অনিতার ছেলে সবে দুই বছর বয়সে পা দিয়েছে। কিন্তু এইটুকু বাচ্চার মধ্যেই আজকাল খুব বাজে কিছু অভ্যাস দেখা যাচ্ছে। প্রায়ই কারণে অকারণে মিথ্যা কথা বলে সে। প্রথম দিকে অনিতা বিষয়টা খুব একটা আমলে নেয়নি। ভেবেছে বাচ্চা মানুষ, জেনেবুঝে তো আর মিথ্যা বলছে না। শিশুতোষ কল্পনায় যা মনে আসছে তাই বলে দিচ্ছে।

কিন্তু ছেলেটার মিথ্যা বলার পরিমাণ যখন মাত্রাতিরিক্ত আকারে বেড়ে গেল, অনিতা বুঝতে পারল পরিস্থিতি ক্রমশই নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। তাই একদিন খুব কড়া করে ছেলেকে শাসন করতে শুরু করল সে। বকাঝকাই দিল বেশি, সেই সাথে কয়েকটা চড়-থাপ্পড়ও দিল। কিন্তু মার খেয়ে ছেলে যেই না উচ্চকন্ঠে কান্না জুড়ে দিল, ছেলের বাবা, দাদি, ফুপু সকলে ছুটে এলো।

“হায় হায় এ কী করছো, এতটুকু ছেলেকে বকছো কেন, মারছো কেন!” এই বলে ছেলেটাকে অনিতার কাছ থেকে বলতে গেলে ছোঁ মেরে কেড়ে নিয়ে গেল তারা। অনিতা তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করল যে ছেলেটা মিথ্যা বলা শিখছে, তাই ওকে শাসন করা প্রয়োজন। কিন্তু কে শোনে কার কথা! “আরে বাবা, ছোট বাচ্চারা একটু আধটু মিথ্যা তো বলবেই! এ জন্য ওদের মারতে হবে কেন!”

পাশাপাশি অনিতার শাশুড়ি তো তার মাতৃত্বের যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলে ফেললেন, “বউমা, বাচ্চা কীভাবে মানুষ করতে হয় তাই তো জানো না তুমি! আমি তো বাপের জন্মেও কোনদিন শুনিনি সামান্য কারণে কেউ তার বাচ্চাকে এভাবে মারধর করছে!”

এভাবেই অনিতা যখন তার নিজের ছেলেকে মিথ্যা বলার অপরাধে শাসন করতে গেল, অন্যরা দৃশ্যপটে আবির্ভূত হয়ে তাকে নিবৃত্ত করল। ফলে মিথ্যা বলা যে অনেক বড় একটা অপরাধ, সে শিক্ষা আর ছেলেকে দেয়া হলো না তার। বরং দুই বছরের বাচ্চাটা অনেক বড় একটা ভুল শিক্ষা পেয়ে গেল অন্যদের কাছ থেকে, তা হলো- মিথ্যা বলা খুব ‘সামান্য’ একটা ব্যাপার, এবং বাচ্চারা একটু আধটু মিথ্যা কথা তো বলবেই!

এই ছেলেই যে বড় হতে হতে খুব বড় মাপের একজন মিথ্যাবাদী মানুষে পরিণত হবে, এবং একটা সময়ে সে প্যাথলজিকাল লায়ারও হয়ে যাবে, মিথ্যা বলতে বলতে সেগুলোকেই সত্য বলে ধরে নিতে শুরু করবে, তাতে আর বিচিত্র কী!

আমাদের দেশে এটি কিন্তু খুবই পরিচিত একটি ঘটনা। বিশেষ করে যৌথ পরিবারগুলোতে এ ধরণের দৃষ্টান্ত দেখা যায় খুব বেশি পরিমাণে। মায়েরা সেখানে স্বাধীনভাবে তাদের সন্তানকে শাসন করতে পারেন না। বাচ্চার বাবা থেকে শুরু করে পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা বাচ্চাকে এত বেশি পরিমাণে আহ্লাদ দেয় যে, বাচ্চার বিগড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যায়।

এবং সেই সম্ভাবনা রোধ করতে মা যে তার বাচ্চাকে শাসন করবেন, সেই অধিকারও কেড়ে নেয়া হয় তার থেকে। তাই তো অসহায় দৃষ্টিতে মা দেখে যান, কীভাবে তার সন্তান ক্রমান্বয়ে বিভিন্ন বাজে অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে, অথচ তিনি কিছুই করতে পারছেন না!

কিন্তু বাস্তবে কি এমন হওয়া উচিৎ? মোটেই না। যে মা সন্তানকে নয় মাস গর্ভে ধারণ করেছেন, এবং বাচ্চার জন্মের পর থেকে প্রতি মুহূর্ত বাচ্চার কল্যাণের জন্য উদয়াস্ত খেটে যাচ্ছেন, তার কি অধিকার নেই প্রয়োজন অনুযায়ী বাচ্চাকে শাসন করার? নিজের বাচ্চার ভালো-মন্দ কি তার চেয়ে অন্যরা বেশি ভালো বোঝে?

