ফুটবল জীবনের অনুরূপ। ফুটবল জগতে বছর বছর অনেক দীপ্তিমান ফুটবলার এসেছেন, কিন্তু কেউই ইয়োহান ক্রুইফের মত এতটা অর্থপূর্ণ ছিলেন না। ফুটবলজীবনে আয়াক্স, বার্সেলোনা এবং নেদারল্যান্ডসের হয়ে খেলে তিনি নিজেকে পেলে, ম্যারাডোনা, পুস্কাস, লিওনেল মেসি এবং জিনেদিন জিদানের মতো গ্রেটদের কাতারে নিয়ে গেছেন। আয়াক্স এবং বার্সেলোনাতে কোচের দায়িত্ব নিয়ে রোমাঞ্চকর দল গড়েছিলেন, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রতিভাবান প্লেয়ার গড়ে তুলেছিলেন এবং বিশ্বের অনেক বড় বড় ক্লাবকে তার মূলমন্ত্র অনুসরণে প্রভাব রেখেছিলেন।

সর্বজয়ী স্পেন- বার্সেলোনার জাভি এবং ইনিয়েস্তা, আজকের অসাধারণ বায়ার্ন মিউনিখ এবং জার্মানি, আশির দশকের শেষ দিকের এসি মিলান সহ আরো অনেক চ্যাম্পিয়ন দলের শ্রেষ্ঠত্বের কথা ক্রুইফকে ছাড়া কল্পনা করা যায় না। এক সময়ের ভিত্তিগত এবং বিপ্লবী ক্রুইফীয় নীতি বর্তমানে আধুনিক ফুটবলের মানদন্ডে পরিনত হয়েছে। ক্ষুদে প্লেয়ারদের বিকশিত করতে তার পরিকল্পনা বিশ্বব্যাপী অনুকরণ হচ্ছে। ১৯৮৪ সালে ক্রুইফ ২০ বছরের খেলোয়াড়ি জীবনের ইতি টানেন। ১৯৯৬ সালের পর কোন শীর্ষ ক্লাবের দায়িত্ব পালন করেন নি। এরপর তিনি লোকহিতৈষী, শিক্ষাগুরু, কমেন্টেটর- পর্দার আড়ালের প্রভূত পরিচয়ে নিজেকে মেলে ধরেন।

গত বছর ৬৮ বছর বয়সে তার ফুসফুসে ক্যান্সার ধরা পরে। তখন থেকে ক্যান্সার সাথে লড়াই করতে অনেকটাই লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যান। গত ফেব্রুয়ারিতে তিনি ঘোষণা দেন ক্যান্সারের সাথে লড়াইয়ে তার অবস্থান আশাব্যাঞ্জক। ফুটবল বিশ্ব যখন ক্রুইফের আরোগ্যলাভে প্রার্থনারত, তখন তার নীতি এবং অনুসারীরা পূণ্যভুমি থেকে দক্ষিণ মহাসাগর- সর্বত্রই তার ভাবনা এবং দর্শন দ্বারা ফুটবলকে নতুন ভাবে সাজিয়ে চলেছেন। ক্রুইফ-ভক্তরা শুধু তার এবং তার দলের খেলার ধরন অনুকরণ করছেন না। তারা মনে করেন ক্রুইফের ফুটবল দর্শনের প্রচলন দ্বারা পৃথিবীকে আরো ভাল অবস্থানে আনা সম্ভব। তারা অনুভব করেন অন্যান্য খেলার ধরনের চেয়ে ক্রুইফের ফুটবল দর্শন অধিক সুন্দর, অধিক আনন্দময় এবং অধিক আত্মিক।

ক্রুইফের শুরুটা ছিল অবনমিত। তার ক্যারিয়ার ছিল দীর্ঘ এবং চ্যালেঞ্জিং। এই দীর্ঘ যাত্রায় তিনি অনেক পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছিলেন- যারা এখনকার ভয়ংকর ডিফেন্ডারদের চেয়ে কোন অংশে কম ছিল না। তার অর্জনের খাতায় রয়েছে ১৪ টি লিগ শিরোপা, অন্যান্য কাপ টাইটেল এবং ১৯৭৪ এর বিশ্বকাপে প্রজ্জ্বলিত পারফর্মেন্সের কারণে সারা বিশ্বের কৃতজ্ঞতা গ্রহণ করেছিলেন।

১৯৭৮ বিশ্বকাপ তার জন্য অত্যন্ত নির্দয় এক অভিজ্ঞতা।

ক্রুইফ বার্সেলোনাতে তার বুটজোড়া তুলে রাখলেন। অ্যামস্টারডাম স্টেডিয়ামে বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে এক বিদায়ী ম্যাচ খেলতে সম্মত হলেন। বায়ার্ন ৮-০ গোলে ম্যাচ জিতেছিল। ম্যাচ শেষে ক্রুইফ এক সতীর্থকে জড়িয়ে ধরে নিজেকে লুকালেন। তখন কেউ একজন ক্রুইফকে একটি ফুলের তোড়া এনে দিলেন। কিন্তু ক্রুইফের কাছে মনে হল এটি যেন সম্মানপ্রদর্শন নয়, বরং এটি তার অন্তোষ্টিক্রিয়া। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি আমেরিকান সকার লিগে লস অ্যাঞ্জেলেস আজটেক্স এবং ওয়াশিংটন ডিপ্লোম্যাটসের হয়ে খেলেছিলেন। এরপর সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য স্পেনের লেভান্তেতে ছিলেন। সেখানে ঝুকিপূর্ন শুকর খামার ব্যবসায় বিপুল অর্থক্ষতিতে পরেন। এরপর ১৯৮১ তে আবারো ফুটবলে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন।

অবসর ভেংগে ফিরে এসে তার প্রথম ম্যাচ ছিল আয়াক্সের হয়ে হারলেম এর বিপক্ষে। ডে মিয়ার স্টেডিয়াম দর্শকে পরিপূর্ন। সন্দেহবাদীরা বলছিল তার বয়স অনেক হয়ে গেছে, তার আগের সেই ম্যাজিক এখন আর নেই। খেলার প্রথম হাফে বল নিয়ে তিনি দুই ডিফেন্ডারের ট্যাকল কৌশলে এড়িয়ে গেলেন, পেনাল্টি এড়িয়ার প্রান্তে চলে এলেন, ডান কাধ কিছুটা নামিয়ে নিলেন। তারপর কোন সতর্কবানী ছাড়াই আলতো কিন্তু সবচেয়ে বিধ্বংসী চিপ করলেন। বিস্ময়ে হতবাক গোলকিপার তাকিয়ে দেখল তার মাথার উপর দিয়ে ভেসে বলের জালে জড়িয়ে যাওয়া।

