ভারতের রাজধানী দিল্লি সেদেশের সবচেয়ে দূষিত শহর তো বটেই, পুরো বিশ্বের মধ্যেই সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় শীর্ষস্থানটি দিল্লির দখলে। সে শহরে দূষণের মাত্রা এতো বেশি যে, প্রায়ই দূষণের কারণে প্রাণহানির খবর চোখে পড়ে। আর সেই শহরেই কিনা কেটে ফেলার পরিকল্পনা করা হচ্ছিল ১৬০০০ গাছ! কি সাংঘাতিক!

কে না জানে, গাছ পরিবেশ রক্ষায় কতটা গুরুত্বপূর্ণ। দিল্লির সাধারণ জনগণও এ ব্যাপারে বেখবর নয়।  অথচ, ভারত সরকারের সম্ভবত এ ব্যাপারটা অজানাই রয়ে গিয়েছিল! অজানা না থাকলে কি আর, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একসাথে ১৬০০০ এরও বেশি গাছ কাটার পরিকল্পনা অনুমোদন করা সম্ভব!

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ২০১৬ সালের কোন এক সময় দক্ষিণ দিল্লির একটি এলাকায় ১৬,০০০ এরও বেশি গাছ কেটে সরকারী চাকুরীজীবীদের জন্য ব্যসস্থান নির্মাণের একটি প্রকল্প অনুমোদন করে।  কিন্তু এই গাছ কেটে আবাসন প্রকল্প নির্মাণের খবরটি কিভাবে জানি জনগণের অগোচরেই রয়ে যায়। এ বছরের জুনে, ভারতীয় মিডিয়াতে প্রকল্পটি সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, প্রকল্প বাস্তবায়নে দিল্লির দক্ষিণাঞ্চলের একটি এলাকায় ই ১১,০০০ এর বেশি গাছ কেটে ফেলা হবে। এ রিপোর্ট প্রকাশের পর রাতারাতি এর বিরুদ্ধে জনমত গড়ে ওঠে। পরিবেশবাদী, দূষণ-বিরোধী অর্গানাইজেশন থেকে শুরু করে দিল্লির শত শত সাধারণ জনগণ এ প্রকল্পের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। এবং সবাই মিলে গাছরক্ষায় সংগঠিত আন্দোলন গড়ে তোলে।

পরিবেশবাদী কর্মীরা এ প্রকল্পের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে শুরু করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতেও দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে এ আন্দোলন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং হোয়াটস্অ্যাপের মত ম্যাসেজিং অ্যাপস গুলোতে এক হাজারেরও বেশি মানুষ বিভিন্ন পদ্ধতিতে গাছরক্ষায় প্রচার প্রচারণা শুরু করে।  গাছের নিচে বসে ধ্যান করা, গাছে উঠে ওয়ার্কশপের আয়োজন, মোমবাতি প্রজ্জ্বলন, বৃক্ষ রোপণ, মিছিল-মিটিং.. বিভিন্নভাবে গাছ রক্ষায় আন্দোলন শুরু করে দিল্লির নাগরিকেরা।

দিল্লির সাধারণ জনগণ, যারা গাছকে ভালবাসে এবং নগরীর ভয়াবহ দূষণ রোধে গাছপালার বিকল্প নেই বলে মনে করে তারা অনেকেই এসে যোগ দেয় এ আন্দোলনে। শহরায়নের ফলে, এবং বিভিন্ন সরকারী বেসরকারী আবাসন প্রকল্পের কারণে দিল্লিতে গাছপালা এমনিতেই আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। এরপরও যেটুকু আছে শহরের দূষণ রোধে সেটুকুই ভরসা।  এখন এই অল্প সংখ্যক গাছপালার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণই যদি সরকারের খামখেয়ালীপূর্ণ আর ভুল পদক্ষেপের কারণে ধ্বংস হয়ে যায়, তবে তা নগরবাসীর জন্য খুবই ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে বলে দিল্লির অনেকেই মনে করছেন।

দিল্লির শীর্যস্থানীয় পরিবেশবাদীদের মতে, দিল্লিকে বাসযোগ্য করে তোলার জন্য বহু বছর ধরে গড়ে ওঠা এসব গাছ রক্ষা এবং আরও বেশি বৃক্ষরোপণের বিকল্প নেই। এসব গাছ কেটে আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনা পুরোপুরিই আত্মঘাতী। সরকারের এই প্রকল্প নাগরিকদের বিশুদ্ধ বাতাসে শ্বাস নিতে পারার মত অধিকারকে খর্ব করে। জনগণের অধিকার এবং পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব সরকারের হাতে। তাই সরকারকেই পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা  পালন করতে  হবে। সেই সরকারই যদি গাছ কাটার এমন ভয়াবহ প্রকল্প হাতে নেয় তবে তার থেকে খারাপ আর কি হতে পারে! দিল্লির ২০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের জন্য এই গাছ ধ্বংসের পরিণতি হবে ভয়াবহ ধ্বংসাত্বক।

