কত ধরণের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের এই পৃথিবী! কত  ধরণের ভূপ্রকৃতি! পাহাড়, পর্বত, সমভূমি, মালভূমি, উপত্যকা, মরুভূমি ছড়িয়ে রয়েছে পুরো পৃথিবীজুড়ে। পৃথিবীর সৌন্দর্য্য বাড়াতে এসবের ভূমিকা নতুন করে বর্ণনায় কিছু নেই। বৈচিত্রময় আর রহস্যময় ভূপ্রকৃতির কারণেই পৃথিবীর কিছু অঞ্চল প্রতিবছর সারা বিশ্বের অসংখ্য ভ্রমণপিপাসু মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। এর অঞ্চলগুলোর মধ্যে কিছু আবার এত বেশি রোমাঞ্চকর এবং ভয়ঙ্কর যে সেখানে যাওয়ার কথা চিন্তা করলেও গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। তবু অসম সাহসী আর ব্যতিক্রমী কেউ কেউ এসব ভয় মন থেকে দূর করে, জয় করতে বেরিয়ে পরে ভয়ঙ্কর সব দুর্গম এলাকা। ব্রাইডসাইট অবলম্ববে এমন দুর্গম কিছু টুরিস্ট ডেস্টিনেশনের কথাই শোনাবো আজ-

ডেথ ভ্যালি, যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত ডেথ ভ্যালি বা মৃত্যু উপত্যকা পৃথিবীর সবচেয়ে উষ্ণতম অঞ্চলগুলোর একটি। এ উপত্যকাটি ভয়ানক বিপজ্জনক এক স্থান। কেন বিপজ্জনক তা এর বর্ণনা শুনলেই কিছুটা বুঝতে পারবেন।

পৃথিবীর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে এই স্থানে ১৯১৩ সালে, ৫৬.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মধ্যপ্রাচ্যের মরু অঞ্চলকেও হার মানায় এখানকার তাপমাত্রা। উপত্যকাটি লম্বায় প্রায় ২২৫ কিলোমিটার আর চওড়ায় আট থেকে ২৪ কিলোমিটার। পশ্চিম গোলার্ধের সব থেকে শুকনো নিম্নভূমি এটি। এখানকার বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ মাত্র পাঁচ সেন্টিমিটার। জায়গাটির বিভিন্ন স্থানে যে সামান্য জলাশয়ের সৃষ্টি হয় তাও ভীষণ লবণাক্ত। সমগ্র উপত্যকাটি বালিতে পরিপূর্ণ। অগ্নিতপ্ত সূর্য এবং মৃত্যু উপত্যকার সমুদ্রের তাপ আপনাকে খুব বেশিসময় টিকতে দিবে না এ জায়গায়। পানি ছাড়া খুব বেশি হলে ১৪ ঘন্টা এ জায়গায় টিকে থাকতে পারবেন আপনি।

যদি ভাবেন, এমন জায়গায় কে আবার বেড়াতে যাবে! তাহলে আরো বিস্ময়কর তথ্য অপেক্ষা করছে আপনার জন্য। শুধু বেড়ানোই নয়, এ জায়গায় রীতিমত অনেক মানুষের বাস। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কৌতুহলী হাজার হাজার পর্যটকের আগমন ঘটে এই মৃত্যু উপত্যকায়।

ডানাকিল মরভূমি, ইরিত্রিয়া

আফ্রিকার ডানাকিল মরুভূমির মতো এতো ভয়ঙ্কর ভূপ্রকৃতি বুঝি পৃথিবীর আর কোন স্থানে নেই। অনেকের মতে, এ জায়গাটিকে “হেল অন আর্থ” বললে খুব বেশি মিথ্যা বলা হবে না। এ এলাকায় অনেকগুলো সক্রিয় আগ্নেয়গিরি রয়েছে যেগুলোর জ্বালামুখ থেকে বিভিন্নরকম বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয়। এ স্থানের রেকর্ডকৃত সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

এমন ভয়াবহ স্থান হওয়া সত্ত্বেও প্রতিবছর আডভেঞ্চারপ্রিয় অনেক সাহসী মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় এ মরুভূমি। তবে, আপনিও যদি এ জায়গায় ভ্রমণে আগ্রহী হয়ে থাকেন, মনে রাখবেন, অভিজ্ঞ গাইডের সাহায্যে ছাড়া এ জায়গায় যাওয়ার চিন্তাও হবে প্রাণঘাতী।

