শুভ জন্মদিন গুরু, শুভ জন্মদিন ক্রিকপ্লাটুন!

Ad

ইয়ে সালে কালা মছুয়া বাঙ্গাল কেয়া ক্রিকেট খেলতা, ও তো সির্ফ মাছলি খাতা অর মাছলি কি সুরুয়া উসকো হাত সে পারতা রাহা তা…

হাসতে হাসতে পাঞ্জাবীদের ছুড়ে দেওয়া এই টিটকারি সহ্য করতে পারতেন না লাডু ভাই, মাথায় আগুন ধরে যেত… পেশায় সাংবাদিক মানুষটা ছিলেন খেলার পাগল, ফুটবল খেলতে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। ক্রিকেটেও কম যেতেন না। দৈনিক আজাদে সহসম্পাদক হিসেবে সাংবাদিকতা শুরু করলেও এক পর্যায়ে ক্রিকেট-ফুটবলে এমনই অন্তঃপ্রান গেলেন যে, ক্রীড়া সাংবাদিক হিসেবেই তাকে সবাই চিনতে শুরু করলো।

হাসিখুশি, প্রাণোচ্ছল মানুষটাকে সারাদিন দেখা যেত খেলার মাঠে পড়ে আছেন, খেলা দেখছেন, আলোচনা করছেন, উৎসাহ দিচ্ছেন। পূর্ব পাকিস্তানের কোথাও ক্রিকেট কিংবা ফুটবল ম্যাচ হবে, আর সেইখানে লাডু ভাইকে দেখা যাবে না, এটা ছিল খুব অসম্ভব একটা ঘটনা।সারাদিন খেলা দেখে বিকেলে ফিরতেন ডেস্কে, সেখানে বসেই ম্যাচ রিপোর্ট তৈরি করে ফেলতেন, যে রিপোর্টের পুরোটা অংশ জুড়েই থাকতো হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগোনো বাঙ্গালী খেলোয়াড়দের প্রতি অবিরাম উৎসাহ আর প্রণোদনা… ফুটবলে পাঞ্জাবীদের শোষণ আর বঞ্চনার বিরুদ্ধে সবসময় শোনা যেত লাডু ভাইয়ের গলা, যেটা পাঞ্জাবীরা কখনই ভুলতে পারেনি। ভুলতে পারেনি এই বাঘের বাচ্চাকে, “বাঙলাদেশ” যে ধারন করতো হৃদয়ের গহীনে…

একাত্তরে মানুষটা ঢাকাতেই ছিলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করেছেন প্রানটা বাজি রেখে। পাঞ্জাবীদের টার্গেট হয়ে থাকায় অনেকেই পালিয়ে যেতে বলেছিল, লাডু ভাই হাসতে হাসতে জবাব দিয়েছিলেন, নিজের দেশ ছেড়ে আমি কোথায় যাব? একাত্তরের ডিসেম্বরের ২য় সপ্তাহে আলবদরের কর্মীরা তাকে তার পুরনো পল্টনের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়, নিজামি আর মুজাহিদের তৈরি বুদ্ধিজীবী নিধন লিস্টে তার নাম ছিল পাকিস্তানের শত্রু হিসেবে, সদ্য স্বাধীন দেশের ক্রীড়াক্ষেত্র নিয়ে কাজ করার স্বপ্ন ছিল তার…

মানুষটা আর ফেরেননি… তার লাশটাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। স্বাধীন বাংলাদেশকে ক্রীড়াক্ষেত্রে অনতিক্রম উচ্চতায় নিয়ে যাবার স্বপ্নটুকু বুকে নিয়েই হারিয়ে গেছেন মানুষটা, অসংখ্য শহীদের ভিড়ে…

দেশ স্বাধীন হইলে আমি ন্যাশনাল টিমের হইয়া ওপেনিংয়ে নামুম, ক্যাপ্টেন হমু। আঙ্গুল তিনটা রাইখেন স্যার, প্লিজ… 

