খেলা ও ধুলা

মাশরাফি-সাকিবদের মতো তিনিও খেলেন জাতীয় দলেই, কিন্তু…

জাতীয় অন্যভাবে সক্ষম (শারিরীক প্রতিবন্ধী) ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়রা বিসিবির বেতনভুক্ত খেলোয়াড় নন৷ বিসিবির পক্ষ থেকে এই খেলোয়াড়দের কোনো সুযোগ সুবিধা সে অর্থে দেয়া হয় না।

তার স্বপ্ন ছিল ক্রিকেটার হবেন, হয়েছেনও কিন্তু একটু অন্যরকম ভাবে। ছোটবেলা টাইফয়েড জ্বর হলো। সেই জ্বরে ডান হাতে সমস্যা দেখা দেয়। এই হাতে আর কিছুই করতে পারেন না তিনি। ফলে ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন ফিকে হতে থাকে তবে ইচ্ছে দমে যায় না।

তিনি ক্রিকেটার হলেন অবশেষে। এখন তিনি বাংলাদেশ অন্যভাবে সক্ষম (শারিরীক প্রতিবন্ধী) জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রধান স্ট্রাইক বোলার, বাম হাতে বোলিং করে থাকেন। বলছিলাম শরিয়তপুরের সন্তান রাসেল শিকদারের কথা।

ক্রিকেট এতো জনপ্রিয় হলেও বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল যেখানে সাকিব, তামিম, মাশরাফিরা খেলেন এর বাইরে অন্য কোনো ক্রিকেট দলের প্রতি সুনজর খুব কমই দিয়েছে বিসিবি। নারী ক্রিকেট দলের বেতন কাঠামো নিয়েও তাদের ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল কিছুদিন আগে। অন্যান্য ক্রিকেট দলগুলোর প্রতি অবহেলার আরো একটি নজির এবার উঠে আসলো রাসেল শিকদারের ঘটনায়। রাসেলরাও তো যখন খেলতে যান, লাল সবুজের জার্সিতে তারা দেশেরই প্রতিনিধিত্ব করেন। তাহলে নূন্যতম সুযোগ সুবিধা তো তারা ডিজার্ভ করেন, তাই নয় কি!

প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দল, রাসেল শিকদার, ফিজিক্যাল ডিজেবল ক্রিকেটার, বিসিবি
বিবিসি বাংলায় জানাচ্ছেন তাদের প্রতি করা অবহেলার কথা।

সম্প্রতি বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদক সরেজমিনে গিয়ে রাসেলের কষ্টের মুহুর্তগুলো তুলে ধরেন। রাসেল জানালেন তার জীবনের গল্প কিংবা আক্ষেপের কথা। তিনি বলেন,

“আমার এক বছর বয়সের সময় টাইফয়েড জ্বর হয়। তখন আমি ভাবতাম না যে আমার এইরকম একটা সমস্যা হবে। আমি যে প্রতিবন্ধী হয়ে যাব তা কখনও আমার চিন্তাভাবনাতে আসে নাই। তবুও বড় হওয়ার সাথে সাথে খেলা চালিয়ে যেতে থাকি।

অনেকে অনেক কথা বলত যে, তুই খেলে কি করবি? জবাবে বলতাম, খেলাটা আমার ভালো লাগে, ভালোবাসি এটাকে। দেখি কতদূর যাওয়া যায়। খেলার জন্য এসএসসি পরীক্ষাটাও আমি দিতে পারি নাই। যখন আমার টেস্ট পরীক্ষা শুরু হয় তখন আমি প্রথম অনুর্ধ্ব-১৮ গ্রুপে চান্স পাই।

প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দল, রাসেল শিকদার, ফিজিক্যাল ডিজেবল ক্রিকেটার, বিসিবি
সিরিজ জেতার পর ট্রফি হাতে রাসেল শিকদার।

তখন আর পরীক্ষা দেওয়া হয় নাই, আর এরপর থেকে পড়ালেখাটাও আর ওইরকমভাবে হয়ে ওঠে নাই। ২০১৪ সালে প্রথম শারীরিক প্রতিবন্ধী ন্যাশনাল ক্যাম্পে চান্স পাই। ২০১৪ সালেই ভারতে এশিয়া কাপ খেলতে যাই। এছাড়া দুবাই গেছি, ইংল্যান্ড গেছি, ইন্ডিয়া গেছি, বাংলাদেশেও একটি টুর্নামেন্ট হইছিল, ওইটায় অংশ নিছি। কয়েকটা টুর্নামেন্টে ম্যান অব দ্যা ম্যাচ হইছি এবং হায়দ্রাবাদে একটা টুর্নামেন্ট হইছিল। ফাইনাল ম্যাচ ছিল, যেটা সুপার ওভার পর্যন্ত গড়িয়েছিল। ওই সুপার ওভারে আমি বল করে ম্যাচটারে জিতাই।”

