তার রেকর্ডই তার হয়ে কথা বলবে। বলা হয় অনেককে নিয়েই। কিন্তু খুব বেশি ক্রিকেটারের ক্ষেত্রে কথাটি শতভাগ সত্য নয়। ডনকে নিয়ে বলা যায়। শচিন নিয়েও। পরিসংখ্যান অবশ্যই তাদেরকে বোঝাতে পারে খুব সামান্য। তাদের শ্রেষ্ঠত্ব অঙ্কে নয়, ব্যাটসম্যানশীপে। তবু তাদেরকে এক কথায় বোঝাতে পরিসংখ্যানই অনেক সময় যথেষ্ট। আরেকজনকে নিয়েও বলা যায়। অ্যালেস্টার কুক।

এই রে, তেড়ে আসবেন না যেন। ডন-শচিনের কাতারে কুককে রাখিনি। সেই তুলনার প্রশ্নই আসছে না। বলেছি স্রেফ রেকর্ড দিয়েই কাউকে ফুটিয়ে তোলার কথা। টেস্ট ইতিহাসের সফলতম বাঁহাতি ব্যাটসম্যান। সফলতম ওপেনার। সাড়ে তিন হাজার রান এগিয়ে থেকে দেশের সফলতম ব্যাটসম্যান। টানা ১৬০ টেস্ট খেলার অতিমানবীয় কীর্তি। অভিষেক ও শেষ টেস্টে সেঞ্চুরি। আরও টুকটাক অনেক অনেক রেকর্ড। একজন কুকের গ্রেটনেস বোঝাতে যথেষ্ট।

ব্যাটসম্যানশীপের কথা বলছিলাম। কোনো ব্যাটসম্যানের পরিসংখ্যান আর ব্যাটসম্যানশীপকে এক সুতোয় গাঁথা অনেক সময়ই বিভ্রান্তিকর। ব্রায়ান লারার ব্যাটসম্যানশীপকে পরিসংখ্যান দিয়ে কিভাবে বোঝানো সম্ভব? আমি যদি বলি আমার দেখা সেরা ব্যাটসম্যান লারা, সেখানে পরিসংখ্যান দিয়ে যুক্তি খুব বেশি দেখাতে পারব না। লারার ব্যাটিং যারা দেখেননি, না দেখাদের মধ্যে যারা গভীরভাবে পড়েন না, জানেন না, অনুভব করেন না, তাদেরকে একজন লারা বোঝানো কঠিন।

মজার ব্যাপার হলো, পরিসংখ্যান দিয়ে কুকের ব্যাটসম্যানশীপও বেশ কিছুটা বোঝানো যায়। অস্ট্রেলিয়ায় ২০ টেস্টে দেড় হাজারের বেশি রান করেছেন। ৫টি সেঞ্চুরি। ২০১০-১১ সিরিজে ৭৬৬ রান, প্রায় অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স। অস্ট্রেলিয়ায় ভালো করতে শুধু ভালো বোলিং সামলানোই যথেষ্ট নয়, স্লেজিংয়ের তোড়, দর্শক ও মিডিয়ার চাপ, পারিপার্শ্বিকতা সবসময়ই খুব কঠিন। কুক সব জয় করেছেন। এই তো গতবছরই, সেরা সময় পেছনে ফেরার পরও মেলবোর্নে বক্সিং ডে টেস্টে খেলেছেন ৬৩৪ মিনিটে ২৪৪ রানের অপরাজিত ম্যারাথন ইনিংস।

এই ব্যাটসম্যানই আবার ভারতে ১৩ টেস্টে রান করেছেন ৫১.৪৫ গড়ে। ৫টি সেঞ্চুরি। ২০১২ সালের সিরিজে টার্নিং সব উইকেটে তিন স্পিনারের ঘূর্নি সামলে তিন সেঞ্চুরি। ৪ টেস্টে ৫৬২ রান। মুম্বাইয়ে কেপির ১৮৬ রানের ইনিংসটি আধুনিক ক্রিকেটের সেরা ইনিংসগুলোর ছোট্ট তালিকায়ও থাকবে। সেই ইনিংসে কুকের ৩৩৬ মিনিটে ১২২ রানের ইনিংসটিও ছিল মহামূল্য।

