অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

বিশ্ববিখ্যাত রত্ন কোহিনূরের যমজ বোন ঢাকার সদরঘাটে?

আচ্ছা, পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান রত্নের নাম কি? প্রশ্নটা করার পর প্রায় সবার মাথাতেই যে আসবে হয়তো, সেটা হচ্ছে কোহিনূর! জগতের আলো নামে পরিচিত এই মহামূল্যবান হীরাটা একইসাথে অভিশপ্ত বলেই বিশ্বাস করেন অসংখ্য মানুষ। কারণ ১৩০৬ সালে দক্ষিণ ভারতের মালওয়া রাজবংশ প্রথম যখন অন্ধ্রপ্রদেশের খনি থেকে উত্তোলন করেছিল কোহিনূর, তারপর থেকে আজ প্রায় ৭০০ বছর ধরে এই ঐশ্বর্য যেখানে গেছে, যে পুরুষের দখলে গেছে, তারই ললাটে নেমে এসেছে ধ্বংস আর মৃত্যু! তবে আমরা কোহিনূর নিয়ে কথা বলবো না, বলবো আরেক ঐশ্বর্য নিয়ে।

মূল্যের দিক কোন অংশে পিছিয়ে না থাকলেও যে রত্ন নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয়নি, যেটার মালিক আমরা, বাংলাদেশ রাষ্ট্র এবং তার জনতা! দক্ষিণ ভারতের সেই খনি থেকে কেবল কোহিনূরই উত্তোলন করা হয়নি, উত্তোলিত হয়েছিল মূল্যবান ও দুর্লভ প্রজাতির আরো একটি রত্ন! যাকে বলা হত দরিয়া-ই-নূর! অর্থাৎ আলোর সাগর! এবং ইতিহাসের নানা অধ্যায় ঘুরে সেই দরিয়া-ই-নুর আজ বাংলাদেশের সম্পদ, কোহিনূরের মত ব্রিটিশদের দখলে গিয়ে ইংল্যান্ডের রাণীর মুকুটে শোভা বাড়ানোর দায়িত্ব যাকে পালন করতে হয়নি, বরং নীরবে-নিভৃতে এক প্রকার অবহেলায় লোকচক্ষুর অন্তরালে দরিয়া-ই-নূর রয়ে গেছে আমাদের খুব কাছে, এই ঢাকা শহরেই!

দরিয়া-ই-নূর প্রথম জনসম্মুখে আসে এক বিচিত্র সময়ে, বিচিত্রভাবে। ভারতে তখন ইংরেজ শাসন চলছিল। উনিশ শতকের মাঝপথের কথা। ব্রিটিশ শাসনামলে ঢাকার নওয়াবদের অর্থ-বিত্ত আর শান-শওকতের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল চারদিকে। খবর এল ভারতে মূল্যবান অলঙ্কার ও পাথরের নিলাম হচ্ছে। ইংরেজরা ভারতের বিভিন্ন রাজ্য আক্রমণ করার সময় যে সব রত্ন, হীরা-জহরত লুট করেছিল, কলকাতার হ্যামিল্টন এন্ড কোম্পানী ভারতের ব্রিটিশ শাসিত সরকারের পক্ষ থেকে সেসব রত্ন নিলামের ব্যবস্থা করছে। ঢাকার বিখ্যাত নওয়াব খাজা আলীমুল্লাহ ছুটে এলন সেই নিলামে। এটা-ওটা পরখ করে দেখলেন, শেষ পর্যন্ত পছন্দ করলেন কোহিনূরের মতোই এক বড়সড় আকারের হীরা। ইতোমধ্যে হীরাটির নাম ছড়িয়ে পড়েছিল। গালভরা নামও ছিল এর। এই হীরাটিই দরিয়া-ই-নূর। অর্থাৎ ‘আলোর সাগর’। নওয়াব আলীমুল্লাহ্ সে যুগে পঁচাত্তার হাজার টাকায় কিনেছিলেন দরিয়া-ই-নূর। একে রত্ন বিশেষজ্ঞরা কোহিনূরের “সিস্টার ডায়মন্ড” হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

