ঢাকা শহরের রাস্তাগুলোতে গত তিনদিন ধরে বাঁধিয়ে রাখার মতো কতগুলো দৃশ্য মঞ্চস্থ হয়েছে। সতেরো আঠারো বছরের কলেজপড়ুয়া কিছু ছেলেমেয়ে রাজপথে নেমে এসেছে ন্যায়বিচারের দাবীতে। একটা ঘাতক বাস তাদের দুই বন্ধুকে এক দুপুরে রাস্তায় পিষে মেরে ফেলেছিল। সেটা কোন দুর্ঘটনা ছিল না, ছিল একটা পরিকল্পিত হত্যা, ঠান্ডা মাথার খুন। সেই খুনের বিচারের দাবীতেই রাজপথে নেমেছে কিশোর ছাত্র-ছাত্রীরা। এই দেশ অনেকবার, অনেক আন্দোলনে তারুণ্যের শক্তি দেখেছে, এবার দেখছে কৈশোরের শক্তি।

এই চারটা দিন ধরে ঢাকা শহরের রাজপথে কলেজপড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীদের অন্যরকম একটা আন্দোলন দেখছি আমরা। এই আন্দোলন ‘জ্বালাও-পোড়াও’ এর আন্দোলন না, এই আন্দোলন মানুষ খুনের আন্দোলন না, ওরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে ‘অরাজকতা’ বা ‘নাশকতা’ সৃষ্টি করছে না। অসম্ভব সুশৃঙ্খল একটা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে তারা। গাড়ি ভাংচুর হয়েছে দুয়েকটা, কিন্ত প্রায় সবগুলোই ফিটনেসবিহীন বাস। কারো ব্যক্তিগত গাড়ির একটা কাঁচও ভাঙেনি এই ছেলেমেয়েরা। উল্টো বাস থেকে যাত্রীদের নামিয়ে দেয়ার আগে ছাত্ররা অনুরোধ করে বলেছে- “আপনারা নেমে যান প্লিজ, এই বাসের লাইসেন্স নেই, ফিটনেসে মেয়াদ নেই।” 

ছাত্র আন্দোলন, কলেজ ছাত্র, শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজ

কোলাটোরাল ড্যামেজ নামে একটা টার্ম আছে। যুদ্ধ-বিগ্রহে অল্প কিছু সাধারণ মানুষ মারা যাবেই। যেকোন আন্দোলনে ন্যুন্যতম কিছু ক্ষয়ক্ষতি হবে, কিছু ভাঙচুর হবে, দুয়েকটা গাড়ি পুড়বে, দুই-চারজন আহত হবেই। এটা আন্দোলনের খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। সেটাকেই আন্দোলনের কোলাটোরাল ড্যামেজ হিসেবে ধরা হয়। সেই হিসেবটা বাদ দিয়েই দেখুন, এমন শান্তিপূর্ণ আর বুদ্ধিদীপ্ত আন্দোলন নিকট অতীতে, বা স্বাধীন বাংলাদেশেই কে কবে দেখেছেন?

অনেকে দ্বিমত পোষণ করতে পারেন, তবুও বলছি, সতেরো-আঠারো বছর বয়েসী এই কিশোর ছেলেগুলো যে পরিপক্ক মানসিকতা আর দুর্দান্ত সৃজনশীলতার পরিচয় এই চারদিনে দিয়েছে, সেটা এককথায় অবিশ্বাস্য! খুনের বিচার চেয়ে রক্ত গরম করে রাস্তায় নেমে যাওয়া এই কিশোর ছেলেগুলোর মাথাভর্তি যে এমন দুর্দান্ত আইডিয়া থাকতে পারে, সেটা হয়তো কারও কল্পনাতেও ছিল না!

এই ছেলেমেয়েরা পুলিশের মার হজম করেছে, মেরে ওদের মাথা ফাটিয়ে দেয়া হয়েছে। নারায়ণগঞ্জে পরিবহন শ্রমিকেরা হামলা করেছে ওদের ওপর, যাত্রাবাড়ীতে আন্দোলনরত এক ছাত্রের ওপর পিকাপ ভ্যান তুলে দিয়েছে এক খুনে ড্রাইভার। কলেজ থেকে বারবার হুমকি দেয়া হচ্ছে টিসি দেয়ার, শিক্ষাজীবন ধ্বংস করে দেয়ার। তবুও ওরা থামেনি, থামার চিন্তাও করেনি। মার খেয়ে লুটিয়ে পড়ার বদলে উঠে দাঁড়িয়েছে আবার। যে পুলিশ ওদের মেরেছে, তাদের সামনে দাঁড়িয়েই বুক চিতিয়ে স্লোগান দিয়েছে- “আমার ভাইয়ের রক্ত লাল, পুলিশ কোন চ্যাটের বাল!” 

