বিগত কয়েক যুগ ধরে চীনের অধিবাসীরা যে অঘটনের ভয়টা পেয়ে আসছিল, অবশেষে তা বুঝি সত্যি হতে চলেছে। বিয়ে নামক সামাজিক প্রতিষ্ঠান থেকে ক্রমশই মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে সে দেশের তরুণ প্রজন্ম। অর্থাৎ চীনা তরুণ-তরুনীরা এখন আর বৈবাহিক সম্পর্কে জড়ানোর ব্যাপারে আগ্রহী নয়। বরং আজীবন ‘সিঙ্গেল’ থেকে স্বাধীনচেতা জীবন যাপনের প্রতিই তাদের আকর্ষণ বাড়ছে। এবং এই আকর্ষণ বৃদ্ধির যে ভয়াবহ হার, তাতে একসময় তা বুঝি দুর্নিবারও হয়ে উঠতে পারে। এমনটাই আশঙ্কা করছেন সে দেশের সমাজবিজ্ঞানীরা।

চীনা তরুণ সমাজের মধ্যে এই ধরণের মানসিকতা নিশ্চয়ই এক দিনে তৈরী হয়নি। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক যে হুট করেই বুঝি মতিভ্রম হয়েছে তাদের! কারণ পুরো এক দশক ধরে দেশটিতে বিয়ের হার বেড়ে চলছিল। কিন্তু তারপর টানা দুই বছর যাবত সে দেশে নতুন বিয়ের হার হ্রাস পেয়েছে। এ বছর ২০১৪ সালের তুলনায় এ হার হ্রাস পেয়েছে ৬.৩%, আর ২০১৩ সালের তুলনায় ৯.১%। পাশাপাশি বিয়ের গড় বয়সও ক্রমশ বেড়ে চলেছে। এ শতাব্দীর প্রথম দশ বছরের তুলনায় গত সাত বছরে বিয়ের গড় বয়স বেড়ে গেছে দেড় বছর।

তবে এই যে বিয়ে একেবারেই না করা, কিংবা করলেও দেরিতে করা, এই ‘ট্রেন্ড’ কিন্তু ইদানীং শুধু চীনেই না, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে জাপান এবং ওইসিডির অন্তর্ভুক্ত অধিকাংশ দেশগুলোতেও লক্ষনীয়। তবে চীনে এই ব্যাপারটা এখনও বেশ অবাক করাই বটে। কারণ চীনা সংস্কৃতিতে বরাবরই বিয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই ছেলেমেয়েদের বিয়ে না করার সম্ভাবনা মাথাচাড়া দেয়ায় খুবই আশংকায় দিন কাটাচ্ছেন চীনের বয়স্ক সমাজ, বিশেষ করে বাবা-মায়েরা।

এবং এজন্য তাদেরকে খুব একটা দোষ দেয়াও যায় না। অনেকেই হয়ত জানেন না, সেই ১৯৫০ সাল থেকেই চীনে ঐতিহ্যগতভাবে ‘অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ’ বিষয়টা আইনত নিষিদ্ধ। কিন্তু তারপরও যেটা দেখা যায়, পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় চীনে ছেলেমেয়ের বিয়েতে বাবা-মায়ের সম্পৃক্ততা অনেক বেশি থাকে। শুধু বেশি বললেও কম বলা হবে। বাবা-মায়ের অমতে ছেলেমেয়ে বিয়ে করছে, এ কথা এখনও ভাবাই যায় না। এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাবা-মায়ের পছন্দকেই শেষ পর্যন্ত মেনে নিতে হয় সন্তানদের। তাই হঠাৎ করে এখন যদি সে দেশের তরুণ প্রজন্ম বিয়ে করাই বাদ দিয়ে দেয়, সেটা তাদের বাবা-মায়ের জন্য কতটা আঘাত বয়ে আনবে, বুঝতেই পারছেন।

