হনুমা বিহারীর নিরীহদর্শন বলটা কাট করতে চাইলেন, ব্যাটে-বলে হলো না ঠিকঠাক। খানিক আগে এমনই একটা কাটে তিন অঙ্কে পৌঁছেছিলেন। তবে এবার ভাগ্যদেবী সায় দিলেন না, ব্যাটের কানায় আলতো চুমু খেয়ে বলটা জমা পড়লো রিশভ পান্টের হাতে। বাইশ গজের এপিটাফটা লেখা হয়ে গেল আপনার, ভারতীয় ফিল্ডারেরা ছুটে এলেন বিদায়ী অভিনন্দন জানাতে, তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে প্যাভিলিয়নের পানে হাঁটা শুরু করলেন আপনি। ওভালে তখন করতালির বন্যা, সর্বকালের পঞ্চম সর্বোচ্চ টেস্ট স্কোরারকে বিদায় জানাচ্ছে ক্রিকেটবিশ্ব, ইংল্যান্ডের টেস্ট ইতিহাসের সর্বোচ্চ রানের মালিককে গুডবাই বলছে বার্মি আর্মি।

আপনি নির্লিপ্ত, চোখের কোণে জলের আভাস নেই, মুখে একটা হাসি ঝুলিয়ে রেখে সিঁড়ি ভেঙে উঠে গেলেন ড্রেসিংরুমে, এই ড্রেসিংরুমে কত হাজারবার ঢুকেছেন আপনি, সেঞ্চুরী হাঁকিয়ে ঢুকেছেন, দলকে জিতিয়ে শ্যাম্পেনের বোতল খুলেছেন এখানে, হারের পরে আপনার অব্যক্ত বেদনার সাক্ষীও তো এই সাজঘর! নামের পাশে সাবেকের তকমা লেগে যাবে একদিন বাদেই, সেটার ছাপ তেমন একটা খুঁজে পাওয়া গেল না আপনার চোখেমুখে! 

অ্যালিস্টার কুক, কুক বিদায়, কুক ট্রিবিউট

অবশ্য আপনার এই নির্লিপ্ততা তো নতুন নয়। সেঞ্চুরীর পরে কতশত রকমের উদযাপন দেখেছে ক্রিকেট, কত রকমের ক্ষ্যাপাটে কাণ্ডকারখানা করেছেন অনেকে, আপনাকে সেসবে গা ভাসাতে দেখা যায়নি কখনও। মুখে স্মিত হাসি ঝুলিয়ে ব্যাটটাকে উঁচিয়ে ধরেছেন শুধু। জীবনের প্রথম টেস্টে যেমন, শেষ টেস্টেও ঠিক তেমনই। মাঝের বারো বছরে অনেক কিছু বদলে গেছে, আপনি বদলাননি। অ্যালিস্টার কুক, আপনার সেই একঘেয়ে হয়ে যাওয়া উদযাপনটাকেও যে আমরা মিস করবো ভীষণ!

দারুণ স্টাইলিশ কোন ব্যাটসম্যান ছিলেন না আপনি, ধ্রুপদী শটের পসরা সাজিয়ে বসতেন না মাঠে। তবুও আপনাকে আলাদা করে চোখে লেগেছিল, কারণটা বোধহয় আপনার উত্তুঙ্গ আত্মবিশ্বাস। আপনার চকলেট বয় ইমেজটাও একটা কারণ হতে পারে। নাগপুরে ভারতের বিপক্ষে অপরাজিত সেঞ্চুরীতে অভিষেক, ক্যাবল টিভির কল্যাণে সেই ইনিংস মিস যায়নি আমাদের। তখন আপনার একুশ বছর বোধহয়, তবে আমরা তখনও অষ্টাদশী হইনি। সেটাই প্রথম মুগ্ধতা। 

সাত সাগর তেরো নদীর ওপাড়ের বেনিয়া শাসকদের ইংল্যান্ডকে খেলাধুলায় সাপোর্ট করার কোন কারণ নেই আমাদের। অ্যাশেজে আমরা আবার ঘোরতর অস্ট্রেলিয়ান, ইংলিশরা সেখানে শত্রুসম। আপনিও তাই বিভীষণসম, মাথায় আছেন, মনে নেই। ২০০৯-১০ অ্যাশেজে সব মিলিয়ে ৭৬৬ রান করলেন আপনি, পিটিয়ে ছাতু বানালেন অজি বোলারদের। ক্যাঙ্গারুদের দেশে অ্যাশেজ জিতলো ইংল্যান্ড, সবচেয়ে বড় অবদান আপনার! শেষ কবে কোন ইংলিশ ব্যাটসম্যান অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে এমন ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করতে পেরেছিল? জানা নেই কারো।

সুনীল গাভাস্কার বলেছিলেন, শচীন টেন্ডুলকারের টেস্ট রান আর সেঞ্চুরীর রেকর্ড যদি কেউ ভাঙতে পারে, সেটা অ্যালিস্টার কুকই পারবেন! কুক, আপনি পারলেন না, হাজার তিনেক রানের ঘাটতি রয়ে গেল শচীনের সঙ্গে। কে জানে, আর গোটা চল্লিশের টেস্ট খেললে হয়তো হয়ে যেতো, টেস্টে সর্বকালের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের জায়গায় লেখা থাকতো আপনার নামটা। এই না হওয়াতে আক্ষেপ হয়তো নেই, তবে অতৃপ্তি তো আছে আমাদের! 