এরপর ক্রুইফ আরো তিন বছর খেলেছেন। মার্কো ভ্যান বাস্তেন, রোনাল্ড ক্যোম্যান এবং ডেনিশ বার্গক্যাম্পের মত ভবিষ্যত স্টার প্লেয়ারদের অনুপ্রানিত করেছিলেন। এরপর কোচ হিসেবে প্রথমে আয়াক্স এবং পরবর্তীতে বার্সেলোনায় দুটি ‘স্বর্গীয় ফুটবল সাম্রাজ্য’ বিস্তৃত করেছিলেন। এখানে স্বর্গীয় শব্দটি ব্যবহারের কারন হচ্ছে ক্রুইফ সম্পর্কে বলতে গিয়ে তার ভক্ত অনুরাগীরা প্রায় সবাইই ধর্মীয় সংক্রান্ত ভাষা ব্যবহার করেছেন।

ভিক বাকিংহাম- আয়াক্সে ক্রুইফের প্রথম কোচ তাকে ব্যাখ্যা করেছেন ‘ফুটবলে বিধাতার উপহার’ হিসেবে। ২০০৮ সালে পেপ গার্দিওলা বার্সেলোনার দায়িত্ব নিয়ে দলের ভিত্তি, জীন সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছিলেন ‘ক্রুইফ আমাদের প্রধান গির্জা নির্মান করেছেন। আমাদের কাজ সেটার রক্ষনাবেক্ষন করা।’

ক্রুইফের কিছু নীতিগত উক্তি:

  • আপনি যদি জিততে না পারেন, তবে এটা নিশ্চিত করুন যাতে না হারেন।
  • প্রতিটি ক্ষতির মধ্যে একটি লাভ আছে।
  • আপনি যদি গন্তব্যে না পৌছাতে পারেন, তবে হয় আপনি অনেক আগে চলে এসেছেন অথবা অনেক দেরি করে ফেলেছেন।
  • যদি আমি আপনাকে বোঝাতে চাইতাম, তবে আমি সেটা ভালমত ব্যাখ্যা করতাম।

স্পেনে থাকতে তিনি খেয়াল করেছিলেন প্লেয়াররা খেলা শুরুর আগে বুকে ক্রস আঁকেন। তিনি তখন বলেছিলেন ‘যদি এই ক্রস আঁকায় কাজ হতো, তবে সব ম্যাচ ড্র হতো।’

১৯৫০ এর শেষের দিকের ক্রুইফের বাসায় তৈরি এক সাদা কালো ভিডিও ফুটেজ আছে। হাড্ডিসার, প্রাণবন্ত এক ছোট্ট ছেলে অ্যামস্টারডামের শহরতলীর ফুটপাথে এদিক ওদিক বল নিয়ে ছুটছে। বল তার শরীরের সমান বড়। ছেলেটি পরিপাটি পোষাক পরিহিত- সোয়েটার, ঢিলেঢালা শর্টস এবং লেদারের জুতা। প্রথম দৃশ্যে ইয়োহান মাথায় বল নিয়ে খেলছিল। পরের দৃশ্যে বয়সে বড় এক ছেলেকে নাটমেগ করল, বল নিয়ে ক্যামেরার বাইরে চলে গেল। ভিডিও ফুটেজে প্রাপ্ত বয়স্ক ক্রুইফের ছাপ পরিলক্ষিত হয়- বিচক্ষন পা, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রবণতা, নিখুত ভারসাম্য।

আর সব গ্রেট প্লেয়ারদের মতই ক্রুইফের প্রতিভার বিকাশ ঘটেছে রাস্তার ধারে অপরিমেয় ঘন্টা অনুশীলনের মাধ্যমে। শৈশবের এক বন্ধু ছোট ইয়োহানকে স্মরণ করতে গিয়ে বলেছিলেন ‘যেখানে ইয়োহান সেখানেই ফুটবল, আবার যেখানে ফুটবল সেখানেই ইয়োহান।’

রাস্তার ধারে ক্রুইফের বল নিয়ে ছোটাছুটির ভিডিওটি করা হয়েছিল ১৯২০ সালের দিকে শ্রমিকদের জন্য শহরতলীতে নির্মিত আবাসস্থলের বাগানে। ক্যামেরাম্যান ছিলেন ক্রুইফের বাবা ম্যানাস ক্রুইফ। অ্যাকারস্ট্রেটে তার একটি ছোট মুদি দোকান ছিল। কয়েকবছর পর হার্ট অ্যাটাকে তিনি মারা যান। ছোট্ট ক্রুইফের জন্য রেখে যান অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ আর দুর্দশার জীবন।

ক্রুইফের বাসা থেকে আয়াক্স স্টেডিয়ামের দূরত্ব মাত্র ৪০০ গজ। ম্যানাস ক্রুইফের মৃত্যুর পর ক্রুইফের মা আয়াক্স স্টেডিয়ামে পরিষ্কারকর্মী হিসেবে কাজ নেন। ক্রুইফ সারাক্ষণ সেখানে ঘুরঘুর করত। ক্লাবের প্রত্যেকেই তাকে চিনত। ক্রুইফের ১৭ তম জন্মদিনের ৬ মাস পর আয়াক্সের ততকালীন কোচ বাকিংহাম ফার্স্ট টিমে ক্রুইফকে অভিষিক্ত করেন। বাকিংহামকে ক্রুইফের ফুটবল জীবনে পিতৃতুল্য ব্যক্তি হিসেবে অভিহিত করা হয়।

আয়াক্স নেদারল্যান্ডসের বড় ক্লাব গুলোর মধ্যে অন্যতম। কিন্তু তখন নেদারল্যান্ডসকে তৃতীয় শ্রেণীর ফুটবল ন্যাশন হিসেবে ধরা হত। কেননা তাদের ট্যাকটিকস এবং সুযোগ সুবিধা ১৯৩০ এর দশকে আটকে ছিল। কিন্তু এরপরের মাত্র ১০ বছরে নেদারল্যান্ডস এবং আয়াক্স বিশ্ব দরবারে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করে নেয়। এটা সম্ভব হয়েছিল ক্রুইফের কল্যাণে।

