সিনেমা হলের গলি

দেবী ট্রেলার: হিমশীতল ভয় ও দারুণ মুগ্ধতা

দেবী নিয়ে দর্শকদের আগ্রহের মাত্রাটা একটু অন্যরকমের। একে তো হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস অবলম্বনে সিনেমা, তার ওপর মিসির আলি এই প্রথম আসছেন বড় পর্দায়। আর দেবী দিয়েই অভিনেত্রীর পাশাপাশি প্রযোজক হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে চলেছেন জয়া আহসান, তার ‘সি- তে সিনেমা’ নামের প্রোডাকশন হাউজের ব্যানারেই নির্মিত হয়েছে দেবী। সিনেমার টিজার মুক্তি পেয়েছিল এপ্রিলে, এরপরে মিসির আলিকে নিয়ে আলাদা টিজারও প্রকাশিত হয়েছিল। অপেক্ষা ছিল ট্রেলারের জন্যে। অপেক্ষার পালা শেষ, আজই ইউটিউবে মুক্তি পেয়েছে দেবী’র অফিসিয়াল ট্রেলার। 

জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হূমায়ুন আহমেদের সৃষ্ট সবচেয়ে জনপ্রিয় চরিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন মিসির আলি। প্রচণ্ড রকমের যুক্তিবাদী এই ভদ্রলোক পেশায় মনোবিজ্ঞানের শিক্ষক। মানব মনের হাজারো রহস্য নিয়েই তার কাজ-কারবার। এর আগে মিসির আলির গল্প নিয়ে নাটক নির্মিত হয়েছে, সেগুলো ছিল ছোটপর্দার কাজ। এবারই প্রথম মিসির আলি আসছেন সিনেমায়, ‘দেবী’ উপন্যাসটাকে বড়সড় ক্যানভাসে মুড়ে রূপালী পর্দায় বন্দী করছেন অনম বিশ্বাস। আর সেখানে মিসির আলির ভূমিকায় আছেন চঞ্চল চৌধুরী। মিসির আলি হিসেবে কেমন করছেন তিনি? ট্রেলারই বা কেমন হলো? রানুর চরিত্রে জয়া আহসান কতটা দুর্দান্ত? 

মিসির আলি হিসেবে চঞ্চল চৌধুরী অসাধারণ। তার চরিত্রের লুক অথবা হাঁটা-চলা-বসা কোনকিছুতেই আরোপিত বা জোর করে বিশ্বাস করানোর মতো কিছু চোখে পড়েনি দেড় মিনিটের ট্রেলারে। ডায়লগ ডেলিভারীতে চঞ্চল বরাবরই অসাধারণ, সেটা যে চরিত্রই হোক না কেন। ‘দেবী’র মিসির আলির বেলাতেও তার কোন ব্যতিক্রম ঘটেনি। জয়া আহসান বলেছিলেন, মিসির আলি চরিত্রে চঞ্চলের চেয়ে ভালো কাউকে তিনি দেখতে পান না, চঞ্চল চৌধুরী সেটা প্রমাণ করে দিয়েছেন কয়েকটা ঝলকেই। 

হুমায়ূন আহমেদ কখনও মিসির আলিকে নিয়ে নাটক বা সিনেমা বানাননি, সেটার পেছনে তার সবচেয়ে বড় যে যুক্তিটা ছিল সেটা হচ্ছে- “প্রত্যেকটা মানুষেরই নিজস্ব একটা ভাবনা আছে, যারা মিসির আলি পড়েছেন, তারাও হয়তো নিজেদের মনে মিসির আলির একটা ছবি এঁকে নিয়েছেন, মিসির আলির গল্পগুলো পড়ার সময় তারা অবচেতন মনে সেই মানুষটাকেই কল্পনা করেন। আমি তাদের সেই কল্পনাটাকে ভাঙতে চাই না।”

