“যে ফুল এবং শিশু ভালবাসেনা সে প্রকৃত মানুষ না!”

কোথাও পড়েছিলাম এই উক্তিটা, তবে কার উক্তি সেটা এখন ঠিক মনে নেই। উক্তিটা যারই হোক কথাটা যে শতভাগ সত্যি সেতো আমরা সবাই জানি। এমন পাষাণ কে আছে শিশুর হাসিতে যার মন নরম হয়না?

শিশুদের কে তুলনা করা হয় একতাল কাদার সাথে, তাকে যেরকম আকার দেয়া হবে সে সেভাবেই গঠিত হবে। আর এই আকার দেয়ার কাজটি প্রথমে করে থাকে পরিবার, এরপর বিদ্যালয় এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান। আমাদের এই যে এত এত সমস্যা তার গোড়াটা কিন্তু এই কাদার তাল কে আকার দেয়ার মধ্যেই। আমরা কি কাদার তাল কে সঠিক আকৃতি দিতে পারছি? আমরা কি আমাদের শিশুদেরকে দেশের উন্নতিতে অবদান রাখার মত করে, আদর্শ ও নীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে গড়ে তুলতে পারছি? আমাদের তো অনেক বড় বড় অফিসার, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার আছে। তবে এই ‘ভাল রেজাল্ট’ করে ‘উপরে’ ওঠা মানুষ গুলো তাদের কর্মক্ষেত্রে দুর্নীতি করছে কেন? অসৎ হচ্ছে কেন? তারা কেন প্রতিক্রিয়াশীলতা ধারণ করছে? নতুন নতুন চিন্তার বিকাশ ঘটছে না কেন? এই সব কিছুর মূল রয়েছে ঐ কাদার তাল কে আকৃতি দেয়ার মধ্যেই!

সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ হচ্ছে শিশুদের জন্য বিনিয়োগ, শিক্ষার উন্নতিতে বিনিয়োগ। দরকার হচ্ছে ভিত্তি গুলো মজবুত করা। ভিত্তি মজবুত থাকলে এর উপর সহজেই চমৎকার দালান দাড় করিয়ে দেয়া যাবে। এই ভিত্তিটা হল প্রাথমিক শিক্ষা। অথচ আমাদের এখানে ঘটছে উলটো ঘটনা। আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার মান খুবই নিম্ন। ভালো শিক্ষকের অভাবের পাশাপাশি এখানে রয়েছে আরও নানা রকম সমস্যা। তবে এসব সমস্যা সমাধানে ব্যক্তি মানুষের থেকে রাষ্ট্রের ভূমিকা বেশি। ধীরে ধীরে অবস্থার উন্নতি হবে এমনটাই আমাদের আশা। রাষ্ট্র তার কাজ করুক, আমরা বরং দেখে আসি আমাদের হাতে কি করার আছে? আমরা কি করে একটি শিশুকে উপযুক্ত ভাবে গড়ে তুলতে পারি। আমি কোন বিশেষজ্ঞ নই, তবে ৬ বছরের মাঠ পর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু বিষয়ে দৃষ্টিপাত করতে চাই।

*শিশু যা দেখে, যা শোনে তাই শেখে। কাজেই সাবধান হোন

একটি শিশু যখন বড় হতে থাকে তখন তার মস্তিষ্ক নতুন নতুন জিনিস গ্রহন করে এবং সেগুলোকে মস্তিষ্কে পাকাপোক্ত করে নেয়। এ কারণে নতুন নতুন জিনিসের প্রতি তার আগ্রহ সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন জিনিসের প্রতি নির্দেশ করে সে জানতে চায় ওটা কি! রঙ্গিন জিনিস, শব্দ সৃষ্টিকারি জিনিস তার মনোযোগ আকর্ষন করে। শুধু তাই নয়, তার আশেপাশের মানুষ জনকেও সে লক্ষ করে গভীর মনোযোগের সাথে এবং তাদের আচরণ গুলোকে অনুকরণ করে। সব সময়ে শোনা ভাষাও সে আয়ত্ত্ব করে এভাবেই। এখানে বাবা মা ও পরিবারের অন্যান্যদের একটা বড় ভূমিকা আছে। শিশুর সামনে ভুলেও কোন গালিগালাজ করা যাবেনা, ঝগড়া কিংবা রাগান্বিত হয়ে কথা বলা যাবেনা। শিশুর উপর এর প্রভাব পড়বেই। প্রতিটা আচরণ করতে হবে তার ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে।

