সিনেমা হলের গলি

দেবী এলো, মিসির আলি এলেন না!

সেদিনের পর থেকে আমি অনেক কিছু বলে দিতে পারি… আমি যা বলি, তা সব সত্য হয়ে যায়…

হূমায়ুন আহমেদ, বাংলাদেশের সাহিত্য জগতের সর্বকালের সবচেয়ে জনপ্রিয় মানুষ। তার হাতে তৈরি বিখ্যাত চরিত্র ‘মিসির আলি’কে এই প্রথম বড়পর্দায় নিয়ে আসছেন অনম বিশ্বাস, আয়নাবাজির চিত্রনাট্যকার ছিলেন ভদ্রলোক, এবার নিজেই সিনেমা পরিচালনায় হাত লাগিয়েছেন, আর শুরুটা করেছেন সাহিত্যের কিংবদন্তী হূমায়ুন আহমেদের সবচেয়ে জনপ্রিয় চরিত্রগুলোর একটিকে নিয়ে।

মিসির আলি চরিত্রটা এর আগেও বেশ কয়েকবার পর্দায় এসেছে, তবে বড় পর্দায় এটাই মিসির আলীর প্রথম আগমন। কল্পিত এই চরিত্রটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক। প্রচণ্ড যুক্তিনির্ভর এই চরিত্রটাকে নিয়ে অনেকগুলো উপন্যাস আর ছোটগল্প লিখেছেন হূমায়ুন আহমেদ, প্রথম উপন্যাস ছিল ‘দেবী’। সেই দেবী উপন্যাসটাকেই সেলুলয়েডে বন্দী করেছেন অনম বিশ্বাস। প্রযোজনায় আছেন জয়া আহসান, তার প্রোডাকশন হাউজ ‘সি তে সিনেমা’ থেকেই নির্মিত হচ্ছে দেবী, পেয়েছে সরকারী অনুদানও।

মিসির আলি চরিত্রে অভিনয় করছেন চঞ্চল চৌধুরী, আর রানু চরিত্রে জয়া আহসান। এছাড়াও আছেন শবনম ফারিয়া, ইরেশ জাকের এবং অনিমেষ আইচ- এটুকু সবাই জানেন। অনম বিশ্বাস কাজ করেছেন দারুণ কিছু প্রতিভাকে একসঙ্গে নিয়ে, টিজার মুক্তি পেয়েছে গতকাল। পাখির কলতান, বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা শাড়ি পরিহিতা রানু, নিঃসঙ্গ দোলনার দোল খাওয়া, অথবা মেঘেদের গর্জন- দুই মিনিটের টিজার জুড়ে কেমন যেন একটা মন খারাপ করিয়ে দেয়া সুর, সেই মন খারাপের মাঝে উঁকি দেয় রহস্য, আড়াল থেকে অচেনা গলায় ফিসফিস করে কেউ ডাকে- রানু! রানু…

টিজারজুড়ে নৈঃশব্দ্যের বাহারী মেলা আছে, আছে রহস্যের লুকোচুরি খেলা, তবে যার জন্যে অপেক্ষা সবচেয়ে বেশী ছিল, তিনিই নেই সেখানে। মিসির আলিকে খুঁজে পাওয়া গেল না টিজারের কোথাও, নেই কোন পুরুষ চরিত্রই। রানু আছেন, আছে নীলু। কিন্ত নেই মিসির আলি। আর তার সেই না থাকাটা যেন মনের তৃষ্ণা বাড়িয়ে দিল বহুগুণে।

দেবী নির্মাণের ঘোষণা যখন এসেছিল, তখন অনেকেরই সন্দেহ ছিল, রানু চরিত্রে জয়া আহসান কতটা মানিয়ে নিতে পারবেন। এই প্রশ্নটা আমি অনেকের কাছেই শুনেছি, সতেরো বছরের রানুর চরিত্রে জয়া আহসান কেন? ব্যক্তিগতভাবে এই অভিনেত্রীর বিশাল ভক্ত আমি, তার প্রতিভার ব্যপারে কোন সন্দেহ ছিল না আমার। যেকোন চরিত্রের ভেতরেই তিনি অবলীলায় ডুব দেয়ার ক্ষমতা রাখেন, সেটা গেরিলার বিলকিস বানুই হোক, অথবা দেবী’র রানু। দেবী’র টিজার সেটাই প্রমাণ করলো। বিষণ্ণতাও যে কি অদ্ভুত সুন্দর হতে পারে, সেটা জয়া আহসানকে না দেখলে হয়তো বোঝা যেতো না।