বাস দুর্ঘটনা, প্রতিবাদ, শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ

ভাষার ব্যবহার নিয়ে হয়তো কেউ আপত্তি করতেই পারেন। কিন্ত অন্যায়ভাবে মেরে যখন আপনার মাথা ফাটিয়ে দেয়া হবে, আপনাকে রক্তাক্ত করা হবে, তখন মুখ দিয়ে নিশ্চয়ই অমৃতবাণী বেরিয়ে আসবে না আপনার। ঢাকা শহরের আলাদা আলাদা জায়গায় এতগুলো কলেজের এত এত ছাত্রছাত্রী রাস্তা অবরোধ করেছে, কোথাও একজন নারীকে তাদের কেউ উত্যক্ত করেছে বলে খবর আসেনি। অথচ সোহরাওয়ার্দী রাজনৈতিক সভায় যোগ দিতে যাওয়া বীরপুঙ্গবেরা ঠিকই রিক্সায় বসে থাকা নারীদের গায়ে পানি ছুঁড়ে মারে, কলেজফেরত ছাত্রীকে হেনস্থা করে!

বাস আটকে ওরা ড্রাইভিং লাইসেন্স চেক করছে, যে কাজটা করার কথা ট্রাফিক পুলিশের। পুলিশ সেটা করে না কখনও, করলেও লেনদেনের বিনিময়ে ছেড়ে দেয়া হয় লাইসেন্স না থাকা চালকদের। এই ছেলেমেয়েরা সেটা করেনি। তারা যে বাসের চালকের কাছে লাইসেন্স খুঁজে পায়নি, সেটাকে আটকে দিয়েছে। এমনকি আর্মড পুলিশ আর পুলিশের গাড়ি আটকেও লাইসেন্স চেক করেছে তারা। মজার ব্যাপার কি জানেন? আর্মড পুলিশের সদস্যদের বহনকারী বাস কিংবা মোটরসাইকেলে চড়ে যাওয়া পুলিশ, কারো কাছেই লাইসেন্স ছিল না! স্প্রে মার্কার দিয়ে আনসার সদস্যদের বহনকারী গাড়িতে ছেলেরে বড় করে লিখে দিয়েছে- ‘লাইসেন্স নাই!’ 

ছাত্র আন্দোলন, কলেজ ছাত্র, শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজ

বাস ভাঙচুর করা হয়েছে রাস্তায়। ভাঙা কাঁচগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল রাস্তায়। কেউ যাতে এগুলোর কারণে অসুবিধায় না পড়েন, কেউ যাতে আহত না হন কোনভাবে, সেজন্যে ঝাড়ু নিয়ে এসে এসব কাঁচ পরিস্কার করে দিয়েছে ছেলেমেয়েরা! কুড়িয়ে এনে রেখেছে রাস্তার একপাশে। জীবনে কোনদিন শুনেছেন, প্রতিবাদী ছাত্ররা ভাংচুরের পরে রাস্তা পরিস্কার করে দিয়েছে? এই কিশোরেরা এখানেও অনন্য!

বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের গাড়ি আটকে দেয়া হয়েছে শাহবাগে। বেচারা মন্ত্রীমশাইয়ের ড্রাইভার উল্টোপথে গাড়ি ছুটিয়ে চলে যাচ্ছিলেন, ছাত্ররা তাকে প্রোটকলসহ আটকে দিয়ে বলেছে, আইন সবার জন্যে সমান! এরপর মন্ত্রীর গাড়ি ফিরে গেছে সঠিক লেনে। ধানমন্ডিতে তারা একটা রাস্তায় সব রিক্সাকে দুইমুখী আলাদা দুইটা লেনে ভাগ করে দিয়েছে। রিক্সায় এই রাস্তাটা পেরুতে আধঘন্টা থেকে একঘন্টা সময়ও লেগে যেতো, রিক্সার কোন আগামাথা থাকতো না। যে কাজটা বছরের পর বছর ধরে কোন ট্রাফিক পুলিশ করতে পারেনি, সেই সুন্দর দৃশ্যটার অবতারনা হয়েছে এই ছেলেমেয়েগুলোর কল্যাণে! 

