মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

চট্টগ্রামের যৌতুকপ্রথা: কদর্য এক সিস্টেমের আদ্যোপান্ত!

কুরবানীর ঈদের কয়েকদিন আগের কথা। এক বড়ভাইয়ের সঙ্গে গরুর বাজারে গিয়েছিলাম। ভাই গরুর দরদাম করছেন, ইন্ডিয়ান গরু তখনও ওদিকের বাজারে ওঠেনি, দাম তাই বেশ চড়া। কথায় কথায় তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কাদের সঙ্গে এবার গরু কিনছেন তারা, কারণ প্রতিবার শরীকেই কুরবানি দিতে দেখেছি তাদের। জবাবে যেটা শুনলাম, সেটার জন্যে প্রস্তুত ছিলাম না। বড়ভাই হাটে এসেছেন তার বোনের শ্বশুর বাড়িতে পাঠানোর জন্যে গরু কিনতে! বোনের বিয়ে হয়েছে মাস চারেক আগে, বিয়ের পরে প্রথম কুরবানীর ঈদ এটা, একটা গরু না দিলে স্বামীর ঘরে তার বোনের মান ইজ্জত আর থাকছে না!

সেই বড়ভাইকে আমি একদম ছোটবেলা থেকে চিনি। তাদের পরিবারের যে আর্থিক অবস্থা, তাতে একটা গরুর খরচ একা বহন করাটা যথেষ্ট ঝামেলার তাদের জন্যে। সেই পরিবারটাই যখন মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে পাঠানোর জন্যে টাকার দিকে না তাকিয়ে আস্ত একটা গরু কিনে ফেলে, তখন একটু অবাকই হতে হয়, আমিও হয়েছিলাম। ইনিয়ে বিনিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ভাই, এটা কি যৌতুক না? উনি হেসে জবাব দিয়েছিলেন, ‘আরে ব্যাটা এগুলো দিতে হয়। যৌতুক হবে কেন, এসব তো উপহার! আর এগুলো দেয়াটাই নিয়ম।’

শ্রদ্ধা বা সম্মানের কারণে এই অদ্ভুতুড়ে নিয়মের কথা শুনে ভাইয়ের মুখের ওপর ‘ছাতা-মাথার নিয়ম’ ডায়লগটা ছুঁড়ে দিতে পারিনি। কি অদ্ভুত একটা সমাজে বাস করি আমরা, যেখানে এখনও স্বামীর সংসারে মেয়েদের সুখ-শান্তি বা নিরাপত্তা নির্ভর করে তার বাবার বাড়ি থেকে কি পাঠানো হয়েছে সেটার ওপরে! যৌতুক বা পণপ্রথাটা আমাদের সমাজে নতুন কিছু নয়। একটা সময় তো এটা ব্যাধির মতো হয়ে উঠেছিল। এখনও কি যৌতুকের হাত থেকে নিস্তার পেয়েছি আমরা? 

চট্টগ্রাম, যৌতুক, উপহার, চট্টগ্রামের যৌতুকপ্রথা

‘উপহার’ বা নিয়মের নাম করে যে অনিয়মগুলো চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে, সেটাই তো যৌতুকের আধুনিক ভার্সন! এগুলো সারাদেশেই ছড়িয়ে আছে, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত দেশের সব জায়গাতেই এসবসব ভণ্ডামির সিস্টেমটা চালু রাখা হয়েছে। তবে এই জিনিসগুলো সবচেয়ে বেশি ঘটে বোধহয় চট্টগ্রামে। বন্দরনগরীতে কিছু কিছু বিয়ের অনুষ্ঠান দেখে সেগুলোকে যৌতুকের উৎসব বললেও বোধহয় কম বলা হয়ে যায়। এই ঘৃণ্য অপরাধটা সেখানে নিয়ম হয়ে গেছে, সমাজে চলতে গেলে সেই নিয়ম নামের অনিয়ম নেমে চলতেই হবে!

এখন আর কেউ মুখ ফুটে নগদ টাকা কিংবা ফ্রিজ-টেলিভিশন-মোটরসাইকেল চায় না। উল্টো বলে দেয়, মেয়ের খুশীর জন্যে তার পরিবার যা দিতে চায় সেটাই তারা নেবেন। আরে ব্যাটা, মেয়ের খুশীর জন্যে বাবা মা মেয়েকে বিয়ে দিচ্ছেন, সেটাই কি যথেষ্ট না? মেয়ের সঙ্গে ট্রাকভর্তি করে উপহার দিতে হবে কেন?

কনের পরিবারের দোষও তো কম না। তাদের ধারণা, মেয়ের সঙ্গে খাট-পালঙ্ক, টিভি-ফ্রিজ-এসির পসরা সাজিয়ে দিলেই তাদের মেয়েটা শ্বশুরবাড়িতে সুখী থাকবে, সেখানে তাকে বাড়তি কদর করা হবে, তাদের মেয়ে মাথা উঁচু করে স্বামীর ঘরে থাকতে পারবে… অদ্ভুত একটা ধারণা! সেই ধারণার বশবর্তী হয়েই তারা মেয়ের বিয়েতে ধারকর্জ করে হলেও বিয়েতে উপহারের নামে যৌতুকের পসরা সাজিয়ে বসেন। সেফটিপিন থেকে রান্নাঘরের হাড়ি, কিংবা এনার্জি সেভিং লাইট থেকে শুরু করে টিভি-ফ্রিজ বা এসি, কোনকিছুই তাদের ‘উপহারের’ তালিকা থেকে বাদ থাকে না। 

