সিনেমা হলের গলি

টি-ব্যাগে ‘দেবী’র প্রচারণা এবং উগ্র ধর্মান্ধদের আস্ফালন!

হুমায়ূন আহমেদের বিখ্যাত মিসির আলী সিরিজের প্রথম উপন্যাস দেবী অবলম্বনে অনম বিশ্বাসের পরিচালনা ও জয়া আহসানের প্রযোজনা-অভিনয়ে চলচ্চিত্র “দেবী” মুক্তি পাচ্ছে আগামী মাসে। সে উপলক্ষ্যেই ইস্পাহানী মির্জাপুর চা এর উদ্যোগে টিব্যাগ স্টোরিজ দেবী চলচ্চিত্রের একটি পোস্টার নিয়ে অভিনব একটা ক্রিয়েটিভ তৈরি করেছিল। একটি শুকিয়ে যাওয়া ব্যবহৃত টি-ব্যাগের গায়ে দেবী চলচ্চিত্রের পোষ্টারটি আঁকা হয়েছিল, টিব্যাগ স্টোরীজ নামে ফেসবুকে বহুল পরিচিত এই পেইজটি থেকে এমন আরও অসংখ্য অসাধারণ আর্ট প্রকাশিত হয়েছে এর আগেও, পোস্টারটি যে কোনভাবেই বিক্রয়ের জন্য হবার প্রশ্নই উঠে না, নতুন কোন পণ্যের প্রচারও নয় স্রেফ দেবী চলচ্চিত্রের প্রচারণার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে এটা সুস্থ-স্বাভাবিক ন্যুনতম কমনসেন্স থাকা যে কেউ বুঝবে!

এবং অভিনব এই প্রচারণার জন্য প্রশংসা করবে, উৎসাহ দেবে। কিন্তু ফেসবুকে ধর্ম প্রচার করা, আমিন লিখেই বেহেশতের টিকেট কনফার্ম করা এক শ্রেণীর মুসলিম নামধারী উগ্র ধর্মান্ধ এই অসম্ভব সুন্দর কাজটাকে হিন্দুদের দেবী আহবান করা হচ্ছে টাইপের প্রোপাগান্ডা আর মিথ্যাচার ছড়িয়ে গালাগালি দিতে শুরু করে! তাদের কথা হচ্ছে ইস্পাহানী নাকি এই পোস্টারের মাধ্যমে ৯০ ভাগ মুসলিমের দেশে হিন্দুদের দেবীদের প্রমোট করছে!

কি, স্তম্ভিত লাগছে না আপনার? স্বাভাবিক, ইস্পাহানী মির্জাপুর চা-এর ফেইসবুক পেইজে এই পোস্টের কমেন্ট সেকশনে এই ধর্মান্ধদের কুৎসিত সব মন্তব্যের বমির দুর্গন্ধে মাথায় রক্ত উঠে যাওয়া স্বাভাবিক! “দেবীর নাম কেন!!?” “এটা মুসলিম দেশ” “আমি মুছলিম তাই আমি মনে করি আমার জন্নো হারাম এই পন্নো” “দেবী আসছে, টি ব্যাগে দেবী ভাসছে” ইত্যাদি নানা ধরণের বিচিত্র আর জঘন্য সব টাকলা মন্তব্যে ভরে যাওয়া ওই পোস্টের কমেন্টবক্স দেখে ভুলে মনে হতে পারে, ভুল করে পাকিস্তান বা আফগানিস্তান চলে আসলাম কিনা! আবার কয়েকজন ছাগল “Ispahani Tea ও এর অন্যান্য পন্য এখন থেকে বর্জন করলাম” “এমন হলে তো এই চা আর পান করবো না!” “Ispahani Tea ও এর অন্যান্য পন্য এখন থেকে বর্জন করলাম” ইত্যাদি বিপ্লবী স্লোগান দিয়ে ইস্পাহানীর চা বর্জনের আহবান জানাচ্ছে। কি বিচিত্র রকমের কুৎসিত এদের চিন্তা-চেতনা, সামান্য একটা আর্টওয়ার্ক নিয়ে এতো নিকৃষ্ট চিন্তাভাবনা করার মত নোংরা এরা এদের মনে ধারণ করে কোথায়?