অ্যালিস্টার কুক, ইংল্যান্ড, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, টেস্ট ক্রিকেট

ব্যাটের পুরনো ধার হারিয়ে ফেলেছিলেন বছর তিনেক আগে। একসময় যে অ্যালিস্টার কুকের উইকেট পাওয়াটা ছিল বোলারদের জন্যে আরাধ্য বিষয়, সেটাই হুট করে যেন সহজলভ্য হয়ে উঠলো! আপনার ব্যাট-প্যাডের ফাঁকে বল ঢোকানোটা ছিল বিশ্বের সবচেয়ে কঠিণ কাজগুলোর একটি, একটা সময় আপনাকে বোকা বানানোর জন্যে মুনি-ঋষিদের মতো তপস্যা করতে হতো প্রতিপক্ষকে, সেই সময়গুলো পেরিয়ে গেল হটাৎই। নিজেকে হারিয়ে খুঁজতে খুঁজতে হয়তো ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন আপনি, তাই ঘোষণাটা দিয়েই দিলেন, বলে দিলেন বিদায়!

কে জানে, আরেকটু চেষ্টা করলে হয়তো আরও বেশ ক’টা দিন ক্রিকেটেই থাকতেন আপনি। জীবনের শেষ ইনিংসটা তো অন্তত সেরকমইবার্তা দেয়। তেরো বছরের ক্যারিয়ারে টেস্ট ইতিহাসের সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকারীদের তালিকার পাঁচ নম্বরে।নিজের নাম তুলে আনাটা তো চাট্টেখানি কথা নয়! সাড়ে বারো হাজার রান বা তেত্রিশটা সেঞ্চুরী আসলে আপনার সামর্থ্যের পুরোটা জানান দিতে পারে না, বলতে পারে না, বাইশ গজে বোলারদের কাছে কতটা আতঙ্কের নাম ছিলেন আপনি! শেষ ইনিংসে কুমার সাঙ্গাকারাকেও ছাপিয়ে গেলেন, বাঁহাতি ব্যাটসম্যানদের মধ্যে আপনার রানই সবচেয়ে বেশি, উদ্বোধনী ব্যাটসম্যানদের মধ্যেও আপনি সবার আগে। ইংল্যান্ডের টেস্ট ইতিহাসের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক তো সেই কবেই হয়েছেন! এতসব রেকর্ডে ভরপুর একটা ক্যারিয়ারের পরে বিদায় বলার সময় আক্ষেপের কিছু কি থাকে আসলে? 

অ্যালিস্টার কুক, ইংল্যান্ড, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, টেস্ট ক্রিকেট

হয়তো থাকে না। তবে দর্শক হিসেবে আমাদের আক্ষেপ তো থাকবেই। তেরো বছর তো অ্যালিস্টার কুককে উপভোগ করার জন্যে যথেষ্ট নয়। গতকাল যখন মিসফিল্ড থেকে অপ্রত্যাশিত বাউন্ডারিতে ছিয়ানব্বই থেকে তিন অঙ্কে পৌঁছে গেলেন, পুরো ওভাল ফেটে পড়েছিল করতালিতে। এই মানুষগুলোই হয়তো কিছুদিন আগে আপনার মুণ্ডুপাত করেছে, রান না পাওয়ায় তার অবসরের দাবী তুলেছে। তবুও তারা ওভালে এসেছে নিজেদের ছেলের বিদায়ের সাক্ষী হতে। আয়ারল্যান্ড থেকে উড়ে এসেছেন নিল ও ব্রায়েন, নিজের সবচেয়ে প্রিয় খেলোয়াড়ের শেষ ইনিংসটা দেখতে। যে স্ট্রাউসের সঙ্গে জুটি বেঁধে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন আপনি, সেই অ্যান্ড্রু স্ট্রাউস কমেন্ট্রিবক্সে ছিলেন আপনার সেঞ্চুরীর সময়টায়। দুজনে জুটি বেঁধে কত ইনিংস গড়েছেন, দলের জয়ের ভিত গড়ে দিয়েছেন, সেসব ভেবে আবেগাপ্লুত হয়েছেন স্ট্রাউসও, কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এসেছে তার!

সেঞ্চুরীতে শুরু, সেঞ্চুরীতে শেষ, বিদায় বলতে হচ্ছে আপনাকে। প্রিয় অ্যালিস্টার কুক, চোখের আড়াল তো হয়ে যাচ্ছেন, কিন্ত মনের আড়াল, সেটা কি করে হবেন বলুন?

Comments
Spread the love