অজ্ঞাত দুর্বৃত্তদের দ্বারা আক্রান্ত হয় আমাদের প্রাণের শহর ঢাকা। একদিকে শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে বিচ্ছিন্নভাবে বোম ব্লাস্টের খবর আসতে থাকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাছে। অন্যদিকে অপরাধ জগতের সাথে জড়িত কেউ কেউ আবার নৃশংসভাবে খুন হতে থাকে এ শহরে। উদ্বিগ্ন পুলিশ ডিপার্টমেন্ট যোগসূত্র খুঁজে পায় বোম ব্লাস্টের সাথে এসব পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের। যার ফলে পুলিশের সবচেয়ে চৌকস, মেধাবী অফিসারদের এ কেসের দায়িত্ব দেয়া হয়। শুরু হয় তাদের দুর্দান্ত অভিযান। ইতিমধ্যে দুর্বৃত্তরা আতংক ছড়িয়ে দিতে পেরেছে গোটা শহরে। পুঁতে রাখা এসব বোমার বিস্ফোরণে প্রাণ ঝরছে নিরপরাধ মানুষের। একটি টেলিভিশন চ্যানেলের ক্রিমিনাল রিপোর্টার চৈতি নিজেই নিয়েছেন এ রহস্যের মোটিভ উদ্ধারের দায়িত্ব।

থ্রিলার ঘরনার এই মুভিতে কেসের দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসারদের মধ্যে প্রধান আকর্ষণ ব্যোম ডিসপজাল ইউনিটের চীফ ইনচার্জ আবির বড়ুয়া। এই আবির চরিত্রে অভিনয় করেছেন এসময়ের জনপ্রিয় নায়ক আরেফিন শুভ। একেবারে অভিজ্ঞ একজন বোমা বিশেষজ্ঞের মধ্যে যতটুকু দক্ষতা থাকা দরকার, যতটা আত্মবিশ্বাস আর প্রয়োজনের সময়ে ত্যাগ তিতিক্ষা আর সাহসিকতার নিদর্শন প্রদর্শন জরুরী তার সবটাই খুঁজে পাওয়া যায় আবির চরিত্রে। তবে এক্ষেত্রে দেশের স্বার্থে সবচেয়ে বেশী ত্যাগ স্বীকার করতে দেখা যায় দুর্বার অকুতোভয় সোয়াট টিমলিডার আশফাককে। নিঃসন্দেহে শরীরী ভাষায় তিনি তার বাহিনীকে অবশ্যই এক ভিন্ন উচ্চতায় তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। আর এই সক্ষমতা দৃশ্যমান হয়েছে মুভির অসাধারন সিনেমাটোগ্রাফির কারনে। চরিত্রটির দৃশ্যায়নে কৌশলী ক্যামেরা মুভমেন্টের জন্য দর্শক নিজেরাও সোয়াট মিশনে চাক্ষুষ উপস্থিত থাকার থ্রিলিং অনুভব করে। অর্থাৎ দর্শক খুব সহজেই অভিযানে অংশগ্রহনকারী হিসেবে নিজেকে ভাবতে পারে। সিনেমাটোগ্রাফির প্রাণবন্ততার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যই যে এটি।

আলফ্রেড হিচককের সাসপেন্স তৈরির যে কৌশল, তার পুরোটাই নির্মাতা দীপঙ্কর দিপন যথার্থভাবে ব্যবহার করেছেন তার প্রথম ফিচার ফিল্ম ঢাকা অ্যাটাকে। ফলস্বরূপ জনমনে বোমা বিস্ফোরণ আতংকের পূর্ববর্তী মুহূর্তের টানটান উত্তেজনা সিনেমা হলের পর্দা ভেদ করে হলে উপস্থিত দর্শকের মনেও অজানা আশংকায় বারেবারে উঁকি মেরে গেছে অনায়াসে।

কেসের আরেক দায়িত্বপ্রাপ্ত গোয়েন্দা অফিসার বরাবরই ভরাট কণ্ঠের গভীরতায় সন্দেহভাজন আসামীদের জিজ্ঞাসাবাদ অংশে তার বুদ্ধিমত্তার প্রমাণ দিয়েছেন। কোনরকম শারীরিক আঘাত না করেই শুধুমাত্র মানসিকভাবে আসামিকে বিপর্যস্ত করে বারবার উদ্দেশ্য হাছিলে সফল হয়েছেন এই ভদ্রলোক। চরিত্রের গভীরতা বিবেচনায় এবং সংলাপের দিক থেকে নিঃসন্দেহে চরিত্রটি শতাব্দী ওয়াদুদের অন্যতম সেরা একটি কাজ।

অফিসার আশরাফের স্ত্রী চরিত্রে কাজী নওশাবা অভিনয় করেছেন একেবারেই দুর্দান্ত। আহ্লাদী , রোমান্টিক এই চরিত্রটি প্রথম থেকেই অত্যন্ত সাবলীল এবং সিনেমার শেষাংশে যথেষ্ট উদ্বিগ্নতার কারন সৃষ্টি করেই গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রত্যাশিত এক প্রতীকী চরিত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। যদিও শট কণ্টিনিউটিতে তার অঙ্গসজ্জায় কিছুটা অসামাঞ্জস্য ছিল বলে মনে হয়েছে।