ছাত্র আন্দোলন, কলেজ ছাত্র, শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজ

এই ছেলেমেয়েগুলোকে আমরা ‘আই এম জিপিএ ফাইভ’ জেনারেশন বলে ঠাট্টা করি। সেই পিচ্চি পিচ্চি কিশোর-কিশোরীরা তাদের সহপাঠীর খুনের বিচারের দাবীতে রাস্তায় নেমে এসেছে, ঢাকা শহরটা প্রায় অচল করে দিয়েছে সতেরো-আঠারো বছর বয়েসি এই ছেলেমেয়েরা! ওরা ব্যাংক লুট করেনি, দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা মেরে দেয়নি, কাউকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে দেয়নি। তবুও ওরা পুলিশি হামলার শিকার হচ্ছে, মেরে মাথা ফাটিয়ে দেয়া হচ্ছে ওদের, গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, ওদের গায়ে পিকাপ ভ্যান তুকে দেয়া হচ্ছে! এই হচ্ছে অন্যায়ের বিচার চাওয়ার পরিণাম!

পুলিশ মারে, শ্রমিকেরা মারে, শিক্ষাজীবন শেষ করে দেয়ার হুমকি দেয়া হয়। কিন্ত সত্যিটা কি জানেন? এসব মারে কাজ হয় না, পিটিয়ে আন্দোলন থামানো যায় না, দ্রোহের ছাইচাপা আগুন নেভানো যায় না কোনভাবেই। ওরা মার খাবে জেনেই পথে নেমেছে, নিজেদের কাছে তাদের অবস্থানটা একদম পরিস্কার, জলের মতোই স্বচ্ছ্ব। এই ছেলেগুলো হাসিমুখে পুলিশের ডান্ডার বাড়ি হজম করতে পারে, পুলিশের হাতে অন্যায়ভাবে আটক হওয়া সহপাঠীকে টেনে ছিনিয়ে নিয়ে আসতে পারে। এদের আপনি কিভাবে রুখবেন? স্কুল-কলেজ বন্ধ করে দিয়ে? ক্যাম্পাস থেকে বেরুতে না দিয়ে? পারবেন না, কোনভাবেই পারবেন না। 

কেন পারবেন না জানেন? কারণ এই ছেলেগুলো সৎ। ওরা একটা ন্যায্য দাবী নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়েছে। আর আপনারা অন্যায়ভাবে ওদের দাবী পূরণ না করেই রাস্তা থেকে হঠিয়ে দিতে চাইছেন। ওরাই সঠিক, আপনারা ভুল। বঙ্গবন্ধু সাতচল্লিশ বছর আগে বলেছিলেন- ‘দাবায়ে রাখতে পারবা না!’ এই ছেলেগুলোকেও দাবায়ে রাখা যাবে না। কয়জনকে মারবেন? কয়জনকে রক্তাক্ত করবেন? কয়জনকে গ্রেফতার করবেন, টিসি দেবেন? 

ছাত্র আন্দোলন, কলেজ ছাত্র, শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজ

পাঁচজনকে মেরে মাথা ফাটিয়ে দিলে আরও পাঁচশোজন দাঁড়িয়ে যাবে। একজনকে গাড়ির নিচে চাপা দিলে আরও এক হাজার ছেলেমেয়ে রাস্তায় জড়ো হবে। গতকাল পর্যন্ত ঢাকা শহরের কলেজ ছাত্ররা নেমেছিল পথে, আজ তো এই আন্দোলনটা সারাদেশেই ছড়িয়ে পড়ছে, পড়েছে। ওদের আপনারা কি করে ঠেকাবেন বলুন? সেই শক্তি তো আপনাদের নেই। হবেও না কোনদিন। 

কলেজপড়ুয়া এই দুরন্ত সাহসী ছেলেমেয়েগুলোকে দেখে অন্যরকম স্বপ্নে বুক বাঁধতে ইচ্ছে হয়। এই যে সাদা বা নীল ইউনিফর্ম পরা ছেলেমেয়েরা রাস্তাজুড়ে অবস্থান নিয়েছে, এই দৃশ্যটা দেখলেই মনটা কেমন ভরে ওঠে! কয়েক বছর আগে এমন ইউনিফর্ম আমাদের গায়েও ছিল। এরকম কিছু করার সুযোগ আমরা পাইনি, ওরা পেয়েছে, সেটা দারুণভাবে ব্যবহারও করছে। ওদের এই প্রতিবাদী ভাবমূর্তিটা দেশ বদলে দেবে, সমাজ বদলে দেবে, এই সমাজের ভ্রান্ত রীতিনীতিগুলোকে বদলে দেবে চিরতরে। নিরাপদ সড়কের দাবীতে ওদের এই আন্দোলনটা মাইলফলক হয়ে থাকবে, এটা তো নিশ্চিত। অনুজদের এমন কীর্তিতে গর্বে বুকটা ভরে ওঠে আমাদের। 

আরও পড়ুন- 

Comments
Spread the love