গ্রেট রিনাস মিকেলস এর কোচিং আর ক্রুইফের নেতৃত্বে আয়াক্স ‘টোটাল ফুটবল’ নামের এক নতুন বিস্ময়কর পদ্ধতিতে খেলতে আরম্ভ করে। ১৯৭১-১৯৭৩ সালে প্রতিবছর ইউরোপিয়ান কাপ জিতে নেয় আয়াক্স। ১৯৭৪ এর বিশ্বকাপে টোটাল ফুটবলের আপডেট ভার্সনে খেলতে থাকে নেদারল্যান্ডস। ক্রুইফের অধিনায়কত্বে বিস্ময়জনক, প্রাণবন্ত, আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে পুরো বিশ্বকাপে আধিপত্য বিস্তার করে নেদারল্যান্ডস। কিন্তু ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির কাছে হেরে যায়।

অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের কারনেই নেদারল্যান্ডস সেদিন ফাইনালে পরাজিত হয়। ম্যাচের দ্বিতীয় মিনিটে কোন জার্মান প্লেয়ার বল টাচ করার আগেই ১৭ টি পাসের পর ক্রুইফের বুদ্ধিদীপ্ত দৌড় থামাতে না পেরে বিপক্ষ ডিফেন্ডার ফাউল করলে পেনাল্টি থেকে গোল দিয়ে লিড নেয় নেদারল্যান্ডস। পরবর্তী ২০ মিনিট নেদারল্যান্ডস দ্বিতীয় গোলের কোন চেষ্টা না করে নিজেরা বল পাস করে খেলতে থাকে। পরবর্তীতে জার্মানি দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়ায় এবং দুই গোল দিয়ে লিড নেয়। দ্বিতীয় হাফে অনেক চেষ্টার পরেও কোন গোল করতে ব্যর্থ হয় নেদারল্যান্ডস। বিশ্বকাপ ফাইনালে হার ক্রুইফের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় বিপর্যয় এবং হতাশাজনক অধ্যায়। কিন্তু বিশ্বকাপ অর্জনে ব্যর্থ হলেও নেদারল্যান্ডসের খেলা সবাইকে মুগ্ধ করেছিল। ১৯৯৮ এর বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে রোমাঞ্চকর জয়, কিন্তু পরবর্তীতে ব্রাজিলের বিপক্ষে পেনাল্টিতে নেদারল্যান্ডস হেরে যাবার পর ক্রুইফ বলেছিলেন ‘তোমার খেলার স্টাইলের কারনে মানুষের প্রশংসা অর্জনের চেয়ে সেরা মেডেল আর কিছু হতে পারে না।’ পরবর্তী তিন চার জেনারেশনে নেদারল্যান্ডস চমৎকার প্লেয়ার এবং সম্মোহিত ফুটবল খেলেও কোন না কোনভাবে শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়েছে। কিন্তু ‘সৃষ্টিশীল এবং উত্তেজনাপূর্ণ’- ক্রুইফের এহেন ফুটবল বিশ্বাসের ভিত্তির প্রতি আস্থা রেখে এখনো সেভাবেই খেলে যাচ্ছে নেদারল্যান্ডস।

অধিকাংশ কোচেরা মনে করেন খেলায় জয়টাই মুখ্য। কিন্তু দৃষ্টিকটু ভাবে খেলে জয় তুলে নেয়ার ব্যাপারে ক্রুইফ কখনওই আগ্রহী ছিলেন না। ১৯৬০ এর দিকে ইতালিয়ানদের মধ্যে ‘যে কোন মূল্যে জিততে হবে’ এই মানসিকতার সৃষ্টি হল। ইতালিয়ানরা তখন রক্ষণশীল ফুটবলে মনোনিবেশ করল। তখন ক্রুইফ আর তার সহযোগী ডাচদল আক্রমণাত্মক ফুটবলের কারনে সমাদৃত হয়েছিলেন।

ক্রুইফ জয় এবং সুন্দর ফুটবলকে অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করেন। তাকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল তিনি কি ডিফেন্সিভ খেলে লিগ জিততে আগ্রহী কিনা। উত্তরে তিনি বলেছিলেন ‘না কেননা এটা খুব বিরক্তিকর কাজ। ভাবুন একবার পুরো সিজন প্রতিপক্ষের আক্রমন প্রতিহত করবেন। এভাবে লিগ জয়ের কোন গ্যারান্টি নেই। পুরো সিজনটাই নষ্ট হবে।

প্লেয়ার হিসেবে ক্রুইফ কেমন ছিলেন? জানতে চাইলে ইউটিউবে ‘Johan Cruijff Is Art’ ভিডিওটি দেখতে পারেন। তার একজন ফ্যানের ১৪ মিনিটের ট্রিবিউট ভিডিও। তার ১৪ নম্বর জার্সির কথা মাথায় রেখে ঠিক ১৪ মিনিটের ভিডিও বানানো হয়েছে। ভিডিওতে আপনি ক্রুইফের সব গুণ দেখতে পাবেন: রহস্যময় বল কন্ট্রোল, মুহূর্তেই দিক পরিবর্তন, তীব্র গতিতে ড্রিবলিং, অসম্ভব অ্যাংগেলে পাস, বলের বাঁক, ক্ষিপ্র গতি; মোটকথা ফুটবলার ক্রুইফের সারাংশ সেখানে রয়েছে। ইংলিশ ফুটবল লেখক ডেভিড মিলার তাকে ‘বুট পায়ে পীথাগোরাস’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। ডাচ লেখক নিকো শেপমকার তাকে ‘চতুর্পদ’ বলেছেন। ডাচ কোরিওগ্রাফার রুডি ভ্যান ডান্টজিগ তাকে ‘দ্য গ্রেট রুডলফ নরইয়েভ’ এর চেয়ে ভাল ড্যান্সার বলে ভূষিত করেছেন।