রাসেল প্রতিভাবান সন্দেহ নেই। খেলাটাকে তিনি ধারণ করেন। তিনি জানেন তাকে সবসময় প্রস্তুত থাকতে হবে, শিখতে হবে। এজন্যে বেশি বেশি প্র‍্যাক্টিস করে যেতে হবে। কিন্তু, সেখানেও খরচ। সেই খরচ সামলাতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন রাসেল।

প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দল, রাসেল শিকদার, ফিজিক্যাল ডিজেবল ক্রিকেটার, বিসিবি
প্র্যাকটিসের বল কেনার জন্য রেস্টুরেন্টে কাজ করছেন রাসেল শিকদার।

তিনি বলেন, “প্রতিদিন প্র্যাক্টিস করতে গেলে, একটা বল কিনতে গেলে সর্বনিন্ম ৫০০ টাকা লাগে। আমি স্ট্রাইক বোলার, আমাকে সবসময় নতুন বল দিয়ে বল করতে হয়। সেই সামর্থ্যটা আমার নাই। এজন্যই এখন আমার এই রেস্টুরেন্টে কাজ করতে হয় নিজের অর্থ যোগানোর জন্য।”

তিনি জানান তারা এখনো কোনো বেতন কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত হননি। ফলে অনিশ্চিত জীবন নিয়ে কষ্টে দিন কাটছে তার। বেতন কাঠামো নিয়ে তিনি বলেন, “মাশরাফি, সাকিব ওরা যেরকম বেতনভুক্ত, আমরা ওরকম বেতনভুক্ত না। এখন বেতনভুক্ত যদি না হয় তাহলে আমাদের চলাফেরার সমস্যা হয়। দেখা গেছে এখন পরিস্থিতির শিকার হয়ে আমার এই খেলাই ছেড়ে দিতে হবে।”

প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দল, রাসেল শিকদার, ফিজিক্যাল ডিজেবল ক্রিকেটার, বিসিবি
প্র্যাকটিসের বল কেনার জন্য রেস্টুরেন্টে কাজ করছেন রাসেল শিকদার।

ক্রিকেটের জন্য রাসেল তার জায়গা থেকে কম কিছু ত্যাগ করেননি। মাধ্যমিক পরীক্ষাটা দিতে পারেননি। এখনো সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন ক্রিকেট খেলে যাওয়ার জন্য। কিন্তু, তারও তো একটা পরিবার আছে। তারও একটা ভবিষ্যৎ আছে। সেটা কে দেখবে? ক্রিকেট খেলে রাসেল তো ফ্ল্যাট, গাড়ি বাড়ি আশা করছেন না, ভালবাসেন বলেই খেলে যাচ্ছেন এতো প্রতিবন্ধকতার পরেও।

সেই প্রতিবন্ধকতা দূর করতে রাসেলদের কি নূন্যতম একটা বেতন কাঠামোর মধ্যে আনা যায় না? ক্রিকেট যখন এগিয়ে যাচ্ছে, তখন রাসেলদের এভাবে রেস্তোরাঁয় কাজ করতে হবে কেনো? তার তো মাঠে থাকার কথা ছিল, রেস্টুরেন্টে না। ক্রিকেটকে ভালবাসার এ কেমন প্রতিদান?

প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দল, রাসেল শিকদার, ফিজিক্যাল ডিজেবল ক্রিকেটার, বিসিবি
জাতীয় অন্যভাবে সক্ষম (শারিরীক প্রতিবন্ধী) ক্রিকেট দলের জার্সি গায়ে রাসেল শিকদার।

কিন্তু জাতীয় দলের খেলোয়াড় হয়েও স্বস্তিতে নেই রাসেল। তাকে এখন কাজ করতে হচ্ছে রেস্তোরাঁর ওয়েটার হিসেবে। কারণ, জাতীয় শারিরীক প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়রা বিসিবির বেতনভুক্ত খেলোয়াড় নন৷ বিসিবির পক্ষ থেকে এই খেলোয়াড়দের কোনো সুযোগ সুবিধা সে অর্থে দেয়া হয় না।

আরও পড়ুন-

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close