কফি- নামটা শুনলেই মনটা চনমন করে উঠে! সকালে ঘুম থেকে উঠে বা সারাদিনের ব্যাস্ততার ফাঁকে এক কাপ কফি আমাদের একদম চাঙা করে তুলে! এই কফি জিনিসটা নিয়ে যতসব মজার ও অদ্ভুত কিছু তথ্য আজ আপনাদের সামনে তুলে ধরছি!

আবিষ্কার:

কফি আবিষ্কারের গল্পটা বেশ মজার। নবম শতকের দিকে ইথিওপিয়ার একদল ছাগল পালক লক্ষ করেন- কফির বীজ খেয়ে তাদের ছাগল গুলো পাগলের মত নাচানাচি করছে! আসলে এটা ছিলো কফির ক্যাফেইনের প্রভাব। তারপর লোকাল এক পুরোহিত কফির বীজ থেকে প্রথম পানীয় তৈরী করেন এবং আবিষ্কার করেন- এটা পান করলে রাত জাগা যায়! এভাবেই শুরু হয় পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় পানীয় গুলোর একট কফির শুরু!

দুনিয়ায় যত কফিখোর!

শুনতে অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি- সারা দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশি বেচাকেনা হওয়া দ্বিতীয় দ্রব্যটি হলো কফি! প্রথমটি- তেল! আর গড়পড়তা হিসেবে সবচেয়ে বেশি কফিখোরের দেশ হলো- ফিনল্যান্ড! প্রতিজন পূর্ণ বয়স্ক ফিনিশ গড়ে দৈনিক ৪-৫কাপ কফি খায়। কিন্তু মোট হিসেব করলে আমেরিকান দের ধারে কাছে কেউ নেই! প্রতিদিন ৪০০ মিলিয়ন বা ৪০ কোটি কাপ কফি খাওয়া হয় যেটা বছর শেষে গিয়ে দাঁড়ায়
১৪৬ বিলিয়ন কাপ কফিতে! সারা দুনিয়ায় হিসেব করলে সেটা ৫০০ বিলিয়ন কাপের চেয়ে বেশি! আর আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরের মানুষেরা কফিতে একটু বেশিই আসক্ত, বাকি দুনিয়ার চেয়ে গড়ে সাত গুন বেশি কফি খাওয়া হয় সেখানে। যদিও এই আঠার শতকের আগে জিনিসটা তেমন জনপ্রিয়ই ছিলো না!

কারা বানায় এই কফি?

দুনিয়ায় ৫০ টা দেশে কফি উৎপন্ন হয়, প্রায় ৫কোটি মানুষ সরাসরি কফি চাষের সাথে জড়িত! আর মোট উৎপন্ন কফির ৪০% ই উৎপন্ন হয় ব্রাজিলে! তারপর আছে কলম্বিয়া ও ভিয়েতনাম।
যদিও কফি পান করায় আমেরিকা এক নাম্বার, কিন্তু তাদের একটা রাজ্যেই কফি বাণিজ্যিক ভাবে উৎপন্ন হয়- হাওয়াই। আর সেখানে উৎপাদিত “Kona” কফি খুব বিখ্যাত কারণ হাওয়াই এর আবহাওয়া কফি চাষের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট!

কফি, পানীয়, ক্যাফেইন, দামী কফি

কফির যত প্রকারভেদ:

সারাদুনিয়ায় যত কফি উৎপাদিত হয় তারা মোটা দাগে দুই প্রকার- এ্যারাবিকা আর রোবুস্টা। ৭০% কফিই এ্যারাবিকা। রোবুস্টা ততটা জনপ্রিয় না, এটা বেশি তিতকুটে আর ক্যাফেইনের পরিমাণ দ্বিগুন!

জনপ্রিয় “এসপ্রেসো” কফি তৈরী হয় ফুটন্ত পানি কফির গুঁড়োর ভিতর দিয়ে চালনা করে। “এসপ্রেসো” শব্দের অর্থ আক্ষরিক ভাবেই “জোর করে কিছু বের করে দেওয়া!” সাধারণ কফির তূলনার প্রতি একক ঘনত্বে ক্যাফেইন প্রায় তিন গুন বেশি থাকে এসপ্রেসো কফিতে!

উলটো দিকে “ডিক্যাফ” বলতে বুঝায় ক্যাফেইন মুক্ত কফি। যদিও ক্যাফেন একদম নিষ্কাশন করা যায় না। কিছু রয়েই যায়। মজার ব্যাপার হলো, বেশি রোস্ট করে বানানো “ডার্ক” কফির ঘ্রাণ সাধারণ কফির চেয়ে তীব্র হলেও তাতে ক্যাফেইন আসলে কম থাকে। কিছু ক্যাফেইন উড়ে যায় রোস্ট করার সময়!

