সিনেমা নির্মানের পর সবচেয়ে বড় আর জরুরী কাজ হচ্ছে সেটাকে দর্শকের কাছে পৌঁছে দেয়াটা। এই কাজটাও সিনেমা বানানোর মতোই যত্নের সাথে করতে হয় পরিচালক-প্রযোজককে। মোটামুটি ৯৯ শতাংশ সিনেমাই ব্যবসায়িক কারনে নির্মিত হয়। আর কোটি টাকা দিয়ে সিনেমা বানিয়ে আপনি যদি লাভের মুখটাই দেখতে না পারলেন, আপনার বানানো সিনেমাটা দেখতে হলে দর্শকই যদি হলে না আসলো, তাহলে সেটা বানানো আর না বানানো তো একই কথা। ‘প্রচারেই প্রসার’- প্রবাদবাক্যটা তো এমনি এমনি তৈরী হয়নি।

কিন্ত এই প্রচারণার জায়গাটায় আমাদের সিনেমা কিংবা সিনেমার নির্মাতারা এখনও অনেকটা পিছিয়ে রয়েছেন। ফেসবুকে এখন বাংলাদেশী সিনেমা নিয়ে প্রচুর কথাবার্তা হয়, আলোচনা-সমালোচনা দুটোই চোখে পড়ে। আঠারো থেকে ত্রিশ- এই বয়সের দর্শকদের মধ্যে বাংলা সিনেমাকে নিয়ে একটা মুগ্ধতার জায়গা রয়েছে, আবার বেশকিছু ক্ষেত্রে চরম হতাশাও প্রকাশ করতে দেখা যায় এদের অনেককে। হতাশার জায়গাটা অবশ্যই ভালো সিনেমার অভাবকে কেন্দ্র করে। বছরে আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে খুব বেশী ভালো সিনেমা তৈরী হয় না। যে কয়টা হয়, সেগুলোও আবার অফট্র্যাকের সিনেমা বা ‘সিনেমা নামের নাটকে’র খেতাব পেয়ে যায় মাঝেমধ্যে। কিছু ভালো সিনেমা তো কোন ফাঁকে মুক্তি পায় সেটাই ঠিকঠাক বুঝে ওঠা যায় না।

এই জায়গাটায় সিনেমার নির্মাতা বা প্রযোজকের করণীয় আছে অনেক কিছুই। আপনি মাসের পর মাস খেটে রক্ত-মাংস এক করে সিনেমা বানাতে পারবেন, অথচ সেটাকে দর্শকের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্যে দুই সপ্তাহের একটা ক্যাম্পেইন কেন করতে পারবেন না? কোটি টাকা সিনেমায় লগ্নি করতে পারবেন কিন্ত সেটা তুলে আনার জন্যে পাঁচ-দশ লাখ টাকা বাজেট কেন একটা সিনেমার প্রমোশনের পেছনে খরচ করতে পারবেন না? ‘দর্শকেরা ভালো সিনেমা দেখে না’ বা ‘ভালো সিনেমার কদর নেই’ কথাগুলো বলার আগে পরিচালক বা প্রযোজকের উচিত নিজেদের দিকে একবার আঙুল তোলা। যে প্রজেক্টটা তারা যত্নের সাথে বানিয়েছিলেন, সেটা আপামর দর্শকের কাছে পৌঁছে দেয়ার কাজটা তারা ঠিকঠাক মতো করেছিলেন তো?

‘মনপুরা’ সিনেমাটা দিয়ে সব শ্রেণীর দর্শকদের মন জিতে নিয়েছিলেন গিয়াসউদ্দিন সেলিম। তার দারুণ নির্মান, চঞ্চল চৌধুরীর দুর্দান্ত অভিনয় আর অসাধারণ সঙ্গীতায়োজনে মনপুরা হয়ে উঠেছিল পুরো বাংলাদেশের সিনেমা। এখনও, এতবার দেখার পরেও সোনাইয়ের কান্না দেখলে আবেগাপ্লুত হন অনেকেই, গানগুলো ঘুরে ফেরে লোকের মুখে মুখে। সেই গিয়াসউদ্দিন সেলিম নয় বছর পরে নিয়ে আসছেন তার নতুন সিনেমা ‘স্বপ্নজাল’। এই সিনেমাটার কাজ চলছে অনেকদিন আগে থেকেই। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই মুক্তি পাবে সিনেমাটা, অথচ বলার মতো কোন প্রচারণা চোখে পড়ছে না এটার পেছনে! দর্শক যদি ‘স্বপ্নজাল’ সম্পর্কে না’ই জানতে পারে, তারা সেটা দেখতে যাবে কিভাবে?

মাটির প্রজার দেশে- ‘Kingdom of Clay Subjects’ নামে একটা সিনেমা মুক্তি পাবে এই মাসের তেইশ তারিখে, আর এগারো দিন পরে। সিনেমাটা বেশ কিছু ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে পুরস্কৃত হয়েছে। এই সিনেমাটার নাম কয়জনে শুনেছেন? অল্প কিছু সিনেমা হলে মুক্তি পাচ্ছে, হয়তো দর্শকের অভাবে প্রথম সপ্তাহের পর আর কোন সিনেমা হলেই দেখা যাবে না এটাকে। ভালো হোক, মন্দ হোক; দিনশেষে সিনেমা একটা প্রোডাক্ট। সেই প্রোডাক্টটা সম্পর্কে তো ক্রেতা(দর্শক) কে জানাতে হবে। তারপর দর্শকই ঠিক করুক, সেই সিনেমাটা সে দেখবে কি দেখবে না। নির্মাতাকে তো তার কাজটা সৎভাবে শেষ করতে হবে। সিনেমা বানিয়েই কাজ শেষ ভাবাটা এই যুগে বড় বেমানান। প্রচারণার অভাবেই অজ্ঞাতনামার মতো অসাধারণ একটা সিনেমা এক সপ্তাহ পেরুনোর আগেই বলাকা থেকে নেমে গিয়েছিল!