*শিশুর জানার আগ্রহ মেটান, সকল প্রশ্নের উত্তের দিন

একটু বড় হলেই শিশুর সকল বিষয়ে জানার আগ্রহ তৈরি হয়। এটা কি? ওটা কেন হয়? সেটা কিভাবে হয়? ইত্যাদি অসংখ্য প্রশ্ন করে সে আশেপাশের মানুষজন কে ব্যতিব্যস্ত করে রাখে। যে শিশু যত বেশি প্রশ্ন করবে বুঝতে হবে তার মেধার বিকাশ তত বেশি হবে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় বাবা মা বা অন্যরা এক পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে শিশুটিকে ঝাড়ি মেরে নিবৃত করে, বিরক্ত হয়। কিন্তু এর ফলে যে তার জানার আগ্রহ কমে যাচ্ছে এটা কি বুঝতে পারছেন? শিশু যতই প্রশ্ন করুক, ধৈর্য্য ধরে তার সকল প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। কখনই তাকে নিবৃত করা উচিত নয়। এতে তার মস্তিষ্কের বিকাশ বাধাগ্রস্থ হবে। বিরক্ত হবেন না, সকল প্রশ্নের উত্তর দিন এবং যথা সম্ভব সঠিক ব্যাখ্যা দিন। কোন আজগুবি ব্যাখ্যা নয়।

*শিশুকে আজগুবি ব্যাখ্যা নয়, সঠিক ব্যাখ্যা দিন। বিদ্বেষ মূলক এবং ভীতিকর শিক্ষা দান থেকে বিরত থাকুন

এই বিষয়ে একটু বিস্তারিত বলার দরকার। আগেই বলেছি শিশুদের মস্তিষ্ক হল খালি হার্ড-ডিস্ক, আপনি যা যা ইনপুট দেবেন সেটাই রয়ে যাবে সেখানে। এই সময়ে সেখানে ভুল, আজগুবি, বিদ্বেষ মূলক, ভীতিকর তথ্য প্রদান শিশুটির জন্যই কেবল ক্ষতিকর নয় বরং সমাজের জন্যও ক্ষতিকর। এই সময় শিশু যদি কোন ভুল জিনিস শেখে সেটা সে আমৃত্যু লালন করবে, সেভাবে জীবন যাপন করবে। যার প্রভাব পড়বে সমাজের উপর।

যেমন একটি মুসলমান পরিবারে জন্ম নেয়া শিশুকে যদি ছোট বেলায় শেখানো হয় তার ধর্মই মহান, বাকি সব ধর্ম ভুয়া এবং অন্যান্য ধর্মের অনুসারিরা নরকে যাবে। তাহলে এটা তার শিশু মস্তিষ্ক নিজের মধ্যে পাকাপোক্ত করে নেবে এবং আজীবন সে অন্য ধর্মের মানুষকে ছোট করে দেখবে। আর এটাই হয়ে আসছে আমাদের সমাজে। একারণেই ঘটে সকল রকম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হাঙ্গামা। একারণেই বাংলাদেশে আক্রান্ত হয় সংখ্যালঘুরা। আমরাই সেরা, বাকিরা নিম্ন শ্রেনীর- এই শিক্ষা প্রতিটি শিশুর মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বুনে দিচ্ছে।

যদি শিশুটিকে শিক্ষা দেয়া হয়, ‘আমরা হলাম মানুষ। সব মানুষই সমান। যে ধর্মের, যে দেশের, যে বর্ণের মানুষ হোক না কেন সবাই সমান।সকলের সমান মর্যাদা প্রাপ্য। সবাইকে ভালবাসতে হবে, সবাইকে মর্যাদা দিতে হবে। তোমার ধর্ম ইসলাম, ওর ধর্ম হিন্দু- তোমরা দুজনেই কিন্তু এক’- তাহলে কি চমৎকার হত! কাজটা কি খুব কঠিন?