চঞ্চল চৌধুরীকে শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত আড়ালে রেখে দিতে চাইছে সিনেমার টিম, সেটা বোঝা যাচ্ছে খানিকটা। প্রতিটা সিনেমা, প্রতিটা চরিত্রের জন্যে আলাদা আলাদাভাবে প্রস্ততি নেন চঞ্চল, মিসির আলির ভেতরে ঢোকার জন্যেও যথেষ্ট পরিশ্রম করতে হয়েছে তাকে, আগে যারা মিসির আলিকে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন, তাদের অভিনয়টা সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছেন চঞ্চল, যাতে তার অভিনয়ের মধ্যে কোন বিশেষ ছাপ চলে না আসে। মিসির আলি চরিত্রটা বাংলা সাহিত্যে দারুণ জনপ্রিয়, সেটাকে পর্দায় আনার ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন থাকতে হয়েছে তাকে। দেবী সিনেমার অফার পাবার পরেও অনেক ভেবেছেন, কাজটা করবেন কি করবেন না, দর্শকদের প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পারবেন এই চরিত্র দিয়ে, দর্শকই বা তাকে কিভাবে গ্রহণ করবেন মিসির আলি হিসেবে- এসব প্রশ্ন নিজের মনে ঘুরপাক খাচ্ছিলো। কিন্ত শেষমেশ নিজেকে চ্যালেঞ্জ করেছেন, নিজের সামর্থ্যকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে কাজটা করেছেন তিনি।

অনিমেষ আইচ-ইরেশ জাকের- দুজনেই ভালো অভিনেতা। উধাও-তে অনিমেষ দারুণ অভিনয় করেছিলেন, চোরাবালি কিংবা সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত স্বপ্নজালে ইরেশ জাকেরের অভিনয় মুগ্ধ করেছে দর্শককে। ওদের তুলনায় শবনম ফারিয়ার সিনেমার অভিজ্ঞতা একেবারেই শূন্য, দেবী দিয়েই চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটছে তার। নাটকে তিনি পরিচিতমুখ, সিনেমায় আসাটা বরং বেশ খানিকটা দেরী করে। অনেক আগে একবার বলেছিলেন, সিনেমায় এলে ভেবেচিন্তে পছন্দমতো চরিত্র নিয়েই আসবেন। দেবীর মতো সিনেমা, বা নীলুর মতো চরিত্র দিয়ে সিনেমায় পা রাখাটা নিশ্চয়ই তার কাছে স্বপ্নপূরণের সমান। টিজারে মাত্র দুই সেকেন্ডের জন্যে দেখা মিলেছে তার, আঁতকে উঠে এক শব্দের ‘কেন’ সংলাপটাও ভালো লেগেছে। ফারিয়ার জন্যে শুভকামনা।

হূমায়ুন আহমেদ দেবী লিখেছিলেন নিজের মতো করে, সেটা পাঠকেরা গ্রহণ করেছে, ভালোবেসেছে। অনম বিশ্বাস পরিচালক, তিনি ঠিক হূমায়ুনের মতো করেই দেবীর গল্পটা বলবেন, এমনটা আশা করা অন্যায়। মূল গল্পটাকে ঠিক রেখে সেটাকে খানিকটা যোগ-বিয়োগ করার অধিকার পরিচালকের আছে, সেই নিজস্বতা তিনি দেখাতেই পারেন। আমাদের দেশে সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মানের পরিমাণ খুব কম, সেখানে জয়া আহসান বা অনম বিশ্বাসেরা যে ‘দেবী’র মতো উপন্যাস নিয়ে সিনেমা বানানোর সাহস দেখিয়েছেন, সেটার জন্যেই ওদের সাধুবাদ জানানো যায়। বাকী ধন্যবাদ বা প্রশংসাগুলো নাহয় সিনেমা মুক্তি পর্যন্ত তুলে রাখা হোক…

দেবী’র টিজার দেখুন এখানে ক্লিক করে।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close