অনুপ্রেরণার গল্পগুচ্ছখেলা ও ধুলারাশিয়া বিশ্বকাপ ২০১৮

ক্রোয়েশিয়ার ইতিহাস, ইট’স নট কামিং হোম!

একটা দল গোলমুখে শট নিয়েছে সাতটা। অন্য দল একটা। বেশিরভাগ সময় একটা দল সমানে আক্রমণ করে গেছে, বলের দখল ধরে রেখেছে, অন্য দলটা রক্ষণ সামলাতেই ব্যস্ত ছিল বেশি সময়। প্রথম দলটা না জিতলেই অন্যায় হতো। ফুটবলে এমন অন্যায় অজস্রবার হয়েছে, অনেক দলের সঙ্গে। তবে ভাগ্যদেবতা আজ হয়তো ক্রোয়েশিয়ার সঙ্গে সেটা করতে চাইলেন না। লুঝনিকি স্টেডিয়ামের ভিআইপি বক্সে বসে ডেভর সুকার অশ্রুসিক্ত চোখে দেখলেন, বিশ বছর আগে তার দলের গড়া কীর্তিকে কেমন বীর বিক্রমে ছাপিয়ে গেল তাদের উত্তরসূরীরা। সুকার পারেননি, মড্রিচ-রাকিটিচরা পেরেছেন, পেরেছেন পেরিসিচ-মানজুকিচরা। প্রথমবারের মতো ক্রোয়েশিয়াকে বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলেছেন তারা, নাটকীয় এক ম্যাচে ইংল্যান্ডকে হারিয়েছেন ২-১ গোলে!

মস্কোয় আজ দেখা মিলেছে দুর্দান্ত এক ফুটবল ম্যাচের। বায়ান্নো বছর পরে ইংল্যান্ডের সামনে ফাইনালে ওঠার হাতছানি, আর ক্রোয়েশিয়া তো কখনও শেষ মঞ্চে ওঠেইনি। পাঁচ মিনিটেই ফ্রিকিক থেকে ইংল্যান্ডের গোল, ট্রিপিয়ারের দূরপাল্লার শটটা চোখে লেগে থাকবে অনেকদিন। ক্যারিয়ারের প্রথম ইন্টারন্যাশনাল গোলটা এমন বড় মঞ্চে করবেন, সেটা ভেবেছিলেন কিনা কে জানে! সেই গোলেই ইংল্যান্ডের এগিয়ে যাওয়া, ম্যাচের কর্তৃত্ব নিজেদের হাতে নেয়া।

প্রথমার্ধের অনেকটুকু সময় রাজত্ব করেছেন ইংরেজরা। মাঠজুড়ে দাপট ছিল থ্রি লায়ন্সদের। মড্রিচ-রাকিটিচরা শুরুর দিকে তাল মেলাতে পারছিলেন না ইংরেজদের গতির সঙ্গে, খেই হারাচ্ছিলেন বারবার। গোটেকয়েক গোলের সুযোগ হাতছাড়া করেছে ইংল্যান্ড, রহিম স্টার্লিং ছিলেন অদৃশ্য। টুর্নামেন্টে ইংল্যান্ডের নায়ক হ্যারি কেইনকে খুঁজে পাওয়া যায়নি সেভাবে, তিনিও মিস করেছেন গোটা দুয়েক সুযোগ। গোল শোধে মরিয়া হয়ে ওঠার লক্ষণ চোখে পড়ছিল না ক্রোয়েশিয়ার খেলায়।

তবে ক্রোয়েশিয়া ফিরলো, স্বরূপেই ফিরলো দলটা, দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকে। দারুণ পাসিং ফুটবলের পসরা সাজালো মাঠে, একের পর এক আক্রমণ রচিত হলো, সেগুলো আছড়ে পড়তে থাকলো ইংরেজদের রক্ষণে। ইংল্যান্ড তখন বেশ খানিকটা ব্যাকফুটে। মাঝমাঠের ব্যাটন তখন হাতে তুলে নিয়েছেন মড্রিচ-রাকিটিচ। আর তাদের সামনে থেকে অবিশ্বাস্য রকমের ভালো খেলছিলেন পেরিসিচ। তার পা থেকেই এলো প্রথম গোলটা। ডানপ্রান্ত থেকে ভেসে আসা ক্রসে মাথা ছোঁয়ানোর সময় নেই বুঝতে পেরেই সেকেন্ডের ভগ্নাংশের সিদ্ধান্তে পা ওঠালেন। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডার হেড করার জন্যে মাথা এগিয়ে দিয়েছিলেন, তবে তার আগে ছিল পেরিসিচের পা। ইংলিশ গোলরক্ষকের করার কিছু ছিল না তেমন। পুরোটা ম্যাচেই এমন দুর্দান্ত খেলেছেন তিনি, ভাগ্য বিরূপ না হলে নিজের দ্বিতীয় গোলটাও পেয়ে যেতেন সত্তর মিনিটের আগেই।