আপনি ধর্মীয় শিক্ষায় শিশুকে শিক্ষিত করতে চান, খুব ভাল কথা। তাহলে সত্য বলা, মানুষের সেবা করা, গুরুজন কে মান্য করে, সৎ থাকা, অপচয় না করা, সবার সাথে ভাল ব্যবহার করা, গরিবদের কে সাহায্য করা- এগুলোর শিক্ষা দিন। ধর্মে যে নৈতিক দিক গুলোর উল্লেখ আছে সেগুলোর শিক্ষা দিন। আরবি পড়তে শেখার চেয়ে এগুলোর গুরুত্ব অনেক বেশি। আমার ব্যক্তিগত অভিমত হল, ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান তথা উপাসনাগত বিষয় গুলো ছোট বেলায় চাপিয়ে দেয়া উচিত নয়। বরং তাকে সকল ধর্ম সম্পর্কে জানতে দেয়া উচিত। গুরুত্ব দেয়া উচিত নৈতিক দিক গুলোর উপরে।

ধর্মীয় শিক্ষা দিন, নৈতিক শিক্ষা গুলোর মাধ্যমে এবং অবশ্যই ভীতি প্রদর্শন ছাড়া। ‘তুমি যদি সত্য না বল তাহলে আল্লাহ তোমাকে ৭০ বছর জাহান্নামের আগুনে পোড়াবেন। সেই আগুন পৃথিবীর আগুনের থেকে কয়েকশ গুন বেশি গরম’- এধরণের কথা গুলো শিশুর মনে কিরকম প্রভাব ফেলতে পারে সেটা কি ভেবে দেখেছেন? এই ধরনের কথা শিশুর মনে তৈরি করবে ভয়, তার আত্মবিশ্বাস কমে যাবে, সে ভাববে আল্লাহ এতই নিষ্ঠুর! সত্য বলা কেন উচিত সেটা নরকের ভয় না দেখিয়েও একটি শিশুকে বুঝানো সম্ভব।

*শিশু যাই করুক তাকে উৎসাহ দিন

হয়তো আপনার শিশু একটি ছবি আকলো, কিংবা দু লাইনের একটা তাল-ছন্দ-লয় বিহীন ছড়া লিখল, অথবা কিছু একটা তৈরি করলো। এগুলো সবই আপনার শিশুর সৃজনশীলতার প্রকাশ। সেটি যেমনই হোক না কেন, ভুল ধরতে যাবেন না। বরং অবাক হবার ভান করুন, খুশি হওয়ার ভান করুন। শিশুকে উৎসাহ দিন যেন এই ধরণের কাজে সে আরও নিয়োজিত হয়। মস্তিষ্ককে ব্যবহার করে। কখনই তাকে নিরুৎসাহিত করবেন না।