ছেলেটার আঙ্গুলগুলো ঝাঁজরা হয়ে গিয়েছিল পাকিস্তানী সেনাদের ব্রাশফায়ারে, ডাক্তারের শুকিয়ে যাওয়া মুখ দেখে মুহূর্তেই ধরতে পেরেছিল, আঙ্গুলগুলো হয়তো কেটে ফেলতে হবে। আকুল অনুনয় জানিয়েছিল ডাক্তারের কাছে, আঙ্গুল তিনটা রাইখেন স্যার।না, আঙ্গুলগুলোতে হওয়া অবর্ণনীয় যন্ত্রণা নিয়ে ভাবছিল না সে, ভাবছিল আবার সে ব্যাট ধরতে পারবে কিনা,দেশটা স্বাধীন হলে আবার আরেকবার ব্যাট হাতে টর্নেডো বইয়ে দিতে পারবে কিনা… প্রায় সময়ই হাসতে হাসতে বলত ছেলেটা, পাকিস্তান তো ভাইঙ্গা দিতাছি, খালি স্বাধীন বাংলাদেশটা হইতে দে, দেখবি ক্যামনে পাইক্কাগুলারে হারাই। ওপেন করতে নাইমা পিটাইতে থাকুম, পিটাইতে পিটাইতে ছাল বাকলা তুইলা ফেলুম। শালার আঙ্গুল তিনটায় গুলি না লাগলেই আর সমস্যা হইত না। কবে যে ভালো হইব কচু, কবে যে ব্যাট ধরতে পারুম…

ছেলেটার নাম ছিল জুয়েল,অবিভক্ত পাকিস্তানের অন্যতম সেরা ওপেনার ছিল।ওপেনিংয়ে নেমে টর্নেডো বইয়ে দিত একেবারে, কি অফসাইড কি অনসাইড, বেচারা বোলার বল ফেলার জায়গাই পেত না। কিন্তু ছেলেটা ছিল বাঙ্গালী, আর পাকিস্তান নামক এই পোকায় কাটায় রাষ্ট্রটায় বাঙ্গালীর অবস্থান ছিল কুকুরের চেয়েও নিকৃষ্ট, গোলামেরও চেয়েও অধম। ছেলেটার স্বপ্ন ছিল আকাশছোঁয়া, ছেলেটা ন্যাশনাল টিমের হয়ে ওপেনিং করার স্বপ্ন দেখতো। ১৯৭১ সালের ২৭শে মার্চ জেলা ক্রীড়া ভবনের সামনে মুশতাক ভাইয়ের ডেডবডিটা পড়ে ত্থাকতে দেখার পর ছেলেটার স্বপ্নটা একটা ধাক্কা খেল। আজাদ বয়েজ ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা মুশতাক ভাইয়ের আপন শত্রুও এই অপবাদ দিতে পারবে না যে, তিনি কাউরে কোনোদিন একটা গালি দিয়েছেন। ক্রিকেট ছিল তার ধ্যান, একমাত্র সাধনা। বিনা অপরাধে এইভাবে মরতে হবে, এইটা হয়তো তার কল্পনাতেও ছিল না। মুশতাক ভাইয়ের সেই দৃষ্টি ছেলেটার মাথায় গেঁথে গেল, ব্যাট ফেলে তুলে নিল স্টেনগান, পাকি শুয়োরগুলারে মারতে হইব, দেশটারে স্বাধীন করতে হইব…

জীবনের শেষ ইনিংসে ছেলেটা অপরাজিত ছিল, অপরাজিত ছিল তিনটা আঙ্গুল ভেঙ্গে যাওয়ার পরেও। আগস্টের ২৯ তারিখে ধরা পড়ার পর টর্চার সেলে মুক্তি কাহা হ্যায়, হাতিয়ার কিধার হ্যায়, প্রশ্নগুলো সহস্রবার করেছে পাকি হায়েনারা, ভাঙ্গা আঙ্গুল তিনটা বুটের নিচে পিষে ফেলার সময় অমানুষিক যন্ত্রণা হচ্ছিল, ছেলেটা হেরে যায়নি। বেয়নেট দিয়ে একটু একটু করে ফালা ফালা করেছে ছেলেটার শরীরটা, কিন্তু ছেলেটা হেরে যায়নি। চিৎকার করেছে, যন্ত্রণায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে, তবুও একটা কথাও বলেনি সে। নিশ্চিত মৃত্যুর সামনেও অপরাজিত ছিল ছেলেটা, মাথা উঁচু করে, বুকটা ফুলিয়ে, হেরে যাওয়াটা যে তার অভিধানে ছিল না…