ক্রুইফের দর্শনীয় মুভ গুলোর একটি হচ্ছে হঠাত করে থেমে যাওয়া। পরমূহুর্তেই ক্ষিপ্রগতিতে ভিন্ন দিকে ছোটা। খুব কম ডিফেন্ডার এই মুভের সাথে তালসামলাতে পারত। আরেকটি মুভ হচ্ছে বিখ্যাত ‘ক্রুইফ টার্ন’ তিনি এটি দেখিয়েছিলেন ১৯৭৪ বিশ্বকাপে সুইডেনের বিপক্ষে ম্যাচে। ক্রুইফ বল ক্রস করার মত ঝুঁকলেন। ডিফেন্ডার ক্রস ব্লক করতে তৈরি। তখনি ক্রুইফ উল্টো ঘুরে নাচতে নাচতে বিপরীতদিকে চলে গেলেন।

ক্রুইফ বল হেড করায় খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না, যদিও প্রয়োজনের সময় তিনি যথেষ্ট ভাল হেড করতেন। তিনি তার সৃষ্টিশীল দক্ষতাকে কাজে লাগাতে অধিক পছন্দ করতেন। বার্সেলোনা ফ্যানরা অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের বিপক্ষে তার অসম্ভব গোলের কথা আজো ভোলে নি। গোলটিতে তিনি অলিম্পিক জিমনাস্টিকদের মত বাতাসে লাফিয়ে উঠে পায়ের বাহিরের অংশ দিয়ে বল জালে জড়িয়েছিলেন। ক্যারিয়ারের শেষদিকে খেলার মাঝখানে অধিকাংশ সময় ক্রুইফ সতীর্থদের কোথায় মুভ করতে হবে সেই দিক নির্দেশনা দিতেন। তার খেলা দেখে থাকলে বোঝা যাবে তিনি শুধু নিজেই খেলতেন না, বরং পুরো দলকে কন্ট্রোল করতেন। কোন প্লেয়ারের তার মত করে পুরো মাঠের খেলাকে এত সূক্ষ্ম আর গভীরভাবে অনুধাবন করার দক্ষতা ছিল না। তিনি ছিলেন অনেকটা দাবাখেলার গ্রান্ড মাস্টারের মত। আপনি চাল দেয়ার আগে যিনি আপনার মন পড়তে পারেন। ক্রুইফ একবার বলেছিলেন ‘খুব বেশি দৌড়িও না। ফুটবল এমন একটা খেলা যেটা মস্তিষ্ক দিয়ে খেলতে হয়।’

প্রকৃতপক্ষে তিনি এবং তার টোটাল ফুটবল দলের সতীর্থরা মাঠে প্রচুর দৌড়াতেন। প্রতিপক্ষকে অভিভূত করতেন তাদের এনার্জি, ক্ষিপ্রতা, স্কিল এবং বিভ্রান্তিকর মুভমেন্ট দ্বারা।

তাহলে কি ক্রুইফ ‘টোটাল ফুটবল’ আবিষ্কার করেছিলেন? পুরোপুরি না। এটা তার আংশিক অর্জন। বাকি অর্ধেক রিনাস মিকেলসের। ১৯৬৫ সালে আয়াক্সের দায়িত্ব নিয়ে মিকেলস অপেশাদার ক্লাবে প্রেরনা আর পেশাদারিত্ব নিয়ে আসলেন। ট্যাকটিকাল দিক উন্নয়নের পুরো কৃতিত্ব মিকেলসের। কিন্তু ক্রুইফকে ছাড়া এটি এক কথায় অচিন্তনীয়। ক্রুইফকে ছাড়া এই দর্শন অনেক আগেই প্রান হারাত। কেননা আশির দশকের শুরুতে যখন ‘টোটাল ফুটবল’ খেলা সকল প্লেয়ার অবসরে গেলেন তখন বিশ্বব্যাপী ডিফেন্সিভ ফুটবল এক ফ্যাশনে রূপ নিল। এমনকি নেদারল্যান্ডস ডিফেন্সিভ ফুটবলের দিকে এগোচ্ছিল।

আয়াক্সের দায়িত্ব নিয়ে ক্রুইফ আবারো টোটাল ফুটবলের মন্ত্রে দীক্ষিত করলেন এবং নিজস্ব দর্শনে নতুনভাবে অলংকৃত করলেন। সময়ের সাথে ক্রুইফের ভাবনাগুলো নেদারল্যান্ডসে দৃঢ় বিশ্বাসে পরিণত হল। তিনি আয়াক্স ইয়ুথ সিস্টেমকে পুনর্গঠন করে তার স্টাইলে খেলার অভ্যাস করিয়েছিলেন। পরবর্তীতে বার্সেলোনাতে আরো অধিক বাজেট নিয়ে একই পন্থা অবলম্বন করেছিলেন। আমরা এখন ধরেই নিয়েছি স্পেন মার্জিত, চিন্তাশীল এবং সৃষ্টিশীল ফুটবলের প্রাণকেন্দ্র। এটিকে বাস্তবায়ন করেছিলেন ইয়োহান ক্রুইফ। ১৯৭৩ সালে যখন তিনি প্রথম স্পেনে এলেন, বার্সা তখন শিরোপা ক্ষরায় ভুগছিল। প্রথম সিজনে তিনি বার্সাকে ১৪ বছরে প্রথমবারের মত লিগ চ্যাম্পিয়ন করেছিলেন। নেদারল্যান্ডসে প্রচলিত একটি কথা হচ্ছে বার্সেলোনা ফ্যানরা তাকে ‘ত্রাণকর্তা’ নাম দিয়েছিল।

কিন্তু তখনই স্পেনে ফুটবল সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটে নি। দেশটি তখন শাসন করতেন ফ্যাসিবাদি একনায়ক ফ্রান্সিস্কো ফ্রাংকো। লা ফুরিয়ার মূলনীতির দ্বারা তখন ফুটবল অবহিত হত। তখনকার সবচেয়ে মূল্যবান গুণাবলী ছিল প্যাসন এবং প্রচেষ্টা। বিলবাও গুচার, আন্দনি গইকয়েটক্সার এর মত ডিফেন্ডাররা তখন জাতীয় ফুটবল দলে প্রতিফলন ঘটিয়েছিল।

