পশ্চিমবঙ্গে আশির দশক পর্যন্ত সিনেমা হলের সংখ্যা ছিল ৭৫০ এর মত। অধিকাংশ সিনেমা হলই গড়ে উঠেছিল উত্তম-সূচিত্রা জুটিকে কেন্দ্র করে। উত্তম কুমারের অকাল মৃত্যু এবং সূচিত্রা সেনের স্বেচ্ছা নির্বাসনে একটা বিশাল শূন্যতা আসে পশ্চিমবঙ্গের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে, যেটা টলিউড নামে পরিচিত। এরপরের ২৫-৩০ বছর অনেক ভাঙা গড়ার মধ্য দিয়ে গেছে টলিউড।

একটা সময় ছিল যখন বাজার টিকিয়ে রাখার জন্য একের পর এক সস্তাদরের সিনেমা তৈরী হয়েছে, যেগুলোতে সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেনের মত পরিচালকদের নির্মিত, কিংবা উত্তম কুমার, সৌমিত্র বন্দোপাধ্যায়, জহর রায়, ভানু বন্দোপাধ্যায় অভিনীত সিনেমার নান্দনিকতা, শিল্পমানের লেশমাত্র ছিল না। এই সময়টায় প্রধান নায়ক হিসেবে ছিলেন মিঠুন চক্রবর্তী, প্রসেনজিৎ, চিরঞ্জিত, তাপস পালের মত অভিনেতারা। তাদের সময়ে বাংলা সিনেমা পুরনো গৌরব হারাতে শুরু করে।

তারপরও অন্তত ইন্ডাস্ট্রি টিকিয়ে রাখার সুবাদে সেগুলো মেনে নিচ্ছিল সকলেই। এবং এগুলোরই পাশাপাশি ঋতুপর্ণ ঘোষ, গৌতম ঘোষ বা অপর্না সেনের মত পরিচালকরা এসে ইন্টেলেকচুয়াল সিনেমা নির্মাণ আরম্ভ করেন। ফলে মোটা দাগে বাংলা সিনেমায় দুইটি শ্রেণীবিভাগ গড়ে ওঠে – কমার্সিয়াল সিনেমা ও আর্ট ফিল্ম – যা কিনা পৃথিবীর আর কোন ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতেই এতটা প্রকটভাবে দৃশ্যমান নয়।

তবে এসব করেও বাংলা সিনেমাকে টিকিয়ে রাখা মুশকিল হয়ে ওঠে ক্রমশই। প্রযুক্তির উৎকর্ষতা ও মানুষের জীবনযাত্রার আমূল পরিবর্তনের কারণে, এখন আর সিনেমা বাঙালির প্রধান বিনোদনের মাধ্যম নয়। সিনেমার তুলনায় টিভি সিরিয়ালের জনপ্রিয়তা ও মার্কেট ভ্যালু কয়েকগুণ বেশি। এমন পরিস্থিতিতে গোটা পশ্চিমবঙ্গে সিনেমা হলের সংখ্যা ৭৫০ থেকে কমে ২৫০-এ এসে দাঁড়িয়েছে।

গত চার বছরের হিসাব যদি করা হয়, ২০১৩ থেকে ২০১৫, প্রতি বছরে টলিউড লস করেছে ৭০ কোটি টাকা করে। ২০১৬ সালে লসের পরিমাণ ১০০ কোটি ছাড়িয়েছে। এর প্রধান কারণ হল, পশ্চিমবঙ্গে বাংলা সিনেমা তার বাজার হারিয়েছে। তার ওপর আবার টিকে থাকার জন্য আজকাল তাদের একই সাথে হলিউড, বলিউড ও দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার সাথে প্রতিযোগিতা করতে হয়। 

টলিউডে একেকটা কমার্সিয়াল সিনেমার বাজেট গড়ে ২ থেকে ৬ কোটি হয়ে থাকে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পশ্চিমবঙ্গে সিনেমার বাজার হলো বড়জোর দেড় কোটি টাকার। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বিগ বাজেটের কোন সিনেমাই লাভের মুখ দেখে না। হাল আমলে স্যাটেলাইট রাইটের মাধ্যমে বাজেট কিছুটা রিকভারি করা গেলেও, দিনশেষে খুব কম বিগ বাজেটের সিনেমাই মাইনাস থেকে প্লাসের ঘরে আসতে পারে। 