কাহিনীর গল্পে ছোট ছোট ক্লু দিয়ে কিছু সিন পরে তার সাথে বেশ ভালভাবে লিঙ্কআপ করা হয়েছে। যা দর্শককে একটি রহস্য গল্পের অনুভূতি দেয়। তবে বিরতির পরবর্তী অংশে কাহিনীর ধারাবাহিকতায় কিঞ্চিৎ বিঘ্ন ঘটেছে। ঢাকা অ্যাটাকের সংলাপ নিয়ে কথা বলতে গেলে বলব, শুধুমাত্র এক গোয়েন্দা অফিসার ছাড়া বাকিদের সংলাপে খুব বেশি বিশেষত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। বরং ক্রিমিনাল রিপোর্টার  চৈতির কিছু সংলাপ ছবির দ্বিতীয় অংশে অসংলগ্ন ঠেকেছে এবং বিরক্তির উদ্রেক ঘটিয়েছে। শ্বাসরুদ্ধকর একেবারে গুরুত্বপূর্ণ সব মুহূর্তেও সাংবাদিকের এই উপস্থিতি ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে পুলিশের কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি হিসেবেই প্রতীয়মান হয়েছে। এছাড়া  হাসপাতালের সামনে পুঁতে রাখা বোমা উদ্ধারে যখন পুলিশ ব্যস্ত, সেসময়ের রোমান্টিক ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক দর্শকদের উদ্ভুত পরিস্থিতির সাথে মনসংযোগে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে বলেই মনে হয়। তবে সর্বোপরি ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর যথেষ্ট রকমের ভাল ছিল।

গানের মিউজিকে টিকাটুলির মোড়ে আইটেম ড্যান্সে লামিয়া মিমো তার পারফর্মেন্সে দর্শকদের একদম বুঁদ করে রেখেছেন খানিক সময়ের জন্য। গাড়ি ছিনতাইকারী রাসেলও ভিলেনীয় অঙ্গভঙ্গিতে দারুন হাস্যরস সঞ্চার করেছে এই গানে। এছাড়াও স্কুলবাসে দৃশ্যায়িত ছবির প্রথম গানটি এবং একদম শেষের টাইটেলকার্ডের গানটি অবশ্যই ইউনিক বলতে হবে। পক্ষান্তরে বাদবাকি গানের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলাই যায়।

আসগরের মেকাপ, কস্টিউম এবং বাহারি চুল যদিও টিপিক্যাল বাংলা সিনেমার ভিলেনদের কথাই মনে করিয়ে দেয়। তবে ঢাকা অ্যাটাকের মূল ভিলেন কিন্তু সম্পূর্ণই ভিন্ন এক চরিত্র। একটা সময় মনে প্রশ্ন হতে পারে ছবির প্রধান আকর্ষণ অফিসার আবির বড়ুয়া, নাকি নৃশংস ধুরন্ধর ঠাণ্ডা মাথার খুনি জিসান? এই প্রশ্নের উত্তর নির্বাচনে দর্শকও বোধহয় হিমশিম খাবে বরাবর। রহস্যময় জিসান চরিত্রটি সাধারন থেকেও অসাধারন। হেজেল আই আর স্মার্ট আউটলুকে তিনি পৈশাচিক, ছদ্মবেশে পারদর্শী এক দুর্দমনীয় ব্লাফমাস্টার। যার কিনা পুলিশকে ব্লাফ দেয়ায় জুড়ি মেলা ভার। তবে তিনি আবার অতীতের অনাকাঙ্ক্ষিত এক পরিস্থিতির স্বীকারও বটে। আবার ছোটবেলা থেকেই তার মধ্যে অপরাধ প্রবণতা ছিল।  সবকিছু মিলিয়ে সম্ভবত আমাদের দেশীয় সিনেমায় কোন ভিলেন ক্যারেক্টারের এত গভীরতা এর আগে আর সেরকমভাবে দেখা যায়নি। কাহিনীকার যেন তার সুনিপন দক্ষতায় অত্যন্ত যত্ন নিয়ে এই ভিলেনকে স্ক্রিপ্টে তুলে ধরেছেন।

নির্মাতাও যেন ভিন্নধাঁচের এই ভিলেনকে পর্দায় তুলে ধরেছেন অত্যন্ত চমকপ্রদভাবে অভিনব উপায়ে দর্শকমনে আকর্ষণ তৈরি করে। ভিলেনকে দেখার জন্যও যে দর্শক উৎকণ্ঠিত হয়ে অপেক্ষা করতে পারে তার নিদর্শন এই ঢাকা অ্যাটাক সিনেমাটি। ভিলেনের পতনে যেমন উল্লাস করা যায়, তেমনি ভিলেনের চাতুর্যেও মুগ্ধ হওয়া যায়। ঢাকা অ্যাটাকের শেষ দৃশ্যই যেন তার প্রমাণ বহন করে। ঢাকা অ্যাটাক সিনেমার শুরুতে যে মাকড়শার জালের বিস্তৃতি দেখানো হয় তার পতন শেষ দৃশ্যে এসে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অকুতোভয় নির্ভীক অফিসারদের হিরোইজমের মাধ্যমেই শেষ হয়। আর খুব সম্ভবত এর সিকুয়াল নির্মাণেরও একটি ইঙ্গিত দেয়।

চলচ্চিত্রটির পরিসমাপ্তি ঘোষণার ঠিক পূর্বমুহূর্তে বড়পর্দায় “In cinemas 2019” লেখাটি দেখে জিসানের ঐ সংলাপটিই এখন থেকে তাহলে বিড়বিড় করে পড়তে শুরু করা যাক…

Let the countdown begin

4….3…2…1

Comments
Spread the love