মাউন্ট ওয়াশিংটন, যুক্তরাষ্ট্র

ভূপৃষ্ঠের অন্য সব এলাকার থেকে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরপূর্বাঞ্চলে অবস্থিত  মাউন্ট ওয়াশিংটনের চূড়ায় বাতাসের বেগ সব থেকে বেশি। এ পর্বতে বাতাসের সর্বোচ্চ বেগ রেকর্ড করা হয়েছে ঘন্টায় ৩২৭ কিলোমিটার। শুধুমাত্র বাতাসের প্রবল বেগই নয়, এখানকার বরফশীতল তাপমাত্রা যা থেকে থেকে ৪০ ডিগ্রিরও নিচে নেমে যায়, সেটাও ভ্রমনিচ্ছুক পর্যটকদের জন্য আরও একটি বড় ধরণের সমস্যা হয়ে দেখা দিতে পারে। মাঝেমধ্যে প্রচন্ডমাত্রার তুষারপাতে ঢেকে যায় মাউন্ট ওয়াশিংটন, যেটা এটিকে আরও দূর্গম স্থানে পরিণত করে। যদিও এ পর্বতের উচ্চতা তুলনামূলকভাবে খুব বেশি নয়, ৬২৮৮ ফুট, তবু বৈরী আবহাওয়ার কারণে এটি পৃথিবীর সবথেকে ভয়ানক পর্বতচূড়া। মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় উঠতে গেলে মানুষকে যতখানি যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, মাউন্ট ওয়াশিংটনের চূড়ায় ওঠার কষ্টকে তার সাথে তুলনা করলে, খুব বেশি ভুল বলা হবে না।

সিনাবং আগ্নেয়গিরি, ইন্দোনেশিয়া

ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপে অবস্থিত একটি স্বক্রিয় আগ্নেয়গিরি এটি। খুব অল্প বিরতিতে অগ্লুৎপাত ঘটে এটি থেকে। অগ্লুৎপাতের ফলে লাভা আর ছাইয়ে পুরোপুরি ছেয়ে যায় পাশ্ববর্তী গ্রামগুলো। নষ্ট হয় হাজার হাজার মানুষের ঘরবাড়ি, বন্ধ হয় জীবিকা অর্জনের পথ। ২০১০, ২০১৩, ২০১৪, ২০১৫ এবং সর্বশেষ ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারীতে অগ্লুৎপাত ঘটেছে এ আগ্নেয়গিরি থেকে। কবে যে আবার হঠাৎ করেই ফুঁসে উঠবে এই আগ্নেয়গিরি কেউ বলতে পারে না আগে থেকে। কিন্তু যখন ফুঁসে উঠবে, তখন ঠিকই বিষাক্ত গ্যাস, পাথর, ছাই প্রভৃতি উদগীরণ করে নরকে পরিণত করবে আশেপাশের স্থান। কেড়ে নেবে কতশত প্রাণ।

যাবেন নাকি এমন জায়গায় বেড়াতে? ভ্রমণপিপাসু অনেকেই কিন্তু যায় সেখানে!

মাদিদি ন্যাশনাল পার্ক, বলিভিয়া

বলিভিয়ায় অবস্থিত মাদিদি ন্যাশনাল পার্ক, প্রথম দর্শনে মুগ্ধ হয়ে যাবে যে কেউ। এত সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য! তবে একে শুধু সুন্দর বললে এর পরিচয় গোপনই থেকে যায়, একে বলতে হবে “ভয়ঙ্কর সুন্দর”। এ পার্কে পৃথিবীর সবথেকে বিষাক্ত আর ভয়ঙ্কর সব প্রাণীর বাস। অন্য সব প্রাণীর কথা যদি বাদ দিই, তবু এখানকার সামান্য একটা লতার সংস্পের্শে মানুষের শরীরে ভয়াবহ সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। চুলকানি, র‌্যাশ, মাথাঘোরা..ভয়াবহ অবস্থা! এছাড়া ভুল করেও যদি কোন লতায় লেগে শরীরের সামান্য অংশ কেটে যায়, ক্ষতিকর সব পরজীবীর আক্রমণে নাজেহাল হয়ে যেতে হবে আপনাকে।

