ডিসকভারিং বাংলাদেশতারুণ্য

ঘুরে বেড়াতে টাকা লাগে? কে বলেছে?

কলেজে গ্র্যাজুয়েশন শেষ হবার আগেই বিশ্বের সত্তরটা দেশে বেড়ানো হয়ে গিয়েছিল আমার। আর এই সময়ে সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি আমাকে হতে হয়েছে, সেগুলো ছিল এরকম- এত ঘোরাঘুরির পয়সা তুমি কোথায় পাও? তোমার বাবা মা কি অনেক পয়সাওয়ালা? তোমার বয়ফ্রেন্ড কি তোমাকে ঘুরে বেড়ানোর টাকা দেয়? এসব প্রশ্নের জবাব কিভাবে দেয়া যায়, আমি এটা খুঁজে পেতাম না, রেগে গিয়ে, নাকি হাসিমুখে। উত্তর তো ওই একটাই- না, না এবং না। সোনার চামচ মুখে দিয়ে আমার জন্ম হয়নি। আর আমার বয়ফ্রেন্ডও আমাকে ঘুরে বেড়ানোর জন্যে কোন টাকা-পয়সা দেয় না। বিমান পরিবহন সংস্থাগুলোর সঙ্গে আমার কোন গোপন চুক্তিও নেই, আর দেশ-বিদেশে আমাকে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো কোন ম্যাজিক কার্পেটও নেই আমার। কিন্ত ওদের প্রশ্নের শেষ হতো না, সেগুলোর তালিকা দীর্ঘ হতেই থাকতো কেবল… 

হ্যাঁ, আমার বাবা-মা ধনী ছিলেন না। আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্টেও কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ছিল না। তবে একটা জিনিস ছিল আমার মনের ভেতরে, ঘুরে বেড়ানোর অদম্য নেশাটা। ছোট থেকেই ডানপিটে স্বভাবের ছিলাম আমি। আমার বয়স যখন সতেরো, তখন আমার মাথায় শুধু দুটো ব্যাপার ছিল- টাকা জমাও, আর সেগুলো ঘুরে বেড়ানোর পেছনে খরচ করো। পুরো ব্যাপারটাই হলো গুরুত্বের। আপনি কোনটাকে প্রায়োরিটি দিচ্ছেন, সেটার বোপরে নির্ভর করে সবকিছু। বিশ ডলার দিয়ে আপনি ম্যাকডোনাল্ডসে ভরপেট লাঞ্চ করতে পারেন, আবার দুই ডলারে একটা বার্গার কিনে নিয়ে বাকিটা জমিয়েও রাখতে পারেন ঘুরে বেড়ানোর জন্যে। আমি দ্বিতীয়টা বেছে নিয়েছিলাম। 

আমার কথা শুনে অনেকেই অবাক হয়, বলে, টাকা জমাবো কিভাবে, তাদের টাকা নাকি থাকেই না, বাতাসে উড়ে যায়! আমার হাতে গাড়ি কেনার মতো যথেষ্ট টাকা যখন হলো, আমি গাড়ি না কিনে একটা বাইসাইকেল কিনে ফেললাম। গাড়ি কেনা আর হাতি পোষা প্রায় সমান কথা। মেন্টেইন্যান্সের খরচ, ইনস্যুরেন্স, তেলের খরচ, সব মিলিয়ে অনেক টাকা বেরিয়ে যেত আমার পকেট থেকে। সাইকেলে বাড়তি কোন খরচই নেই তেমন, অথচ আমি ঠিকই যাতায়াত করতে পারছি এটায় চড়ে! টাকা তো এভাবেই বাঁচাতে হয়, যদি টাকা বাঁচানোটা আপনার প্রায়োরিটি হয়, তাহলে গাড়ির বদলে সাইকেল বেছে নেয়াটা আপনার জন্যে কোন ব্যপারই না। 

আমি বন্ধুদের সাথে ডিনারে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলাম। কারন রোজ পাঁচটা ডলার কম খরচ করাটাও আমার কাছে অনেক কিছু ছিল। অনেকে আড়ালে আমাকে ‘কিপ্টে’ ডাকতো, তাতে আমার বয়েই গেছে। কলেজে থাকাকালীন একটা গ্রোসারি শপে কাজ করতাম আমি, ঘন্টায় সাত ডলার করে পারিশ্রমিক পেতাম। সেই টাকার প্রায় পুরোটাই আমি জমিয়ে রাখতাম। আমি তখন হিসেব করতাম, বিশ ডলারের একটা ডিনার মানে আমার তিন ঘন্টার স্যালারি, পঁচাত্তর ডলারের একটা নতুন ব্যাগ মানে দশ ঘন্টার পরিশ্রম… এভাবে চিন্তা করতে করতেই মিতব্যায়ীতা জিনিসটা আমার মধ্যে ঢুকে গিয়েছিল। 