চট্টগ্রাম, যৌতুক, উপহার, চট্টগ্রামের যৌতুকপ্রথা

মোটামুটি অবস্থাসম্পন্ন যারা, তাদের কথা বাদই দিলাম। আমার আপনার মতো যারা মধ্যবিত্ত, যাদের মাসের বিশটা দিন মোটামুটি গেলে শেষের দশটা দিন টানাটানিতে যায়, তারাও কিন্ত এই অনিয়মের সঙ্গে দিব্যি মানিয়ে নিয়েছেন! নিজেরা চার-পাঁচ শরীকে কুরবানী দিলেও সমস্যা নেই, মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে আস্ত একটা গরু কিন্ত পাঠানো চাই! একদম নিতান্ত অপারগ কেউ যদি আস্ত গরু-ছাগল পাঠাতে না’ই পারে, নিজেদের গরুর একটা রান কিন্ত পাঠানো চাই! ঈদের দিনে নিজের গায়ে গতবছরের জামা উঠুক, তবুও মেয়ে জামাইয়ের চৌদ্দ গুষ্টির জন্যে ব্র‍্যান্ডশপ থেকে জামাকাপড় কিনে পাঠাতে হবেই! রমজানে হাজার হাজার টাকার ইফতারি, গ্রীষ্মে ফলের ডালি আর শীতে পিঠার সারি তো আছেই!

বিয়েতে কমসে কম হাজার দুয়েক মানুষ খাওয়াতে হবে, খাবারের আইটেম দশটার কম হলে কিন্ত আবার নাক কাটা যাবে! নাক রক্ষার জন্যে এর কাছে ধার চাও, অমুকের কাছ থেকে ধার নাও। ধারের ঠেলায় পরের কয়েকটা বছর যে তারা আর কোমর সোজা করতে পারবে না, সেটা খেয়াল থাকে না কারো, খেয়াল থাকলেও উপায় থাকে না। মেয়ের সুখ বলে কথা! আর মেয়ে যদি গর্ব করে শ্বশুরবাড়িতে বলতে না পারে যে ‘আমার বাবার বাড়ি থেকে গাড়ি ভর্তি করে অমুক তমুক পাঠিয়েছে’, তাহলে আর বিয়ে দিয়ে লাভ কি হলো? বিয়ের আগে দাও, বিয়ের সময় দাও, বিয়ের পরেও দাও… কেবল দিতেই থাকো। এ এক অফুরন্ত চাহিদা! মেয়ের ননদের শ্বশুরের ভাইয়ের ছোট শ্যালিকার ছেলের আকিকায় কিছু না দিতে পারলে কি মেয়ের মানসম্মান আর থাকবে? থাকবে না। মানসম্মান বজায় রাখার জন্যে তিমির পেটে ‘উপহার’ ঢালতে থাকো কেবল…

বলছি না যে চট্টগ্রামের সব পরিবারেই এই প্রথাটা আছে, কিংবা সবাই এই যৌতুক বা উপহারের বাজে নিয়মটাকে অনুসরণ করেন। ব্যতিক্রম অনেক আছে। কিন্ত দুই পক্ষের মধ্যে যখন সংখ্যার বিচার করতে যাবেন, উপহারের প্রথা মেনে না চলা দলটাকে খুবই ছোট মনে হবে আপনার কাছে। বেশিরভাগ মানুষ এই ভ্রান্ত নিয়মটাকে ট্রেডিশান বানিয়ে ফেলেছে। মেয়ের শ্বশুরবাড়ির চাহিদা পূরণ করতে করতে কোমর বাঁকা হয়ে গেলেও তারা এসব সংস্কার পালনে মরিয়া, নইলে মেয়ে যে সুখে থাকবে না! 

চট্টগ্রাম, যৌতুক, উপহার, চট্টগ্রামের যৌতুকপ্রথা

ছোটবেলায় বিটিভিতে নাটিকা দেখতাম, যৌতুকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হতো সেগুলোতে। যৌতুক নেয়া এবং দেয়া, দুটোই নাকি সমান অপরাধ। পত্রিকা খুললেই একটা সময় যৌতুকের কারণে হত্যা বা নির্যাতনের খবর চোখে পড়তো। পরিমাণটা কিছুটা কমেছে হয়তো, তবুও এখনও, এই ২০১৮ সালে এসেও শ্বশুরবাড়ির চাহিদামতো ‘উপহার’ দিতে না পারার অপরাধে নারীদের নির্যাতিত হতে হয়, পদে পদে অপদস্থ করা হয় তাদের। আর আমরা ‘নারী স্বাধীনতা চাই’ বলে মুখে ফেনা তুলি…

চট্টগ্রামের বাইরের মানুষজনই অনেক সময় ঠাট্টা করে বলে, ছেলে বিয়ে দাও চট্টগ্রামে, তাহলে উপহার নিয়ে চিন্তা করতে হবে না আর! বিশ্রী এই সিস্টেমটা সারাদেশেই আছে, ঢাকা কুমিল্লা খুলনা বরিশাল সব জায়গাতেই আছে, কিন্ত চট্টগ্রামে এটার প্রকোপ অন্য যে কোন জায়গার চেয়ে অনেকটা বেশি। শিক্ষিত-অশিক্ষিত বা ধনী-গরীব নির্বিশেষে সবাই গা ভাসিয়েছে এই বিচ্ছিরি সিস্টেমের জোয়ারে, এটাই সবচেয়ে হতাশার। 

ছবি কৃতজ্ঞতা- ওয়েডিং ডাইরি বাংলাদেশ, ওয়েডিং হান্টার বাংলাদেশ

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close