(১)

আপনার শরীর খারাপ হলে, অসুখ-বিসুখ হলে আপনি কী করেন? আর যাই করেন, নিশ্চয়ই কোনো “ফেসবুক সেলিব্রেটির” কাছে সমাধান চান না, তাই না? নিশ্চয়ই আপনি ডাক্তারের কাছে যান, ওষুধ খান। এক পর্যায়ে ঠিক হয়ে যায় আপনার শরীর। তাহলে, প্রশ্নটা হচ্ছে- মনের সমস্যা হলে সেলিব্রেটির ইনবক্সে নক করার মানেটা কী? ভেবে দেখেছেন বিষয়টা কখনো?

টপিকটা বেশ ইম্পরটেন্ট। একটু মন দিয়ে পড়েন লেখাটা।

(২)

আমরা একটা অদ্ভুত পৃথিবীতে বাস করি। এখানে কারো হাত বা পা ভেঙ্গে গেলে সেটার কেয়ার নেয়ার জন্য বহু মানুষ দৌড়িয়ে আসবে। কিন্তু কারও মন ভেঙ্গে গেলে সেটার কেয়ার নেয়ার জন্য কেউ আসবে না। সবাই সেটাকে ইগনোর করে যাবে। হয়তো পাশে মানসিক শক্তি দেয়ার মতো কিছু বন্ধু-বান্ধব পাবেন। তবে সেটা কোনো সলিউশন না। শুধু মোটিভেশনাল কথাবার্তা দিয়ে, স্বান্তনা দিয়ে বা আনন্দ-উল্লাস করে, নতুন জায়গায় ঘুরতে গিয়ে মনের ক্রিটিক্যাল সমস্যা ঠিক করা অসম্ভবের কাছাকাছি একটা কাজ। এইভাবে যখন আপনি দিনের পর দিন – আপনার মনকে ইগনোর করতে থাকবেন, তখনই মনের মধ্যে বাসা বাঁধবে একটা মারাত্মক রোগ।

রোগটার নাম, “ডিপ্রেশন”।

আপনারা জানেন কিনা, জানি না- প্রতি তিরিশ সেকেন্ডে এই পৃথিবীতে একজন করে মানুষ এই ডিপ্রেশনের জন্য মারা যাচ্ছে। নিজেরাই নিজেকে মারছে তারা, সুইসাইড করছে। কবি জীবনানন্দ দাশ সুইসাইড করেছিলেন, বহু বিখ্যাত মানুষ সুইসাইড করেছেন। এই অনলাইনেই কয়েক দিন পরপর সুইসাইডের খবর দেখি। বুঝতেই পারছেন, বিপদ একেবারে দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। এর আগেই আমাদের সমাধানটা খুঁজে বের করতে হবে। ডিপ্রেশন কী, সেইটা একটু বুঝতে হবে আগে।

আসেন দেখি, এই “ডিপ্রেশন” জিনিসটা কী।

(৩)

আমাদের মধ্যে একটা বিশাল ভুল ধারণা আছে যে, কোনো মানুষ যদি চুপচাপ, এক কোণে হতাশ হয়ে পড়ে থাকে, একাকী থাকে বা দুঃখে একেবারে ভারাক্রান্ত থাকে – তাহলে সেটাই ডিপ্রেশন। এইটা বিরাট ভুল কনসেপ্ট। মারাত্মক ভুল কনসেপ্ট। আপনার প্রেম ভেঙ্গে গেছে, বা রেজাল্ট খারাপ হয়েছে, বা চাকরি চলে গেছে, বা কিছু একটা ঠিকঠাক নাই – তাই আপনার মন খারাপ। “মন খারাপ” একটা স্বাভাবিক ব্যাপার, সময়ের সাথে সাথে এমনিতেই ঠিক হয়ে যায়।

ডিপ্রেশন হলো- দুনিয়ার সবকিছু ঠিকঠাক আছে, কিন্তু আপনার মন ঠিক নাই।

সময়ের সাথে সাথে এই মন খারাপ বাড়তে থাকে, বাড়তেই থাকে। সবার ক্ষেত্রে সুইসাইডাল বৈশিষ্ট্য দেখা যায় না, কিন্তু আহত একটা মন পড়ে থাকে, যখন কোনো কারণ ছাড়াই “কিচ্ছু ভালো লাগে না”। এইরকম যদি আপনার সাথে হয়ে থাকে, এবং দিনের পর দিন কোনো কারণ ছাড়াই এই অবস্থা চলতে থাকে, তাহলে হ্যাঁ ভাই, আপনি ডিপ্রেশনে ভুগছেন।