১৯৮৮ সালে ক্রুইফ যখন কোচ হিসেবে বার্সেলোনায় ফিরেন, তার ১৩ বছর পূর্বেই ফ্রাংকোর মৃত্যু ঘটেছে। স্পেনেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে গণতন্ত্র। পরবর্তী কয়েকবছরে তিনি রিষ্টো স্টয়চকভ, রোনাল্ড ক্যোমান, রোমারিও, মাইকেল লাউড্রপদের মত তারকাদের সাথে গার্দিওলা সহ লোকাল তরুনদের নিয়ে ড্রিম টিম গঠন করলেন। ১৯৯০-৯১ থেকে ১৯৯৩-৯৪ পর্যন্ত টানা চার সিজন লা লিগা এবং এর মধ্যে প্রথমবারের মত চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতে নেয় বার্সেলোনার রোমাঞ্চকর দলটি। হঠাত করেই স্পেনের সবাই বার্সার মত করে খেলতে চাইতে লাগল।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইংলিশরা যুদ্ধের সাহসী বিকল্প হিসেবে ফুটবল আবিষ্কার করেছিল এবং তারা সরল রেখার ন্যায় এক নির্দিষ্ট ফর্মেশনে খেলত। ব্রাজিলিয়ানরা ভাবল ফুটবল হচ্ছে স্বতন্ত্র কারুকার্য দেখানোর মঞ্চ। ইটালিয়ানরা তাদের রক্ষণশীল মনোভাব ফুটবলে নিয়ে আসল। জার্মানদের ছিল সংগ্রামের উদ্দীপনা। চিরন্তর প্রেচেষ্টা, শারীরিক ক্ষমতা এবং টিমওয়ার্ক ছিল তাদের সাফল্যের চাবিকাঠি।

ক্রুইফ এবং মিকেলস ফুটবলকে নতুনভাবে কল্পনা করলেন- পারদর্শীতা এবং স্থানিক প্রতিযোগিতা, যে দল সবচেয়ে কম জায়গা প্রতিপক্ষকে দেবে তারাই জয়লাভ করবে। তারা দুজন নিজেদের অজান্তেই ফুটবলে ডাচ সংস্কৃতি নিয়ে এসেছিলেন। শত বছর ধরে ডাচরা তাদের জনবহুল এবং সমুদ্র-হুমকিতে থাকা ভূমিকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে কাজে লাগানো এবং নিয়ন্ত্রন করার বিভিন্ন চতুর পন্থা অবলম্বন করে আসছে। ভেরমির, সেনরিদাম এবং মোন্দ্রায়ান প্রমুখের পেইন্টিংয়ে ডাচদের এরকম চেতনার প্রমান পাওয়া যায়। এটি ডাচ স্থাপত্য এবং ভূমি ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান। ফুটবলকেও এটির অংশ করা ছিল আরেকটি পদক্ষেপ।

টোটাল ফুটবল কি ট্যাকটকাল সিস্টেম নাকি কল্পনাপ্রসূত তৈরি? এটা নিয়ে আজ অবধি বিতর্ক চলছে। অনেকটা ধর্মের মত। অবস্থা পরিবর্তেনের সাথে এটাকে মানিয়ে নিতে হয়েছে। ১৯৭০ এর শুরুর দিকে মিকেলসের নতুন উদ্ভাবন ছিল প্লেয়ারদের জায়গা পরিবর্তনের প্যাটার্ন। তার দলের ডিফেন্ডার, মিডফিল্ডার, অ্যাটাকাররা ক্রমাগত পজিশন চ্যাঞ্জ করত। স্কোয়াডের ফর্মেশন ৪-৩-৩ থাকলেও সেখানে প্লেয়াররা প্রতিনিয়ত পজিশন বদলাত। এরপর ফুটবল অনেক বেশি দ্রুত হয়ে গেল, স্পেস বের করা কঠিন হয়ে পরল।

১৯৮৬ বিশ্বকাপের সেরা দল ছিল ডেনমার্ক যদিও তারা স্পেনের কাছে ৫-১ গোলে হেরেছিল। ডেনমার্ক সর্বপ্রথম উইংব্যাকদের সামনে অগ্রসর করেছিল উইংগারদের সাথে। যদিও তখন এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয় নি। সেই দলের প্রধান প্লেয়ারদের মধ্যে জেসপার ওলসেন, সোরেন লেরবি, ইয়ান মোলবি আয়াক্সে ক্রুইফের সতীর্থ ছিলেন। দলটির ক্যাপ্টেন মোর্টেন ওলসেন ক্রুইফের খেলায় মুগ্ধ ছিলেন। পরবর্তীতে ডেনমার্কের কোচ হয়ে তিনি দলকে ক্রুইফিয় দর্শনে রুপান্তর করেন। সময়ের পরিক্রমায় ড্রিব্লিং হারিয়ে যাচ্ছিল। ক্রুইফের বৈদ্যুতিক গতি, প্রতিপক্ষকে ফাকি দিয়ে বল নিয়ে বেরিয়ে যাবার দক্ষতা এবং সতীর্থদের উদ্দেশ্যে বিধ্বংসী পাস দেবার ক্ষমতা। সতীর্থ জনি রিপ, রব রেন্সেনব্রিনক এবং পিয়েত কাইজার ভাল ড্রিবলার ছিলেন।

১৯৯৫তে আয়াক্স চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের পর কোচ লুই ভ্যান হাল বলের দখল এবং গতির ব্যাপারে প্রাধান্য দিলেন। ক্রুইফ এবং ভ্যান হাল একে অন্যকে অপছন্দ করেন। কারনটা কারও জানা নেই। তাদের দুজনের মধ্যে অনেক মিল। দুজনেই কাছাকাছি জায়গায় বেড়ে উঠেছেন, আয়াক্সে দুজনের উত্থান ঘটেছে। ফুটবলগত দিক থেকে দুজনেই এক রকম। দর্শনগত দিক থেকে তাদের পার্থক্য হচ্ছে ভ্যান হাল নিজেকে ক্রুইফের চাইতে মিকেলসের কাছের শিষ্য মনে করেন এবং মিকেলসের সিস্টেমে তার অগাধ বিশ্বাস। আর ক্রুইফ সর্বাধিক প্রতিভাবান সৃষ্টিশীল প্লেয়ারদের উপর আস্থা স্থাপন করেন। ৯০ এর দশকের নেদারল্যান্ডসে ক্রুইফ সাম্রাজ্যের প্রধান সেনাপতি ডেনিস বার্গক্যাম্প বলেছিলেন ‘তিনি ড্রিবলিং এ বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি এবং সে সময়কার ডাচ দল পাসিং এবং মুভমেন্টের মাধ্যমে স্পেস বের করতে পছন্দ করতেন।’

