শহরের মশা কে মারবে? শহরের নাগরিকদের মশা কামড়াতে কামড়াতে যখন হতাশ করে ফেলে, তখনও এই প্রশ্নের সমাধান হয় না। মাঝেমাঝে পিক-আপ ভ্যানের পেছনে মাস্ক পড়ে মেয়রের লোকজন ছোটখাট কামান থেকে সাদা ধোঁয়া উড়িয়ে চলে যায়। তাতে কাজ হয় না অলিতে গতিতে থাকা পরিবারগুলোর। নিরুত্তাপ মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী তাই অফিস শেষে কয়েলের প্যাকেট হাতে ঘরে ফিরে যায়। শহরের ব্যাচেলর গোষ্ঠি যদিও পুরো প্যাকেট কিনে না, কয়েলের ব্যবসা তবু বাড়তেই থাকে। ক্লান্ত নাগরিকরা দুষ্ট বাতাসের সাথে কয়েলের ধোঁয়া নিতে নিতে শান্তির ঘুম দেয়। ঘুমানোর আগে কেউ কেউ ঠাট্টা করে, ‘মশা মারতে কামান দাগিয়েও লাভ হলো না’।

চীনা বিজ্ঞানীদের মনে হয় ঠাট্টা-মশকরা একদম পছন্দ নয়।  তারা ঘোষণা করেছেন, “কামান না হোক। এবার মিলিটারি রাডার দিয়ে মশা মারা হবে’। ‘বেইজিং ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি’র একদল গবেষক এও দাবি করেছেন তারা সফলতার একদম দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছেন। চীনা সরকার এই গবেষণা দলের কাজের জন্য বরাদ্দ দিয়েছে ১০০ কোটি টাকা। খবরের কাগজে তো পড়েছিলাম, আমাদের রাজধানীতে মশা মারতে এক বছরের বাজেট ৪৫ কোটি টাকা। সুতরাং টাকার হিসেবে চীনাদের মশা মারার রাডার স্বল্পমূল্যেই বলতে হবে।

চীনা মিলিটারির সর্বাধুনিক রাডার প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে এই কাজে। চীনা যুদ্ধজাহাজগুলোতেও একই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। গবেষকরা দাবী করেছেন এই রাডার এতই শক্তিশালী হবে যে, দুই কিলোমিটার দূর থেকে সেটি প্রত্যেকটি মশাকে ধ্বংস করতে পারবে। একজন গবেষক একটি চৈনিক পত্রিকাকে বলেছেন, ‘মশার আকারের ছোট ছোট পতঙ্গকে একটা একটা করে চিহ্নিত করা এবং সেটাকে অনুসরণ করা এখন আর মোটেও সাইন্স ফিকশন নয়। আমরা একদমই কাছাকাছি পর্যায়ে আছি এমন একটি রাডারের, যেটি জীবন বিধ্বংসী মশাগুলো মেরে ফেলবে’।

রাডারটি আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পতঙ্গের ব্যাপক তথ্যও আহরণ করতে পারবে। খুব দ্রূতগতির ‘ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক ওয়েভ’ রাডারটি থেকে ছেড়ে দেওয়া হবে, এবং মশাসহ অন্যান্য পতঙ্গের হদিস পেলেই সেটাকে আঘাত করবে। শুধু এটাই নয়, তরঙ্গটি সেই রাডারে ফিরে যাবে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসহ, যেমন-মশাটির গোত্র, সেই মশাটি পুরুষ নাকি স্ত্রী, সেটা কোনদিকে উড়ছিল ইত্যাদি ইত্যাদি। এইরকম তথ্যগুলো নিয়ে বিজ্ঞানীরা পুনরায় গবেষণা করবেন যে, মশটির প্রজনন ক্ষেত্র কোথায়। একই তথ্য ব্যবহার করে মশাটির আবাস সংলগ্ন এলাকাকে সতর্ক করে দেওয়া হবে।

চীনের আধুনিক যুদ্ধজাহাজে এরকম রাডার ব্যবহার করা হচ্ছে সেখানে একসাথে অনেক অ্যান্টেনা কাজ করে। এই অ্যান্টেনাগুলো থেকে একসাথে বিভিন্নদিকে ‘মাইক্রোওয়েভ’ ছুঁড়ে দেয় এবং খুব দ্রুতগতিতে আকাশে উড্ডীয়মান মিসাইল কিংবা সামরিক জেটকে সনাক্ত করতে পারে। গতানুগতিক ঘূর্ণায়মান রাডারগুলো এত তাড়াতাড়ি সনাক্তকরণের কাজ করতে পারে না। রাডারটিতে আলাদা একটি অ্যান্টেনা থাকবে যেটি দোদুল রেডিও তরঙ্গ তৈরী করবে একসাথে অনেকদিকে। ‘পোলারাইজেশন’ নামের এই পদ্ধতিতে, মশাটি ক্ষুধার্ত-রক্তপিপাসু স্ত্রী মশা নাকি রেণুখাদক পুরুষ মশা সেটিও ধরা পড়বে। এইদিকে একটি দ্রুতগতির কম্পিউটার একটি ‘অ্যালগরিদম’ ব্যবহার করে একই ধরণের মশার চলাফেরা সনাক্ত করবে সেই এলাকায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দাবী করেছে, দশ লাখ লোক প্রতিবছর ম্যালেরিয়া আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। মশাকে খুব সামান্য পতঙ্গ মনে হলেও, জীবাণু সংক্রমণকারী মশারাই পৃথিবীতে সবচেয়ে জীবনঘাতী কীট। দশ লাখ মানুষ প্রতিবছর মশার কামড় খেয়ে মারা যাচ্ছে, ভাবা যায়? যতটা কম গুরুত্ব দেই আমরা, আমাদের ‘সেবা’য় নিয়োজিত নির্বাচিত কর্পোরেশন, এটা কিন্তু এতটা কম গুরুত্বের ব্যাপার নয়। মজার কথা হচ্ছে চীনে গত কয়েকবছরে ম্যালেরিয়ার মৃত্যুর সংখ্যা বেশ কমেছে। কিন্তু শহরের বাইরে যে জনগোষ্ঠি, যাদের কাছের নাগরিক সেবা পৌছায় না সেখানে ম্যালেরিয়াসহ ডেঙ্গু-জিকাতে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে-মারা যাচ্ছে। মিলিটারি রাডার এবং বিজ্ঞানীদের অভিনব চিন্তাভাবনা-এই দুইয়ে মিলে হয়ত কয়েকদিন পর’ই আমাদের এতদিনের ঠাট্টা-মশকরার বিষয়টি সত্যি সত্যি ঘটিয়ে ফেলবে চীনারা।

বিতর্ক একটা উঠেছে ইতঃমধ্যেই। মশাদের একেবারেই নিধন করলে পরিবেশের কি কোনও ক্ষতি হবে কি না! পৃথিবীতে ৩৫০০ প্রজাতির মশা উড়ে বেড়াচ্ছে। এইসব মশাদের শতকরা মাত্র ছয়ভাগ হলো স্ত্রী মশা এবং এরাই মানুষকে কামড়ায়-মানুষের রক্ত খায়। এই ছয়ভাগের অর্ধেক অর্থাৎ মাত্র তিন পার্সেন্ট মশা মানুষের শরীরে রোগ-জীবাণুর সংক্রমণ ঘটায়। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন এই তিনভাগ মশা মেরে সাফ করে লাখ লাখ মানুষের জীবন বাঁচানো গেলে-তাদের সাফ করাই ভাল।

 

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-