ইনসাইড বাংলাদেশরাজনীতি নাকি জননীতি

কমিউনিজম এবং বেহেশতি ইউটোপিয়া

মানুষের অত্যন্ত সাধারণ একটা বৈশিষ্ট্য হল, তার চাহিদার কোন শেষ নেই। কোন একটি চাহিদা পূরণ হলেই, নতুন একটি চাহিদা তার জায়গা দখল করে নেয়। আসলে এই চাহিদাই মানব সভ্যতা বিকাশের মূল চালিকাশক্তি। গুহাবাসী মানুষ যদি তাদের বসবাসের গুহা আর একবেলা শিকার নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতো, তাহলে নিত্য নতুন আবিষ্কার হতনা। মানুষ যত দিন বেঁচে থাকবে ততদিন তার চাহিদার কোন শেষ হবে না। কোন চাহিদা না থাকা মানে মৃত! এমনকি জাগতিক চাহিদাহীন সাধু সন্ন্যসীদেরও চাহিদা থাকে- নির্বান লাভের চাহিদা!

আপনি যদি কোন মানুষকে খাওয়া, পড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা সহ তার সব মৌলিক চাহিদা পূরণের ব্যবস্থা করে দেন, তাতেও কিন্তু সেই মানুষটি সন্তুষ্ট হবেনা। তার তখন একটা ভাল মোবাইল ফোন লাগবে, গহনা কিংবা শাড়ি লাগবে। আপনি তাকে স্যামসাং কিনে দিলে এক সময় তার মধ্যে আই-ফোনের চাহিদা তৈরি হবে। আই-ফোন পেলেও চাহিদা মিটবেনা, নতুন ভার্শন আসার সাথে সাথে তার ওটার প্রতি আকর্ষন তৈরি হয়ে যাবে! আপনি তাকে একটা শাড়ি দিন, তার পাশের বাসার ভাবির শাড়িটার প্রতি চাহিদা তৈরি হবে। এটা মানুষের সাধারণ এবং প্রাকৃতিক বিবর্তনজাত বৈশিষ্ট্য।

এই বৈশিষ্ট্য থাকার কারণেই, পুঁজিবাদ সাফল্যের সাথে টিকে আছে কালের পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এবং টিকে থাকবে। কারণ পুঁজিবাদ প্রতিনিয়ত কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করে চলে এবং মানুষের মধ্যে সেগুলোর প্রতি আকর্ষন তৈরি করে। অপরদিকে এই একই বৈশিষ্ট্যের কারণে অত্যন্ত মানবিক এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হবার পরও কমিউনিজম টিকে থাকতে ব্যর্থ হয়েছে। কমিউনিজম আসলে একটা ‘ইউটোপিয়া’ যা আসলে একটা অতিসুন্দর ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি আমাদের মনে তৈরি করে, যা কিনা আসলে স্বর্গের প্রতিরূপ! কিন্তু বাস্তবে যা সম্ভব নয় এই মর্ত্যলোকে। তাত্ত্বিক ভাবে যা অসাধারণ, প্রায়োগিক ভাবে যা অবাস্তব।

রাহুল সাংকৃত্যায়নের ‘কমিউনিজম ও ভাবিকাল’ নামে একটা বই আছে। এই বই এ তিনি কয়েক হাজার বছর পরের ভবিষ্যৎ পৃথিবী কল্পনা করেছেন, যেখানে সমগ্র পৃথিবীতে কমিউনিজম প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। তিনি সেই স্বল্পায়তনের রচনায় শিক্ষা, চিকিৎসা সহ প্রায় সকল কিছুর ‘সম্ভাব্য’ রূপ তুলে ধরেছেন। বইটা সুখপাঠ্য, ভবিষ্যৎ পৃথিবীর বর্ণনা পড়তে পড়তে, ইসলামে বর্ণিত বেহেশতের কথা মনে আসে। কিন্তু আদতে সেটা পৃথিবীতে সম্ভব কিনা সেটা নিয়ে সন্দেহ জাগে!

জর্জ অরওয়েলের বিখ্যাত একটা উপন্যাস আছে, যার নাম ‘অ্যানিমল ফার্ম’। উপন্যাসটা একটা পলিটিকাল স্যাটায়ার, লেখা হয়েছিল স্ট্যালিনকে উদ্দেশ্য করে। উপন্যাসে দেখা যায়, একটা ফার্ম হাউজের পশুদের মধ্যে ধীরে ধীরে স্বাধীনতার চেতনা জাগ্রত হয়, তারা যে মানুষের দ্বারা নিগৃহীত হচ্ছে- এই বোধ তাদের মধ্যে উদয় হয় এবং বিদ্রোহের চেতনা গড়ে ওঠে। একটা পর্যায়ে বিদ্রোহ করে তারা ফার্ম থেকে মানুষদের তাড়িয়ে দিয়ে, স্বাধীন ‘অ্যানিমল ফার্ম’ গড়ে তোলে। বিজয়ের প্রাথমিক পর্যায় কেটে যাওয়ার পরেই দেখা যায় নিজেদের মধ্যে কোন্দল, বিদ্রোহে নেতৃত্বদানকারী অংশটির ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠা। বলাই বাহুল, অরওয়েল পশুদের রূপকে মানুষের কাহিনীই তুলে এনেছেন।

মানুষের অসীম চাহিদার কারণেই আসলে কমিউনিজম টিকে থাকতে পারবেনা। তবে তাত্ত্বিক ভাবে এবং সাম্যবাদী মানুষের কাছে এর আবেদন সর্বদাই থাকবে, কারণ এই তত্ত্বটিই মানুষের সম-অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়। মানুষের জন্য কাজ করতে চাওয়া অধিকাংশ তরুণই তাই কমিউনিজমের প্রতি আকৃষ্ট হয়। কিন্তু তাত্ত্বিক ইউটোপিয়া, আর প্রায়োগিক বাস্তব এক নয়।

ইসলামে বর্ণিত বেহেশতে কমিউনিজম সৃষ্ট হতে পারে। সেখানে নাকি যা চাওয়া হবে, তাই পাওয়া যাবে। এমনকি, কোন ফল খেতে চাইলে গাছ থেকে পেড়ে খেতে হবেনা, সেই ফল নিজে থেকেই মুখের সামনে চলে আসবে! এমন কোন কল্পিত জগতে, যেখানে মানুষের কোন চাহিদাই অপূর্ণ থাকবেনা- সেটাকে এক রকম সাম্যবাদী অবস্থা বলা যেতে পারে! আমাদের অনেক প্রবীণ কমরেডরা হয়তো এই কারণেই ইদানীং বেশি বেশি ধর্ম কর্ম করছেন! ‘ইহকালে তো কমিউনিজম প্রতিষ্ঠা করতে পারলাম না, পরকালে একটা চেষ্টা নিয়ে দেখব’- এমনটাই মনে হয় তাদের ভাবনা!

তবে আমার ধারণা স্বর্গ বা বেহেশতেও চাহিদাপূর্ণ হওয়া মানুষের এমন কোন চাহিদা সৃষ্টি হবে যা স্বয়ং স্রষ্টাও পূরণ করতে পারবে না! এই মানুষ গুলো তখন নিজেরাই স্রষ্টার মত হতে চাইবে, স্রষ্টার বিরূদ্ধেই ঘোষণা করবে বিদ্রোহ!

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close