এই হীরাটা বাংলাদেশে প্রাপ্ত রত্নসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় আকৃতির এবং সবচেয়ে মূল্যবান। দরিয়া-ই-নূর-এর বহিরঙ্গ কার্নিশযুক্ত আয়তাকার। একটি স্বর্ণের বাজুবন্দের মধ্যখানে দরিয়া-ই-নূরকে বসানো হয়েছিলো। এর চারপাশে সংযুক্ত ছিল অপেক্ষাকৃত ছোট দশটি ডিম্বাকৃতির হীরকখন্ড। মানে দশতা ছোট হীরার মাঝখানে বসানো দরিয়া-ই-নূরকে রীতিমত অসামান্য অভিজাত লাগে দেখতে। মূল হীরকখন্ডটির ওজন ২৬ ক্যারেট। ছোটগুলির প্রতিটি ৫ ক্যারেট করে। এ হিসেবে দরিয়া-ই-নূরের সমন্বিত ওজন ৭৬ ক্যারেট। ব্রিটিশ জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান হ্যামিল্টন অ্যান্ড কোম্পানি জানিয়েছে, প্রাকৃতিক ও বিশুদ্ধ হীরকখণ্ডটি টেবিল আকৃতির, সমতল পৃষ্ঠ এবং মূল পাথরটি বর্ণহীন। অথচ এর আলোকচ্ছটার দীপ্তিতে ঝলসে যায় চোখ!

উত্তোলনের পর দরিয়া-ই-নূর দির্ঘদিন ছিল মারাঠাদের দখলে। পরে হায়দ্রাবাদের নওয়াব সিরাজ উল মুলুক মারাঠা রাজার কাছ থেকে এই রত্নটি কিনে নেন ১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকায়। এরপর দীর্ঘদিন বাদে হায়দ্রাবাদের নওয়াবের কাছ থেকে মুঘল সম্রাটদের দখলে আসে দরিয়া-ই-নূর। ১৭৩৯ সালে পারস্যের বাদশাহ নাদির শাহ দিল্লি আক্রমণ করে দুর্বল মুঘল সম্রাট মোহাম্মদ শাহ্‌-এর কাছ থেকে ময়ূর সিংহাসন, কোহিনূরসহ মূল্যবান ধনরত্ন লুট করে পারস্যে নিয়ে যান। জানা যায়, সে সময়ে কোহিনূর ও অন্যান্য রত্নরাজির সঙ্গে দরিয়া-ই-নূর চলে যায় পারস্যে। সম্ভবত তখনই দরিয়া-ই-নূরের নাম রাখা হয়েছিল। নাদির শাহ্‌ আততায়ীর হাতে নির্মমভাবে নিহত হন। পর্যায়ক্রমে এই রত্নের মালিক হন আহমদ শাহ-দুররানি। তিনিও নিহত হলে তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র মাহমুদ শাহ জোর করে ক্ষমতা দখল করেন। কিন্তু জ্যেষ্ঠপুত্র শাহ সুজা কোহিনূর ও দরিয়া-ই-নূরসহ মূল্যবান ধনরত্ন নিয়ে কাশ্মীরে পালিয়ে এসে আশ্রয় নেন। সেই সময় পাঞ্জাবের শিখ মহারাজ রণজিৎ সিং শাহ সুজার কাছ থেকে দরিয়া-ই-নূর হীরাটি লাভ করেন।

রণজিৎ সিং ছিলেন অসম্ভব রত্নপ্রিয় মানুষ। দুর্লভ ও ঐতিহাসিক ঐশ্বর্যের সমঝদার ছিলেন তিনি, এগুলো সংগ্রহের বাতিক ছিল তার। আর তার রত্ন ভান্ডারের সবচেয়ে দামী রত্ন ছিল এই দুটি, কোহিনূর ও দরিয়া-ই-নুর। কিংবদন্তী আছে যে, মহারাজ রণজিৎ সিং-এর অসম্ভব প্রিয় ছিল এই রত্ন দুটি, এক হাতে কোহিনূর পরিধান করলে অন্য হাতে দরিয়া-ই-নূর পরিধান করতেন তিনি। কিন্তু তাকেও শোচনীয় মৃত্যু বরণ করতে হয়। তার মৃত্যুর পর দরিয়া-ই-নূর শের সিং, নেহাল সিং-এর হাত ঘুরে শেষ পর্যন্ত নাবালক রাজা দীলিপ সিং-এর অধিকারে আসে। নাবালক রাজা দীলিপ সিং ১৮৪৯ সালে পাঞ্জাব যুদ্ধে ব্রিটিশদের কাছে হেরে গিয়ে আত্মসমর্পণ করেন। ব্রিটিশরা দীলিপকে কোহিনূর, দরিয়া-ই-নূরসহ অন্যান্য মূল্যবান সম্পদ তাদের কাছে হস্তান্তর করতে বাধ্য করে। ১৮৫০ সালে লর্ড ডালহৌসি কোহিনূর, দরিয়া-ই-নূরসহ কিছু মূল্যবান অলংকার লন্ডনে হাইড পার্কের বিখ্যাত মহামেলায় প্রদর্শনের জন্য প্রেরণ করেন। ব্রিটিশদের সঙ্গে মহারাজ দীলিপ সিংহের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী শিখ রাজার সম্পদের ওপর ব্রিটিশদের অবৈধ হস্তক্ষেপ নিয়ে ১৮৫১ সালে প্রশ্ন তোলা হয়। এর পরই কোহিনূর ও কিছু মুক্তার মালা রানির জন্য রেখে দরিয়া-ই-নূরসহ অন্যান্য অলংকার ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ১৮৫২ সালে।