*ভুলেও তুলনা করবেন না, নেতি বাচক কথা বলবেন না

এই কাজটি বেশির ভাগ বাবা মাই করে থাকেন। অমুকে পারল, তুমি পারলানা কেন কিংবা অমুকে এত ভাল করল, তুমি পারলা না কেন অথবা তোমাকে দিয়ে কিছু হবেনা, তুমি একটা অপদার্থ- এই জাতীয় কথাগুলো আপনার শিশুকে সম্পূর্ণ নষ্ট করে দিতে পারে। এই জাতীয় কথায় শিশুর আত্মবিশ্বাস নষ্ট হয় এবং আজীবন সে আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভোগে। আত্মবিশ্বাসহীনতা মানেই ব্যর্থতা। তুলনা না করে শিশুকে তার পজিটিভ দিক গুলো ধরিয়ে দিন। তার পূর্বের সাফল্য গুলোর কথা মনে করিয়ে দিন তা যত ছোটই হোক না কেন। ‘তোমার দ্বারা কিছু হবেনা’ না বলে ‘আমি জানি তুমিই পারবা, এখন পারও নাই তো কি হয়েছে, এরপরের বার অবশ্যই পারবা’- এই কথা শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেবে যা তাকে পরবর্তি জীবনে সাহায্য করবে।

*শিশুকে দিয়ে মিথ্যা বলাবেন না, তাকে দিয়ে ভাল কাজ করান

আপনি আপনার শিশুকে শিক্ষা দিচ্ছেন, সদা সত্য কথা বলিবে। আবার আপনিই পাওনাদার ফোন করলে শিশুকে দিয়ে বলাচ্ছেন, ‘বাবা বাড়ী নেই!’ আপনি শিশুকে ন্যায় নীতির কথা শুনান আবার আপনিই মেলার প্রবেশ পথে সামান্য কিছু টাকা বাচাতে ৬ বছরের বাচ্চার বয়স ৫ বছর বলেন! শিশুরা কিন্তু এই বিষয় গুলো লক্ষ করে এবং এগুলো থেকেই শিক্ষা গ্রহন করে। এগুলো থেকেই শিশু মিথ্যা বলা, অসততার শিক্ষা পায়। ‘সদা সত্য কথা বলিব’- এই বাক্য চরম মিথ্যাবাদীও স্কুলে পড়ে এসেছে, তাতে তার মিথ্যা বলা আটকায়নি! কাজেই লক্ষ রাখুন আপনি আপনার শিশুর সামনে ভুল উদাহরন স্থাপন করছেন কিনা?

*পারিবারিক কলহ- শিশুর জন্য সব থেকে বড় হুমকি

শিশুর সামনে কখনই ঝগড়া করবেন না। তবে অনেক সময় পরিস্থিতি এমন হয় যে বিবাহ বিচ্ছেদ পর্যন্ত হয়ে যায়। এবং এসকল ক্ষেত্রে মূল ভুক্তভোগী হয় শিশুরা। ব্রোকেন ফ্যামিলির শিশুরা কি দুঃসহ অবস্থার ভিতর দিয়ে যায় সেটা ভুক্তভোগী ছাড়া আর কারও পক্ষে উপলব্ধি করা সম্ভব না। যদি বিবাহ বিচ্ছেদ অনিবার্য হয়েই পড়ে সেক্ষেত্রে সন্তানদের ভবিষ্যতের দিকে লক্ষ রাখুন। তারা যেন বাবা-মা উভয়ের কাছেই যাওয়া আসা করতে পারে এটা নিশ্চিত করুন। শিশুর কাছে আপনার স্বামী/স্ত্রীর দুর্নাম করবেন না। শিশুকে মানসিক সাপোর্ট দিন, যেন তার ক্ষতিটুকু সে পুষিয়ে নিতে পারে।