হুমায়ূন আহমেদের কথাটার খানিকটা প্রতিধ্বনি চঞ্চল চৌধুরীর মুখেও বারবার শোনা গেছে, যখনই দেবী বা মিসির আলিকে নিয়ে কথা উঠেছে, তিনি বলেছেন, তার ভেতরে যে মিসির আলি বাস করেন, সেটাকেই তিনি বের করে আনতে চেয়েছেন, কাউকে অনুকরণ বা অনুসরণ করতে চাননি। আর যেহেতু মিসির আলি বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় চরিত্রগুলোর একটি, তাই সেই চরিত্রে ঢোকার বেলাতেও প্রচণ্ড সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়েছে তাকে। যারা মিসির আলিকে পর্দায় দেখবেন, তাদের কাছে যেন কোথাও অবাস্তব মনে না হয়, সেটা মাথায় রাখতে হয়েছে সবসময়। 

রানুর চরিত্রে জয়া আহসান তো টিজারেই মাতিয়ে দিয়েছিলেন। ট্রেলারেও সেটার ধারাবাহিকতা বজায় আছে। ছাদের রেলিঙে পা ঝুলিয়ে বসা, একা একা কথা বলা কিংবা অদৃশ্য কোন ডাক শুনে ভয়ে মুখ শুকিয়ে যাওয়ার দৃশ্যগুলো গায়ে কাঁটা দেয়ার জন্যে যথেষ্ট। যেকোন চরিত্রের ভেতরেই জয়া আহসান অবলীলায় ডুব দেয়ার ক্ষমতা রাখেন, সেটা গেরিলার বিলকিস বানুই হোক, অথবা দেবী’র রানু। বিষণ্ণতাও যে কি অদ্ভুত সুন্দর হতে পারে, সেটা জয়া আহসানকে না দেখলে হয়তো বোঝা যেতো না। 

ট্রেলারে শব্দ নিয়ে মোটামুটি ছেলেখেলা করা হয়েছে। ট্রেলারজুড়েই গা ছমছমে এক আবেশ ছিল, কী হতে যাচ্ছে এরপর- তা নিয়ে ছিল কৌতূহল। শব্দ প্রকৌশলী হিসেবে ছিলেন রিপন নাথ। এর আগে তিনি কাজ করেছেন অজ্ঞাতনামা, ডুব এবং হালদা’র মতো সিনেমায়। প্রশংসা করার মতো কাজ ছিল সেগুলো, প্রশংসা পাবেন এবারও। অনম বিশ্বাসের পরিচালনার হাতেখড়ি হচ্ছে দেবী দিয়ে, সেই হিসেবে তার পরিচালনা শতভাগ নিখুঁত হবে, এটা আশা করাটা অন্যায়। কিন্ত পরিচালক হিসবে ক্যারিয়ারের শুরুতেই হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস নিয়ে কাজ করতে বাড়াবাড়ি রকমের সাহসের প্রয়োজন পড়ে। অনম বিশ্বাস সেই সাহসটা দেখানোর জন্যে হলেও ধন্যবাদ পাবেন। 

আমাদের দেশে সাহিত্যনির্ভর সিনেমা নির্মিত হয় খুব কম। অনেকদিন পরপর হয়তো একটা-দুটো দিনেমার দেখা মেলে এমন। ভালো গল্পের ভালো সিনেমার সংখ্যাও তো এই ইন্ডাস্ট্রিতে হাতেগোনা। সেই মুহূর্তে আগামী ১৯শে অক্টোবর দেবী আসছে প্রেক্ষাগৃহে। ভালো সিনেমকে উৎসাহিত করার জন্যে হলেও সবার উচিত দেবী’র পাশে দাঁড়ানো। সিনেমার মন্দার এই সময়টাতে জয়া আহসান বা অনম বিশ্বাসরা যে ‘দেবী’র মতো উপন্যাস নিয়ে সিনেমা বানানোর সাহস দেখিয়েছেন, সেটার জন্যেই তাদের সাধুবাদ জানানো যায়। বাকী ধন্যবাদ বা প্রশংসাগুলো নাহয় সিনেমা মুক্তি পাওয়া পর্যন্ত তুলে রাখা হোক…

আরও পড়ুন- 

ইউটিউবে দেবী’র ট্রেলার দেখুন এই লিংকে ক্লিক করে।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close