আপনি-ই সাংবাদিকইনসাইড বাংলাদেশ

জলবায়ু পরিবর্তনের দায় আপনারও!

পৃথিবীতে সমস্যা কত রকমের তা গুণতে শুরু করলে হয়তো সংখ্যাটা আশ্চর্য রকম বেপরোয়া হয়ে উঠবে। কিন্তু এক সমস্যাতে এসে সব দেশ একই কাতারে দাঁড়াবে আর তা হল পরিবেশ দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন। সাধারণ শিক্ষা নেওয়া একজন মানুষ মাত্রই সহজে বলতে পারবে পরিবেশ কি, কেন দূষিত হচ্ছে আমাদের চারপাশের পরিবেশ আর কিভাবেই বা পরিবেশ বাঁচানোর জন্য পদক্ষেপ নেওয়া যায়। অথচ পেছন ফিরে তাকালেই খুব স্পষ্টভাবে বোঝা যাবে যে আমাদের আশেপাশের দূষণ বাড়ছে বৈ কমছে না। আপনি যত ক্ষমতাধর কেউ হন না কেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সত্যতা স্বীকার করতে আপনি বাধ্য।

আপনি নিজের বাসার ডাইনিং টেবিলে বসে গরুর মাংস চিবুতে চিবুতে বলতেই পারেন, ‘এই যে এত ফ্যাক্টরি দেশে, লিটার লিটার ময়লা পানি রোজ খালে-বিলে, নদীতে ছেড়ে দিচ্ছে, এভাবেই তো হচ্ছে পানি দূষণ। আর এই যে এত এত কল-কারখানা, দিন নেই রাত নেই কার্বন ডাই অক্সাইড ছেড়েই যাচ্ছে চিমনি দিয়ে, এভাবেই তো হচ্ছে বায়ুদূষণ। আর রাস্তায় বের হলেই চারদিকের হর্নে কানে তালা লেগে যায়, সেইদিনের শিশুটিও বোঝে শব্দ দূষণ এভাবেই শহরটার প্রাণশক্তি নিয়ে নিচ্ছে ক্রমশ।‘ এই আপনাকে আমি যদি বলি, জলবায়ু পরিবর্তনের দায় আপনারও, ক্ষেপে গিয়ে তেড়ে আসবেন বুঝি? ক্ষেপুন, তাতে সত্য বদলাবে না।

জাতিসংঘের ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন (এফএও) কর্তৃক ২০০৬ সালের প্রকাশিত প্রতিবেদন ‘লাইভস্টকস লং শ্যাডো’ তে লেখা হয়েছে, ‘প্রাণিসম্পদ ক্ষেত্রটি অনেকগুলি বাস্তুতন্ত্র এবং সামগ্রিকভাবে আমাদের পৃথিবীর জন্য একটি উদ্বেগের কারণ। বিশ্বব্যাপী এটি গ্রিনহাউজ গ্যাসের (জিএইচজি) বৃহত্তম উৎস এবং জীব বৈচিত্র্য হ্রাসের প্রধান কারণগুলির মধ্যে একটি; উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলিতে এটি সম্ভবত পানি দূষণের অন্যতম প্রধান উৎস।’

চমকে উঠলেন? পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের আপনি হয়তো নেতাগোছের কেউ। সবসময় দোষারোপ করে এসেছেন দেশের ক্রমবর্ধমান শিল্পায়নকে, দেশের হর্তা কর্তার এই ব্যাপারে উদাসীনতাকে। এবার সময় হয়েছে যার যার জায়গা থেকে পরিবেশকে সত্যিকার অর্থে বাঁচিয়ে তোলার, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণগুলি চিহ্নিত করে সেগুলো বয়কট করবার। কারণ পরিবেশের হয়তো তেমন কিছুই এসে যায় না, কিন্তু দূষিত পরিবেশে আমার আপনার টিকে থাকাটা বাস্তবিক অর্থেই অসম্ভব।