শ্রীলঙ্কায় তার গড় ৪৮.৩৩। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৫৫.৩৬। ওয়েস্ট ইন্ডিজে ৫৪.৩৩। এই যে প্রতিকূল সব কন্ডিশনে সাফল্যের অঙ্ক, সেটিই তার ব্যাটসম্যানশীপের প্রতিচ্ছবি। নিউ জিল্যান্ড আর দক্ষিণ আফ্রিকায় খুব সমৃদ্ধ নয় রেকর্ড। তবে মনে হয় না প্রমাণের কিছু বাকি ছিল বা আছে।

অ্যালিস্টার কুক, ইংল্যান্ড, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, টেস্ট ক্রিকেট

আমার কাছে অবশ্য দেশের বাইরে নয়, তার ব্যাটসম্যানশীপের সবচেয়ে বড় প্রমাণ মনে হয় দেশের মাটিতে পারফরম্যান্সই। কারণটা সিম্পল। এতগুলো বছর আর এতগুলো টেস্ট ধরে এই কন্ডিশনে নতুন ডিউক বল সামলানো!

কন্ডিশন ও ডিউক বল, দুটিই প্রবল প্রতিপক্ষ। ডিউক বলের মুভমেন্টের সামনে নাচানাচি করতে তো কম ব্যাটসম্যানকে দেখলাম না! এমনিতেই সুইং বেশি, তার ওপর এই কন্ডিশন। সেটাও একেকসময় একেকম। ইংলিশ গ্রীষ্মের কয়েকটি পর্যায় থাকে। গ্রীষ্মের শুরুতে যেমন ব্যাট করা সবচেয়ে কঠিন। উইকেট খুব রুক্ষ থাকে। তামিম যে ২০১০ সালে উইজডেন বর্ষসেরা হলেন, সেটি ছিল মূলত ইংলিশ গ্রীষ্মের শুরুতে অমন কঠিন উইকেটেও দুটি দাপুটে সেঞ্চুরি করায়। গ্রীষ্মের শুরুর পর আবার নানা ধাপে উইকেট থাকে একেকরকম। আবার অনেক সময় এক দিনেই অনেক রকম কন্ডিশনে খেলতে হয়। মেঘলা আকাশ, রোদ বেশি বা কম, বৃষ্টির আগে বা পরে, বাতাস কম না বেশি, কোন দিক থেকে কোন দিকে ইছে, নানা রকম অবস্থা। তো এরকম উইকেটে, এরকম কন্ডিশনে, নতুন ডিউক বল বছরের পর বছর সামলানো ক্রিকেটের কঠিনতম কাজগুলোর একটি। কুক সেই কঠিনেরেই ভালোবেসেন।

বলতে পারেন, সে তো অভ্যস্ত, এই কন্ডিশনে খেলেই বেড়ে উঠেছে। কিন্তু কন্ডিশনের ধারণা থাকাই সবকিছু নয়। প্রতিবারই কঠিন কাজটা নতুন করে শুরু করতে হয় শূন্য থেকে। প্রতিবারই জিততে হয় চ্যালেঞ্জ। তাছাড়া আরও হাজার হাজার ক্রিকেটারও সেই কন্ডিশনে বেড়ে উঠেছেন। তাদের একজনও কুক হতে পারেননি!