২০০০ এর পরবর্তীতে ফুটবল আরও দ্রুতগতির হলে বার্সেলোনা টিকিটাকার বিকাশ ঘটায়। ২০০৮ সালে দেরিতে হলেও স্পেন ফুরিয়ার অবশেষসমুহ ছেড়ে দিয়ে ক্রুইফীয় নীতি গ্রহণ করে বিশাল সাফল্য লাভ করে। স্পেনকে ইতোপূর্বে কখনও ফুটবলের পরাশক্তি হিসেবে ধরা হত না। কিন্তু হঠাত করে তারা বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী দলে পরিণত হল এবং ২০০৮, ২০১২ ইউরো এবং ২০১০ বিশ্বকাপ- টানা তিনটি মেজর টুর্নামেন্ট জিতে নিল।

টোটাল ফুটবলের বর্তমান রূপান্তর দেখে ৯০ এর প্লেয়ারদের অনেক ধীরগতির মনে হবে। এখনকার দল খুব কম বলের দখল হারায় এবং জাভি, ইনিয়েস্তা, বুস্কেটসের মত মিডফিল্ডাররা বিহ্বল স্পিডে অবিশ্বাস্যভাবে ক্ষুদ্র পরিসরে বল আদান প্রদান করে। তবুও সাবেক বার্সেলোনা কোচ গার্দিওলা বলেছিলেন ‘বার্সেলোনা এখনো ক্রুইফের নির্মিত গীর্জা’। নিজ দলের জন্য স্পেস খুজে বের করা এবং প্রতিপক্ষকে সবচেয়ে কম স্পেস দেওয়া এখনো অভিন্ন মূলমন্ত্র হয়ে আছে।

মাঠের ঘাস, সাদা কালিতে আকা লাইন এবং গোলপোস্টের জালের মত প্রেসিং এখন ফুটবলের মৌলিক উপাদান। প্রেসিংয়ের বিকাশ ঘটেছিল আয়াক্সে ক্রুইফের সতীর্থ ইয়োহান নেস্কেন্সের মাধ্যমে। তার কাজ ছিল প্রতিপক্ষ প্লেমেকারকে পরাস্ত করা। নেস্কেনসের ভিকটিমরা তার ট্যাকলের ভয়ে নিজ হাফের গভীরে অবস্থান নিয়ে তার থেকে রক্ষা পাবার চেষ্টা করত। মিকেলস এ ব্যাপারটি খেয়াল করে তার ভাবনায় এটিকে অন্তর্ভুক্ত করেন সেইসাথে দলের সবাইকে এটি অনুকরণের নির্দেশ দেন। আয়াক্স দলবল নিয়ে প্রতিপক্ষের হাফে শিকারের খোজ শুরু করল। তারা হাই অফসাইড লাইন প্রয়োগ করত। পুরো দল যখন প্রতিপক্ষের হাফে অবস্থান নেবে তখন বল হারালে একমাত্র কাজ দ্রুত নিজের হাফে ফিরে আসা।

এই আইডিয়াকে আরেক ধাপ সামনে নিয়ে ক্রুইফ সুইপার-কিপার ধারণার প্রবর্তন করলেন। আগের দিনে গোলকিপারের কাজ ছিল লাইনে দাঁড়িয়ে প্রতিপক্ষের শট ঠেকানো। ১৯৭৪ বিশ্বকাপে গোলকিপার হিসেবে ইয়ান জোংবলেডকে দলে নিতে মিকেলসকে প্ররোচিত করলেন ক্রুইফ। ইয়ান তার লাইন থেকে সামনে এগিয়ে আসতে পছন্দ করতেন এবং অস্বাভাবিকভাবে বল পায়ে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। এখনকার গোলকিপাররা প্রতিনিয়ত তার এই স্কিল কপি করেন। তার এই স্কিলের কারনে নেদারল্যান্ডস তখন আরো উপরে উঠে প্রেসিং করতে লাগল।

প্রায় সময়ই ফর্মেশন দিয়ে ফুটবলকে সম্পূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। ক্রুইফ ৪-৩-৩ ফর্মেশনের অনুসারী তবে এটি দ্বারা তাকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না। এই ফর্মেশনকে কাজে লাগানোর অনেকগুলো পদ্ধতি রয়েছে। থিয়েরি হেনরি ডাচ ফুটবল স্টাইলের গভীর অনুরাগী, আর্সেনালে তিনি ক্রুইফিয়ান ফুটবল খেলেছেন। তিনি পরামর্শ দিয়েছেন যাতে সংখ্যার ফাদে পা না দেই। ‘ফরমেশন কোন বিষয় না। আর্সেনালে আমরা যেমনটা খেলতাম ৪-৩-৩ বা কোন স্ট্রাইকার ছাড়া ৬-৪-০ যাই হোক। এটার মূলভাব হচ্ছে টোটাল ফুটবল। যে কোন সময় অ্যাটাক করা। প্রত্যেকে আক্রমণে অংশ নেয়, সবাই ডিফেন্সে সাহায্য করে। এটাই ডাচ আইডিয়া। আর্সেনালে আমি ৪-৪-২ এবং ৩-৪-৩ ফর্মেশনেও খেলেছি। মূলকথা আপনার স্টাইল হচ্ছে টোটাল ফুটবল।’

ভ্যান ড্যান বুগার্ড দাবি করেছিলেন ক্রুইফ ফুটবলের আধ্যাত্মিক ধাধার সমাধান করেছেন। ক্রুইফের অনেক সমালোচক এবং শত্রু ছিল। খুব বেশি আদর্শবাদী, একগুয়ে, ডিফেন্সে অনাগ্রহী, বিতর্কপ্রিয় এরকম বহু নামে তাকে দোষীসাব্যস্ত করা হয়েছে। তাদের প্রতি বুগার্ডের উত্তর হচ্ছে ‘যারা ক্রুইফকে আক্রমণ করেন তারা তাকে বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। পর্যাপ্ত প্রতিভাবান প্লেয়ার সম্পন্ন কোন দল ক্রুইফের স্টাইল অনুসরণ করলে অন্য দল থেকে এগিয়ে থাকবে।’