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার জনগণের এই স্বতস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়ায় বেশ হতচকিত। তারা প্রথমে বলেছিল, মাত্র চৌদ্দ হাজার গাছ কাটা হবে। তারপর আন্দোলন জোড়দার হলে সরকারপক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়, প্রতিটা গাছ কাটার পরিবর্তে দশটি চারাগাছ রোপণ করা হবে। যেটার নাম দেওয়া হয়েছিল ক্ষতিপূরণমূলক বনায়ন।

কিন্তু, সরকারের এসব সান্ত্বনার বুলি পরিবেশ আন্দোলনকারীদের শান্ত করতে পারেনি। তাদের যুক্তি,  দিল্লির দূষিত বাতাসে চারাগাছ টিকে থাকার হার খুবই কম। তাছাড়া যে এলাকায় গাছ কাটা হচ্ছে তার থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে চারাগাছ রোপণ করা হলে সেই এলাকার মানুষের কি উপকার হবে! তাছাড়া চারাগাছগুলো বড় হয়ে পরিণত গাছগুলোর শেপে আসতে শত বছর লেগে যাবে। তাই পরিণত গাছগুলো কাটার পক্ষে কোন যুক্তিই মানতে রাজি নন আন্দোলনকারীরা।

শেষমেশ উপায়ান্তর না দেখে, ভারতের শহর ও নগর পরিকল্পনাকারী মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ‍টুইটারে এক টুইটে জানান, দিল্লির উন্নয়নের জন্য কোন প্রকল্পের কারণে আর গাছ কাটা হবে না। নগর পরিকল্পনার জন্য অন্য কোন পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে, যে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কোন গাছ কাটার প্রয়োজন পড়বে না।

কিন্তু এসব আশার বাণী শুনিয়েও দিল্লির  জনগণকে নিবৃত্ত করা যায়নি। জনগণের পক্ষ থেকে তাই, দিল্লির হাইকোর্টে সরকারের সিদ্ধান্ত বাতিলের জন্য দু’টি পিটিশন দায়ের করা হয়। এরই প্রেক্ষিতে, ৪ঠা জুলাই, গাছ কাটার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে দিল্লি হাইকোর্ট। আদালতের তরফ থেকে জানানো হয়, মামলার পরবর্তী নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত দিল্লির কোন গাছ কাটা যাবে না। জাতীয় পরিবেশ আদালত বা এনবিসিসিকে আদালত নির্দেশ দিয়েছে, রাজধানী দিল্লিতে গাছ কাটা বন্ধ রাখতে হবে। আদালতের পক্ষ থেকে বলা হয়, “কোন উন্নয়ন কর্মকান্ড বাস্তবায়নের জন্য দিল্লিকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত কোন ভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।”

পরিবেশ আন্দোলনের সাথে জড়িত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ আদালতের এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা এই জয়কে সরকারের অন্যায্য সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জনগণের জয় বলে আখ্যায়িত করেছেন।  আন্দোলনকারীরা অবশ্য এখনো পুরোপুরি নিরুদ্দিগ্ন হতে পারছেন না। কেননা, আদালত এর আগেও এমন নির্দেশ দিয়েছিল এবং তা সত্ত্বেও সরকারী কন্ট্রক্টরদের গাছ কাটা থেকে বিরত করা যাচ্ছিল না।

পরিবেশকর্মীদের দাবী, দিল্লিতে গাছ কাটা তো যাবেই না, উল্টো কিভাবে এই নগরীকে আরও সবুজ করে তোলা যায় সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। তবেই নগরটির দূষণের মাত্রা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। আর এর জন্য প্রয়োজন জনগণের মধ্যে সচেতেনতা এবং সক্রিয়তা। তা না হলে সরকারী কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময় নানা উছিলায় গাছ ধ্বংস করে এমন উন্নয়নমূলক প্রকল্প হাতে নিতে থাকবে।

পরিবেশ আন্দোলনকারীরা পরিবেশ বাঁচাতে শিক্ষা, বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষায় গাছপালা রক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে শিশুদের শিক্ষিত করার দিকে গুরুত্বারোপ করেন। গাছ মানুষের কত ভাবে উপকার করে এবং গাছ ধ্বংসের কারণে পরিবেশ কেমন হুমকির মুখে পড়বে এ সম্পর্কে সঠিক শিক্ষা যদি ছোটবেলা থেকেই নাগরিকদের দেওয়া যায় তবেই পরিবেশ রক্ষায় নাগরিকরা মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারবে বলে পরিবেশ আন্দোলনকারীরা মনে করেন।

Comments
Spread the love