ডিপ্রেশন, আত্মহত্যা, চিকিৎসা, মনের অসুখ

আরও ক্লিয়ার হতে চান ? আচ্ছা, তাহলে আরও কিছু লক্ষণ বলিঃ

১- ঘুম এবং খাওয়া-দাওয়া অত্যন্ত অনিয়মিত হয়ে যাবে। সারা রাত ঘুম আসবে না, শেষ রাতের দিকে কষ্ট করে ঘুমাতে হবে, বা মাথা ঝিমঝিম করবে।

২- একবার যদি কোনোভাবে ঘুমাতে পারেন, তাহলে মনে হবেঃ এইভাবেই সারাজীবন থাকলে ক্ষতি কী ? জেগে ওঠা এবং বিছানা থেকে নামতে গেলে মনে হবে এগুলো পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ।

৩- জীবন চূড়ান্ত অর্থহীন বলে মনে হবে। আশেপাশের সবকিছু বিরক্ত লাগবে, পাবলিক গ্যাদারিং বিরক্ত লাগবে, দাওয়াত-অনুষ্ঠানে অ্যাটেন্ড করতে বিরক্ত লাগবে। চোখের সামনে তাজমহল দেখলে মনে হবেঃ “এইটা আর এমন কী ?”

৪- অবাক হওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে যাবে। সোজা বাংলায়, বিশাল কোনো ঘটনাতেও টাশকি খাবেন না, চমৎকৃত হবেন না, কোনো আবেগ কাজ করবে না।

৫- কাছের মানুষদের সাথে দুর্ব্যবহার করা শুরু করবেন। যদি ব্যবহার ভালোও করেন, ভেতরে ভেতরে অল্পতেই মহা বিরক্ত লাগবে। মনে হবে একটা মুখোশ পড়ে আছেন, যার ভেতরকার দুঃখী চেহারাটা শুধু আপনিই জানেন।

৬- কোনো একটা জিনিস মাথার ভেতরে ঘুরতে থাকলে সহজে সেটা বের করতে পারবেন না। ওই একই জিনিস চক্কর মারতে থাকবে মাথার ভেতরে। অ্যানালিটিক্যাল চিন্তা কাজ করবে না। হিসাব জাতীয় সমস্যা সমাধান করতে গেলে হাবার মতো তাকিয়ে থাকবেন বা মাথায় শূন্যতা ঘুরতে থাকবে, কিন্তু কিছুই ফলাফল বের হবেনা।

৭- কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ করে হার্টবিট প্রচণ্ড বেড়ে যাবে। ঘাম হবে খুব। অল্প পরিশ্রমেই মনে হবে হাঁপিয়ে যাচ্ছেন।

৮- “আমাকে দিয়ে কিছু হবে না” – এই চক্রের মধ্যে ঘুরতে থাকবেন। জীবনে উন্নতির প্রতি কোনো ধরনেরই কোনো আকর্ষণ কাজ করবে না। অবনতি হলেও সেটা গায়ে লাগবে না।

(৪)

ওপরে বর্ণিত এক বা একাধিক সমস্যা, বা এগুলোর কাছাকাছি কোনো সমস্যা যদি আপনার থাকে, তাহলে ডেফিনিটলি “ঘটনা ঘইটা গেছে”, ভাই। ইউ নিড হেল্প। আমাদের হাত-পায়ের মতোই ব্রেইনও একটা অঙ্গ, এইটাও অসুস্থ হয়, সমস্যা এইটারও হতে পারে। চোখ-কান-নাক-মুখ সবকিছুর জন্য যেমন ডাক্তার আছে, মনের সমস্যার জন্যও সাইকোলজিস্ট আছে, সাইকিয়াট্রিস্ট আছে। এটা ধরে নেয়ার কোনো কারণই নাই, সাইকিয়াট্রিস্ট মানেই “পাগলের ডাক্তার” এবং সে ঘুমের ওষুধ দিবে। নো, টোটালি ভুল ধারণা। এইটা একটা ক্লিনিক্যাল সাবজেক্ট এবং কঠিন সাবজেক্ট। দীর্ঘ পড়াশোনা করা লাগে এই সাবজেক্টে।