হ্যাঁ, বাচ্চাকে শাসন করতে গিয়ে অনেক মা’ই হয়ত একটু বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলে, যা কখনোই কাম্য নয়, এবং তাতে হীতে বিপরীত হতে পারে। কিন্তু তিক্ত সত্য এটিই যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় কোনো মা তার বাচ্চার ভালোর জন্যই তাকে শাসন করতে গেলেও, পরিবারের বাকি সবাই মিলে তাকে থামিয়ে দেয়। এবং ছোট বাচ্চাটাকে আদরে আদরে বাঁদর বানিয়ে ফেলে। দিনশেষে তাই দেখা যায়, বাচ্চার জন্ম দেয়া থেকে শুরু করে তার পেছনে সকল পরিশ্রম করলো তার মা’ই, কিন্তু বাকি সবাই মিলে সেই বাচ্চার স্বভাব ও চরিত্র নষ্ট করে দিল, এবং সেই দায়ভার তাদের কাউকে নয়, বাচ্চার মাকে একাকেই বহন করতে হলো!

অথচ এ বিষয়টি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে ছোট বাচ্চারা একদম ছোট বয়সে কোন কাজে খারাপ কাজে অভ্যস্ত হয়ে গেলে, পরবর্তী জীবনে তাদেরকে যতই শোধরানোর চেষ্টা করা হোক না কেন, সেসব চেষ্টা খুব একটা কাজে আসে না। শুধু মিথ্যা বলাই নয়। উদাহরণস্বরূপ আরও বলা যায়, না বলে অন্যের জিনিস নেয়া, অধিকার আদায়ে গায়ের জোর ব্যবহার করা ইত্যাদির কথাও।

অর্থাৎ বড় হয়ে মানুষ যেসকল বাজে ও সমাজবিরোধী কাজে লিপ্ত হয়, সেগুলো তারা শিখে আসে একদম ছোটবেলাতেই, যখন তাদের নিজেদের ভালো-মন্দ বোঝার বয়সই হয়নি। ওই সময়ে তারা না বুঝেই এ ধরণের কাজ করে আর অন্যরা তাতে বাধা দেয় না বলেই, একটু একটু করে তারা এসব কাজে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে এবং বড় হয়ে কাজগুলো আরও বেশি পরিমাণে করতে শুরু করে।

অথচ একজন মা যদি খুব ছোটবেলাতেই তার বাচ্চাকে কিছুটা বুঝিয়ে শুনিয়ে, কিছুটা শাসন করে এ ধরণের কাজ থেকে নিবৃত্ত করতে পারতেন, তাহলে ওই বাচ্চা বড় হয়ে কিছুতেই আর এমন হয়ে যেত না। তাই কোন মা যদি তার বাচ্চার বাজে অভ্যাস দূর করার জন্য তাকে শাসন করেন, তাকে কখনোই বাধা প্রদান করা উচিৎ নয়। মনে রাখা উচিৎ, মায়ের কাজ যেমন সন্তানকে আদর-স্নেহ দিয়ে বড় করা, ঠিক তেমনই প্রয়োজনমাফিক শাসন করাও। মাকে তার কাজটা করতে দিন। অহেতুক সেখানে নাক গলিয়ে একটা বাচ্চার ভবিষ্যৎ নষ্ট করবেন না।

পাশাপাশি মায়েদেরও মনে রাখতে হবে, বাচ্চাকে শাসন বলতে কিন্তু শুধু গায়ে হাত তোলা বা কঠিন স্বরে বকাঝকা করাই নয়। খুব শান্তভাবে বাচ্চাকে বুঝিয়ে শুনিয়েও মন্দ কাজ থেকে নিবৃত্ত করা সম্ভব। তবে সব বাচ্চার ক্ষেত্রে স্রেফ বুঝানোতে কাজ না-ও হতে পারে। সেক্ষেত্রে তাদেরকে একটু আধটু মারা বা বকা দেয়া যেতেই পারে, কিন্তু সেটি যেন কখনোই মাত্রা অতিক্রম না করে।

বাচ্চাকে কোন মন্দ কাজের জন্য শাসন করা হলে, কেন কাজটি মন্দ সেটি বুঝিয়ে দেয়া খুবই জরুরি। তা না হলে শাসন করার পুরো প্রক্রিয়াটিই বিফলে যাবে। বাচ্চার মনে ভয় জন্মাবে বলে মায়ের সামনে সে আর ওই কাজ হয়ত করবে না, কিন্তু মায়ের আড়ালে ওই কাজ ঠিকই করতে থাকবে। এভাবে সে কিছু নিষিদ্ধ কাজের সন্ধান পেয়ে যাবে। এ কথা তো আমরা সকলেই জানি যে নিষিদ্ধ কাজের প্রতি মানুষের আগ্রহ মজ্জাগত। তাই খেয়াল রাখতে হবে, অতিরিক্ত শাসন করতে গিয়ে বাচ্চাকে যেন আবার কোন নিষিদ্ধ কাজের হদিস দিয়ে দেয়া না হয়!

পরিশেষে আবার বলব, মায়ের চেয়ে মাসির দরদ কিন্তু কখনোই মঙ্গল বয়ে আনে না। তাই বাচ্চার ভালোমন্দ মাকেই আগে বুঝে নিতে দিন। যদি তাতে কাজ না হয়, কেবল তাহলেই হস্তক্ষেপ করুন। নতুবা নিছকই কোন বাচ্চাকে আহ্লাদ দিতে গিয়ে, মাকে তার অধিকার বঞ্চিত করবেন না। কারণ মনে রাখবেন, কোন বাচ্চা যদি নষ্ট হয়ে যায়, আপনার-আমার কিন্তু কিছুই যাবে আসবে না, অথচ ওই মাকে ভুগতে হবে আজীবন।

Comments
Spread the love