অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

দিল্লি পেরেছে, আমরা কবে পারব? আদৌ কি পারব?

দারুণ সাড়া জাগিয়ে জন্ম হয়েছিল ভারতের আম আদমী পার্টির, তারচেয়ে বেশি প্রত্যাশার জন্ম দিয়ে দলটা বসেছিল দিল্লির ক্ষমতায়। মাঝে বেশ কয়েকটা বছর কেটে গেছে, প্রত্যাশার সাথে প্রাপ্তির সম্মিলন ঘটেছে খুব কমই। ক্ষমতায় বসার পরে ‘জনগণের দল’ খ্যাত আম আদমি পার্টিও আর পাঁচটা রাজনৈতিক দলের পথেই হেঁটেছে বলে অভিযোগ অনেকের। তবুও ভারতের অন্যান্য অনেক রাজ্যের ক্ষমতাসীন সরকারের চেয়ে ভালো কাজ দেখিয়েছে তারা। তবে এবার দিল্লির ক্ষমতাসীনেরা এমনই এক প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যেটা সফল হলে ভারত তো বটেই, পুরো বিশ্বেই অন্যরকম একটা নজির স্থাপন করে ফেলবে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের এই সরকার।

নাগরিক সেবাগুলোকে জনগণের দুয়ারে এনে দেয়ার দারুণ এক পদক্ষেপ নিয়েছে দিল্লির সরকার। একবার ভাবুন তো, পাসপোর্ট বা জন্ম সনদের জন্যে আপনাকে পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনে দৌড়াতে হচ্ছে না, ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্যে দালাল ধরতে হচ্ছে না, পকেট থেকে খসে যাচ্ছে না বড় অঙ্কের টাকা। কিংবা বিয়ের জন্যে ম্যারেজ রেজিস্টারের অফিসে লাইন দিতে হচ্ছে না, উল্টো ম্যারেজ রেজিস্টার নিজে আপনার বাসায় হাজির হয়ে যাচ্ছেন, কিংবা তার প্রতিনিধিকে পাঠিয়ে দিচ্ছেন, এরকম হলে কেমন লাগবে? অকল্পনীয় হলেও সত্যি, আজ থেকে এই ঘটনাগুলোই ঘটতে যাচ্ছে দিল্লিতে! 

এই সেবাগুলোর গালভরা নাম দেয়া হয়েছে পাবলিক সার্ভিস, কিন্ত এই পাবলিক সার্ভিসগুলো সেবা না হয়ে ভোগান্তি হয়ে আছে বছরের পর বছর ধরে। বাংলাদেশ হোক কিংবা ভারত, পাসপোর্ট বা ড্রাইভিং লাইসেন্সের মতো ব্যাপারগুলোর জন্যে যথেষ্ট হয়রানি আর ভোগান্তির শিকার হতে হতো। পাসপোর্টের কথাই ধরুন না, সব ব্যবস্থা অনলাইনে করার পরেও পুলিশ ভ্যারিফিকেশনের নামে টাকা দিতে হয় আমাদের দেশে, আবেদনপত্রের এটাসেটা ভুল ধরে টাকা খাওয়ার ধান্ধাও জারী আছে, আর পাসপোর্ট অফিসে দালালদের দৌরাত্ন্য তো আছেই।

গাড়ির লাইসেন্স করাবেন? যেতে হবে বিআরটিএ-তে। বলা হয়, ঢাকা শহরে এতগুলো কাকও নেই, যত দালাল আছে বিআরটিএ-তে! গেলেই দালালেরা ছেঁকে ধরবে আপনাকে। তিন-পাঁচ হাজার টাকা বাড়তি খরচ করলেই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আপনাকে ড্রাইভিং লাইসেন্স জোগাড় করে দিতে পারবে এরা, সে আপনি ড্রাইভিং জানুন আর না জানুন। কিংবা স্মার্টকার্ডের ব্যাপারটাই ভাবুন, নির্ধারিত দিনে কয়েক ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে সংগ্রহ করতে হচ্ছে এই স্মার্টকার্ড, অথচ দিল্লিতে এখন থেকে রেশন কার্ড বাড়িতে এসে দিয়ে যাওয়া হবে সরকারের তরফ থেকে! রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে দাঁড়িয়ে ঘন্টার পরে ঘন্টা থাকতে হবে না তাদের।

দিল্লি সরকার এই পদক্ষেপের পেছনে নাগরিক সুবিধার কথা তো ভেবেছেই, সেই সঙ্গে ভেবেছে দালালদের দৌরাত্ন্য বন্ধ করার বিষয়টাও। সেবা পাওয়া নাগরিকদের অধিকার, সেই অধিকার আদায়ের জন্যে কেন তাদের বাড়তি টাকা খরচ করতে হবে? কেন তাদের তৃতীয় কোন ব্যাক্তির শরণাপণ্ণ হতে হবে, কেনই বা তাদের দিনের পর দিন সরকারী অফিসে ঘুরতে হবে?