কি ঘটবে যদি সব দল ক্রুইফের নীতি অনুসরণ করে? যদিও এরকম অবস্থার এখনো সৃষ্টি হয় নি তবে কিছু ব্যাপারে খুব কাছাকাছি রয়েছে। ঠিক যেমন বিভিন্ন ধর্ম বিভিন্ন জায়গায় পৌঁছে গিয়ে আঞ্চলিক সংস্কৃতির সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। একইভাবে সব দেশই ডাচ স্টাইল গ্রহণ করেছে, সেই সাথে নিজেদের কিছু বৈশিষ্ট্য অন্তর্ভুক্ত করেছে। জার্মানি ক্রুইফের নীতি গ্রহণ করেছে ২০০০ এবং ২০০৪ ইউরোতে ব্যর্থতার পর। তারা এখন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। বেলজিয়াম, নিউজিল্যান্ড দলগুলো ক্রুইফের পথ অবলম্বন করছে।

ওএফসি চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ী এবং ২০১৪ ক্লাব বিশ্বকাপের ব্রোঞ্জজয়ী সেমি-প্রো অকল্যান্ড সিটির ম্যানেজার রেমন ট্রিবুলিটক্স একজন স্বঘোষিত ক্রুইফিয়ান। তিনি ছোটবেলা থেকে বার্সেলোনার সমর্থক এবং ক্রুইফের ড্রিম টিমের খেলা দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। কখনো বার্সেলোনা বা ক্রুইফের সাথে কাজ না করেও তিনি তার দলকে ক্রুইফের আদর্শে গড়েছেন।

বর্তমানে প্রিমিয়ার লিগের শীর্ষ কোচদের বেশিরভাগ ডাচ অথবা ডাচ মতবাদে বিশ্বাসী। আর্সেন ওয়েংগার, ভ্যান গাল, গাস হিডিংক প্রত্যেকেই ডাচ। এছাড়া লিভারপুলের ক্লপ, এভারটনের রবার্তো মার্টিনেজ গভীরভাবে ক্রুইফ ভক্ত। গার্দিওলা পরের সিজনে ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দিয়ে দলটিকে টিকিটাকায় রূপান্তরিত করবেন। এমনকি ১৯৯০ এর নিউক্যাসেল দল ছিল ডাচদের নিয়ে গড়া। তখনকার কোচ ছিলেন স্টিভ ম্যাকলারেন যিনি এর আগে নেদারল্যান্ডসের এফসি টোয়েন্টেতে কাজ করেছেন।

ক্রুইফ নেদারল্যান্ডসের পাশাপাশি স্পেনকে নিজের দেশের মত ভাবেন। এজন্যই এখানে তার কল্পনাশক্তির বাস্তবায়ন করেছেন। ইংল্যান্ডে কেনো কোচিং করান নি, এমন প্রশ্নের উত্তরে ক্রুইফ বলেছিলেন ‘ইংলিশরা তাদের কিক করো-দৌড়াও ফুটবল নিয়েই খুশি। তিনিও তাদের এই স্টাইল পরিবর্তনে আগ্রহী না।’ কিন্তু ক্রুইফের অনুরাগী ও শিষ্যদের এমন কোন বিধিনিষেধ নেই। তার শিষ্যরা হাসিমুখে ক্রুইফ প্রদত্ত দর্শন বিশ্বব্যাপী প্রচার করে চলেছেন।

ক্রুইফের বন্ধু গাস হিডিংক ২০০২ বিশ্বকাপে দক্ষিণ কোরিয়াকে সেমিফাইনালে উত্তীর্ন করায় সেখানে এখনও তাকে ‘ফুটবল সাধু’ হিসেবে সম্মান প্রদর্শন করা হয়। এছাড়াও তিনি রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, তুর্কি জাতীয় দলের ম্যানেজারের দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৭০ এর ক্রুইফের টোটাল ফুটবল মন্ত্রের সতীর্থ এরিয়ে হান চীন দলের কোচ ছিলেন। আরেক সতীর্থ উইম ইয়ান্সেন সৌদি আরব, জাপান ও স্কটল্যান্ডের জাতীয় দলের দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৭৮ বিশ্বকাপের ডাচ অধিনায়ক রুড ক্রল মিশর এবং দক্ষিন আফ্রিকার দায়িত্বে ছিলেন। ক্রুইফের ছেলে জর্ডি (কাতালান সাধুর নামানুসারে যার নাম রাখা হয়েছিল) সাইপ্রাস এবং মালটায় ফুটবল শিক্ষা দিয়েছেন। বর্তমানে তিনি ইজরাইলের ক্লাব মাকাবি তেল আবিবের স্পোর্টিং ডিরেক্টর।

বর্তমান সময়ে কেউ টোটাল ফুটবলের আইডিয়া বিস্তৃত করতে চাইলে তার সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করবে ঐ অঞ্চলের ফুটবল সংস্কৃতির উপর। উদাহরণস্বরূপ আশির দশকের শেষদিকে এসি মিলানকে টোটাল ফুটবলে রূপান্তর করতে এরিগো সাচ্চিকে সমর্থন এবং বিনিয়োগ করেছিলেন সিলভিও বের্লুসকোনি। এবং অর্জন করেছিলেন বিশাল সফলতা। সত্তরের দিকে সাচ্চি আয়াক্স এবং নেদারল্যান্ডসের গুণমুগ্ধ হন। তিনি প্রায়ই ক্রুইফ এবং তার দলের ট্রেনিং দেখতে অ্যামস্টারডামে যেতেন। তরুন কোচ সাচ্চি ডাচদের থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা নিজ দলে প্রয়োগ করলেন। ক্রুইফের শিষ্য গুলিত, ভ্যান বাস্তেন, ফ্রাংক রাইকার্ডের সাথে তরুন স্থানীয় প্লেয়ার পাওলো মালদিনি, ফ্রাংকো বেরেসি, কার্লো আঞ্চেলোত্তিদের নিয়ে দল গড়ে প্রেসিং, অ্যাটাক এবং স্পেসের ব্যবহারের উপর জোর দিলেন। শীঘ্রই মিলান পরিণত হল বিশ্বসেরা ক্লাবে।