এরকম একটা সময় এসে টলিউড তাক লাগিয়ে দিচ্ছে নতুন ঘরানার এক ধরণের সিনেমা তৈরী করে। ইন্ডাস্ট্রিতে এসেছে কৌশিক গাঙ্গুলি, সৃজিত মুখার্জী, অঞ্জন দত্ত, অনীক দত্ত, মৈনাক ভৌমিক, শিবপ্রসাদ-নন্দিনী রায়, অরিন্দম শীল এদের মত কিছু পরিচালক, যাদের পরিচালিত সিনেমাগুলো ঠিক কমার্সিয়ালও নয়, আবার অফ ট্র্যাকও নয়। এদের সিনেমায় গানবাজনা, ক্ষেত্রবিশেষে এমনকি নাচানাচিও থাকে, আবার কাহিনীতে কিছু চিন্তা উদ্রেককারী কন্টেন্টও থাকে। এবং সবচেয়ে বড় কথা, এইসব সিনেমার স্ক্রিপ্ট দক্ষিণী সিনেমার কপি নয়। হয় অরিজিনাল স্ক্রিপ্ট, নয়ত সাহিত্য থেকে অনুপ্রাণিত।

বাংলা সিনেমার ঘোর দুর্দিনেও শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত বাঙালি দর্শককে টার্গেট অডিয়েন্স বানিয়ে বেশ ভালোই জাঁকিয়ে বসেছে এইসব নতুন ঘরানার সিনেমা। ওপেনটি বায়োস্কোপ, ফড়িং, বাইশে শ্রাবণ, চতুষ্কোণ, বেডরুম, রঞ্জনা আমি আর আসব না, বং কানেকশন, ভূতের ভবিষ্যৎ, আশ্চর্য প্রদীপ, মুক্তধারা, বেলাশেষে, প্রাক্তন, শব্দ, বাস্তুসাপ, আবর্ত, রাজকাহিনী – গত কয়েক বছরে ভালো বাংলা সিনেমার নাম বলে শেষ করা যাবে না। এখানে ভালো বলতে বক্স অফিসে কেমন সাড়া ফেলেছে তা নির্দেশ করা হচ্ছে না। ক্রিটিকালি এক্লেইমড কিনা আর সাধারণ মধ্যবিত্ত শিক্ষিত দর্শকের ভালো লেগেছে কিনা তা বোঝানো হচ্ছে। ইন্টেলেকচুয়াল আর পপুলার ঘরানার মাঝামাঝি অবস্থানরত এইসব সিনেমা নিয়মিত ভারত ও ভারতের বারের বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসব থেকে সম্মানজনক পুরস্কারও নিয়ে আসছে। 

তবে সাম্প্রতিক সময়ে টলিউডের জীয়নকাঠি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে গোয়েন্দা কাহিনী নির্ভর সিনেমা। সন্দীপ রায় তো ফেলুদাকে নিয়ে নিয়মিত সিনেমা বানাচ্ছিলেনই, এর পাশাপাশি ২০০৮ সালে অঞ্জন দত্ত চিন্তা করেন বাঙালির সর্বাধিক প্রিয় গোয়েন্দা চরিত্র ব্যোমকেশকে নিয়ে একটা ফ্র্যাঞ্চাইজি শুরু করার। সে ফ্র্যাঞ্চাইজি এতটাই সফল হয়েছে যে অঞ্জন দত্ত একাই গত আট বছরে পাঁচটা ব্যোমকেশ করেছেন। তার দেখাদেখি অরিন্দম শীলও এখন ব্যোমকেশকে নিয়ে আরেকটা ফ্র্যাঞ্চাইজি খুলে বসেছেন, যেখান থেকে ইতিমধ্যে দুইটি সিনেমা রিলিজ পেয়ে গেছে। এর পাশাপাশি টুকটাক আরও কিছু সিঙ্গেল ব্যোমকেশ হয়েছে, যার একটি নির্মাণ করেছিলেন স্বয়ং ঋতুপর্ণ ঘোষও।

এছাড়া আরও অনেকগুলো গোয়েন্দা চরিত্র সাম্প্রতিক সময়ে বড় পর্দায় এসেছে। যেমন শীর্ষেন্দুর শবর, সুনীলের কাকাবাবু, নীহাররঞ্জন গুপ্তের কিরীটি, সমরেশ মজুমদারের অর্জুন, সমরেশ বসুর গোগোল, মোস্তফা সিরাজীর কর্ণেল। এমনকি খুব শীঘ্রই হয়ত সুচিত্রা ভট্টাচার্যের মিতিন মাসীকেও দেখা যাবে রূপালী পর্দায়। এখানেই শেষ নয়। গোয়েন্দা বা থ্রিলার ঘরানার অরিজিনাল স্ক্রিপ্ট নিয়েও সিনেমা হচ্ছে, যেমন সাহেব বিবি গোলাম, উড়োচিঠি, চোরাবালি, ষড়রিপু ইত্যাদি। 