তারপর হ্যামিল্টন এন্ড কোং-এর নিলাম থেকে এই মহামূল্যবান হীরাটি কেনেন নওয়াব আলিমুল্লাহ। তিনিই প্রথম এই হীরাটি আরো ১০টি ছোট ছোট পাঁচ ক্যারেটের হীরার মাঝখানে বসিয়ে সোনার ফ্রেমের সাহায্যে মূল হীরার সঙ্গে সংযুক্ত করে একটা বাজুবন্ধনীর মত করে ব্যবহার করতে শুরু করেন। এরপর হ্যামিল্টন অ্যান্ড কোম্পানির সহযোগিতায় ঢাকার নওয়াবদের সংগৃহীত বিভিন্ন রত্নসামগ্রীর একটি অ্যালবাম প্রকাশ করা হয়। এ অ্যালবামে দরিয়া-ই-নূর বিশেষ গুরুত্ব পায়। ১৮৮৭ সালে ভাইসরয় লর্ড ডাফরিন ও লেডি ডাফরিন কলকাতার বালিগঞ্জের নওয়াব ভবনে দরিয়া-ই-নূর প্রত্যক্ষ করে এতোটাই অভিভূত হন যে তারা এই ঘটনা তাদের ডায়েরীতে লিপিবদ্ধ করে রাখেন। ১৯১২ সালে সম্রাট পঞ্চম জর্জ ও রানী মেরী কলকাতা সফরে এলে হীরকখন্ডটি দেখেন এবং চমৎকৃত হন।

কিন্তু অচিরেই নওয়াব পরিবারে নেমে আসে দুর্যোগ। নওয়াব খাজা আলিমুল্লাহ মারা যাওয়ার পর আর্থিক সংকটে পড়ে নওয়াব পরিবার। নানা অব্যবস্থাপনার কারণে জমিদারি আয় কমে গেলে আর্থিক দৈন্যে পড়েন নবাব সলিমুল্লাহ। হাতি, ঘোড়া, উটেরবহরসহ স্থাবর-অস্থাবর অনেক সম্পত্তি তিনি বিক্রি করে দেন। তাতেও না কুলালে তিনি ঋণ নেন। ১৯০৮ সালে নবাব সলিমুল্লাহ তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বন্ধক রেখে ৪১৪২নং দলিলমূলে ৩ শতাংশ সুদে ৩০ বছরের মধ্যে পরিশোধের শর্তে ১৪ লাখ রুপি ঋণ নেন। নওয়াব খাজা সলিমুল্লাহ দরিয়া-ই-নূর হীরকখন্ডটি সরকারের নিকট বন্ধক রেখে যখন ঋণ গ্রহণ করেছিলেন তখন এর মূল্য নিরূপণ করা হয়েছিল ৫ লক্ষ টাকা। সেই ঋণ আর নবাব পরিবার পরিশোধ করতে পারেননি। এক পর্যায়ে তিনি এটি বিক্রি করে দেওয়ার অনুরোধ জানালে উদ্দেশ্যে হ্যামিল্টন অ্যান্ড কোম্পানির তত্ত্বাবধানে ১৯১১ সালে এটি আবার ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়। কিন্তু হীরকখন্ডটি কোন এক অদ্ভুত কারণে ইউরোপীয়দের তেমন আকৃষ্ট করতে পারে নি। সেখানে এর দাম ওঠে সর্বোচ্চ ১৫০০ পাউন্ড। এ অবস্থায় হীরকখন্ডটি ফেরত এনে কলকাতায় হ্যামিল্টন অ্যান্ড কোম্পানির তত্ত্বাবধানে ১৯৪৮ সালে পর্যন্ত সংরক্ষণ করা হয়। প্রতি বছর ফি বাবদ ২৫০ টাকা দিতে হতো নবাবদের।