ইতালির সব দল রাতারাতি এসি মিলানের মত হতে চাইল। কিন্তু ইতালির ফুটবল সংস্কৃতি বদলালো না। কারন কেউই মিলানের ফুটবল সৌন্দর্য পেতে চায় নি, তারা চেয়েছিল কেবল মিলানের মত সফলতা। কিছুদিন পর মিলানের রাইভাল ক্লাব ইন্টারে যোগ দিলেন বার্গক্যাম্প। সেখানে বার্গক্যাম্পের দুবছর ছিল দুর্বিষহ। ইতালির সংবাদ মাধ্যম তাকে বিদ্রুপ করত। এমনকি তার কিছু সতীর্থও তার সমালোচনা করেছিল।

পরিস্থিতি বদলে গেল ১৯৯৫ সালে বার্গক্যাম্প আর্সেনালে যোগ দেবার পর। অত্যধিক ডিফেন্সিভ ফুটবল খেলার কারনে আর্সেনালের কুখ্যাতি ছিল। আর্সেনাল নিজেদের পরিবর্তন করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। এছাড়া ইংল্যান্ড তখন নতুন প্লেয়ার, কোচ এবং আইডিয়া প্রকাশের প্রারম্ভে ছিল। বার্গক্যাম্পকে ইংলিশ পরিবেশে মানিয়ে নেবার চাইতে বরং তার থেকে ফুটবল শিক্ষা গ্রহণে অধিক আগ্রহী ছিল আর্সেনাল। তারা পরিবর্তনকে বাধা দেয় নি বরং দুহাত বাড়িয়ে আলিঙ্গন করেছিল। ১৯৯৬ সালে আর্সেন ওয়েংগার ক্লাবটির ম্যানেজার হবার পর আর্সেনাল হয়ে উঠল আয়াক্সের ইংলিশ ভার্সন।

আর নেদারল্যান্ডসের কি হল? ক্রুইফীয় নীতিতে ফুটবল বিশ্বের একাত্মতায় নেদারল্যান্ডস ক্ষতিগ্রস্ত হল। ডাচদের এতদিনে বাড়তি সুবিধা আর রইল না। অন্যান্য দল ডাচদের আইডিয়া কপি করে তাদেরকেই পরাজিত করল। ২০১৬ ইউরোতে অংশগ্রহণে ব্যর্থতা প্রমান করে ডাচদের নিজস্ব সিস্টেমের পতন ঘটেছে। প্রতিবেশী দেশ জার্মানি, বেলজিয়ামের মত নেদারল্যান্ডস এখন আর বিশ্বমানের প্লেয়ার তৈরি করতে পারছে না।

ক্রুইফ অনেক আগেই এ সমস্যাটি সনাক্ত করেছিলেন এবং ২০১১ সালে তার মতানুসারে প্রাক্তন প্লেয়াররা আয়াক্সের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছিল। তার প্ল্যান ছিল ইয়ুথ সিস্টেম ঢেলে সাজানো এবং মেধাবী তরুন প্লেয়ারদের পরিচর্যা করে অসাধারণ প্লেয়ারের আবির্ভাব ঘটানো। তার পরিকল্পনা এখনো ফলপ্রসূ হয় নি। অসুস্থ হবার কিছুদিন আগে সাবেক সহযোগীদের সাথে বিবাদে জড়িয়ে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেন। অন্যসর্বত্র তার লিগ্যাসি এখনো অভেদ্য। এখনকার সেরা প্লেয়ার এবং কোচেরা তার প্রতি ঋণের কথা অকপটে স্বীকার করেন। সাম্প্রতিক সময়ে মেসি-সুয়ারেজের দ্বৈত পেনাল্টি তার প্রতি কৃতজ্ঞতার একটি উদাহরণ।

১৯৮২ সালে আয়াক্সের হয়ে হেলমন্ড স্পোর্টের বিপক্ষে এরকম পেনাল্টি নিয়েছিলেন ক্রুইফ। সাধারণত তিনি পেনাল্টি নিতে অপছন্দ করতেন। তাই সতীর্থদের পেনাল্টি নিতে দিতেন। কিন্তু সেদিন তিনি পেনাল্টি নিতে এগিয়ে এলেন এবং আলতো পাসে ওলসেনের উদ্দেশ্যে বল বাড়িয়ে দিলেন। ওলসেন হেলমন্ড গোলকিপারকে প্রলুদ্ধ করে আবারো ক্রুইফকে বল পাস করলেন। ক্রুইফ তখন ধীরেসুস্থে ফাকা জালে বল জড়িয়ে দিলেন। ২০০৫ সালে আর্সেনালে রবার্ট পিরেস এবং ‘১৪ নম্বর জার্সি পরিহিত’ হেনরি এরকম পেনাল্টি নেবার চেষ্টা করে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু গত বছর ১৪ ফেব্রুয়ারি (ক্রুইফের বিখ্যাত ১৪ সংখ্যাটি আবারো আবির্ভূত হল) ভ্যালেন্টাইন ডেতে সেল্টা ভিগোর বিপক্ষে ৬-১ গোলের জয়ে মেসি-সুয়ারেজ ক্রুইফের প্রতি তাদের ভালবাসা প্রদর্শন করেছিলেন। লা মাসিয়ার সেরা ছাত্র মেসি বল পাস করেন। সাবেক ‘আয়াক্স’ প্লেয়ার লুইস সুয়ারেজ বল জালে জড়িয়ে দেন। এটি ছিল এক স্মরণীয় মুহূর্ত। ক্রুইফ তার বন্ধুর মাধ্যমে জানিয়েছিলেন তিনি এটি পছন্দ করেছেন।

প্রকৃতপক্ষে মেসি এবং সুয়ারেজের কৌশলে ত্রুটি ছিল। তারা গোলে কিক নেবার জায়গা সংকুচিত করে ফেলেছিলেন। এতে গোলকিপারের সুযোগ ছিল গোল সেভ করার। আর ক্রুইফের পেনাল্টিতে গোলকিপার ছিল অসহায়। এটা অনেকটা এওয়ার্ডে ডেভিড বাওয়ির প্রতি লেডি গাগার ট্রিবিউটের মত। লেডি গাগার পরিহিত আচ্ছাদন এবং প্রযুক্তিগত কোয়ালিটি ছিল অত্যন্ত জমকালো। আর সেখানে ভালবাসা প্রদর্শনের কোন কমতি ছিল না। কিন্তু শ্রদ্ধা নিবেদনের উদ্দেশ্যে অনুকরণ আমাদেরকে আরও বেশি মূল সংস্করণের মর্ম উপলব্ধি করতে শেখায়।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-