কিছুটা সংখ্যাগত ধারণা নেওয়া যাক। প্রতি কিলোগ্রাম গরুর মাংস উৎপাদনে, জমির প্রয়োজন হয় মুরগি উৎপাদনের চাইতে ছয়গুণ এবং পানির প্রয়োজন হয় প্রায় দ্বিগুণ। বন ক্ষয়ের কারণগুলির মধ্যে মাংস শিল্প এককভাবে আধিপত্য ধরে রেখেছে, বিশেষ করে দক্ষিণ আমেরিকাতে। খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করা না হলে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে ২০৫০ সাল নাগাদ কৃষিখাতে উৎপাদন বিশ্বব্যাপী বাড়াতে হবে ৭০% এবং উন্নয়নশীল দেশে তা বাড়াতে হবে দ্বিগুণ। এই “খাদ্য ফাঁক” (ফুড গ্যাপ) বন্ধ করতে প্রয়োজন খাদ্যতালিকাতে মাংসের বিকল্প হিসেবে পরিবেশগত দিক থেকে কম ক্ষতিকারক কোন খাদ্য বেছে নেওয়া।

পশ্চিমা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, অগুণিত ঝর্ণা এবং নদীতীরস্থ বাসস্থান পশুদের চারণভূমি দ্বারা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। এর ফলে পরিবেশে ফসফেট, নাইট্রেটসের পরিমাণ বৃদ্ধি, দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়া, বর্ধিত তাপমাত্রা, অস্বচ্ছতা এবং ইউট্রোফিকেশনের (কোন জলাশয়ে খনিজ ও উদ্ভিদের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া যা দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কমিয়ে দেয়) মত ঘটনাগুলি বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং প্রজাতির বৈচিত্র্য হ্রাস পাচ্ছে। জলাশয়ের সুরক্ষার জন্য প্রাণিসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিকল্প হিসেবে যেসকল পদ্ধতি চিন্তা করেছে তার মধ্যে রয়েছে লবণ এবং খনিজের স্থানান্তর, বিকল্প পানির উৎসের ব্যবহার, ঝর্না এবং নদীর কিনারে বেড়া দেওয়ার ব্যবস্থা করা ইত্যাদি। পূর্ব আমেরিকাতে দেখা গেছে, শুকরের খামার থেকে যে বর্জ্য নির্গমন হয় তা মিসিসিপি নদী এবং আটলান্টিক মহাসাগরসহ প্রচুর জলাশয়ের ইউট্রোফিকেশনের কারণ। সার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে তা পানিবাহিত ঝুঁকি কমাতে অনেকটাই সাহায্য করতে পারে।

এখন প্রশ্ন আসতেই পারে, উন্নত বিশ্বের সাথে কি আর আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশের তুলনা চলে? উত্তরটা দেওয়ার আগে আরো কিছু তথ্য জানিয়ে দি। বাংলাদেশে গরু এবং মুরগির মোট সংখ্যা যথাক্রমে ২৪ মিলিয়ন এবং ১ মিলিয়ন। তাদের মধ্যে, ২ মিলিয়ন উন্নত প্রজাতির গরু (সুত্রঃ লাইভস্টক ডিরেক্টরি, ১৯৯২-৯৩)। জিডিপিতে প্রাণিসম্পদের অবদান প্রায় ৬.৫%। বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ২০% মানুষের আয় সরাসরি বা পরোক্ষভাবে গৃহপালিত পশুর সাথে জড়িত। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার ৯% আসে গবাদি পশুর চামড়া রপ্তানির মাধ্যমে। গবাদি পশু ৮০ মিলিয়ন টন গোবর সরবরাহ করে যা প্রতি বছর কৃষিকাজে ব্যবহার করা মোট সারের প্রায় ১০%। তাই চাইলেও বাংলাদেশের উন্নয়নে গবাদি পশুর ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই।

খাদ্যাভ্যাসে মাংসের বিকল্প শুধু যে জলবায়ু পরিবর্তন নিরসনের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ তা নয়, খাদ্য, তন্তু, জ্বালানির ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানোর জন্যও মাংসের বিকল্প ভাবা দরকার। জমির পরিমাণ বাড়ছে না কিন্তু পৃথিবীর জনসংখ্যা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে; কৃষিখাতে এর প্রভাব স্থুলভাবে উপলব্ধি করা যাচ্ছে। বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখন তাই মাংসের বিকল্প হিসেবে উদ্ভিজ্জ খাবার বেছে নেওয়াতেই পরিবেশ এবং স্বাস্থ্য দুই-ই রক্ষা করা সম্ভব।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close