্তর্ভূক্ত হওয়ায় জাপানি আক্রমণের শংকা ছিল। সেই শংকা আশংকাই থেকে গেল। জাপানিরা আর এলো না। এলেন স্যার হাবাট রিড। গভর্নর অব বেঙ্গল। কলিকাতা থেকে সোজা ঢাকায়। নিয়মমাফিক ঢাকার স্কুলের ছেলেরা সারিবদ্ধভাবে দাড়িয়ে তাকে স্যালুট জানালো। নতুন গভর্নর হাবার্টের স্ত্রী লেডি হাবার্ট ছিলেন সুন্দরী ইংরেজ মহিলা। তিনি ঢাকায় এসেই মোটর শো করার উদ্যোগ নিলেন। এদেশে আগে মোটর শো হয়নি। তাই প্রিয়তমার মন রক্ষায় গভর্নর সাহেব নির্দেশের চিঠি দিলেন মোটর শো আয়োজনের। ঢাকা শহরে তখন গাড়ী! ঘোড়া পালতেই যে শহরের চানাবুট শেষ হয়, তার আবার মোটর শো! শহরে গাড়ী বলতে নবাব পরিবার, বড় বাবু, জমিদার আর খান বাহাদুরদেরই ছিল গুটি কয়েক গাড়ী। তাদের আমন্ত্রণ জানানো হল মোটর শো’তে অংশ নিতে। শহরে ভয় ছিল জাপান তার পূর্ব ঘাঁটি বার্মা থেকে আক্রমন করতে পারে। খবর এলো,কক্সবাজারে বোমা পড়েছে। তারপরও দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যেই ইংরেজ সাহেবের আদেশ তামিল করার জন্য ঢাকার গাড়ীওয়ালারা আগ্রহ প্রকাশ করলো তারা মোটর শো’তে অংশ নিবে। বার্মিজরা আকিয়াব, বুথিডং আর রাথিডং থেকে দলে দলে চলে এলো কক্সবাজারে। যুদ্ধ এখনো অনেক দূরে আছে ঢাকা থেকে। সেজন্য কারও কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। সবাই উঠে পড়ে লাগল মোটর শো নিয়ে।

ঢাকায় তখন মির্জা আবদুল কাদের সরদারের একটা ব্যান্ডনিউ অস্টিন গাড়ী ছিল। তিনিও ঠিক করলেন মোটর শো’তে অংশ নিবেন। পরামর্শ করতে বসলেন মাস্টার মোস্তফা হোসেন, লরি মাস্টার অমূল্য বাবু আর খাজা ইসমাইল সাহেবের সাথে। কেমন হবে গাড়ী, কেমনভাবে সাজালে গাড়িটা শোর জন্য যোগ্য হবে ইত্যাদি। মাস্টার মোস্তফা হোসেন ছিলেন করিতকর্মা লোক। লায়ন থিয়েটারে ষ্টেজে অনেক বছর ধরে কাজ করতেন। ছিলেন ষ্টেজ ডিরেক্টর। যুদ্ধের সময় কাজ চলে গেলে, লায়ন থিয়েটারের কলাকুশলীরা অসহায় হয়ে পড়েন। সে সময় মোস্তফা হোসেন একটা বক্স ক্যামেরা নিয়ে এলেন। ইংরেজ সোলজাদের ছবি তুলতেন ভিক্টোরিয়া পার্কে। মানে,,’ওয়ান মিনিট ফটো ক্যামেরা কামিং বরাবর’! যুদ্ধের সাথেই যার বসবাস তাকেই দেয়া হল অস্টিন গাড়ী সাজসজ্জার দায়িত্ব। সিদ্ধান্ত হলো যুদ্ধকে প্রতীকী করে ‘সাপকে বধ করছে ময়ূর- এই দৃশ্যটা গাড়ীতে ফুটিয়ে তোলা হবে। জার্মানির হিটলার সাপ আর ব্রিটিশ সম্রাট ময়ূরের প্রতীক। শান্তির প্রতীক ময়ুর সেই সাপকে মেরে ফেলছে।

ঢাকায় সে সময় জোয়াল প্রসাদের একটা সাজসজ্জার দোকান ছিল। তলব করা হলো তাকে। হিসাব করে দেখা গেলো গাড়ী সাজাতে যত পালক লাগবে তা ঢাকায় পাওয়া সম্ভব না। খবর পাঠানো হলো চিটাগাং লায়ন সিনেমাতে। কিছুদিনের মধ্যেই চিটাগাং থেকে ময়ুরের পালক এসে হাজির। তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দেয়া হল ফটিক চন্দ্র নন্দীর ওপর। ফটিক বাবু নাওয়া-খাওয়া ভুলে সোমরসে সিক্ত হয়ে বসতেন আদলটা আঁকতে, তারপর কাঠামো দিলেন। আস্তে আস্তে নিল সেপটা। বিপদ একটা হল, ময়ুরের মুখটা সোজা স্হির রাখা যাচ্ছিল না। পড়ে যাচ্ছিল বারবার। কি আর করা, শেষ পর্যন্ত মাথাটা লাল ফিতা দিয়ে গাড়ির ব্যাক ডালার সাথে বাঁধা হল। গাড়ীর পাদানিতে ঢাল আকারে দেয়া হলো পালক। আর বডিতে দুটো চমৎকার পাখা। মাসখানেকে পুরো অবয়য দাড়িয়ে গেল।

অবশেষে এলো সেই দিন। ১৯ জুলাই ১৯৪০। মোটর শো প্রদর্শনী হলো রমনার রেসকোর্স ময়দানে। সুন্দরী লেডি হাবার্ট এসে শো উদ্বোধন করলেন। ঘুরে ঘুরে শো দেখলেন। ঢাকার গন্যমান্য প্রায় সবারই গাড়ী ছিল প্রদর্শনীতে। অনুমানিক ২০টা গাড়ী অংশ নেয় শো’তে এবং সবগুলোই সুসজ্জিত। সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা বিশ্বযুদ্ধকে প্রতীকী করে সজ্জিত করার জন্য অস্টিন গাড়ীটি লেডি হাবার্টের মনে ধরে যায়। প্রশংসা পেল মির্জা আবদুল কাদের সরদারের দৃষ্টিনন্দন আইডিয়া। ব্যাস, সব গাড়ীকে টেক্কা দিয়ে প্রথম প্রাইজটা পেল অস্টিন গাড়ীটা। সেইদিন রাতে পুরো ইসলামপুর মহল্লা যেন জেগে উঠলো। কাদের সরদার থাকতেন আওলাদ হোসেন লেনে। হ্যাজাক লাইট জ্বালিয়ে সঙ্গী সাথীর মিছিল নিয়ে হাজির হলেন মাকে সালাম ও দোয়া নিতে। পরের সপ্তাহে এ উপলক্ষে এক বিরাট পার্টি হলো। ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট এলেন পার্টিতে। বাদ গেল না শহরের গন্যমান্যরাও। ঢাকার মোটর শো’র বিজয়োত্তর উৎসবের কাছে মার খেয়ে গেল মহাযুদ্ধের দামামা। এত কিছুর পরও মানুষ বলতে ছাড়েনি,

“সা,রে,গা,মা,পাধানি
বোম ফালাইছে জাপানি
বোমের মইধ্যে কেউটা হাপ
বিটিশ কয় বাপরে বাপ।”

Comments
Spread the love