ভালোবাসার জন্য, ভালোবাসার মানুষটার জন্য কতজনই না কত কিছু করেছে পৃথিবীতে! সম্রাট শাহজাহান তো স্ত্রী মমতাজ মহলের স্মৃতি ধরে রাখতে বানিয়ে ফেলেছিলেন পৃথিবীর সপ্ত আশ্চর্যের এক বিস্ময় তাজমহল! কিন্তু বিহারের দুর্গম গেহলৌর গ্রামের দশরথ মাঝি স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসায় জন্ম দিয়েছিলেন এমন এক কীর্তি যে সেটা হার মানিয়েছে সব বিস্ময়ের পুরাণকেও! বিশাল বিস্তৃত পাহাড় তার সামনে পরাভূত হয়েছে, পাহাড়ের বুক চিরে নিজের হাতে তৈরি করেছেন এক বিশাল রাস্তা!

ভারতের বিহার রাজ্যের গেহলৌর গ্রাম। গয়া জেলার নিকটবর্তী এই গ্রামটিও আক্রান্ত ছিল জাতপ্রথা,দুর্নীতি, বঞ্চনা, নির্যাতন, বর্ণপ্রথায়। এসব ছাড়াও আরও বড় একটি সমস্যা ছিল সেই গ্রামে, শেষ প্রান্তে প্রাচীরের মত মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল বিশাল এক পাহাড়, বাইরের দুনিয়া থেকে যা বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল সেই গ্রামকে, দৈনন্দিন কাজে এই পাহাড়কে টপকাতে হত তাদের। পাহাড়ের এপারে পানি, বিদ্যুৎ সুবিধা তো দূরের কথা, নেই কোনো স্কুল বা হাসপাতালও। এই গ্রামের মানুষদের জীবনের মৌলিক চাহিদাগুলো মেটাতে প্রতিদিন চার মাইলের পথ পাড়ি দিতে ৪০ মাইল পথ ঘুরতে হতো, কিংবা পায়ে হেঁটে ডিঙ্গোতে হত ৩০০ ফুট উঁচু পাহাড়।

সেই গ্রামেরই এক দিনমজুর দশরথ মাঝির স্ত্রীর নাম ছিল ফাগুনিয়া। তাদের বিয়ে হয়েছিল সেই কৈশোরেই! প্রচন্ড ভালোবাসতো দশরথ তার স্ত্রীকে। প্রতিদিন তাকে পাহাড়ের ওপারে যেতে হত কাজ করতে। পাহাড়ের যে পথ ধরে ফাগুনিয়া ওপারে দশরথকে খাবার পৌঁছে দিতে যায়, সেটা খুবই বিপদসংকুল।তাই দশরথ সবসময় আশংকায় থাকতো স্ত্রীকে নিয়ে, কবে না কোন দুর্ঘটনা ঘটে যায়। একদিন দশরথের আশংকায় সত্য হলো। পাহাড় ডিঙ্গিয়ে খাবার পৌঁছাতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হলেন স্ত্রী ফাগুনিয়া। কিন্তু হাসপাতাল যে ৭০ কিলোমিটার দূরে! ফলে হাসপাতালে নেবার পথেই বিনা চিকিৎসায় স্ত্রীকে হারান দশরথ। সেই মুহুর্তেই পুরো পৃথিবীটা যেন শূন্য হয়ে গিয়েছিল দশরথের! জীবনটাই এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল তার।

স্ত্রীকে হারানোর এই দুঃস্বপ্ন তাকে তাড়া করে বেড়াতো। বার বার মনে হচ্ছিল এই পাহাড়টা না থাকলেই সব অন্যরকম হতে পারত। যদি পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে একটা রাস্তা থাকত! সেই ভাবনা থেকে আশপাশের অনেকের সঙ্গে আলোচনা করলেন দশরথ মাঝি। কিন্তু সবার এক কথা কিচ্ছু করার নেই। দশরথ মাঝি সেটা মানতে রাজি নন। তার মনে যে আজব এক সংকল্প ঘুরছিল ! তিনি প্রস্তাব দিলেন সবাই মিলে কাটতে হবে পাহাড়। বানাতে হবে পথ। অন্যরা তার কথা শুনে হেসেই উড়িয়ে দিল। সবার একই কথা এত বড় পাথুরে পাহাড় কাটা একেবারেই অসম্ভব। দশরথের সেই প্রস্তাবে কেউ রাজি হলো না। তবে এক পর্যায়ে সবাই মিলে স্থানীয় সড়ক বিভাগে যোগাযোগ করলেন। কিন্তু সড়ক বিভাগ পাহাড় কেটে রাস্তা বানানোর ব্যাপারে কোনো আগ্রহই দেখাল না। ফলে স্থানীয়রা সবাই হতাশ হয়ে পড়লেন। তারা আবার ফেরত গেলেন আগের অবস্থায়। যেখানে নিয়তিই সব। কিচ্ছু করার নেই।

