অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

ইশ, আমাদের যদি এমন একটি বাড়ি থাকতো!

যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান লেকের পশ্চিম তীরে অবস্থিত উইসকনসন অঙ্গরাজ্যের মিলওয়াকি শহরের বাসিন্দা এক তরুণ দম্পতি ৫৬০ বর্গ ফুটের একটা বাড়ি বানিয়েছে। বাড়ি তো যে কেউ বানাতে পারে সে আবার বিশেষ কি- এমনটাই ভাবছেন তো? আছে, এই বাড়ির বিশেষ একটি দিক আছে। বাড়িটির বিশেষ দিক হলো, বাড়িটি তৈরির উপাদান। নানা ধরণের পুরাতন বাতিল জিনিসপত্র পূণর্ব্যবহার এবং মেরামত করে তৈরি করা হয়েছে বাড়িটি। কোন ইট, বালি, সিমেন্টের তো বালাই নেই’ই! কোন নতুন উপাদান কিনেও বানানো হয়নি বাড়িটি। সেখানকার সান্তা ক্রুজ মাউন্টেনের উপর বাড়িটি তৈরি করতে তাদের খরচ পড়েছে মাত্র ১০,০০০ ডলার। দশ হাজার ডলার আবার কম হলো? এমনটি যারা ভাবছেন, তাদের জন্য তথ্য হলো, যুক্তরাষ্ট্রে মাত্র দশ হাজার ডলার দিয়ে একটা বসবাসযোগ্য বাড়ি নির্মাণ অনেকটা স্বপ্নের মত।

যা হোক, স্থাপত্যকলার ছাত্র টেইলর বোড এবং প্রিস্কুলের শিক্ষিকা ও ইয়োগা ইন্সট্রাকটর স্টেফ বিয়ে করেন বছর পাঁচেক আগে। দুজনই সমবয়সী, চিন্তাভাবনাও অনেকটা এক রকম। তারা স্বপ্ন দেখতেন এমন একটা বাড়িতে তারা সংসার পাতবেন, যে বাড়ির প্রতিটি পরতে পরতে থাকবে প্রকৃতির ছোঁয়া। প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে সুখে-শান্তিতে সে বাড়িতে বসবাস করবে তারা।

এমন একটা বাড়ি বানাতে চেয়েছে এই দম্পতি, যেখানে থাকবে আধুনিক স্থাপত্যকলা আর প্রাকৃতিক উপাদানের সমন্বয়। তারা, স্থাপত্যকলা এবং জীবনব্যবস্থার সমন্বয় ঘটিয়ে ছোটখাটো, স্বয়ংসম্পূর্ণ, পরিবেশ বান্ধব, সাশ্রয়ী একটা আবাস গড়ে তুলতে চেয়েছে। বয়স যখন পঁচিশ ছিল, তখন থেকেই এমন একটা বাড়িতে সাদামাটা একটা জীবনের স্বপ্ন দেখত টেইলর এবং স্টেফ দম্পতি।

সেই স্বপ্ন পূরণে তারা নিজেদের পরিকল্পনায়, নিজের চেষ্টায়, নিজের হাতে, নিজেদের ব্যবহৃত পুরনো জিনিসপত্র মেরামত করে সেগুলো দিয়েই নির্মান করে ব্যবহার উপযোগী সুন্দর এক বাড়ি। শুধু নিজেদের আরাম আয়েশের জন্য নয়, টেইলর ও স্টেফ দম্পতি অন্যদের জন্য আদর্শ হিসেবে তৈরি করেছে প্রাকৃতিক ব্যবহার্য জিনিসপত্র দিয়ে তাদের বাড়িটি।

বাইরে থেকে দেখতে ছোটখাট বাড়িটির, ভেতরটা বেশ প্রশস্ত। বড় বড় জানালা গুলোতে নতুন কাঁচের বদলে ব্যবহার করা হয়েছে প্লাস্টিক ও কাঁচের ফেলে দেওয়া বোতল। ব্যবহৃত বাতিল সব বোতল জোগাড় করে সেগুলো রিসাইকেল করে জানালায় এবং বাড়ির ভেতরে সাজাতে ব্যবহার করা হয়েছে। রংবেরঙের বোতলের ভেতর দিয়ে সূর্যের আলো যখন বাড়ির ভেতরে প্রতিফলিত হয়, তখন ভিন্ন রকম এক সৌন্দর্য ঝলমলিয়ে ওঠে বাড়ির ভেতরে। বাড়িটির টেবিল, দেয়াল, সিলিং এবং কেবিনেট বানাতে যেসব কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে সবই পুনর্ব্যবহৃত বা সংশোধিত কাঠ। কোনটাই নতুন নয়।