ছেলেটা আর ফিরে আসেনি, স্বাধীন বাঙলাদেশের হয়ে ওপেনিং করার স্বপ্ন দেখতো যে ছেলেটা, সে আর ফিরে আসেনি। হাসিখুশি সেই রাজপুত্রটার স্বপ্নটা পূরণ হয়নি, স্বপ্নটা যে সে উৎসর্গ করেছিল একটা স্বাধীন দেশের জন্য, একটা লাল-সবুজ পতাকার জন্য…

আম্মা, দেশের এ রকম অবস্থায় তুমি যদি আমাকে জোর করে আমেরিকায় পাঠিয়ে দাও, আমি হয়তো যাব শেষ পর্যন্ত, কিন্তু বিবেক চিরকালের মতো অপরাধী করে রাখবে আমাকে। আমেরিকা থেকে হয়তো বড় ডিগ্রি নিয়ে এসে বড় ইঞ্জিনিয়ার হব; কিন্তু বিবেকের ভ্রুকুটির সামনে কোনো দিনও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব না। তুমি কি তা–ই চাও আম্মা?

মায়ের চোখে চোখ রেখে শান্ত গলায় কথাগুলো বলেছিল ছেলেটা,তর্কে সে কোনদিনই হারেনি।সেদিনও হারলো না।অপরিমেয় আবেগের স্রোত চাপা দিলেন মা, বুকে পাথর বেঁধে বললেন,”ঠিক আছে যা, তোকে দেশের জন্য কোরবানি করে দিলাম।“ আমেরিকার আইআইটিতে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ উপেক্ষা করে বেরিয়ে গেল ছেলেটা, দেশের ডাকে।ট্রেনিং শেষ করে ঢাকায় দুর্ধর্ষ সব অপারেশন চালিয়েছিল ওরা, একদিন চুপি চুপি মায়ের সাথে দেখা করতে এসে হাসিমুখে বলেছিল, ///আমাদের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল খালেদ মোশাররফ কী বলেন, জানো? তিনি বলেন, “কোনো স্বাধীন দেশ জীবিত গেরিলা চায় না; চায় রক্তস্নাত শহীদ।” অতএব মামণি, আমরা সবাই শহীদ হয়ে যাব—এ কথা ভেবে মনকে তৈরি করেই এসেছি।/// আগস্টের শেষ দিকে ধরা পড়বার পর টর্চার সেলে উনিশ বয়সের সেই অমিত প্রতিভাধর তরুন শরীফ ইমাম রুমির চামড়া তুলে ফেলার পর জিজ্ঞেস করা হল আবার, মুক্তি কা রুট বাতাও, অ্যামুনিশন কিধার সে আতা হ্যায়? যন্ত্রণায় প্রানটা যেন বেরিয়ে যাবে, কিন্তু রুমি মচকালো না। চোখে চোখ রেখে ঠাণ্ডা গলায় বললো,

You people are going to die. You can’t flee, you can’t leave-Nobody can save you- I can tell you this much…

ঠিক তার পাশের সেলেই বদিউল আলমকে বলা হল, ওর বন্ধুরা তথ্য দিচ্ছে, ওরা মুক্তি পেয়ে যাবে, সেও যদি তথ্যগুলো দেয়, তবে ছেড়ে দেওয়া হবে তাকে। ফৌজদারদারহাট ক্যাডেট কলেজের অসম্ভব মেধাবী ছাত্র ছিল ছেলেটা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্যাংস্টার বদি একাত্তরে পাকিস্তানী আর্মির ত্রাসে পরিনত হয়েছিল, ইঁদুরের বাচ্চার মত গর্তের ভেতর লুকিয়ে পড়তো পাকিস্তানীরা বদিদের ভয়ে, টর্চার সেলে তাই অস্ত্রের তথ্যের জন্য অকল্পনীয় বর্বরতায় অত্যাচার চলেছিল ওদের উপর, কিন্তু টুঁ শব্দ করেনি বদি, এক পর্যায়ে দৌড়ে গিয়ে সুইচবোর্ডের ভেতর আঙ্গুল ঢুকিয়ে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল সে, পারেনি। লাত্থাতে লাত্থাতে আবার ফিরিয়ে আনা হয়েছে, অনন্তকাল ধরে টর্চার চলেছে, তারপর আবার সেই প্রশ্ন, আর্মস কা রুট বাতাও,টেল আস এবাঊট দ্যা রুটস… প্রায় আধমরা বদির জবাবটা পাথরকঠিন শোনাল, আমি কিছুই বলব না, যা ইচ্ছা করতে পারো। ইউ ক্যান গো টু হেল..