অ্যালিস্টার কুক, ইংল্যান্ড, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, টেস্ট ক্রিকেট

হ্যাঁ, ইংল্যান্ডে ওপেন করেও কুকের চেয়ে বেশি গড় আছে তার মেন্টর গ্রাহাম গুচের। ওপেন করে জেফ্রির গড়, সেঞ্চুরি দুটিই বেশি। লেন হাটন, হার্বার্ট সাটক্লিফের গড়ও বেশি। এই দুজন তো সর্বকালের সেরাদের অন্যতম। তার পরও কুক আলাদা। তার চেয়ে বেশি ম্যাচে তো নতুন ডিউক সামলাতে হয়নি আর কাউকে! ৮২ টেস্টে ওপেন করেছেন ইংল্যান্ডে, আরও ৭ টেস্টে খেলেছেন তিনে। মানে প্রায় নতুনই। এতগুলো টেস্টে নতুন ডিউকের ছোবল সামলাতে তিনি ছিলেন দলের সবচেয়ে বড় নির্ভরতা। দলকে আর কিছু ভাবতে হয়নি। আমার মতে, তার ব্যাটসম্যানশীপের সবচেয়ে বড় সার্টিফিকেট এটিই।

আরেকটা জায়গায়ও তিনি হয়ত অনন্য। আমরা তার টেকনিক, তার টেম্পারামেন্ট, তার কঠিন মনোসংযোগের কথা বলি। ড্রাইভ শটে কখনোই স্বচ্ছন্দ ছিলেন না, তবু ড্রাইভে করেছেন হাজার হাজার রান। কাট-পুল-ফ্লিক ভালো ছিল, আরও শাণিত করেছেন সময়ের সঙ্গে। সেসব কোত্থেকে এলো? তাড়না থেকে। ভেতরের তাগিদ থেকে। তাগিদ নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার। সব ক্রিকেটারই হয়ত সেটি চায়, পারে কম জনই। কুক পেরেছেন। সামর্থ্যের সীমানা তিনি বাড়িয়েছেন সময়ের সঙ্গে। ছাড়িয়েছেন নিজেকে। এবং সেইটুকুর পুরোটাই ঢেলে দিয়েছেন ২২ গজে। যতটা পারতেন, তার সবটুকু। বিদায় বেলায় কুক বলেছেন, সর্বোচ্চ যেখানে তিনি যেতে পারতেন, সেখানে পৌঁছেছেন। সেরা যতটা দিতে পারতেন, তার সবটাই দিতে পেরেছেন। ক্রিকেট ইতিহাসের খুব বেশিজন এই তৃপ্তি নিয়ে বিদায় নিতে পারেননি।

অ্যালিস্টার কুক, কুক বিদায়, কুক ট্রিবিউট

আরেকটা জায়গায়ও তিনি সেরাদের একজন। মাঠের ভেতরে-বাইরে নিজেকে যেভাবে তুলে ধরেছেন। সত্যিকারের ভদ্রলোক। ক্যারিয়ারে আদৌ বিতর্ক স্পর্শ করেছে কিনা, আতিপাতি করে খুঁজতে হবে। কেপি অধ্যায় ঠিকভাবে সামলাতে না পারা নিয়ে আক্ষেপ কিছুটা করেছেন। তবে সেখানে তার ভূমিকাও ছিল সামান্য। এছাড়া আর কিছু? মনে পড়ে না…।

আমার বরং মনে পড়ে ২০১৬ সালের আমাদের দেশে টেস্ট সিরিজের কথা। নিরাপত্তার শঙ্কায় ইংল্যান্ডের সিরিজ ছিল অনিশ্চিত। শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ড এসেছিল। মিরপুরে তারা টেস্ট হারল আমাদের কাছে। ম্যাচ শেষে কুক বলেছিলেন, “I’m really glad I’ve been able to lead an England side here, so many people came out to support us. People need to come here and play cricket. You can see their development. At home they will be a tough side to beat. They have a lot of good spinners. It’s not easy for me to say, but it’s a good win for Bangladesh cricket. Maybe some things are bigger than one game.”