দেবী, ইস্পাহানী টি-ব্যাগ, সিনেমার প্রচারণা, উগ্র ধর্মান্ধ

সবচেয়ে জঘন্য মন্তব্যটি সম্ভবত ছিল এটি-

“ইস্পাহানীর জনপ্রিয়তা অচিরেই হারাবে এই ফাজলামীর জন্য। মনে রাখতে হবে এটা মুসলিম অধ্যুষিত জনপদ”।

মানে এই শয়তানেরা বলতে চাইছে এই জনপদে অন্য ধর্মপালন করতে দেবে না এরা। এদের কথা হচ্ছে মুসলিম অধ্যুষিত জনপদে দেবীর কথা বলা যাবে না। অথচ এই নিকৃষ্ট বর্বরগুলো ভুলে যায় যে ইসলামে ধর্মের নামে জোর-জবরদস্তিকে কড়াভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, রাসূল পাক (সাঃ) বারবার উল্লেখ করে গেছেন যে তোমরা ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি করো না, কাউকে তার ধর্ম পালনে বাধা দিয়ো না। আজকের এই ফেসবুক মুমিনেরা এতোটাই ধর্মান্ধ পশু হয়ে গেছে যে যেখানে সেখানে সুযোগ পেলেই তারা ইসলামের নামে, ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশের দোহাই দিয়ে অন্য ধর্মাবলম্বীদের কটাক্ষ করে, গালাগালি করে, হুমকি দেয়, পারলে এই দেশ থেকেই বের করে দেয়। একাত্তরের পর থেকে এই দেশে অন্য ধর্মাবলম্বীদের উপর যে ভয়ংকর অত্যাচার, নির্যাতন আর প্রতিহিংসার দাবানল চলেছে গত ৪৭ বছর ধরে, সেগুলো সবই চালিয়েছে এই উগ্র মৌলবাদীরা। ইসলামের নামে এরা যে বর্বরতা আর তান্ডব চালিয়েছে, তার ফলে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন অসংখ্য ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ। কক্সবাজারের রামু, রংপুর, কুমিল্লা, চট্টগ্রামের গত কয়েক বছর ধরে যে মসজিদের মাইক ব্যবহার করে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার ঘটনা ঘটছে, সেগুলো এই ধারাবাহিক ধর্মীয় উগ্রবাদ আর মৌলবাদের ফসল।

আর সে কারণেই আজ এই উগ্র ধর্মান্ধরা “দেবী”র মত একটা অসামান্য সৃষ্টি থেকে তৈরি আরেকটি অভিনব কাজের উপরও ঝাঁপিয়ে পড়ছে নির্দিধ্বায়। তাও এটি হুমায়ূন আহমেদের বই বলে তার পাঠকেরা এদের পাল্টা মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন ইস্পাহানীর পেইজে, অন্য কোন বিষয়ে হয়তো আমরা এই প্রতিবাদটাও দেখতাম না। কারণ আমরা যারা শান্তিপূর্ণ মুসলমান বলে নিজেদের পরিচয় দেই, তারা কখনই এই ধর্মীয় উগ্রবাদের বিরুদ্ধে জোরগলায় প্রতিবাদ করিনি। কখনই অন্য ধর্মাবলম্বীদের ধর্ম পালনে বাধা দেওয়া মুসলিম নামধারী মৌলবাদীদের প্রতিহত করিনি, কখনই তাদের রুখে দেইনি। বরং নানাভাবে নানা জায়গায় যখন ইসলামের নামে উগ্রবাদের, ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের উপর আক্রমণের ফতোয়া দেওয়া হয়েছে, ব্রেনওয়াশ করা হয়েছে, জামায়াতে ইসলাম, হেজাজতের মত ধর্মান্ধ সংগঠনগুলো, দেলোয়ার হোসেন সাইদী, জাকির নায়েকের মত ভয়ংকর উগর ধর্মান্ধরা যখন মালাউনদের উপর হামলা করলেই, তাদের দেব-দেবীদের মুর্তি ভেঙ্গে ফেললেই, তাদের এদেশ থেকে তাড়িয়ে দিলেই সওয়াব পাওয়া যাবে, বেহেশতে যাওয়া যাবে বলে প্রচার করেছে, দেশের সিংহভাগ সহজ সরল ধর্মপ্রাণ মানুষকে ধর্মান্ধ জানোয়ারে পরিণত করেছে, সবকিছু ধর্ম টেনে উগ্রবাদের প্রসার চালিয়েছে, তখন আমরা শান্তিপূর্ণ মুসলমানেরা সেসব এড়িয়ে গেছি।