টাকা জমানোটা যে খুব সহজ, তা নয়। কিন্ত নিজের মনের সঙ্গে যুদ্ধে জিততে হয়। নিজেকে প্রশ্ন করতে হয়, আসলে আমি কি চাই? পঁচাত্তর ডলারের ওই দামী ব্যাগটা, নাকি কাশ্মীরে দুটো দিন বাড়তি থাকার সুযোগ? কলেজে চার বছরের পুরো সময়টা এক জোড়া জুতো পরেই কাটিয়ে দিয়েছি আমি। দুই রুমের ফ্ল্যাটের বদলে হোস্টেলে চারজনের সঙ্গে রুম শেয়ার করেছি। এসবের প্রতি আমার আগ্রহ ছিল না, থাকা উচিতও নয় বোধহয়। আমি বরং আগ্রহভরে অপেক্ষা করতাম গ্রীষ্মের ছুটির জন্যে, কিংবা সেমিস্টার ব্রেকের জন্যে। তখন আমাকে আর পায় কে!

সাড়ে চারশো ডলারের আইফোন এসেছে, আমি সেটা না কিনে টাকা জমিয়েছি, সেই টাকা খরচ করার সময় তো এখনই! প্লেনের টিকেট বুক করো, উড়ে যাও কলম্বিয়ায়! একটা আইফোনের চেয়ে ল্যাটিন আমেরিকায় তিন সপ্তাহের ভ্রমণটা নিঃসন্দেহে অনেকগুণ বেশি আকর্ষণীয়। যখন আমার বয়স সাতাশ, তখন আমি প্রথম আইফোন কিনি। ততদিনে বিশ্বের অর্ধেকটা আমার দেখা হয়ে গেছে। ভাবলাম, এবার বোধহয় কেনা যায় জিনিসটা; দেখি, স্টিভ জবস কি এমন জিনিস বানিয়েছে! 

ওই যে, বললাম না, পুরো ব্যাপারটাই প্রায়োরিটির। নতুন আইফোন আর কলম্বিয়া ভ্রমণের মধ্যে আমার কাছে কলম্বিয়াই প্রাধান্য পেয়েছে সবসময়। একশো ডলার খরচ করে শীতের কোট কেনাটা কোন প্রয়োজনীয় কাজ বলে মনে হয়নি আমার কাছে, তারচেয়ে এই টাকায় মিশরে চারটে দিন বেশি থাকতে পেরেছি আমি, নীলনদের তীরে স্লিপিং ব্যাগের ভেতরে শুয়ে তারা দেখার সুযোগ পেয়েছি, হয়তো অনেক বিলিওনিয়ারও সেটা দেখার সুযোগ পাননি। সাতাশ বছর বয়সে আমার হাতে আইফোন এসেছে, কিন্ত ততদিনে রোমান কলোসিয়াম কিংবা প্যারিসের আইফেল টাওয়ার- সব দেখা হয়ে গিয়েছে আমার। 

ডিয়ার অ্যালেন, ভ্রমণ, টাকা, সাশ্রয়, মিতব্যায়ীতা

আমি বলবো না আপনি যেখানে টাকা ঢালছেন সেগুলো বাজে খরচ। তবে আপনার প্রায়োরিটিটা অন্য জায়গায়। দিনশেষে আপনি যদি বলেন, আপনার হাতে ঘুরে বেড়ানোর মতো টাকা নেই, তাহলে আপনি মিথ্যা বলছেন। বেড়ানোটা ফার্স্ট প্রায়োরিটি হলে সেটাকেই গুরুত্ব দেয়া উচিত ছিল, ম্যাকডোনাল্ডসের বার্গার কিংবা কেলভিন ক্লেইনের স্যুটকে নয়। কোনকিছু যদি আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে, সেটা পূরণ করার জন্যে আমি যে কোন কিছু করতে প্রস্তুত থাকবো। আমি কি খাচ্ছি, কোথায় থাকছি, কি পরছি- এগুলো তখন খুবই ছোটখাটো ব্যাপার হয়ে যাবে আমার কাছে, এবং হয়ে গেছেও। 

আমার কাছে ভ্রমণটা কোন বিলাসিতা নয়, শুধু সাগর বা পাহাড়ের কাছে কয়েকটা দিন ছুটি কাটানোও নয়। ঘুরে বেড়ানোটা আমার কাছে অক্সিজেনের মতো। এটা ছাড়া আমি বাঁচবো না। এজন্যে আমাকে ডেসপারেট হতেই হয়, অনেক কিছুর মায়া ছাড়তে হয়। কারণ দিনশেষে জীবনানন্দের বনলতা সেনের মতো এটাই আমাকে দু’দণ্ড শান্তি দিতে পারে… 

-ডিয়ার অ্যালেন, ব্লগার এবং ট্যুরিস্ট।

আরও পড়ুন- 

ডিয়ার অ্যালেনের ভিডিওবার্তা দেখুন এখানে- 

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close