//মা, এরপর থেকে জুয়েল-কাজীরা যে অপারেশনে যাবে, আমি সেটাতে যেতে চাই। এতো বড় জোয়ান ছেলে ঘরে বসে থাকে, আর দেশের মানুষ মার খায়, এইটা ক্যামন কথা? এইটা হবে না।”

– ঠিক আছে, তুই যুদ্ধে যেতে পারিস, আমার দোয়া রইলো।

ভাবলেশহীন চোখে তাকিয়ে থাকে ছেলে মায়ের মুখের দিকে, বুঝতে চেষ্টা করে, মা কি সত্যিই বলছেন না রেগে গিয়ে অনুমতিটা দিচ্ছেন…

–মা, তুমি কি অন্তর থেকে পারমিশন দিচ্ছ, নাকি রেগে গিয়ে? –আরে রাগ করব ক্যান? দেশটা স্বাধীন করতে হবে না?//

আজাদের মায়ের সাথে আজাদের আবার দেখা হয় নাখালপাড়া এমপি হোস্টেলের টর্চারসেলে।গরাদের ওপারে দাড়িয়ে থাকা আজাদকে তার মা চিনতে পারেন না। প্রচণ্ড মারের চোটে চোখমুখ ফুলে গেছে, ঠোঁট কেটে ঝুলছে, ভুরুর কাছটা কেটে গভীর গর্ত হয়ে গেছে।

–“মা, কি করব? এরা তো খুব মারে। স্বীকার করতে বলে সব। সবার নাম বলতে বলে।“ –“বাবা, তুমি কারোর নাম বলোনি তো? –না মা, বলি নাই। কিন্তু ভয় লাগে, যদি আরও মারে, যদি বলে দেই… –বাবারে, যখন মারবে, তুমি শক্ত হয়ে থেকো। সহ্য করো। কারো নাম বলো না। –আচ্ছা মা। ভাত খেতে ইচ্ছে করে। দুইদিন ভাত খাই না। কালকে ভাত দিয়েছিল, আমি ভাগে পাই নাই। –আচ্ছা, কালকে যখন আসব, তোমার জন্য ভাত নিয়ে আসব।

সাফিয়া বেগমের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যায়। হায়ে হাত তোলা তো দূরে থাক, ছেলের গায়ে একটা ফুলের টোকা লাগতে দেননি কোনোদিন। সেই ছেলেকে ওরা এভাবে মেরেছে… এভাবে…

মুরগির মাংস, ভাত, আলুভর্তা আর বেগুনভাজি টিফিন ক্যারিয়ারে ভরে পরদিন সারারাত রমনা থানায় দাড়িয়ে থাকেন সাফিয়া বেগম, কিন্তু আজাদকে আর খুঁজে পান নাই। ক্র্যাক প্লাটুনের বাকি সদস্যদের মত আজাদকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। ১৯৮৫ সালের ৩০শে আগস্ট মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সাফিয়া বেগম আর একটাবারের জন্যও ভাত মুখে তোলেননি। বেঁচে থাকার জন্য রুটি খেয়েছেন, পানি দিয়ে ভিজিয়ে পাউরুটিও খেয়েছেন কখনও, কিন্তু ভাত না। তার আজাদ যে ভাত খেতে চেয়েও ভাত খেতে পায়নি…

***

এরকম অযুতনিযুত হাহাকারে ভরা আত্মত্যাগের উপর দাড়িয়ে আজকের এই বাংলাদেশ, মাথা উঁচু করে লাল-সবুজ পতাকাটা বুকে জড়িয়ে বুক ফুলিয়ে অসংখ্য আমাদের পদচারনা।স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরে আজ বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ এক সমীহ জাগানো নাম,নানা সেক্টরে তার সগর্ব পদচারনা। যার একটি ক্রিকেট,যাতে পৃথিবীর সেরা সাতটি দেশের একটি এই সবুজ জমিনের উপর লাল সূর্যের বাংলাদেশ।