দেবী, ইস্পাহানী টি-ব্যাগ, সিনেমার প্রচারণা, উগ্র ধর্মান্ধ

তাদের চরম হিন্দুবিদ্বেষী, উগ্রবাদী ওয়াজ মাহফিল যেখান থেকে হিন্দুদের দেবদেবীর ধ্বংস চাওয়া হয়, হিন্দুদের উপর আক্রমণের ফতোয়া দেওয়া হয়, সেগুলো বন্ধ করার বিন্দুমাত্র চেষ্টাও করিনি। ফলে ইসলামের নামে এই ধর্মীয় উগ্রবাদ আজ এমন এক পর্যায়ে চলে গেছে যে এই উগ্র ধর্মান্ধরা প্রচন্ড সাহসী হয়ে ফেসবুকে এসে হুমকি দিচ্ছে, দেবীর পোস্টারের নীচে এসে বলার সাহস পাচ্ছে যে এই দেশ স্রেফ মুসলমানের, এখানে দেবীর কথা বলা যাবে না! এই ভয়ংকর ধর্মীয় ও নৈতিক অবক্ষয়ের জন্য, আজকের এই অবস্থার জন্য অন্যতম দায়ী আমরা, শান্তিপূর্ন মুসলমানেরা!

অথচ এই দেশ যতটা একজন মুসলমানের, ঠিক ততটা একজন হিন্দুর, ঠিক ততটা একজন বৌদ্ধর, ঠিক ততটা একজন খ্রিস্টানের, ঠিক ততটা পাহাড়ে বাস করা প্রত্যেকটা জাতিগোষ্ঠীর, প্রত্যেকটা ধর্মের মানুষের! এই দেশ কখনই কেবল মুসলমানদের একলার নয়, এই দেশের প্রতি ইঞ্চিতে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-পেশা নির্বিশেষে প্রত্যেকটা মানুষের অধিকার আছে। আচ্ছা ধরেন আজকে যদি সত্যিই ইস্পাহানী কিংবা অন্য কোন ব্র্যান্ড হিন্দু ধর্মাবলম্বী ভাই-বোনদের দুর্গাপূজা সামনে রেখে “দেবী” নাম দিয়ে একটি নতুন ফ্লেভারের চা বাজারে নিয়ে আসে, দেবী দুর্গার ছবি টি-ব্যাগে এঁকে ঠিক এভাবে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে প্রচারণা চালায়, তাহলে সমস্যা কোথায়? সমস্যা কেন হবে? এই টি-ব্যাগের চা খেলে কি কেউ হিন্দু হয়ে যাবে? তার ধর্ম নষ্ট হয়ে যাবে? অবশ্যই না!