বাংলাদেশের জয়টা যে ক্রিকেট খেলাটার জন্যই দারুণ ব্যাপার, র‌্যাঙ্কিংয়ের নয় নম্বর দলের কাছে হারা একটা কুলীন ক্রিকেট জাতির অধিনায়কের জন্য এটি ছিল দারুণ সাহসী এক উচ্চারণ। কুক ছিলেন এমনই। যত বড় ব্যাটসম্যন, তার চেয়েও বড় মানুষ। অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, ইংল্যান্ড এবং ক্রিকেট খেলাটার ছিলেন দারুণ একজন দূত।

ক্রিকেটারদের ক্ষেত্রে আরেকটি ব্যাপারও গুরুত্বপূর্ণ আমার মতে। ড্রেসিং রুমে কতটা শ্রদ্ধা আদায় করতে পারলেন। ইংলিশ ড্রেসিং রুমের ভেতরের খবর তো জানি না। তবে বাইরে সতীর্থরা তাকে যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, তাতে মনে হয় এখানেও তিনি চ্যাম্পিয়ন। ওভাল টেস্ট শেষে কুককে নিয়ে বলতে গিয়ে টিভি ক্যামেরার সামনে গলা ধরে এলো জেমস অ্যান্ডারসনের। ব্রিটিশদেরও এমন আবেগ! গড়িয়ে পড়ল জল। ওই অশ্রুতেই লেখা আছে কুকের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা।

কুক ছাপ রেখে যাচ্ছেন। মাঠের ভেতরে-বাইরে ছাপ। ইংলিশ ক্রিকেটে, বিশ্ব ক্রিকেটে ছাপ। ক্রিকেট খেলাটির পথচলায় তার পরিচয় তুলে ধরবে তার ছাপই। 

আমি ব্যক্তিগতভাবে ভেবেছিলাম, আরেকটি অ্যাশেজ অন্তত খেলবেন। সেরা চেহারা অবশ্যই অতীত। তবে বর্তমানের কুকও এই ইংল্যান্ড দলে অনায়াসে আরও কয়েক বছর খেলতে পারতেন। বয়স মোটে ৩৩। তবে ইংলিশ, অস্ট্রেলিয়ানরা এরকমসই। নিজেকে জোর করে টানেন না। ট্রেনিংয়ে নিজের ভেতর তাগিদটা আগের মতো টের পাচ্ছেন না, ব্যস, ছেড়ে দিলাম! তারা সাধারণত নিজের সঙ্গে প্রতারণা করেন না।

তিনি যাচ্ছেন তৃপ্তি নিয়ে। কিন্তু ক্রিকেট রোমান্টিকদের দীর্ঘশ্বাস লম্বা হলো আরেকটু। ধ্রুপদি টেস্ট ব্যাটসম্যান প্রজাতি ক্রমেই বিরল হয়ে পড়ছে। চলে গেলেন তাদের আরও একজন।

সময় অবশ্য সব কিছুর সঙ্গে মানিয়ে নিতে শেখায়। এই তো, শচিনের স্টান্স দেখি না কতদিন হয়ে গেল, উইকেটে লারার জাদুকরী উপস্থিতি মিলিয়ে গেল চোখের সামনে থেকে, পান্টারের পুল মনে হয় সুদূর অতীতের, ওয়ার্নির ঘূর্ণি দেখি না, কণ্ঠ শুনি, ক্যালিসকে দেখি আইপিএলের ডাগআউটে, জয়াসুরিয়া-অরবিন্দকে ছাড়া শ্রীলঙ্কা দল দেখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠলাম, এখন জয়াবর্ধনে-সাঙ্গাবিহীন দলও দেখছি। ইংল্যান্ডের হয়ে ওপেন করছেন না কুক, সেটিতেও সয়ে উঠবে মন।

স্রেফ মাঝেমধ্যে পড়বে একটু দীর্ঘশ্বাস… বিষাদের বাতাস!

Comments
Spread the love