সিনেমা হলের গলি

দেবী’র মিসির আলি এবং একজন ‘কনফিউজড’ চঞ্চল চৌধুরী!

“এ পর্যন্ত ছয়টা সিনেমায় আমি কাজ করেছি, কিন্ত কাজের অফার তো হাজার হাজার এসেছে। কিন্ত সেগুলোর মধ্যে আমি নিজেকে খুঁজে পাইনি। মনপুরা থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় দেড়শো-দুশো ছবি আমি ছেড়ে দিয়েছি, কারণ এই ছবিগুলোর কোনটার বেলাতেই আমার মনে হয়নি যে এই গল্প বা এই চরিত্রটাতে আমার অভিনয় করা উচিত। আমাদের সব অভিনেতা-অভিনেত্রীদেরই বোধহয় চরিত্র বাছাইয়ের এই ব্যাপারটাতে একটু ভাবার দরকার আছে। তাতে কাজটা ভালো হয়।”

“আমরা তো কাজ করি দর্শকের জন্যে। টিভিতে কাজের বেলায় হয়তো কখনও মানের সঙ্গে আপোষ করি, আপোষ হয়ে যায়। শিল্প দিয়ে তো সবসময় জীবন চলবে না। একটা কাজ করার সময় দর্শকের কথাটাই তো মাথায় থাকে প্রথমে, দর্শকের একটা এক্সপেক্টেশন থাকে আমাদের ওপরে। সেটা আমি ফুলফিল করার চেষ্টা করি আমার সর্বোচ্চ মেধা-যোগ্যতা বা পরিশ্রম যতোটুকু আছে, সবটুকু দিয়ে। এই বিষয়গুলো মাথায় রেখেই আমি ছবি করি, যেকারণে প্রত্যেক বছরে দুই-চার-পাঁচটা ছবি আমি করি না, এক বছর বা দুই বছর পরপর একটা করে সিনেমা করি। আর সেটা এই হিসেব মাথায় রেখেই করি যে, দর্শক যখন সেই সিনেমায় বা সেই চরিত্রে আমাকে দেখবে, সেটা তাদের ভালো লাগবে কিনা।”

“আমাদের টিভিতে এখন আড়াইশো-তিনশো টা চ্যানেল, পুরো বিশ্বের সবকিছুই হাতের নাগালে। আমরা হলিউড দেখছি, বলিউড দেখছি, বিশ্বের নানা প্রান্তের ভালো সিনেমাগুলো দেখা হয়ে যাচ্ছে আমাদের। ফলে একটা আন্তর্জাতিক মানের এক্সপেক্টেশন লেভেল তৈরি হচ্ছে। কিন্ত আমরা যারা সিনেমা বা নাটকে কাজ করছি, তারা কিন্ত বাংলাদেশের বাস্তবতায় কাজটা করছি। এখন, দর্শকের চোখ বা চিন্তাভাবনাটা যেভাবে প্রস্তত হয়েছে, আমার কাজটা যদি সেরকম না আসে, দর্শক হিসেবে আমারই সেটা ভালো লাগবে না।”

“একজন দর্শক যখন একটা সিনেমা দেখতে যায়, সে কিন্ত তুলনা করে হলিউড বা বলিউডের সাথেই। সে সবচেয়ে ভালো কোন কাজটা দেখেছে, সেটার সঙ্গে মেলায় এটাকে। আমাদের সিনেমা বা নাটকের বাজেট কত, শিডিউল কত দিনের নেয়া হয়েছিল, টেকনিক্যালি আমরা কতটা পিছিয়ে, সেসব কিন্ত শুরুতে তারা ভাববে না। দর্শক দেখছে না মানে কোথাও না কোথাও আমার ঘাটতি আছে। সেই ঘাটতিটা পূরণের বড় দায় কিন্ত নির্মাতাদের। সেইসাথে দায়টা আমাদের সবারও।”

“আমাদের মার্কেটটাও তো অনেক ছোট। এখানে সিনেমার পেছনে মাঝামাঝি একটা বাজেট ইনভেস্ট করে সেটা তুলে আনাও যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং একটা কাজ। আমরা কিন্ত যথেষ্ট স্যাক্রিফাইস করে সিনেমায় কাজ করি। একদম অভিনেতা-অভিনেত্রী থেকে শুরু করে টেকনিশিয়ান, ক্যামেরাম্যান কিংবা পরিচালকও হয়তো তার পুরো পারিশ্রমিকটা পাচ্ছেন না ঠিকঠাক। প্রযোজক এখান থেকে ওখান থেকে টাকাপয়সা এনে, গাড়ীটাড়ী বিক্রি করে চেষ্টা করছেন টাকা ম্যানেজ করার। আল্টিমেটলি স্যাক্রিফাইস করে একজন মানুষ কতদূর যেতে পারে?”