জিনিসপত্র পুরনো হলেই ছুড়ে ফেলে দেওয়ার অভ্যাস, খুব দাম্ভিক বলে মনে হয় টেইলরের কাছে। তাই তারা এমন একটা উপায় বেছে নিয়েছিল নিজেদের জন্য, যাতে করে তারা ব্যবহৃত বাতিল জিনিসপত্রকে বাড়ি বানানোর জন্য কাজে লাগাতে পারে। কারের টায়ার ভেঙে সেগুলোকে মাটিতে ইটের মত বসিয়ে তারা তৈরি করেছে মেঝে। কাঁচের বদলে বোতল ব্যবহার করেছে ঘরে বৈচিত্র আনার জন্য। ঘরের ভেতরের শোভা বর্ধনে ব্যবহৃত সব কাঠই এসেছে পুরাতন পূর্বে ব্যবহৃত কাঠ থেকে।

একটা বাড়ি বানানো মোটেও সস্তা ব্যাপার নয়। কিন্তু টেইলর আর স্টেফ দম্পতি তাদের বাড়িটি মাত্র ১০ হাজার ডলার দিয়েই সম্পূর্ণ করতে সমর্থ হয়েছে, কারণ তারা বাড়িটি বানিয়েছে, ব্যবহার অযোগ্য এবং সহজপ্রাপ্য সব জিনিসপত্রকে রিসাইকেল করে। তাছাড়া, নিজের বুদ্ধিতে, নিজের জায়গায়, নিজেদের পরিশ্রমে তৈরি করা হয়েছে বলে বাড়িটি তৈরি করতে খরচ হয়েছে অবিশ্বাস্যরকম কম। বন্ধুবান্ধব এবং আত্মীয় স্বজনরাও অনেকটা সাহায্যে করেছে তাদের এই বাড়িটি তৈরির কাজে। তারা দেখিয়ে দিয়েছে, ইচ্ছে আর সংকল্প থাকলে নতুন কিছু করে দেখানো খুব একটা কঠিন নয়।

টেইলর এবং স্টেফ দম্পতিই যে এধরণের বাড়ি তৈরির চিন্তা প্রথম করেছে তা কিন্তু নয়। পুরাতন জিনিসপত্রকে পূনর্ব্যবহারের মাধ্যমে প্রাকৃতিক উপায়ে এমন বাড়ি তৈরির ধারণা প্রথম উদ্ভাবন করেছিলেন স্থপতি মাইকেল রেইনোল্ডস্। তিনি এ ধরণের বাড়ির নাম দিয়েছিলেন ‘আর্থশিপ’।

স্থপতি মাইকেল রেইনোল্ডস্ ছয়টি নীতিকে সামনে রেখে এ ধরণের বাড়ি তৈরির চিন্তা করেছিলেন-

১) সূর্যের তাপ এবং বায়ূপ্রবাহকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহের মাধ্যমে প্রাকৃতিকভাবেই বাড়ির ভেতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ।

২) স্বয়ংসম্পূর্ণ পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা।

৩) প্রাকৃতিক এবং পূনর্ব্যবহৃত জিনিসপত্রকে নতুনভাবে কাজে লাগানো।

৪) প্রাকৃতিক উপায়ে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা।

৫) দীর্ঘকালীন প্রাকৃতিক সংরক্ষণাগার।

৬) বাড়িতেই অনেক ধরণের শাকসবজি, ফলমূল উৎপাদনের ব্যবস্থা।

মোটকথা, আর্থশিপ হলো এমন একটি আবাসন ব্যবস্থা, যেখানে সরকারী সরবরাহ ব্যবস্থার উপর নির্ভরতা কমিয়ে এবং জীবাশ্ম জ্বালানীর ব্যবহার কমিয়ে কম খরচে প্রাকৃতিক দ্রব্যদি পূনর্ব্যবহার করে সর্বোচ্চ আরাম-আয়েম নিশ্চিত করা সম্ভব।

বাড়ি বানানোর জন্য “আর্থশিপ” নামক এ ধারণাটা তো বেশ ভালই, না কি বলেন? খরচ কম হলো, পুরাতন জিনিসকে কাজে লাগানো হলো, আবার সুন্দর প্রাকৃতিক একটা ব্যসস্থানও পাওয়া গেল- একের ভেতর তিন। তাই নয় কি?

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close