‘চলিতেছে, শাপলা টকিজে চলিতেছে… সুপারস্টার নায়ক মান্না অভিনীত আম্মাজান, আম্মাজান, আম্মাজান’। অন্তত শহরের আমরা সবাই মাইকে প্রচারিত এমন বাংলা চলচ্চিত্রের এমন বিজ্ঞাপন শুনতে পাই। একদম ছোটবেলায় একবার খটকা লেগেছিল টকিজ আবার কি! আমাদের রংপুর শহরেই তিনটে টকিজ ছিল, ‘শাপলা টকিজ’ ‘লক্ষ্মী টকিজ’ আর ‘নূরমহল টকিজ’। সিনেমা হলের নামগুলো এরকম টকিজ হয়ে গেল কিভাবে?

সিনেমার শুরুটা নির্বাক ছিল এ কথা আমরা সবাই মোটামুটি জানি। তবে সিনেমা হলগুলোও যে শব্দহীন ছিল তেমন কিন্তু না। প্রায় সমস্ত বড় বড় সিনেমা হলে অর্কেস্ট্রা’র দল ছিল। ছোটখাট হলগুলোতে থাকত নিদেনপক্ষে একটা পিয়ানো। মানুষ ভালই মানিয়ে নিয়েছিল সিনেমার এই ঘরানার সাথে। চার্লি চ্যাপলিনের মত পরিচালক সেসময় এমন সিনেমা বানালেন যা ১০০ বছর পর এসেও মানুষ একই উৎসাহ নিয়ে দেখছে। যাই হোক, অনেক ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে একটা চমকপ্রদ পরিবর্তন এলো সিনেমার জগতে। সেটা ১৯২৭ সালের অক্টোবর মাসের কথা।

‘দ্য জ্যাজ সিঙ্গার’ নামের একটা সিনেমা নিয়ে এলো ওয়ার্নার ব্রাদার্স সিনেমা স্টুডিও। এই ছবির মূল বিশেষত্ব হলো এটি একটি সবাক সিনেমা। সিনেমার নায়ক-নায়িকা এখানে কথা বলে , সেই কথা দর্শকেরা শুনতে পায়। দর্শকেরা হুমড়ি খেয়ে পড়ল দ্য জ্যাজ সিঙ্গার দেখার জন্য। এরপর থেকে নির্বাক সিনেমার উপর থেকে একটা বড় অংশের দর্শক আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে লাগল। সুতরাং নির্মাতারাও নির্বাক যুগ থেকে সবাক যুগে পদার্পণ করলেন। খুব অল্প সময়ে ঘটে যাওয়া এই ‘ব্রেক থ্রু’ কিন্তু অনেকেই সানন্দ্যে গ্রহণ করতে পারেন নি। অনেক স্টুডিও থেকে ধারণা করা হয়েছিল এই শব্দের ক্যাচক্যাচানি ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু তারা যে ভুল ছিল এটা এখন-এইসময়ে বসে আমরা সহজেই বলে দিতে পারি।

ওয়ার্নার ব্রাদার্স ভিটাফোন নামের সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করে দ্য জ্যাজ সিঙ্গার সিনেমাটি প্রচার করছিল। সিনেমাটি আন্তর্জাতিকভাবে তিন মিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করে যেটা সেসময়ের অন্যতম সর্বোচ্চ। মূলত দ্য জ্যাজ সিঙ্গার সিনেমাটি হলে আসামাত্র সিনেমার আরেকটি নাম হয়, আর সেটা হল টকি (Talkie)। শব্দযুক্ত, সবাক এই ঘরানার সিনেমাগুলোর নাম হয়ে যায় টকিজ (Talkies)।