সিনেমা বলেন, নাটক বলেন, আমরা আসলে এখনও প্রফেশনালিজমের সর্বোচ্চ জায়গাটায় যেতে পারিনি। আমরা আর্টিস্ট বা টেকনিশিয়ানদের প্রফেশনালি ট্রিট করতে পারি না। আমাদের এখানে ব্যক্তিগত সম্পর্কটাকে খুব বড় করে দেখা হয়। বাণিজ্যিক কাজে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বড় হয়ে দেখা দিলে সেখানে কাজটা ভালো হবে না। যেটা আমরা এক্সপেক্ট করছি, সেই এক্সপেক্টেশনটা পূরণ হবার ক্ষেত্র কিন্ত আমরা তৈরি করতে পারছি না।”

চঞ্চল চৌধুরী, মনপুরা, আয়নাবাজি, দেবী

“হূমায়ুন আহমেদের মিসির আলি তো আমাদের বাংলা সাহিত্যেরই বিশেষ একটা চরিত্র। আমি যদি সেই দেবদাস থেকেই শুরু করি, হিমু এবং মিসির আলি, দুটো চরিত্রেরই আলাদা একটা অবস্থান আছে পাঠকের কাছে। হূমায়ুন আহমেদের যারা পাঠক, তারা মিসির আলিকে খুব ভালো করে চেনে, তার নাড়ি-নক্ষত্র সবকিছুই জানে। প্রত্যেকটা পাঠকের ভেতরেই একজন মিসির আলি বাস করেন তাদের দৃষ্টিতে, যে মিসির আলির ইমেজটা হয়তো এইরকম।”

“আমি আয়নাবাজি করার পরে খুব কনফিউশনে ছিলাম। আয়নাবাজিতে আমি ছয়টা চরিত্রে অভিনয় করেছি, এরপরে আমি কোন সিনেমায় অভিনয় করবো? কারণ, যেকোন সিনেমায় অভিনয় করতে গেলেই তখন আয়নাবাজির সাথে তুলনা করা হবে। আয়নাবাজির যখন শুটিং চলছে, তখন অনেকে যেমন আমাকে প্রশ্ন করতো, এটা কি মনপুরার মতো হিট করবে? এখন, একটার মতো তো আরেকটা কখনোই হতে পারে না। আমি কনফিউশনে ছিলাম যে, আয়নাবাজি করার পরে আমি আবার সিনেমাতে ব্যাক করবো কিভাবে? কোন চরিত্রে, কোন গল্পে, কার ডিরেকশানে?”

আয়নাবাজির সাফল্যে বা দর্শকের ভালোবাসা যেমন আমি উপভোগ করেছি, ঠিক তেমনই এই বিরক্তিকর মূহুর্তের মধ্যে দিয়েও আমাকে যেতে হয়েছে। ঠিক সেই মূহুর্তেই ‘দেবী’র প্রস্তাবটা আমি পেয়েছিলাম। মিসির আলী চরিত্রে আমাদের দেশের অনেক গুণী অভিনেতারা এর আগে অভিনয় করেছেন, মিসির আলিকে নিয়ে নাটক হয়েছে, সিনেমা কখনও হয়নি। এটা আমার জন্যে একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল, এই চরিত্রটা আমি কিভাবে ফুটিয়ে তুলবো পর্দায়? আগে যারা মিসির আলিকে পর্দায় রূপ দিয়েছেন, তাদের কাউকেই আমি ফলো করতে চাইনি। কনফিউশনে ছিলাম বিধায় দেবীকে হ্যাঁ বলতে আমি সময় নিয়েছি।”

দর্শকের একেকজনের মনে কল্পনায় মিসির আলি একেকরকম। আমার কল্পনায় হয়তো একরকম, হূমায়ুন আহমেদের কল্পনায় আবার আরেক রকম। আমি মিসির আলি করার চ্যালেঞ্জটা নিয়েছি এজন্যে যে, এই চরিত্রটার যে শক্তিটা, সেটা হয়তো আমাকে আয়নাবাজির আয়না থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করবে। মিসির আলির জন্যে আমরা কি করেছি না করেছি সেটা বলবো না, তবে আপনারা যখন হলে গিয়ে সিনেমাটা দেখবেন, নিশ্চয়ই বুঝতে পারবেন, আমাদের চেষ্টা আর পরিশ্রমটা কোন পর্যায়ের ছিল।”

**********************

কখনও তিনি মনপুরার সোনাই, কখনও টেলিভিশনের সোলায়মান, কখনও বা আয়নাবাজির আয়না, কিংবা নিজাম সাঈদ চৌধুরী। যখন যে চরিত্রেই হাজির হয়েছেন, দারুণ অভিনয়ে সবার মন জয় করে নিয়েছেন, সিক্ত হয়েছেন দর্শকের ভালোবাসায়। এবার তিনি আসছেন হূমায়ুন আহমেদের সৃষ্ট বিখ্যাত চরিত্র মিসির আলির বেশে। তিনি চঞ্চল চৌধুরী, আজ তেতাল্লিশ বছর বয়সে পা দিলেন এই অভিনেতা। জন্মদিনে ভক্তদের জন্যে উপহার হিসেবে ঘোষণা করেছেন দেবী’র মুক্তির তারিখ। আগামী ১৯শে অক্টোবর মুক্তি পাচ্ছে হূমায়ুন আহমেদের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমাটা। এগিয়ে চলো’র পক্ষ থেকে চঞ্চল চৌধুরীকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা। লাখ লাখ দর্শকের মতো আমরাও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি, মিসির আলী চরিত্রে চঞ্চল চৌধুরীর অভিনয়ের জাদু দেখার জন্যে।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close