*শিশুকে ‘Sexual Harassment’ সম্পর্কে শিক্ষা দিন

আমাদের আশেপাশেই ছড়িয়ে আছে অসংখ্য বিকৃত মানুষ। হয়তো এরা আছে আপনার পরিবারের মধ্যেই। অসংখ্য শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয় কিন্তু সেটা তারা বলতে পারেনা। অথচ এধরণের ঘটনা তাদের কে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। শিশুকে হয়তো সেক্সুয়াল হ্যারেসমেন্ট কি এটা বুঝানো সম্ভব নয় তবে তাকে শিক্ষা দিতে হবে তার মত করে। শিশুকে তার শরীরের স্পর্শকাতর অংগ গুলো সম্পর্কে ধারণা দিন। বুক, দু পায়ের মাঝে এবং পিছনে- এই স্থান গুলো হচ্ছে তার স্পর্শ কাতর স্থান। শিশুকে (ছেলে মেয়ে উভয়কেই) শিক্ষা দিন কেউ যদি তার এই সকল অঙ্গে হাত দেয়, বারবার স্পর্শ করে, চাপ দেয় তাহলে যেন সে সেখান থেকে চলে আসে এবং চিৎকার করে। শিশুকে বারবার এই শিক্ষা দিন, দরকার হলে রিহার্সাল করান। এতে শিশুটি প্রাথমিক একটি প্রটেকশন পাবে। মনে রাখবেন এই বিষয়টি অতি-গুরুত্বপূর্ণ।

*শিশুর মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন

একটি শিশুকে পরিপূর্ণ ভাবে বিকশিত করার সব থেকে চমৎকার মাধ্যমটি হল বই। শিশুর মধ্যে তার বয়সের উপযোগী বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। আপনার নিজের হয়তো অভ্যাস নেই, কিন্তু শিশুর মধ্যে এই অভ্যাসটুকু ঢুকিয়ে দিন, গ্যারান্টি দিচ্ছি যদি এই অভ্যাস বহাল থাকে তার মানসিক বিকাশের অনেক গুলো দিক নিয়ে আপনাকে আর চিন্তা করতে হবেনা। গল্প উপন্যাস কবিতা সহ তথাকথিত ‘আউটবই’ এর গুরুত্ব পাঠ্য বই এর থেকে অনেক অনেক অনেক গুণ বেশি। এই সকল বই এর শিক্ষা হাতেনাতে পাওয়া যায়না, গ্রেড দিয়ে মাপাও যায়না। তবে এই সকল শিক্ষা আপনার শিশুর মধ্যে সকল রকম মানসিক গুণাবলীর বিকাশ ঘটাবে। তাকে বই পড়তে নিরুৎসাহিত করবেন না, উৎসাহিত করুন। বই কিনে দিন, লাইব্রেরিতে নিয়ে যান। বইকে তার বন্ধু বানিয়ে দিন এবং যথা সম্ভব টেলিভিশন থেকে দূরে রাখুন!

*শিশুর মতকে গুরুত্ব দিন, তার উপর কোন কিছু চাপিয়ে দেবেন না

শিশুকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করবেন না। এমন একটা ভাব দেখান যেন তাকে আপনি গুরুত্ব দিচ্ছেন। সেও যেন নিজেকে পরিবারের একজন গুরুত্বপূর্ণ সক্রিয় সদস্য মনে করে। আরও বড় হলে, লক্ষ নির্ধারণের প্রশ্নে শিশুর উপর আপনার মতকে চাপিয়ে দেবেন না। তাকে সকল পথ সম্পর্কে, সেগুলোর লাভ-ক্ষতি, সুবিধা-অসুবিধা সম্পর্কে ধারণা দিন। কিন্তু তার মতকেই প্রাধান্য দিন। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বাবা মায়েরা নিজেরা যেটা হতে পারেন না, সন্তান কে সেই স্থানে দেখতে চান। লক্ষ নির্ধারণে সন্তানকে সাহায্য করুন কিন্তু সিদ্ধান্ত তাকেই নিতে দিন।

*শাসন যেন মাত্রাতিরিক্ত না হয়

সন্তানকে অবশ্যই শাসন করবেন তবে যদি বুঝিয়ে কাজ হলে সেটাই সর্বোত্তম। আর শাসন করতে হলেও ভুলেও অন্য কারও সামনে সেটা করবেন না। অনেক বাবা মাই স্কুলে রাস্তা ঘাটে কিংবা সকলের সামনে বাচ্চাকে মারেন, বকা দেন। এতে শিশুটির আত্মসম্মানে আঘাত করা হয়।শিশু হলেও তারও একটা আত্মসম্মান বোধ আছে, এটিকে নষ্ট করে দেবেন না। শাসন করতে হলে তাকে আলাদা নিয়ে, বুঝিয়ে যথা সম্ভব ধীরতা ও স্থিরতার সাথে করুন। অন্য কারও সামনে সন্তান কে শাসন করবেন না।