নিষিদ্ধ পানীয় কফি!

ইতিহাসে এখন পর্যন্ত ৫বার কফি নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো। প্রথমে ১৫১১ সালে মক্কায়, অভিযোগ- কফি খেলে মাথায় উলটাপালটা ভাবনা আসবে। তারপর ষোড়শ শতকে রোমের ধর্মীয় নেতারাও কফি নিষিদ্ধ করে কারণ তাদের বিশ্বাস ছিলো এই পানীয় “স্যাটানিক”! তবে পোপ সপ্তম ক্লেমেন্ট কফি এত ভালো বাসতেন যে- তিনি এই ণিষেধাজ্ঞ উঠিয়ে দেন। কিন্তু অটোমান সম্রাট চতুর্থ মুরাদ কফি শুধু নিষিদ্ধই করলেন না, ইতিহাসে প্রথম কফি খাওয়ার অপরাধে শাস্তির বিধান দিলেন- প্রহার থেকে শুরু করে সমুদ্রে নিক্ষেপ পর্যন্ত!

১৭৪৬ সালে সুইডিশ সরকার কফি তো বটেই, কফি খাওয়ার জিনিসপত্রও নিষিদ্ধ ঘোষনা করে। আর সর্বশেষ প্রুশিয়ার রাজা ফেড্রিক দা গ্রেট ১৭৭৭ সালে কফি নিষিদ্ধ করেন কারণ তিনি ভয় পাচ্ছিলেন তাদের নিজের পানীয় বিয়ার থেকে না কফির জনপ্রিয়তা বেশি হয়ে যায়!

সবচেয়ে দামী কফি!

সবচেয়ে দামী যে কফি তার প্রতি আউন্স বীজের দাম ৬০০ ডলার! আর এটার প্রসেসিং খুব সুন্দর- সুমাত্রান জংলি বিড়ালকে কফির বীজ খাওয়ানো হয়। বীজ গুলো হজম না হয়ে বিড়ালের বিষ্ঠার সাথে বেরিয়ে আসে আংশিক ফর্মেন্টেড হয়ে। এই কফিই সেখান থেকে উদ্ধার করে তৈরী হয় দুনিয়ার সবচেয়ে দামী কফি- “Kopi Luwak”! কফি খাবার তৃষ্ণা বেড়ে গেছে না?

কফি, পানীয়, ক্যাফেইন, দামী কফি

কফি ও দুধ:

কফির সাথে যদি ক্রিম মেশানো হয় তাহলে সেটা ব্ল্যাক কফির চেয়ে ২০% কম গতিতে শীতল হয়। কিন্তু কফিতে যদি দুধ মেশানো হয় তাহলে সেটা ক্যাফেইনের প্রভাব অনেকটাই কমিয়ে দেয়!

কফির ওভারডোজ!

হ্যা, আর সব নেশা দ্রব্যের মত কফির ক্যাফেইনেরও ওভারডোজ আছে। কাউকে কফি খাইয়ে মেরে ফেলার জন্য মোটামুটি ১০০ কাপ কফি টানা খাওয়াতে হবে!

সবচেয়ে বড় কফি কাপ!

২০১৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় একবারে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ কফি বানানো হয়েছিলো- ৩৭০০ গ্যালন ছিলো সেটার পরিমাণ! আর আইস কফির রেকর্ড লাস ভেগাসের- আইস ছাড়াই ১৫০০ গ্যালন কফি একবারে, ২০১০ সালে।

কফি সারায় রোগ!

বৃদ্ধদের “আলঝেইমার” রোগের বিরুদ্ধে ক্যাফেইনের পজিটিভ ইফেক্ট পাওয়া গেছে। এছাড়া টাইপ ২ ডায়াবেটিস এবং পারকিনসন রোগ প্রতিরোধে কফি উপকারি। পুরুষদের প্রোস্টেট এবং নারীদের স্কিন ক্যানসার নিয়মিত কফি পানে ঝুঁকি কমায় বলে প্রমাণ মিলেছে!

দিন শেষে, ক্লান্তি দূর করতে, শরীর মন চাঙ্গা করতে এক কাপ গরম কফির কোন বিকল্প নেই। এটার ঘ্রাণই যথেষ্ট একটা মানুষকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলতে! কফির আবেদন কত সেটা জানতে এই তথ্যটাই যথেষ্ট- আমেরিকায় এমনকি একজন সাধারণ কর্মী পর্যন্ত বছরে হাজার ডলারের উপর ব্যায় করে শুধু কফির পিছনেই!

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-