ভ্যালি অফ ডেথ, কামচাটকা, রাশিয়া

রাশিয়ার পূর্ব প্রান্তে কামচাটকা উপদ্বীপে অবস্থিত এক উপত্যকাকে ভ্যালি অব ডেথ বা মৃত্যুর উপত্যকা বলা হয়। পুরো কামচাটকা উপদ্বীপ জুড়ে চার লাখেরও বেশি মানুষ বাস করে। কিন্তু এ উপদ্বীপের মৃত্যু উপত্যকায় মানুষ তো দূরের কথা কোন প্রাণীই বাস করতে পারে না। উচ্চমাত্রায় বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে এ উপত্যকায়। যার কারণে, কোন প্রাণীই বেশি সময় বেঁচে থাকতে পারে না এ উপত্যকা এলাকায়। প্রাণী এবং গাছপালা কোন কিছুই টিকে থাকতে পারে না। কোন মানুষ যদি ভুলে এখানে চলেও যায় তবে বাতাসে বিষাক্ততার কারণে সে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই খারাপ অনুভব করতে থাকে। জ্বর, মাথা ঘোরা এবং শিরশিরে অনুভূতি কাবু করে ফেলে তাকে।

বিকিনি অ্যাটল, মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ

প্রশান্ত মহাসাগরের মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের অনন্য সুন্দর দ্বীপ বিকিনি এটল। আজ থেকে ৭০ বছর আগে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ দ্বীপে ২৩টি পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়। তারপর থেকেই এ দ্বীপটি পরিত্যক্ত। আশেপাশের অঞ্চলে বসবাসকারী জেলে সম্প্রদায় এ দ্বীপ ছেড়ে পালিয়েছে অনেক আগেই। কারণ এই দ্বীপের আশেপাশের সমস্ত প্রাণীজগত নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল পারমাণবিক অস্ত্রের তেজষ্ক্রিয়তায়। মাছ তো দূরের কথা, অস্তিত্ব ছিল না কোনো সামুদ্রিক উদ্ভিদেরও। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, ৭০ বছর পর আবার প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে উঠছে এ দ্বীপ। জন্ম নিচ্ছে সামুদ্রিক প্রবাল। যা খেয়ে জীবন ধারণ করতে পারছে সাপ আর টোনা মাছ। মাছেরা বংশবৃদ্ধি করছে। মোটামুটি স্বাভাবিক এক জীবনচক্র ফিরে আসছে এ দ্বীপে।

যদিও তেজষ্ক্রীয়তার ভয়াবহতা হ্রাস পাচ্ছে তবু এখনো মানুষের জন্য উপযোগী হয়ে ওঠেনি এ দ্বীপ। অস্বাভাবিক তেজষ্ক্রীয়তার হার মানুষের শরীরে ক্যান্সারের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।

এলিফ্যান্ট কিংডম, চনবুরি, থাইল্যান্ড

থাইল্যান্ডের এলিফ্যান্ড কিংডম আসলে একটি কুমিরের খামার। এর মালিক পর্যটকদের মনোরঞ্জনের জন্য এই খামারের উপর একটি ভাসমান মাচা তৈরি করেছেন। মাচাটি প্লাস্টিকের ব্যারেলের সাহায্যে পানির উপর ভেসে থাকে। আর কাঠের মাচাটি ঘেরা থাকে নেট জাতীয় কিছু একটা দিয়ে। মাচার উপরে আবার ছাদের ব্যাবস্থাও আছে। পর্যটকরা চারদিকে ঘেরা মাচায় দাঁড়িয়ে, খাবার দিতে দিতে খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করতে পারে কুমিরগুলোকে।

ব্যাপারটা দেখতে অনেক মজার হলেও, সেখানে যেতে যথেষ্ট সাহসের দরকার হয়। কোনভাবে যদি মাচাটা ডুবে যায় বা মাচা থেকে কেউ পানিতে পরে তবে শত শত কুমিরের খাবারে পরিণত হয়ে দুনিয়া ছাড়তে হবে চোখের নিমিষে।

নাট্রন লেক, তানজানিয়া

দেখে শুষ্ক স্থলভূমি মনে হলেও এটা তানজানিয়ার একটি লেকের ছবি। লেকের নাম নাট্রন লেক। লেকের পানির উপরিভাগে ক্ষারযুক্ত লবণের একধরণের আবরণ রয়েছে, যার সংস্পর্শে আসলে খুব কম সময়েই যেকোন প্রাণীর মৃত্যু ঘটে। সঙ্গত কারণেই এই লেকের পানিতে সাঁতার কাটা নিষেধ। কেউ এ লেকের অনন্য সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে তা দেখতে গেলেও, এটি থেকে আসা হাইড্রোজেন সালফেটের অসহনীয় গন্ধের কাছে সে আকর্ষণ হার মানে। তাই কেউই বেশি সময় এ লেকের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারে না।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-