চীনা সরকারও এই বিষয়টা নিয়ে যথেষ্ট চিন্তিত। এবং তারা হাত গুটিয়ে বসে নেই। ২০০৭ সালে চীনের শিক্ষা মন্ত্রনালয় সে দেশের ২৭ বা তার বেশি বয়সী অবিবাহিত মেয়েদেরকে প্রকাশ্যে ‘লেফটওভার উইমেন’ আখ্যা দিয়েছিল। পাশাপাশি তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল যে পাত্র বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তারা যেসব অবাস্তব, অলীক ‘স্ট্যান্ডার্ড’ সেট করে, তা থেকে বেরিয়ে এসে যেন অতিসত্ত্বর বিয়ে নামক শুভকাজটা সেরে ফেলে। কিন্তু এই আহ্বানে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বরং নারীদেরকে অপমান করা হয়েছে, এমন অভিযোগ তুলে চীনা সরকারকে এক হাত নিয়েছিল সে দেশের শিক্ষিত সমাজ।

এছাড়া ২০১৬ সালে আবার চীনা সরকার বিলম্বে বিয়ে করাদেরকে (পুরুষদের ক্ষেত্রে ২৫ বছর, নারীদের ক্ষেত্রে ২৩ বছর) আগে যে অতিরিক্ত ৭ দিনের ‘হানিমুন লিভ’ দেয়া হতো, সেটা বাতিল করে। সরকারের ধারণা ছিল, তরুণ-তরুণীরা হয়ত সাতদিন বেশি ছুটি পাওয়ার আশাতেই দেরিতে বিয়ে করে। কিন্তু ছুটির পরিমাণ কমিয়ে দেয়ার পরও গত এক বছরে অবস্থার বিন্দুমাত্র উন্নতি হয়নি।

চীনা সরকার বিশেষভাবে চিন্তিত ওই লাখ লাখ পুরুষদের নিয়েও, যাদের জন্ম ১৯৭০ সালের পর। কেননা ১৯৭০ সালের পর চীনে লিঙ্গভিত্তিক গর্ভপাত শুরু হয়েছিল। শর্ত ছিল এমন যে গর্ভের শিশু যদি মেয়ে হয় তাহলে গর্ভপাত করানো যাবে, কিন্তু ছেলে হলে করানো যাবে না। এর ফলে ১৯৭০ সালের পর চীনে মেয়ের তুলনায় ছেলে শিশু অনেক বেশি জন্মেছে, এবং বর্তমানে প্রাপ্তবয়স্ক ওইসব পুরুষদের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক পাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না। চীনা গণমাধ্যমের ভাষ্যমতে, এই ‘অতিরিক্ত পুরুষ’ এর সংখ্যা সম্ভবত আড়াই থেকে সাড়ে তিন কোটির মত। এবং এই বিপুল সংখ্যক প্রাপ্তবয়স্ক অবিবাহিত পুরুষ থাকায় চীনে বর্তমানে জুয়া খেলা, পতিতাবৃত্তির মত অনৈতিক কর্মকান্ডগুলো বেড়েই চলেছে।

তাহলে দেখতেই পারছেন, যে দেশে বিয়ে করতে ইচ্ছুক চল্লিশোর্ধ্ব পুরুষের সংখ্যা এত বিশাল পরিমাণে, সেই দেশেই আবার তরুণ প্রজন্ম হাতে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বিয়ে করতে রাজি না! এবং এ ধরণের মানসিকতা ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের মধ্যেই বেশি দেখা যাচ্ছে। এর একটা কারণ হলো চীনে লিঙ্গ বৈষম্য। অর্থনৈতিকভাবে চীন যতই এগোক, সামাজিকভাবে দেশটি এখনও প্রাচীনপন্থীই রয়ে গেছে। তাই বিয়ে সংক্রান্ত যেকোন আইনি লড়াইয়ে নারীদের চেয়ে পুরুষেরা বেশি সুবিধা ভোগ করে থাকে। তাই জেনে বুঝে নারীরা এখন আর বিয়ে নামক ‘ফাঁদ’-এ পা বাড়াতে আগ্রহী না। কেননা তাদের তো অর্থনৈতিক কোন টানাপোড়েন নেই। নিজেদের দেখভাল তারা নিজেরাই করতে পারে। আর বিয়ে না করেও তাদের পক্ষে যেকোন পুরুষের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব।

অর্থাৎ এক কালে নারীদের বিয়ের আবশ্যকতা হিসেবে যে দুইটি কারণকে প্রধান হিসেবে বিবেচনা করা হতো, চীনের বর্তমান আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে সেগুলো আর ধোপে টিকছে না। আর তাই সে দেশে যে বিয়ের হার কমছে, এতে অবাক হওয়ার কি আছে!

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-