নওয়াব খাজা সলিমুল্লাহর মৃত্যুর পর এবং পাকিস্তান সৃষ্টির পর বিভাগীয় কমিশনার এবং রাজস্ব বোর্ডের অনুমতিক্রমে নবাব পরিবারের সদস্য খাজা নসুরুল্লাহর সঙ্গে এস্টেটের ডেপুটি ম্যানেজার বেলায়েত হোসেন কলকাতার হ্যামিল্টন অ্যান্ড কোম্পানির কাছ থেকে ১৯৪৯ সালে দরিয়া-ই নূর ঢাকায় নিয়ে আসেন। এরপর ইম্পেরিয়াল ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার ঢাকা শাখায় রাখা হয়। ১৯৬৬ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় ইম্পেরিয়াল ব্যাংক বন্ধ হয়ে গেলে আবারো হীরকখন্ডটা স্থানান্তর ও হাতবদল হয়, শতাব্দীপ্রাচীন দরিয়া-ই-নূরের স্থান হয় ন্যাশনাল ব্যাংক অফ পাকিস্তান-এর সদরঘাট শাখায়।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানী সেনারা পরাজয়ের মুখে প্রায় সব ব্যাংক-বীমা লুটপাট করলেও ও ধ্বংসযজ্ঞ চালালেও কোন এক রহস্যজনক কারণে ওদের হাত থেকে বেঁচে যায় দরিয়া-ই-নূর! স্বাধীন বাংলাদেশে ন্যাশনাল ব্যাংক অফ পাকিস্তান পাল্টে পরিণত হয় সোনালী ব্যাংকে, কিন্তু সদরঘাট শাখার ভল্টে রয়েই যায় সেই দরিয়া-ই-নূর! ১৯৮৫ সালে নবাব পরিবারের ‘বিই’ প্রপার্টির মালিকের পক্ষ থেকে হীরকটির বিশুদ্ধতা যাচাই এবং পরিমাপ গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়। এজন্য উটাহ জেমোলজিক্যাল সার্ভিস কোম্পানিকে দায়িত্ব দেয়া হয়। তারা পরীক্ষা করে হীরকটির অকৃত্রিম বিশুদ্ধতা পেয়েছিল। কিন্তু খুব সম্প্রতি দরিয়া-ই-নূর আসলেই সদরঘাট শাখায় আছে কি না সে সম্পর্কে সন্দেহ দেখা দিয়েছে।

ব্রিটেনের রানী প্রতিবছর তার গহনা প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করতেন। দরিয়া-ই-নূরসহ অন্যান্য রত্নগুলো প্রদর্শনীর পর ফেরত পাঠানো হত আবার ভারতে। কয়েকটা সুত্র থেকে জানা যায় একবার রত্নগুলো ফেরত পাঠানোরর পর অভিযোগ ওঠে যে নকল গহনা ফেরত পাঠানো হয়েছে। তো যে আইসিএস অফিসার রত্নগুলো ফিরিয়ে এনেছিলেন, তিনি একটি প্যাকেটে এগুলো জমা দিয়েছিলেন।কিন্তু ওই প্যাকেটের মধ্যে আসল হীরাটা আছে কিনা এটি ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিদর্শন করা সঠিক হবে না মনে করে তখন আর পরিদর্শন করা হয়নি। এরপর পেরিয়ে গেছে অনেকদিন।১৯৮৫ সালে নওয়াব পরিবারের উদ্যোগে হীরাটা যাচাই করা হলেও এখন আবারও উঠে আসছে সেই পুরনো বিতর্ক। ভল্টে থাকা এই হীরাটাই কি আসল দরিয়া-ই-নূর? এরই মধ্যে বেশ কয়েকবার হীরাটি যাচাইয়ে বিদেশী বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে ভল্ট খুলে পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হলেও আমলা তান্ত্রিক জটিলতায় শেষ পর্যন্ত আর এই তদন্ত এগোয়নি। যা নিতান্তই দুর্ভাগ্যজনক।

আমরাও চাই সোনালী ব্যাংকের সদরঘাট শাখার ভল্ট খুলে আবার আরেকবার পরীক্ষা করে দেখা হোক রত্নটি। শত শত বছর ঘুরে এসে আজ দরিয়া-ই-নূর বাংলাদেশের সম্পদ, জনগনের সম্পদ। এটি সযত্নের রক্ষার দায়িত্বও আমাদের!

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close