দশরথ মাঝি, মাঝি দ্য মাউন্টেইনম্যান

কিন্তু ভালবাসার মানুষটিকে হারিয়ে সবকিছু শূন্য হয়ে যাওয়া দশরথের আসলে আর পেছনে ফেরার কোন পথ ছিল না। চোয়ালবদ্ধ শপথ নেন তিনি, যে করেই হোক এই পাহাড় চিরে তৈরি করবেন রাস্তা। প্রথমে সবাই হেসেই উড়িয়ে দিল তার এই পরিকল্পনা, পাগল বলে হাসিতামাশা শুরু করলো, কিন্তু শেষ সম্বল ছাগলটা বেচে দিয়ে হাতুড়ি-শাবল আর গাইতি কিনে ঠিকই স্ত্রীকে কেড়ে নেওয়া পাহাড়কে উড়িয়ে দেওয়ার সংকল্প নিয়ে কাজ শুরু করলেন দশরথ। খেয়ে না খেয়ে, রাত-দিন এক করে চলতে থাকে তার সংগ্রাম। দৃশ্যটা কল্পনা করুন একবার, আকাশ ফুঁড়ে গজিয়ে ওঠা বিশাল দৈত্যাকার পাহাড়ের গায়ে অক্লান্ত শ্রমে হাতুড়ি শাবল গাইতি চালিয়ে যাচ্ছেন এক শুকনো পলকা সামান্য মানুষ, তার লক্ষ্য ভেঙ্গে ফেলবেন এই পাহাড়, মাঝখান দিয়ে তৈরি করবেন এক রাস্তা! খুব অবিশ্বাস্য আর অসম্ভব শোনাচ্ছে না?

কিন্তু দশরথ দমেননি, একটাবারের জন্যও থামেননি। ধীরে ধীরে তামাশা দেখতে আসা মানুষজনের সংখ্যাও কমে গেল, একসময় একেবারেই একা হয়ে গেলেন দশরথ, যুদ্ধটা তার একার, লড়ছেন একলাই! স্ত্রীশোকে পাগল হয়ে যাওয়া এক হতভাগ্য মানুষের জন্য নস্ট করার সময় এই পৃথিবীতে ক’জনের আছে? এ সময় তিনি মাঝে মাঝে মানুষের বিভিন্ন জিনিস পাহাড় পার করে দিতেন। এ থেকে প্রাপ্ত সামান্য অর্থ দিয়েই কোনোমতে চলতো তার সন্তানদের ভরণ-পোষণ। আর সার্বক্ষণিক চলতো দশরথের পাহাড়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম। এভাবে এক দিন, দু’দিন করে কেটে যায় বছরের পর বছর। এর মধ্যে একবার ভীষণ খরায় পুড়ে গেল সব, গ্রামবাসীদের অনেকেই গেহলৌর ছেড়ে চলে যেতে শুরু করে। দশরথের বাবা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যেন দশরথ তাদের সাথে শহরে চলে যায়। কিন্তু যাননি দশরথ মাঝি টলেননি, একটা মুহুর্তের জন্যও তার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি।

প্রায় দশ বছর চলে যায়। দশরথের বছরের পর বছর ধরে পরিশ্রমের ফলে পাথুরে পাহাড়ের বুক চিরে দেখা দিল পথ। প্রায় অসম্ভব এক লক্ষ্যপূরণের সম্ভবনা দেখা দেওয়ায় দ্বিগুণ উদ্যমে দশরথ চালিয়ে যান তার যুদ্ধ! ১৯৬০ সালে যখন দশরথ পাহাড়টা কাটতে শুরু করেন, তখন তার বয়স ছিল ৩৫। দীর্ঘ ২২ বছরের নিরলস সাধনায় ১৯৮২ সালে ৫৭ বছর বয়সী দশরথ একদিন তার পথ থেকে সরান শেষ পাথরটি। গ্রামবাসী অবাক হয়ে দেখলো, পাহাড়ের বুক চিরে তখন তৈরি হয়েছে ৩৬০ ফুট লম্বা ও ৩০ ফুট চওড়া একটি পথ। প্রায় ২৫ ফুট পরিমাণ উচ্চতার পাথর কাটতে হয়েছে দশরথ মাঝিকে এই রাস্তাটা বানাবার জন্য।

মুঘল সম্রাট শাহজাহান যেমন তিল তিল করে গড়ে তুলেছিলেন তার ‘তাজমহল’, ঠিক তেমনি স্ত্রীর প্রতি অসামান্য ভালোবাসায় দশরথ তৈরি করেছিলেন এই রাস্তা, পরবর্তীতে যার নাম হয় ‘দশরথ মাঝি রোড’। এর ফলে আগে যেখানে পৌঁছানোর জন্য মানুষের পাড়ি দিতে হতো ৫৫ কিলোমিটার পথ, এখন সেই দূরত্ব নেমে এসেছে মাত্র ১৫ কিলোমিটারে। এখানেই শেষ নয় দশরথের সংগ্রাম!