যদি হিন্দুরা এই দেশের নাগরিক হয়, যদি তাদের নাগরিক মর্যাদা আর দশ জন মুসলমানের মত একই রকমের হয়, তাহলে কেন হিন্দুদের পূজা-পার্বণ সামনে রেখে নতুন পণ্য বাজারে আসতে পারবে না? উৎসব হতে পারবে না? ইসলামের মূল বাণী ছিল শান্তি, এই বাংলাদেশে আবহমান কাল ধরে সকল ধর্মের মানুষ পাশাপাশি সহাবস্থান করে এসেছে, একসাথে ধর্মীয় উৎসব পালন করেছে পাশাপাশি, কেউ কারো প্রতি একটা সামান্য কটু কথা না বা আচরণ না করেই! আমরা ছোটবেলায় পুজা দেখতে গিয়েছি, আমাদের হিন্দু বন্ধুরা শবেবরাতে হালুয়া -রুটি খেয়েছে, ঈদের দিনে আমাদের বাসায় বেড়াতে এসেছে, কই তখন তো আমাদের ধর্মপালনে বিন্দুমাত্র সমস্যা হয়নি। তাহলে এখন এই ধর্মান্ধ জানোয়ারগুলো যখন ইসলামের নামে এমন কুৎসিত নোংরা ঘৃণার চাষ করবে, কেন এদের আমরা সহ্য করবো? কেন এই মুসলিম নামধারী ধর্মান্ধ শয়তানগুলোকে ইসলামের মুখপাত্র সেজে বসতে দেবো? একবারও কি ভেবে দেখেছি?

দেবী, ইস্পাহানী টি-ব্যাগ, সিনেমার প্রচারণা, উগ্র ধর্মান্ধ

আর ফেসবুক নিবাসী উগ্র ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের জন্য বলি- মিসির আলী ঘনঘন চা খেতে পছন্দ করতো- উপন্যাসের এতো চমৎকার একটা ব্যাপারটা চলচ্চিত্রের প্রচারণায় টি-ব্যাগ আর্টের মত এমন অভিনব শৈল্পিকভাবে তুলে আনার মর্যাদা বোঝার সামর্থ্য আপনাদের কখনো হবে না। আপনারা সবকিছুতেই ধর্ম টেনে আনেন, “দেবী” মত এমন সামান্য একটা বাংলা শব্দকেও আপনারা হিন্দুয়ানী বলে এর বিরোধিতা করছেন। অথচ কয়েক প্রজন্ম পেছনে গেলেই দেখা যাবে যে পীর-আওলিয়া, ওলী-আল্লাহগণ এই দেশে ইসলাম প্রচার করতে আসার আগে আপনাদের শতকরা ৯৮ ভাগ মানুষের পুর্ব পুরুষ ছিল নিম্ন বর্নের হিন্দু। এর অর্থ কি জানেন? আপনার শরীরে যে রক্ত প্রজন্ম থেকে প্রজন্মাতরে বয়ে আসছে, এখন আপনার ধমনীতে বইছে সেটা আসলে আপনার হিন্দু পুর্বপুরুষের রক্ত।

যদিও রক্তের কোন ধর্ম হয় না, ধর্মের ভিতিতে রক্তের রঙও আলাদা হয় না, সব রক্তই একইরকম লাল, কিন্তু আপনারা যেহেতু সবকিছুতে ধর্ম টানেন, সুতরাং পারলে আপনার ধমনী থেকে আপনার হিন্দু পূর্বপুরুষের রক্তটা ত্যাগ করেন। “এই হিন্দুয়ানি রক্ত আমরা চাই না, এটা বলে রক্তটা শরীর থেকে বের করে আপনার আরব বাপদের রক্ত ঢোকান। সবই যখন আপনার কাছে হিন্দুয়ানী লাগে, বর্জন করার ডাক দেন, তাহলে আপনার হিন্দু পূর্বপুরুষের রক্ত আর বাদ থাকবে কেন? পারবেন হিন্দুয়ানী রক্ত শরীর থেকে বের করে দিতে?

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close