সবাক সিনেমাতে সাউন্ড রেকর্ডের ক্ষেত্রে ছিল নানা সীমাবদ্ধতা। সেসময়ের মাইক্রোফোনগুলো কেবলমাত্র অল্প দূরত্বের শব্দ গ্রহণ করতে পারত। অভিনেতা-অভিনেত্রীদের তাই মাইক্রোফোনের একদম কাছাকাছি দাঁড়িয়ে সংলাপ আওড়াতে হতো। এমনকি নড়াচড়াও প্রায় বন্ধ। সাউন্ড রেকর্ডিংয়ের সীমাবদ্ধতা কাটাতে ক্যামেরারও নড়াচড়া সীমাবদ্ধ হয়ে গেল। একই জায়গায় দাঁড়িয়ে কলাকুশলীরা সংলাপ বলে যাচ্ছে, গান গাচ্ছে। সিনেমা যেন গল্পের প্রয়োজন নাই, কেবল প্রয়োজন আছে শব্দের, কথার। শব্দের প্রতি দর্শক আর নির্মাতাদের লোভ সিনেমাকে আবার প্রায় শুরুর দিকের বিরক্তিকর পর্যায়ে নিয়ে গেল। গ্রিফিথ কিঙ্গা আইজেনস্টাইনের মতো পরিচালকদের সিনেমা সম্পাদনার কলাকৌশলগুলো তখন এই টকিগুলোতে প্রয়োগ করা অসম্ভব হয়ে পড়ল। সেসময়ের নির্বাক সিনেমার জনপ্রিয় কয়েকজন ‘ফিল্মস্টার’ও প্রায় বিতাড়িত হলেন সিনেমা জগত থেকে। কারও কারণ ছিল তাঁর শব্দের উচ্চারণ ভাল নয় কিংবা কারও ইমেজের সাথে তার কন্ঠস্বর মিলছিল না। সব মিলিয়ে এত তড়িৎ একটা পরিবর্তন পুরো সিনেমা জগতটাকেই বদলে দিল। এবং শুরুর দিকে পরিবর্তনটা কেবলমাত্র দর্শকের মনোরঞ্জন ও নতুন কিছু প্রবর্তনের উত্তেজনাকর বিষয় হিসেবে গ্রহণ করার জন্য, প্রায় অনেক কিছুই গোলমেলে হয়ে গিয়েছিল। তবে মজার বিষয় হল, সমগ্র পৃথিবী যখন মহামন্দার যাতাকলে পিষ্ট। এই টকিজ’ই তখন হলিউডের ফিল্ম ইন্ড্রাস্ট্রিকে বাঁচিয়ে রেখেছিল।

১৯২৯ সালের জানুয়ারিতে আমেরিকা জুড়ে প্রায় বিশ হাজার সিনেমা হল ছিল। সেগুলোর মধ্যে মাত্র ১৫৭ টি হলে সাউন্ড সিস্টেম ছিল যার ফলে মানুষ সেগুলোতে সবাক সিনেমা দেখতে পেত। ভিটাফোন সিস্টেম বেশ ব্যয়বহুল ছিল, তাই সব সিনেমাহল চট করে সাউন্ড সিস্টেমের ব্যবস্থা করে ফেলতেও পারছিল না। কিন্তু বড় বড় সিনেমা স্টুডিওগুলো তখন সবাক সিনেমা বানানোতেই মেতেছে তখন। ওয়ার্নার ব্রাদার্স, ফক্স, এমজিএম। মানুষও চাইছিল এমন ছবি দেখবে যেখানে কলাকুশলীরা কথা বলছে। ১৯২৯ সালের শেষ নাগাদ প্রায় নয় হাজার সিনেমা হল সাউন্ড সিস্টেম এর আওতায় এলো। আর এদিকে দর্শকের উৎসাহ দেখে স্টুডিওগুলো যেসব সিনেমা ‘সাইলেন্ট ফিল্ম’ হিসেবে চিত্রধারণ করা হয়ে গেছে, সেগুলোতেও তড়িঘড়ি করে সংলাপ বসিয়ে দিতে লাগল। সিনেমার বিজ্ঞাপন মানে সেটা যে একটা ‘টকি ফিল্ম’ সেইদিকে জোর দেওয়া। সিনেমার গল্প-চিত্রনাট্য তখন আর প্রায় ভাবাতই না স্টুডিওগুলোকে। অবশ্য তখনও কিছু কিছু নির্বাক ছবি বানানো হচ্ছিল হলিউডে। এর কারণ হিসেবে বলা যায়, গ্রামের দিককার সিনেমা হলগুলোতে টকি ফিল্ম প্রদর্শনীর সুব্যবস্থা না থাকা। টকিজ দেখতে গ্রামের লোকজনের তাই যেতে হতো শহরের সিনেমা হলগুলোতে।

টকিজ নামটি সিনেমার জন্য সম্মানজনক নাকি অপমানজনক, সেটা অবশ্য বেশ তথ্যভিত্তিক বিতর্কের বিষয়। বাংলাদেশের সিনেমা হলগুলোর নাম টকিজ হওয়ার কারণ মূলত অনুকরণ। টকিজের যুগ পেরিয়ে এখন আমরা সিনেমাতে শব্দের রীতিমত জাদুকরী ব্যবহার দেখতে পাই। তবে হুট করে সিনেমার নাম বদলে টকিজ করে দেওয়া এক রোমাঞ্চকর ইতিহাসই বটে। সিনেমার ইতিহাসের সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক না থাকলেও অজ্ঞাতসারেই আমরা ইতিহাসের অংশ আমাদের নামের সাথে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছি!

Comments
Spread the love