দশরথ মাঝি, মাঝি দ্য মাউন্টেইনম্যান

এই পথকে জাতীয় সড়কের সাথে সংযুক্ত করতে তিনি সিদ্ধান্ত নেন প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে দিল্লি যাবেন।কিন্তু ট্রেনের টিকেটের সামান্য ২০ রুপিও তার কাছে ছিল না, টিকেট চেকার তাকে ট্রেন থেকে ফেলে দিয়েছিল। অপমানিত বিপর্যস্ত মাঝি সিদ্ধান্ত নিলেন পায়ে হেঁটেই যাবেন ১৫শ কিলিমিটার দূরে দিল্লিতে। কি,শুনতে খুব অসম্ভব শোনাচ্ছে?

নাহ, যে মানুষটা ২২ বছর ধরে সংগ্রাম করে পাহাড়কে পরাভূত করতে পারেন, তার জন্য হেঁটে দিল্লি পৌঁছানো আসলে খুব একটা অবাস্তব শোনানোর কথা না। তিনি পায়ে হেঁটেই রওয়ানা দেন বিহার থেকে দিল্লী। পথে যেতে যেতে সকল ষ্টেশন মাস্টার এর কাছ থেকে স্বাক্ষর সংগ্রহ করেন তিনি। কিন্তু বিধিবাম, দিল্লীতে গিয়েও দুর্ভাগ্যবশত তিনি দেখা করতে পারলেন না প্রধানমন্ত্রীর সাথে।

দিল্লি পৌঁছাতে না পারলেও বিহারের মুখ্যমন্ত্রীর দেখা পান তিনি, তার এই অসামান্য অবদানের কথা শুনে বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নিতেশ কুমার। নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দশরথ মাঝিকে সেখানে বসিয়ে সম্মান প্রদর্শন করেন। তাকে ভারতের সর্বোচ্চ চতুর্থ বেসামরিক পদক পদ্মশ্রীতে পুরষ্কৃত করবার জন্য কেন্দ্রের কাছে সুপারিশ করে বিহার রাজ্য সরকার। কিন্তু বাদ সাধে বন মন্ত্রণালয়। কারণ কি? দশরথের অপরাধ হচ্ছে তিনি পাহাড় ও বন কেটেছেন। অথচ দশরথের ক্ষেত্রে প্রেক্ষাপটটা ছিল একেবারেই আলাদা! কিন্তু সেটা বিবেচনার বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করে প্রশাসনের একটা অংশ দশরথ যেন পুরষ্কার না পান, সেই চেষ্টা করতে থাকে।

কিন্তু যে মানুষটা কখনো কোন স্বীকৃতির পরোয়া না করে নিরলস শ্রম দিয়ে গেছেন তার গ্রামবাসীর কল্যাণে, তার স্ত্রীর স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে, তাকে কি আর এই ধরনের ষড়যন্ত্রে আটকে রাখা যায়? তার গ্রামের মানুষের কাছে, বিহার এবং সারা ভারতের মানুষের কাছে দশরথ আজ এক অসামান্য অনুপ্রেরণা, অমিত গর্ব! বিহার সরকারের পক্ষ থেকে তাকে ৫ একর জমি দেওয়া হয়। নিজের জীবনটাই যিনি মানুষের জন্য উৎসর্গ করে দিয়েছেন, সেই দশরথ এই জমিটুকুও দান করে দেন হাসপাতাল তৈরির জন্য! দশরথের এই জীবন কাহিনী নিয়ে ২০১৫ সালে ভারতে তৈরি হয় “Manjhi The Mountain Man” নামের একটি সিনেমা, যেখানে অপূর্ব অভিনয়শৈলীতে দশরথ মাঝিকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলেন নওয়াজদ্দীন সিদ্দিকি!

২০০৭ সালের ১৭ আগস্ট প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন দশরথ, রাত-দিন ২৪ ঘন্টা নিরলস পাথর ঠুকে ঠুকে পাহাড় ভেঙ্গেছিলেন যিনি, যার ভালোবাসার শক্তির কাছে আকাশ ছোঁয়া পাহাড়ও দাঁড়াতে পারেনি!

Comments
Spread the love