টেকি দুনিয়ার টুকিটাকি

ক্লোন আইফোন কিনবেন নাকি?

যুগটা স্মার্টফোনের। মানুষের হাতে হাতে এখন নানা ব্র‍্যান্ডের স্মার্টফোন, সেগুলোর হরেক রকম ফিচার। পাঁচ-সাত হাজার টাকা থেকে শুরু করে লক্ষাধিক টাকা দামের স্মার্টফোনও বাজারে অ্যাভেইলেবল এখন, যে যার সামর্থ্য আর পছন্দ অনুযায়ী মোবাইল কিনছে, ব্যবহার করছে। তবে স্মার্টফোনের স্মার্টফোন দিয়েই এই যুগে মানুষকে স্মার্টভাবে বোকা বানানোর রাস্তা বেছে নিয়েছে অনেকে। নামীদামী ব্র‍্যান্ডগুলোর ক্লোন বা কপি মোবাইলে এখন বাজার ভরে গেছে। এক শ্রেনীর অসাধু ব্যবসায়ী আইফোন বা স্যামসাং- এর মতো বিখ্যাত ব্র‍্যান্ডগুলোর লেটেস্ট মোবাইলের কপি ভার্সন বানিয়ে বাজারে ছাড়ছে, ক্রেতাদের বোকা বানিয়ে লুটে নিচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা।

ভাবুন তো, এক লাখ টাকা দামের আইফোন যদি কাউকে চার-পাঁচ হাজার টাকায় বিক্রি করতে দেখেন আপনি, নিশ্চয়ই আগ্রহী হবেন সেটার ব্যাপারে। শিক্ষিত মানুষ হয়ে থাকলে আপনার বুঝে যাওয়ার কথা, পাঁচ হাজার টাকায় যে আইফোন বিক্রি হয়, সেটা কোন জাতের জিনিস হবে না। তবুও আগ্রহটা হয়তো থেকেই যাবে, কি আছে পাঁচ হাজার টাকার এই আইফোনে? যে মানুষগুলো প্রযুক্তি সম্পর্কে তেমন কোন জ্ঞান রাখে না, মোবাইলের আগামাথা ঠিকমতো বোঝে না, তাদের নয়-ছয় বুঝ দিয়ে এরকম কিছু একটা গছিয়ে দেয়া তো খুবই সহজ, তাই না? এবং ঠিক এই ঘটনাটাই ঘটছে অহরহ। 

একদম হুবহু অরিজিনাল মোবাইলের মতো দেখতে এই কপি মোবাইলগুলোকে ডাকা হয় ক্লোন, কপি, সুপার কপি, মাস্টার কপি বা কোরিয়ান কপি, ইত্যাদি গালভরা নামে। যে নামেই ডাকা হোক না কেন, এদের কাজ একটাই, ক্রেতার মাথার চুল অর্ধেক করে দেয়া। চার-পাঁচ হাজার থেকে শুরু হয়ে একটু ভালো কোয়ালিটির কপি হলে এই মোবাইলগুলোর দাম হতে পারে আট-দশ হাজার টাকা পর্যন্ত। কিন্ত কাজে উনিশ-বিশ পার্থক্য এদের। অনেকেই হয়তো আইফোন বা স্যামসাঙের দামী মোবাইলগুলো, যেমন এস-এইট, এস-নাইন বা নোট নাইন কেনার সামর্থ্য না থাকায় এসব মোবাইল কেনার দিকে ঝুঁকে যান, কিন্ত বোকা মানুষগুলো এটা জানেন না যে, খাল কেটে কুমির আনতে যাচ্ছেন তারা।

এক লক্ষ টাকা আর চার-পাঁচ হাজার টাকার মধ্যে যতটা না পার্থক্য, আসল আইফোন বা স্যামসাঙের মোবাইলগুলোর সাথে এই কপি বা ক্লোন মোবাইলগুলোর পার্থক্য এরচেয়েও বেশি। একটা ব্যাপারেই শুধু মিল আছে, অরিজিনাল আইফোন আর ক্লোন আইফোনের বাহ্যিক গড়নে একচুলও পার্থক্য নেই। বরং কখনও কখনও কপি আইফোনকেই বেশি চকচকে মনে হতে পারে। আইফোনে যেমন ডুয়াল ক্যামেরা থাকে, এসব ক্লোন ফোনেও ডুয়াল ক্যামেরার ডিজাইন করা থাকে, তবে এরমধ্যে একটি ক্যামেরা বাম্প একেবারেই ফেক। আইফোন এক্স-এ অডিও আউটপুটের ব্যবস্থা রাখা হয়নি, তাই ক্লোন আইফোনগুলোতেও অডিও পোর্ট নেই! একদম শতভাগ অনুকরণ যাকে বলে আরকি। তবে পুরো ব্যাপারটা বাইরে ফিটফাট, ভেতরে সদরঘাটের মতোই। কিংবা সদরঘাটের চেয়েও খারাপ অবস্থা এসব ক্লোন বা কপি মোবাইলের ভেতরে। 

মোবাইল ওপেন করার সাথে সাথেই পার্থক্যটা চোখে পড়বে যে কারো। জীবনে একবার হলেও আইফোনের যে কোন একটা ভার্সন দেখেছেন, এমন কেউ ক্লোন আইফোনের ডিসপ্লেটা দেখলেই বুঝে যাবেন যে এখানে কোন না কোন ঘাপলা আছে। আইফোনের বিখ্যাত রেটিনা ডিসপ্লে’র জায়গায় ক্লোন মোবাইলে ব্যবহার করা হয় একদমই নীচু মানের টিএফটি ডিসপ্লে, যেটার স্ক্রীন রেজুলেশন মেরেকেটে এইচডি পর্যন্ত যেতে পারে।