সবমিলিয়ে টলিউডে এখন গোয়েন্দা কাহিনীর ভরভরন্ত মৌসুম। সারা বছর আর সব সিনেমা ফ্লপ হলেও, গোয়েন্দা কাহিনী নির্ভর সিনেমা ঠিকই লাভের মুখ দেখছে। উদাহরণস্বরূপ গত পুজোয় মুক্তি পাওয়া অঞ্জন দত্তের ব্যোমকেশ ও চিড়িয়াখানা সিনেমাটির কথা বলা যায়। মোট পাঁচটা সিনেমা রিলিজ পেয়েছিল পুজোয়। তার মধ্যে এটিই সবচেয়ে কম বাজেটের। এবং এই সিনেমা নিয়ে কলকাতায় বিন্দুমাত্র প্রচার প্রচারণা হয়নি। রাস্তায় কোন পোস্টার পর্যন্ত লাগানো হয়নি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেছে, বাঙালি সপরিবারে পুজোর ছুটিতে আর কোন সিনেমা দেখতে যাক আর নাই যাক, ব্যোমকেশ ও চিড়িয়াখানা দেখতে ঠিকই গেছে। কিংবা ক্রিস্টমাস ও স্কুল ফাইনালের বন্ধে রিলিজ পাওয়া ব্যোমকেশ পর্ব ও ডাবল ফেলুদা, দুটোই রমরমিয়ে চলেছে, একটা সিনেমা আরেকটা সিনেমাকে বিন্দুমাত্র প্রভাবিত করেনি।

মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, কলকাতায় গোয়েন্দা কাহিনী নির্ভর সিনেমার এই জয়যাত্রার পেছনে কারণ কী? এক অংশের মতে, এ হলো বাঙালি শিক্ষিত মধ্যবিত্তের চিন্তাধারার পরিবর্তন। তারা আর প্রেম ভালোবাসা কিংবা একশন নির্ভর সিনেমা দেখতে আগ্রহী নয়। তারা দেখতে চায় এমন সিনেমা যাতে একাধারে মানবিক আবেদন আছে, মাথা খাটানোর সুযোগ আছে, আবার কিছুটা সাহিত্যমূল্যও আছে। আর এই সব চাহিদাই বেশ ভালোভাবে পূরণ করতে পারে ব্যোমকেশ, ফেলুদা বা শবরের সিনেমাগুলো।

বিশ্লেষকদের মধ্যে আরেক অংশের মনোভাব আবার কিছুটা আক্রমনাত্মক। তাদের মতে, ভারতবর্ষে বাঙালিদের অবস্থা বর্তমানে খুবই শোচনীয়। ব্যবসা, চাকরি, শিক্ষা সকল ক্ষেত্রেই অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের কাছে মার খেয়ে যাচ্ছে বাঙালিরা। আর তার ফলে বাঙালিরা একধরণের ফ্রাস্ট্রেশন বা ডিপ্রেশনে ভোগে, যা থেকে তারা সাময়িক মুক্তি পায় গোয়েন্দা কাহিনীনির্ভর সিনেমাগুলো দেখে। কেননা একমাত্র এইসব সিনেমাতেই বাঙালিকে সংস্কৃতি ও আচার আচরণের দিক থেকে তাদের প্রকৃত রূপে চিত্রায়িত করা হয়, পাশাপাশি বাঙালিকে বুদ্ধিমান জাতি হিসেবেও উপস্থাপিত করা হয়, যা দেখে দর্শকেরা এক ধরণের ইগো স্যাটিসফেকশন লাভ করতে পারে।

তবে অন্তরালের কারণ যাই-ই হোক না কেন, এ কথা অনস্বীকার্য যে টলিউডের বর্তমান দুরাবস্থার দিনে একমাত্র আশার প্রদীপ, একমাত্র ট্রাম্পকার্ড গোয়েন্দা কাহিনী নির্ভর সিনেমাগুলোই। কিন্তু কথায় আছে, অতিভোজনের ফলে অমৃতেও অরুচি চলে আসে। তাই অদূর ভবিষ্যতে বাঙালি যদি গোয়েন্দা কাহিনীর ওপর থেকেও মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। আর তখন টলিউডের সর্বনাশের ষোলকলা পূর্ণ হবে। সম্ভবত সে কারণেই তারা সময় থাকতে থাকতেই বাংলাদেশের বাজার দখল করতে উঠেপড়ে লেগেছে!

Comments
Spread the love