বাংলা সিনেমা, সিনেমার প্রচারণা, স্বপ্নজাল, মনপুরা, আয়নাবাজি, হালদা

রেদওয়ান রনি’র আইসক্রীম সিনেমাটা যখন মুক্তি পায়, তখন বাংলা সিনেমা নিয়ে অনলাইনে খুব বেশী আলাপ-আলোচনা চোখে পড়তো না। রনি কিন্ত তার টার্গেট অডিয়েন্সটা ধরার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলেন। সিনেমার কলাকূশলীদের নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ঘুরেছেন, তরুণদের সঙ্গে কথা বলেছেন। আইসক্রীম হয়তো বড়সড় সফলতা পায়নি, কিন্ত পরিচালক তার জায়গাটা থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলেন। তবে সিনেমা প্রমোশন কাকে বলে সেটা দেখিয়ে দিয়েছেন অমিতাভ রেজা। আয়নাবাজি মুক্তি পাবার আগে আমি শুধু ফেসবুকেই শত শত পোস্ট দেখেছি, অনেকেই আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন তাদের শহরে সিনেমাটা মুক্তি পাচ্ছে না বলে। প্রথম সপ্তাহে মাত্র একুশটা সিনেমা হল পাওয়া আয়নাবাজি পরের সপ্তাহেই গিয়েছিল একশোর বেশী হলে! তারুণ্যের ক্রেজটাই এমন, এটাকে ধরতে পারলে সিনেমা ব্যবসাসফল হবেই। প্রয়োজন শুধু ওদের পালসটা বুঝতে পারা, নির্মিত সুখাদ্যটাকে ওদের নাগালে পৌঁছে দেয়া।

আমাদের সিনেমার বাজারটা খুব বেশী বড় নয়। একসময় হাজার বারশো সিনেমা হল ছিল, সেটা এখন নামতে নামতে দুই-আড়াইশোর কোঠায় এসে ঠেকেছে। কিন্ত এগুলোর মধ্যে তিন-চারটের বেশী মানসম্মত সিনেমা হল নেই পুরো বাংলাদেশেই। ঢাকার ভেতরে স্টার সিনেপ্লেক্স আর যমুনার ব্লকবাস্টার সিনেমা ছাড়া পরিবার কিংবা নারীদের নিয়ে সিনেমা দেখতে যাওয়ার মতো জায়গা তো নেই আর। কিন্ত দর্শকদের মধ্যে শুধু এই শিক্ষিত শ্রেণীটাকে টার্গেট করেও তো সিনেমাকে ব্যবসাসফল করা যায়। হালদা সিনেমাটা তো শুধু সিনেপ্লেক্স থেকেই সাইত্রিশ লক্ষ টাকার ব্যবসা করেছিল।

বাকী সিনেমা হলগুলোর কথা এই অনুচ্ছেদে বাদ দিলাম, ঢাকার দর্শকদের কথাই লিখি এখানে। সিনেপ্লেক্স কিংবা ব্লকবাস্টারে টিকেটের দাম কমপক্ষে দুইশো থেকে আড়াইশো টাকা। শিক্ষিত আর অভিজাত শ্রেণীর দর্শকেরাই সেখানে ভীড় জমান। তাদের সবারই সময়ের দাম আছে। নিজেদের কাজের ফাঁকে সময় বের করে সুস্থ বিনোদন খুঁজে নিতে তারা এই জায়গা দুটোতে ভীড় করেন। কোন সিনেমাটা আসছে, সেটার বিষয়বস্তু কি, কারা কারা অভিনয় করছেন, দর্শকের জন্যে কি নতুনত্ব আছে সেখানে, এসব জিনিস আপনি দর্শকের মাথায় ঢুকিয়ে না দিলে তারা কেন যাবে আপনার সিনেমাটা দেখতে?

ঠিকই আমরা সিনেপ্লেক্সে যাবো, ব্লকবাস্টারে যাবো, আপনার সিনেমাটা যে থিয়েটারে চলছে, তার পাশের থিয়েটারে বসে একটা ভীনদেশী সিনেমা দেখে চলে আসবো। আমাদের সময়ের মূল্যটা এদেশীয় পরিচালকদের পাবার কথা ছিল, কিন্ত তারা প্রমোশনের পেছনে বাড়তি সময় বা অর্থ খরচ করতে চান না দেখে তাদের সুন্দর কাজটা সম্পর্কে দর্শক জানবে না, সেই কাজটা দেখাও হবে না আর। অনেক দিন পরে হয়তো ইউটিউবে সিনেমাটা দেখে আমরা হা হুতাশ করবো, এত ভালো একটা সিনেমা দর্শক হলে গিয়ে দেখলো না, এসব নিয়ে স্ট্যাটাস দেবো, লিখবো। কিন্ত ঘোড়া চুরি যাওয়ার পরে আস্তাবলে তালা দিয়ে লাভ কি বলুন?

Comments
Spread the love