ডিসক্লেইমারটা শুরুতে দিয়ে রাখা ভালো। এই লেখার সাথে বাংলাদেশ দলের সর্বশেষ ম্যাচ জয়ের কোন সম্পর্ক নেই। বাংলাদেশ গতকাল হেরে গেলেও লেখাটা আসতোই।

ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড কয়েকদিন আগে ক্রিকেটারদের সঙ্গে নতুন চুক্তির তথ্য প্রকাশ করেছে। তিনটে ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে ক্রিকেটারদের, সর্বোচ্চ বেতন বাৎসরিক দুই কোটি রুপী। মহেন্দ্র সিং ধোনি, বিরাট কোহলি, অজিঙ্কা রাহানে, চেতেশ্বর পূজারা, রবিচন্দন অশ্বিন, রবীন্দ্র জাদেজা আর মুরালি বিজয় এই বেতন পান। এটা এ-ক্যাটারির বেতন। অন্য ক্যাটাগরীগুলোতে ক্রিকেটারেরা বছরে যথাক্রমে এক কোটি আর দুই কোটি রুপী বেতন পেয়ে থাকেন।

বিসিসিআই বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ড। খেলোয়াড়দের পেছনে তারা কাড়ি টাকা ঢালতেই পারে। স্পন্সর আর টিভি স্বত্ত্ব থেকেই তারা বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় করে। তবে চমকটা দেখা গেছে নারী ক্রিকেটারদের বেতনের বেলায়। আগে তাদের সর্বোচ্চ বেতন ছিল বছরে পনেরো লাখ রুপী, সেটা এক ধাক্কায় বেড়ে গিয়ে এবার হয়েছে পঞ্চাশ লক্ষ রুপী! বাংলাদেশী টাকায় যেটা প্রায় ষাট লক্ষ টাকার বেশী। সাকিব-তামিম-মাশরাফিরাও এক বছরে বোর্ড থেকে এত টাকা বেতন পান না। এমনকি বি ক্যাটাগরিতে থাকা নারী ক্রিকেটারেরাও বছরে ত্রিশ লক্ষ রুপী বেতন পাচ্ছেন!

গতবছর এক দফা বেতন বাড়ানো হয়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের। এ-প্লাস ক্যাটাগরীতে আগে যেটা মাসিক আড়াই লক্ষ টাকা ছিল, সেটা বেড়ে হয়েছে চার লক্ষ টাকা। সেই হিসেবে আন্তর্জাতিক ম্যাচ ফি ছাড়া সাকিব-তামিমদের বাৎসরিক আয় আটচল্লিশ লক্ষ টাকা। বিসিসিআইয়ের কেন্দ্রীয় চুক্তিতে থাকা সি-গ্রেডের পুরুষ ক্রিকেটারদের বাৎসরিক আয়ও বাংলাদেশের এ-প্লাস ক্যাটাগরিতে থাকা ক্রিকেটাদের চেয়ে খানিকটা বেশি।

বিসিবি, বিসিসিআই, ক্রিকেটারদের বেতন, নারী ক্রিকেটারদের বেতন

এছাড়া ইন্টারন্যাশনাল ম্যাচ ফি’তেও পার্থক্যটা অনেক বড়। প্রতিটা টেস্ট ম্যাচের জন্যে বোর্ড থেকে পনেরো লক্ষ রূপি বা প্রায় উনিশ লক্ষ টাকা পান ভারতীয় ক্রিকেটারেরা। বাংলাদেশের ক্রিকেটাদের বোর্ডের তরফ থেকে দেয়া হয় টেস্টপ্রতি সাড়ে তিন লক্ষ টাকা। ওয়ানডেতে দুই লক্ষ টাকা করে ম্যাচ ফি পান মাশরাফিরা, টি-২০ তে সাকিব-মুশফিকেরা পান এক লক্ষ পঁচিশ হাজার টাকা করে। আর ভারতীয় ক্রিকেটারদের ম্যাচ ফি ওয়ানডেতে সাড়ে সাত লক্ষ টাকা, টি-২০ তে চার লক্ষ টাকা(প্রায়) করে।

ভারতীয় ক্রিকেটারদের প্রাপ্তির সঙ্গে তুলনা করাটা হয়তো বাতুলতা, কিন্ত অন্যান্য টেস্ট খেলুড়ে দলগুলোর সঙ্গে তুলনা করলেও আয় ব্যায়ের অঙ্কে অনেকখানি পিছিয়ে থাকেন বাংলাদেশী ক্রিকেটারেরা। বেতন আর ইন্টারন্যাশনাল ম্যাচ ফি মিলিয়ে সবচেয়ে বেশী আয় করেন অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটারেরা, স্টিভেন স্মিথের আয় বছরে ১.৪৭ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় বারো কোটি টাকা। ইংলিশ ক্রিকেটারেরা আছেন এর পরেই। তৃতীয় অবস্থানে আছে কোহলির ভারত।