পারফরম্যান্সের কথা কিছু না বলাই ভালো। ৫১২ মেগাবাইট থেকে বড়জোড় এক গিগাবাইট পর্যন্ত র‍্যাম দেয়া হয় এসব মোবাইলে, স্টোরেজ দেয়া হয় আট বা ষোল গিগাবাইট পর্যন্ত। সেখানে আবার আইফোনের সাথে মিল রেখে বাড়তি মেমোরি কার্ড ব্যবহারের সুযোগও রাখা হয় না! আইফোনের আইওএস অপারেটিং সিস্টেমের জায়গায় এসব মোবাইলে মিলবে সাধারণ অ্যান্ড্রয়েড ফিচার। আইফোনের ভেতরে গুগল প্লে-স্টোর দেখার মতো বিরল সৌভাগ্যবান হতে চাইলে একটা ক্লোন আইফোন কিনে দেখতেই পারেন যে কেউ। 

আইফোনের ক্যামেরার সুনাম দিগ্বিজোড়া। তবে এসব ক্লোন আইফোন বা অন্য ক্লোন মোবাইলগুলোর ক্যামেরা মানেই ডিজাস্টার। বন্ধুবান্ধবের আড্ডায় এসব ক্লোন আইফোন দেখিয়ে ভাব নেয়া যায় ঠিকই, তবে সেই আইফোন দিয়ে সেলফি তুলতে গেলেই হাসির পাত্র হতে হবে। বাদবাকী পারফরম্যান্সের কথা বলে আর কি লাভ! একটা অ্যাপ ওপেন হতেই কয়েক ঘন্টা কেটে যাবে, ফেসবুকে ঢুকলে কয়েকশো বার হ্যাং করবে মোবাইল। আর একসঙ্গে দুটো অ্যাপ ওপেন করার কথা স্বপ্নেও ভাববেন না এই কাজ করতে গেলে মোবাইল রি-স্টার্ট মেরে ঠিক করতে হবে! আর ব্যাটারি খরচ হবে পানির মতো, দিনে চার-পাঁঁচবার চার্জ দিয়েও কুলানো যাবে না, এমনই অবস্থা!

ত্রিশ-চল্লিশ হাজার টাকার মোবাইলের জায়গায় উল্টোপাল্টা বুঝিয়ে ক্রেতাকে এসব ক্লোন মোবাইল গছিয়ে দেয়ার অনেক নজির আছে, আছে এমন অনেক অভিযোগ। আইইএমইআই নম্বর চেক করে কেনার সুযোগটা থাকে না সেখানে, আবার অনেকে হয়তো এতসব হটিলতা বোঝেনও না। আবার এই ক্লোন আইফোনগুলো অনেকে আবার অনলাইনে বিক্রি করে, তারা সেখানে উল্লেখ করেই দেয় যে এগুলো ক্লোন বা কপি মোবাইল। তবে ক্লোন মোবাইল নিয়ে আমাদের দেশের মানুষের ধারণাটা খুব বেশি স্পষ্ট নয়, তাই অনেকে হয়তো না বুঝেই চার-পাঁচ হাজার টাকায় আইফোনের মতো দেখতে চকচকে একটা মোবাইল হাতে পাবার লোভে এগুলো কিনে ফেলেন। কিন্ত পরে ভুল বুঝতে পারলেও টাকাটা ফেরত পাবার কোন উপায় থাকে না। বিক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারাও আর সাড়া দেন না। এভাবেই নয়ছয় বুঝ দিয়ে চলছে ব্যাবসা। 

স্মার্টফোন আমরা কেন কিনি? ইন্টারনেট ব্রাউজ করবো বলে, ফেসবুক/হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করবো বলে, গান শোনা, ছবি দেখা বা অন্যান্য দরকারী কাজগুলো করবে বলে তাই না? কেউ কেউ আবার গেম খেলার জন্যেও মোবাইল কেনেন, আবার কারো স্মার্টফোন কেনার পেছনে ফটোগ্রাফিও একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্ত এসব ক্লোন মোবাইলে নিত্যনৈমিত্যিক কাজকর্ম করার কথা ভুলেই যান একেবারে। যদি আপনার কাজ হয় শুধু ফোনে কথা বলা, আর মাঝেমধ্যে পকেট থেকে আইফোনটা বের করে একটু ভাব নেয়া, আর সময় দেখা, তাহলে এই ক্লোন মোবাইলগুলো আপনি নিতেই পারেন। এর বাইরে অন্য কিছু করতে চাইলে ক্লোন মোবাইল কেনা মানে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারা ছাড়া আর কিছুই নয়।

এখন পছন্দ ক্রেতার হাতে। আপনার পকেটে পাঁচ-সাত হাজার টাকা আছে, আপনি এই দামের ভেতরে একটা স্মার্টফোন কিনতে চান, ভালো কথা। সিম্ফোনি, ওয়ালটন বা আরও অনেকেই আছে, যারা ছয়-সাত হাজার টাকার মধ্যে মোটামুটি মানের স্মার্টফোন বাজারে এনেছে। বাজেট আরেকটু বাড়ালে হয়তো শাওমি/হুয়াওয়ের মতো ভালো ব্র‍্যান্ডের মোবাইলই আপনি কিনতে পারবেন। তাহলে কেন পাঁচ-সাত হাজার টাকায় এসব ক্লোন বা কপি মোবাইল কিনে নিজের কষ্টার্জিত টাকাটা পানিতে ফেলবেন, কেন সেধে সেধে প্রতারিত হবেন?

তথ্যাসূত্র কৃতজ্ঞতা- অ্যান্ড্রয়েড টোটো কোম্পানী, টেকটিউনস।

আরও পড়ুন- 

Comments

Tags

Related Articles