মেডিক্যাল সায়েন্সে মোটামুটি পঞ্চাশেরও বেশি ধরনের আচরণকে মানসিক সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ডিপ্রেশন তার মধ্যে খুব সামান্য একটা সমস্যা, যেটাকে ইগনোর করলে আপনি একদিন সুইসাইডাল হয়ে উঠতে পারেন। ভয়ের ব্যাপার হচ্ছে ফেসবুক জেনারেশনের মধ্যে এই “কিচ্ছু ভালো লাগে না” – সমস্যার প্রকোপ খুব ভয়াবহ। তাই সতর্ক হোন এবং ডাক্তারের কাছে যান।

একমাত্র চ্যালেঞ্জ হচ্ছে আপনি যে সমস্যায় আছেন, সেটা বুঝতে পারা। কারণ, ডিপ্রেশন রোগে আপনার ব্রেইন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে যে বেঁচে থেকে আর কোনো লাভ নাই, জীবন একটা অর্থহীন যাত্রা। এখন, কোনোভাবে আপনার কাজ হলো, দাঁতে দাঁত চেপে একবার ডাক্তারের কাছে চলে যাওয়া। বাকীটা সে হ্যান্ডেল করবে।

আপনার যদি মনে হয় যে আপনার মনের কোনো সমস্যা আছে – তাহলে আপনার অবশ্যই সমস্যা আছে। আপনি যদি দেখেন যে আপনার ফ্রেন্ড দীর্ঘদিন যাবৎ ইরেগুলার আচরণ করছে – তাহলে তার অবশ্যই সমস্যা আছে। মনের দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা শুধু ভালো ভালো কথায় ঠিক হয় না। ফেসবুকে চ্যাট করে এই সমস্যার সমাধান হবে না। এর জন্য এক্সপার্ট কাউন্সেলিং লাগে, ওষুধ খাওয়া লাগে, বিভিন্ন সাইকোলজিক্যাল এক্সারসাইজ করা লাগে। সবচেয়ে বড় কথা ডাক্তারের কাছে যাওয়া লাগে।

হয়তো খুব মাইল্ড ডিপ্রেশন নিয়ে আপনি এক জীবন কাটিয়ে দিতে পারবেন, তবে লিখে রাখেন, বেঁচে থাকার মজাটা পাবেন না, ভাই। জীবন একটা অত্যন্ত আনন্দময় অভিজ্ঞতা। বেঁচে থাকার প্রত্যেকটা মুহুর্ত যদি আপনাকে আনন্দিত করতে না পারে, তাহলে ডাক্তার দেখান। এক হাজার – দুই হাজার টাকা খরচ করেন, আরেকটু ভালোভাবে, অর্থপূর্ণভাবে বাঁচেন।

ফাইনাল সাজেশন একটাই-

ফেসবুকে লিখে লাভ নাই
টুইটারে লিখে লাভ নাই
বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করে লাভ নাই
সেলিব্রেটিকে নক দিয়ে লাভ নাই

যে এই বিষয়ে এক্সপার্ট, তার কাছে যান। ডাক্তার দেখান। প্রোপার ওষুধপত্র খেলে এবং কাউন্সেলিং নিলে ধীরে ধীরে এই রোগ ঠিক হয়ে যাবে।

(৫)

লাস্টে সামান্য একটু কথা বলি। আমি আমার ফেসবুক প্রোফাইলের ইন্ট্রোতে লিখে রেখেছি- “তুমুল আবেগে, আনন্দে বাঁচি।” এক সময় আমি এরকম ছিলাম না। আমি ডিপ্রেশনের শিকার হয়ে এক সময় সারা শরীর বেল্ট দিয়ে চাবকে চাবকে পিটিয়েছি, রেল লাইনে গিয়ে সুইসাইড করার চেষ্টা করেছি, নেশা করেছি, বাইশ তলা বিল্ডিং থেকে লাফ দেয়ার চেষ্টা করেছি, দেয়ালে মাথা ঠুকেছি, সারা শরীর ঝাঁঝড়া করে ফেলেছিলাম আমি এক সময়।

সুমাইয়া সুলতানা আদিবা বাঁচেনি। এই শুভজিৎ ভৌমিক, সিভিয়ার ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশনে আক্রান্ত সেই বিরল সৌভাগ্যবান, যে শেষ পর্যন্ত বেঁচে গিয়েছে। বাঁচার কথা ছিলো না, কিন্তু এই বোনাস লাইফটা খুব মূল্যবান। তাই আমি প্রচণ্ড আনন্দে বাঁচার চেষ্টার করছি। প্রত্যেক মুহুর্তে, প্রত্যেক সেকেন্ডে।

আদিবা আর আমার মধ্যে পার্থক্যটা হচ্ছে, ও ফেসবুকে লিখেছিলো। আর আমি ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-