বাংলাদেশের সাকিব আল হাসান বোর্ড থেকে গড়ে প্রতিবছর আয় করেন ১ লক্ষ চল্লিশ হাজার ডলার, টাকার অঙ্কে যেটা এক কোটি বারো লাখ টাকার মতো। স্মিথের দশভাগের একভাগও নয়! দক্ষিন আফ্রিকা, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নিউজিল্যান্ড, সবার বোর্ড থেকে প্রাপ্ত বেতনই বাংলাদেশী ক্রিকেটারদের চেয়ে বেশী। শুধু জিম্বাবুয়েই আছে আমাদের পেছনে। অথচ আয়ের দিক থেকে বিশ্বের ধনী ক্রিকেট বোর্ডগুলোর মধ্যে বিসিবির অবস্থান চতুর্থ স্থানে! অথচ সেটার প্রতিফলন ক্রিকেটারদের বেতনে দেখা যায় না মোটেও।

এ তো গেল পুরুষ ক্রিকেটারদের কথা। নারী ক্রিকেটারেরা যে কতটা বৈষম্যের শিকার হন, সেটা তো বলার অপেক্ষাই রাখে না। অল্প ক’দিন আগেই ফেসবুক আর মিডিয়া সয়লাব হয়ুএ গিয়েছিল, নারী ক্রিকেটারদের ছয়শো টকা ম্যাচ ফি’র সংবাদে। সমালোচনার মুখে সেটা বাড়িয়েছিল বিসিবি, বেড়ে কত হয়েছিল জানেন? এক হাজার টাকা মাত্র! ভারতের মিতালী রাজেরা যেখানে বছরে পঞ্চাশ লক্ষ টাকা বেতন পাচ্ছেন বোর্ড থেকে, তখন সালমা-জাহানারাদের মাসিক বেতন মাত্র ত্রিশ হাজার টাকা, বছরে সাড়ে তিন লক্ষ টাকা!

বিসিবি, বিসিসিআই, ক্রিকেটারদের বেতন, নারী ক্রিকেটারদের বেতন

এমন অদ্ভুত বেতন বৈষম্যের কারন জানতে চাইলে বিসিবির পক্ষ থেকে যুক্তি দেখানো হয় নারীদের ক্রিকেটে স্পন্সর নেই, দর্শক নেই বলে।  অথচ ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া মেয়েদের ক্রিকেটে ভর্তুকী দিয়ে হলেও নারী ক্রিকেটারদের বেতন বৈষম্যের শিকার হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে আসছে সবসময়। অস্ট্রেলিয়ার নারী ক্রিকেটারদের বেতনের অঙ্কটা শুনেও চোখ কপালে উঠবে। বছরে এক লক্ষ আশি হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলার বেতন পান শীর্ষ ক্রিকেটারেরা। বাংলাদেশী টাকায় যেটা এক কোটি বিশ লক্ষ টাকা। বোর্ডের লভ্যাংশ থেকেও অর্থ পেয়ে থাকেন অস্ট্রেলিয়ার নারী ক্রিকেটারেরা। এমনকি নারী ক্রিকেটারদের বেতন-ভাতা প্রদানের পেশাদারিত্বের দিক থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোর্ডও অনেক এগিয়ে।

বিসিবিও তো এমন কোন পদক্ষেপ নিতে পারে। প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছার। বিসিবির আয় বা মুনাফা, কোনটাই তো কম নয়। টাকার অঙ্কগুলো শুনলে হা হয়ে তাকিয়ে থাকতে হয় শুধু। বছরে দুই-আড়াইশো কোটি টাকা আজ থেকে চার-পাঁচ বছর আগেও আয় করতো বিসিবি, সংসদে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীই জানিয়েছিলেন সেটা। এখন তো এই আয়ের অঙ্ক আরও বেড়েছে, বেড়েছে মুনাফাও। বিপিএল থেকেও প্রতি মৌসুমে পঁচিশ-ত্রিশ কোটি টাকা মুনাফা যোগ হয় বিসিবির কোষাগারে। তাহলে যাদের কল্যানে এই আয়টা হচ্ছে, সেই ক্রিকেটারদের বেতন দিতে তো সমস্যা নেই কোন। পিছিয়ে থাকা নারী ক্রিকেটটাকে ঢেলে সাজিয়ে আধুনিকায়ন করতেও বাঁধা নেই কোন। টাকা আছে, ভালো কিছু করার ইচ্ছেটা হয়তো নেই।

সাকিব-তামিম-মুশফিকদের বিসিবি থেকে প্রতি মাসে যে বেতনটা দেয়া হয়, সেটা আমাদের দেশের সাধারণ কোন চাকুরীজীবির এক বছরের আয়ও নয় হয়তো। কিন্ত যখন বিশ্বের অন্যান্য দেশের ক্রিকেটারদের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তখন এই অঙ্কটাকে খুবই ক্ষুদ্র মনে হয়। আর নারী ক্রিকেটারদের আয়ের সঙ্গে তো কোনকিছুরই তুলনা চলে না। এখনকার পৃথিবীতে অর্থের চেয়ে বড় প্রনোদনা বা অনুপ্রেরনা খুব বেশী কিছু নেই। বিসিবি সেই অর্থটা ঢালতে রাজী হলেও আমাদের প্রমিলা ক্রিকেটটা পাল্টে যেত বলেই আমার বিশ্বাস।

তথ্যসূত্র কৃতজ্ঞতা- দ্য ক্রিকেট মান্থলি, টোটাল স্পোর্টেক ডটকম।

Comments
Spread the love