দুর্দান্ত খেলাটা আসলে হয়েছে ম্যাচের শেষ পঁচিশ মিনিটে। এতক্ষণ লিড ধরে রাখা ইংল্যান্ড এবার রক্ষণের খোলস ছেড়ে বেরিয়েছে, ক্রোয়েশিয়াও চেষ্টা করছে আরেকটা গোলের দেখা পাবার। জমজমাট ফুটবল বলতে যা বোঝায়, দর্শকেরা উপভোগ করেছেন ঠিক তা’ই। পুরোটা ম্যাচজুড়ে দারুণ খেলেছেন পেরিসিচ, গোল করেছেন, করিয়েছেনও। ভারজালিকো তো গোললাইন থেকে ফিরিয়েছেন স্টোনসের হেড। সেটা ঠিকঠাক ক্লিয়ার করতে না পারলে ঘটনা অন্যরকমও হতে পারতো।

তবে গল্পের শেষ আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টুকু লিখেছেন মারিও মানজুকিচ। দারুণ স্ট্রাইকার তিনি, গোলের খোঁজে হন্যে হয়ে থাকেন সারাক্ষণ। সেই মানুষিটা বিশ্বকাপে যেন নিজেকে হারিয়ে খুঁজছিলেন। পাঁচ ম্যাচে মাত্র একটা গোল ছিল তার। মনে মনে নিজেকে পাপী ভাবছিলেন কিনা কে জানে! সেই পাপ মোচনের জন্যে মানজুকিচ বেছে নিলেন আজকের ম্যাচটাকেই। ওস্তাদের মার শেষ রাতে বাগধারাটা মানজুকিচের জানার কথা নয়, তবে কাজটা যা করেছেন, তাতে এই লাইনটা খুব ভালোভাবেই যায় তার সঙ্গে। পেরিসিচের বাড়ানো বলটার দিকে শিকারী চিতার মতো এগিয়ে গেলেন তিনি, যেন গোলের গন্ধ নাকে এসেছিল তার। ইংলিশ দুই ডিফেন্ডারকে চোখের পলকে ছিটকে ফেললেন বোকা বানিয়ে। শটটায় আর ভুল করেননি, করার কথাও নয়। মানজুকিচ যেন তখন ওল্ড ওয়াইন! টিভি ক্যামেরা তখন কাঁপছে, আর গ্যালারীতে বসে আবেগে কাঁপছেন ডেভর সুকার!

ম্যাচটা ছিল ইংল্যান্ডের তারুণ্য বনাম ক্রোয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা। ইংলিশদের গতি বনাম ক্রোয়াটদের পাসিং ফুটবলের। শেষমেশ তাতে জয় ক্রোয়েশিয়ার। বলা হয়, মেধা আর তারুণ্য নাকি ম্যাচ জেতায়, আর অভিজ্ঞতা জেতায় টুর্নামেন্ট। ক্রোয়েশিয়া আজ স্রেফ অভিজ্ঞতা দিয়েই ম্যাচটা বের করে নিলো। ওদের বদলী খেলোয়াড়ও যে একশোর বেশি ইন্টারন্যাশনাল ম্যাচের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন! এই দল না জিতলে আর জিতবে কে? ২০০৭ এ ওয়েম্বলিতে ইংল্যান্ডের ইউরো খেলার স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল ক্রোয়াটদের হাতে, এবার বৃটিশদের বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার আরও বড় স্বপ্নটা ভেঙে দিলো ক্রোয়েশিয়া।

ক্রোয়েশিয়ার এটা প্রথম ফাইনাল, রাশিয়া বিশ্বকাপ নতুন চ্যাম্পিয়ন পাবে কিনা, সেই প্রশ্নের উত্তরটা তোলা রইলো আরও কয়েকদিনের জন্যে। আর ইংল্যান্ডজুড়ে চলতে থাকা ‘ইটস কামিং হোম’ ক্যাম্পেইনের এখানেই সমাপ্তি। এই বিশ্বকাপে তো আর ট্রফিটা জন্মভূমিতে ফিরছে না!

Comments
Show More

Related Articles

Close