এসব ভাবনা থেকেই হোম সার্ভিসের এই আইডিয়াড়া জন্ম নিয়েছে। সরকারী অফিসগুলো অফিসের মতোই থাকুক, মাছ বাজার না হোক, এরকমটাই চেয়েছে দিল্লির আম আদমি সরকার। ধীরে ধীরে এখানে আরও সেবা যোগ করা হবে বলে জানা গেছে। এখন এই হোম সার্ভিস সুবিধার কারণে সরকার আর জনগণের মাঝে দালাল বলে কেউ আর থাকবে না বলেও মোটামুটি নিশ্চিত তারা।

এই সেবাগুলো ঘরে বসে পাবার জন্যে দিল্লির নাগরিকদের শুধু নির্দিষ্ট নম্বরে ফোন করে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত দিতে হবে। এই হোম সার্ভিসের চার্জ ধরা হয়েছে পঞ্চাশ রুপী প্রতি সেবা। ফোন করলেই পাসপোর্ট অফিস থেকে ক্যামেরা আর বায়োমেট্রিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্ক্যানার সহ লোক হাজির হয়ে যাবে, পুরনো রেশন কার্ড জমা নিতে চলে আসবে কেউ, একদিন পরেই আবার দিয়ে যাবে নতুনটা। অথবা বাসা বদলেছেন, রেশন কার্ডে সেটা ঠিক করা হয়নি, সামান্য ঠিকানা বদলের ব্যাপারটা কার্ডে তোলার জন্যে আপনাকে অফিসের চক্কর কাটতে হবে না, তারাই লোক পাঠিয়ে ল্যাপটপে আপনার নতুন সব ডিটেইলস নিয়ে যাবে। ড্রাইভিং লাইসেন্সও করা যাবে ঘরে বসেই, তবে ড্রাইভিং টেস্টের পরীক্ষা দিতে হবে অফিসে গিয়ে।

দিল্লির সরকার তো এই সেবা চালু করে ফেললো আজ থেকে। কিন্ত আমরা কবে চালু করতে পারবো নাগরিকবান্ধব এমন হোম সার্ভিসগুলো? কবে আমরা খাবার বা পণ্যের মতো করে সরকারী এই সার্ভিসগুলোও অর্ডার করতে পারবো অনলাইনে বা ফোন মারফত? প্রায় দুই কোটি মানুষের বিশাল এই শহরে যানযট ঠেলে পাসপোর্ট অফিস বা এই ধরণের সেবাগুলোর জন্যে ঘন্টার পর লাইনে দাঁড়ানোটা যথেষ্ট ঝক্কি ঝামেলার কাজ। এরপরেও তো অসাধু কর্মকর্তা আর দালালদের দৌরাত্ন্যে বাড়তি টাকা খসানো লাগেই।

তবে স্বপ্ন দেখতে ভয় হয়। সামান্য রেলওয়ের ই-টিকেটিং সিস্টেমটাই তো ঠিকঠাকমতো চালু করা গেল না এখনও! দুয়েকজন সরকারী কর্মকর্তা প্রাণপণে চেষ্টা করে যাচ্ছেন এই সিস্টেমটা ঠিক করার, কিন্ত তাদের কথা কেউ শুনছে না সেভাবে। টিকেট বিক্রির সময় ব্যক্তিগত তথ্যাদি রাখা হলেই টিকেটের কালোবাজারী নেমে আসবে শূন্যের কোঠায়, ভারতে যেটা হয়েছে অনেক আগেই। কিন্ত বাংলাদেশে কালোবাজারী বা দালালদের থামানোর কোন উদ্যোগ নেই রেলওয়ের সংশ্লিষ্টদের, গরজও নেই। মাঝে মাঝে মনে হয়, এদেশে সরকারী কর্মকর্তাদের চেয়ে দালালদের ক্ষমতাটাই বুঝি বেশি! তাই দিল্লির মতো এমন হোম সার্ভিসের স্বপ্ন দেখতেও ভয় হয়, দিল্লি যে অনেক দূর!

তথ্যসূত্র- টাইমস অফ ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, হিন্দুস্তান টাইমস

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close