আজকের এই অবস্থানে আসতে অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হয়েছে, অনেক অক্ষমতার আক্ষেপ ভরা অভিমানের প্রহরে একের পর এক ম্যাচ অসহায় আত্মসমর্পণ করে, জিততে জিততে হেরে যাবার অনেক হাহাকারে ভরা গল্প সঙ্গী করে আজ আমরা পৃথিবীর অন্যতম দাপুটে দল, যাদের ভয় পায় সবাই, হারার আগে যারা হেরে যায় না, শেষবিন্দুতেও লড়ে যায় বাঘের হুংকারে।

মাঠে খেলে এই এগারোটা টাইগার। আর তাদের গলার রগ ফুলিয়ে সমর্থন দেই আমরা কিছু ক্র্যাকপিপল। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সমর্থকদের সাথে আমাদের পার্থক্য হল, আমরা কখনো আশা ছাড়তে পারি না।লাস্ট ওভারে ৩৬রান লাগবে, ক্রিজে ১১ নাম্বার ব্যাটসম্যান, অতি অসম্ভব জেনেও আমরা ছয় বলে ছয়টা ছক্কা দেখার অপেক্ষায় বুক বাঁধি, প্রত্যেকটা সিঙ্গেলে হাত তুলে চিৎকার করে ছয়ের উচ্ছ্বাসে মাতি,১০ উইকেটে হেরে যেতে যেতে হঠাৎ বিপক্ষের একটা উইকেট ফেলে দিতে পারলে কিংবা কারোর সেঞ্চুরি আটকে দিতে পারলে বিশ্বজয়ের আমাদের গর্জন শোনা যায় পৃথিবীর ওপ্রান্ত থেকেও।খেলা না,স্রেফ টাইগারগুলোকে লাল-সবুজ রঙে মাঠে নামতে দেখলেই, জাতীয় সঙ্গীত গাইতে শুনলেই আমাদের চোখে পানি এসে যায়, এতোগুলো বাঘকে সদর্পে মাঠে ছুটতে দেখেই আমাদের প্রানটা ভরে যায়, সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসে।

হেরে গেলে যে রাগ হয় না, তা না।ভয়ংকর যন্ত্রণায় এক রাশ অভিমানে পৃথিবীটা ফাঁকা হয়ে যায়। কিন্তু পরের ম্যাচেই আবার তাদের খুঁজে পাওয়া যায় আগের মত, যে মানুষটা ভেজা চোখে আর কোনদিন বাংলাদেশের ম্যাচ দেখবে না বলে পাথরকঠিন প্রতিজ্ঞা করে, পরের ম্যাচেই তাকে দেখা যায় সবার চেয়ে জোর গলায় চেঁচাতে, একটু আগেই যে তামিম ডাউন দ্যা উইকেটে এসে ওয়াহাব রিয়াজকে গ্যালারীতে আছড়ে ফেলেছে… বড্ড পাগল আমরা, ক্রিকেট মানেই আমাদের কাছে এই ১১ টা বাঘ…

এই পাগলামির শেকড়টা অনেক গভীরে। ক্রিকেটাররা মুক্তিযোদ্ধা না, মাশরাফির সাথে সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের তুলনা চলে না, ক্রিকেট ম্যাচ মুক্তিযুদ্ধ না— এই তিনটা লাইনই ধ্রুব সত্য। কিন্তু তারপরেও ক্রিকেটের সাথে মুক্তিযুদ্ধ চলে আসে। লাল-সবুজ রঙ দুটো সর্বাঙ্গে জড়িয়ে যখন ১১টা টাইগার মাঠে নামে, তখন ৪৪ বছর আগের সেই রক্তাক্ত জন্মইতিহাস ফিরে ফিরে আসে।

স্বাধীন বাংলাদেশের হয়ে ওপেনিংয়ে ব্যাট করার স্বপ্ন বুকে নিয়ে চলে যাওয়া জুয়েলকে আমরা খুঁজে পাই তামিমের তিন পা এগিয়ে ডাউন দ্যা উইকেট ছক্কায়, সৌম্য সরকারের দুর্দমনীয় সাইক্লোনে, পিটিয়ে তক্তা বানিয়ে দেওয়া সব মারে, রুমির ঠাণ্ডা মাথার দুর্ধর্ষতা খুঁজে পাই মুশফিকের কুলনেসের মধ্যে, আরাফাত সানির ঠাণ্ডা চাহনির শীতলতায় নিঃস্পৃহ ধ্বংসলীলা আমাদের মনে করিয়ে দেয় বদির কথা, পাকিস্তানীরা এভাবেই পিষে ফেলতো ছেলেটা, উদ্ধত শিরে ওয়াহাব রিয়াজের চোখে চোখ রেখে সাকিবের ঠাণ্ডা প্রত্যুত্তরে আমরা খুঁজে পাই আলতাফ মাহমুদ নামের সেই অকুতোভয় বঙ্গশার্দুলকে, নিশ্চিত মৃত্যুর মুখেও যার শির ছিল উন্নত… উদ্ধত।

সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি আমাদের অধিনায়ক,মাশরাফি বিন মর্তুজা নামের এক অকুতোভয় বঙ্গশার্দুল, যার ভেতর পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেনানায়ক মেজর খালেদ মোশাররফের অপরিমেয় ব্যক্তিত্ব আর নেতৃত্বগুন। খুঁজে পাওয়া যায়, পাওয়া যায় গেরিলা যুদ্ধের কিংবদন্তী ক্যাপ্টেন এটিএম হায়দারের অসমসাহসী দুর্ধর্ষতা, ভ্রাতৃস্নেহে সবাইকে আপন করে খাঁটি হীরে বানিয়ে প্রতিপক্ষের উপর অমিত সাহসে ঝাঁপিয়ে পড়া, তারপর একচুল ছাড় না দিয়ে শেষ বিব্দু পর্যন্ত লড়ে যাওয়া বাঘের গর্জনে…

হ্যাঁ, খেলার মাঝে আমরা মুক্তিযুদ্ধ খুঁজে পাই, মুক্তিযুদ্ধ যদি রাজনৈতিক গণ্ডগোল হয়ে থাকে, তবে খেলার সাথে আমরা রাজনীতি মেশাই। আমাদের এই স্পিরিটটা বহু পুরোনো, সেই পলাশীর প্রান্তর থেকে শুরু করে একাত্তরের ১৬ই ডিসেম্বরে বিজয় অর্জিত হবার আগ পর্যন্ত একটু একটু করে গড়ে উঠেছে আমাদের এই দেশাত্মবোধের স্পিরিট, আর মাঠের ঐ ১১ টাইগার যখন বিশ্বদরবারে লাল-সবুজের প্রতিনিধিত্ব করে, যখন আমাদের অধিনায়ক বলে,

///দেশ আছে বলেই আমি আছি। বারবার ইনজুরি থেকে ফিরে আসার প্রেরণাও পাই সেসব বীর মুক্তিযোদ্ধার কাছ থেকেই। এমনও ম্যাচ গেছে আমি হয়তো চোটের কারণে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছিলাম না। দুই-তিনটা বল করেই বুঝতে পারছিলাম সমস্যা হচ্ছে। তখন তাঁদের স্মরণ করেছি। নিজেকে বলেছি, ‘হাত-পায়ে গুলি লাগার পরও তাঁরা যুদ্ধ করেছিলেন কীভাবে? তোর তো একটা মাত্র লিগামেন্ট নেই!

দৌড়া…

দেশের পতাকা হাতে দেশের জন্য দৌড়ানোর গর্ব আর কিছুতেই নেই। পায়ে আরও হাজারটা অস্ত্রোপচার হোক, এই দৌড় থামাতে চাই না আমি…///

তখন আমাদের এই পাগলামি পূর্ণতা পায়, খুব অবাক হয়ে আবিস্কার করি আমরা একা নই,টাইগাররা মাঠে নামলে আমাদের পেছনে এসে দাঁড়ায় অযুতনিযুত শহীদ প্রান, যারা একটা স্বাধীন জমিনের জন্য, একটা লালসবুজ পরিচয়ের জন্য অকাতরে হাসিমুখে প্রান দিয়েছিল। মাঠে খেলে যে ১১জন, অবশ্যই তাদের ব্যক্তিগত স্কিলেই খেলা জিতি আমরা, কিন্তু মাঠে তাদের ভেতরে সবসময় সর্বক্ষণ একাত্তরের শহীদেরা থাকে… জয়-পরাজয় সকল ক্ষেত্রে… যে বাংলাদেশের জন্য সবটুকু ত্যাগ করলো যারা, সেই বাংলাদেশের খেলার সময় তারা আসবে না, এটা কি হয়?

এই আদর্শ আর বিশ্বাসে আস্থা রেখে কয়েকবছর আগে যাত্রা শুরু করেছিলাম আমরা কিছু ক্র্যাক পিপল, লক্ষ্য ছিল ভিনদেশী দালালদের ভিড়ে কাতারে কাতারে বাংলাদেশের দালাল বানাবো।শুরুতে আমরা অল্প ছিলাম, তারপর দিনে দিনে বেড়ে চললাম, সমমনা অনেকেই এসে যোগ দিল, অনেকেই ভিন্ন ভিন্ন ষ্টেশনে নেমে গেলো।তারপর একসময় স্যাবোটাজ করে আমাদের লাইনচ্যুত করে ফেলার চেষ্টাও করা হল। কিন্তু আমরা থামিনি।অনুপম হোসেন পুর্নমের ভাষায় বলতে হয়, ট্রেন বদলায়, প্ল্যাটফর্ম বদলায়, যাত্রাবিরতি আসে। কিন্তু কিছু যাত্রী সবসময় গন্তব্যে অবিচল থাকে, তাদের স্বপ্নটা কেউ কেড়ে নিতে পারে না। লক্ষ্যে পৌছানোর আগ পর্যন্ত তারা চেষ্টা চালিয়ে যায়… স্বপ্নের যে মৃত্যু নেই!

সেই স্বপ্নকে বুকে চেপে আজ থেকে ঠিক এক বছর আগে ক্রিকপ্লাটুন – Cricplatoon সম্পূর্ণ নতুন এক প্ল্যাটফর্ম যাত্রা শুরু করেছিল অনলাইনে। দিনটি ছিল মাশরাফি বিন মর্তুজার জন্মদিন। শুরু থেকেই স্বাধীনতার দীপ্তিতে উদ্ভাসিত, একাত্তরের ক্র্যাকপিপলদের বীরত্বে অনুপ্রাণিত স্রেফ বাংলাদেশের দালাল তৈরির ইন্সটিটিউশন হিসেবে ক্রিকপ্লাটুন একটা আলাদা ধারা তৈরির চেষ্টা করেছে। যেখানে দল-মত-পথ-ধর্ম নির্বিশেষে শুধুমাত্র বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য অকৃত্রিম ভালবাসা আর পাগলামি ধারন করা মানুষগুলো বিচরন করবে।কতটুকু পেরেছে সে বিচার সময় করবে। তবে স্বপ্ন ছোঁয়ার চেষ্টা চলবে আমাদের নিরন্তর। অনলাইন কিংবা অফলাইনের অন্য কোন সংগঠনের সাথে আমাদের কোন মিল নেই, আমরা কারোর অনুকরন কিংবা অনুসরনে বিশ্বাসী নই, আমাদের লক্ষ্য ও স্বপ্ন কেবল দেশের প্রতি স্বত্বহীন শর্তহীন ভালোবাসা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মাতরে ছড়িয়ে দেওয়া… ঘোর দুঃসময় থেকে সুসময়- প্রত্যেকটা মুহূর্ত নিঃস্বার্থভাবে জন্মভূমিকে বুকে দিয়ে আগলে রাখা… শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত…

সেই যে একটা রাজপুত্রের মত ফুটফুটে সুন্দর একটা ছেলে ছিল, স্বাধীন বাঙলাদেশের হয়ে ওপেনিং করার স্বপ্ন দেখতো, তার স্বপ্নটা কিন্তু হারায়নি… হারাতে দেইনি , দেবো না কখনো। জুয়েল বেঁচে থাকবে এগারোটা টাইগারের মাঝে, সেই অসম্ভব সুন্দর স্বপ্নটা বাঁচিয়ে রাখবে আমাদের টাইগাররা, বাঁচিয়ে রাখবো আমরা, বুকের অনেক গভীরে, চিরকাল…

শুভ জন্মদিন ক্রিকপ্লাটুন… অভিবাদন, ভালোবাসা নিরন্তর…

#Cricplatoon #আমরা_আলো_আনবো #আমরা_আলোয়_আনবো #Stronger_Than_Ever

গ্রুপ লিংক- https://www.facebook.com/groups/cricplatoon71/

 

( ছবি বানিয়েছেন- Anjum Shykh Utchas )

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Ad

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য লেখাগুলো

Ad