আসলে এই তালিকা অনেক দীর্ঘ। অনেক কিছুই বাবা মা সন্তান প্রতিপালন করতে করতে শেখেন, বোঝেন, প্রয়োগ করেন। তবে এই বিষয় গুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিধায় আলাদা করে উল্লেখ করা। আরেকটি কথা মনে রাখতে হবে, শৈশব যেন কাটে আনন্দে। পড়াশুনা শিশুর ভবিষ্যতের জন্য দরকার কিন্তু পড়াশুনার চাপ যেন তার শৈশব কে নষ্ট না করে। আপনার সন্তান কে রেসে নামিয়ে দেবেন না। তার মেধা, তার সৃজনশীলতা বিকাশে সাহায্য করুন। স্কুলে ফার্স্ট হওয়ার থেকে একটা চমৎকার ছবি আকতে পারাটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং দরকারি। আপনার সন্তান কে সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলুন, এরপরে তার পথ সে নিজের খুজে নেবে…

না কথা এখনও শেষ হয়নি, কারন এখনও যে বলাই হয়নি অনেক কিছু। আমি এতক্ষন যে ‘শিশু’দের কথা বললাম তারা সকলেই সুবিধাভোগী শ্রেনীর, উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্তের ঘরে আদরে বড় হওয়া শিশু। কিন্তু আমি এখানে অর্ধেকের বেশি শিশুর কথা বলতে পারিনি যারা বড় হচ্ছে বস্তিতে, রেললাইনের ধারে, পতিতা-পল্লীতে, রাস্তায় রাস্তায়। তাদের মৌলিক চাহিদা গুলোই মিটছে না সেখানে তাদের মানসিক বিকাশ তো অনেক পরের কথা। আমরা যখন শিশুদের ভবিষ্যতের কথা বলি তখন এরা আমাদের আলোচনার বাইরেই থেকে যায়। এই শিশুদের জন্য আমাদের কিছুই করার নেই?

বড় পরিসরে আমাদের কিছু করার তেমন একটা সুযোগ নেই। এই শিশুরা অল্প বয়সেই পড়াশুনা ছেড়ে দিয়ে কায়িক শ্রমে লেগে যায় এর পিছনে কারণ হল অর্থনৈতিক। আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে বস্তির শিশুদের জন্য একটা স্কুল পরিচালনা করতাম। বস্তিতে গিয়ে গিয়ে বাচ্চাদের নিয়ে আসতাম এবং সম্পূর্ন নিজেদের খরচে তাদের কে পড়ানোর চেষ্টা করতাম। আমাদের স্কুলের নিয়মিত একটা বাচ্চা হঠাৎ করে স্কুলে আসা বন্ধ করে দিল। ওর বাড়িতে খোজ নিয়ে জানা গেল ছেলেটিকে কোন দোকানে কাজে দিয়ে দেয়া হয়েছে! বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করেও কোন লাভ হয়নি, শিক্ষার লাভ টা তাৎক্ষনিক ভাবে বোঝা যায়না, কিন্তু দোকানে কাজ করে শিশুটি এখনই টাকা রোজগার করছে। বাবা মার কাছে এটাই লাভ জনক। নানা ভাবে বুঝিয়ে, ভয় দেখিয়েও শিশুটিকে আমরা স্কুলে আনার ব্যবস্থা করতে পারিনি। এরকম ঝড়ে পড়ার সংখ্যা কল্পনার বাইরে। এখানে মূল কারণ অর্থনৈতিক। এখানে ব্যক্তি উদ্যোগে বেশি কিছু করার সুযোগ নেই, দায়িত্বটা রাষ্ট্রের।

ব্যক্তি উদ্যোগে আমরা যা করতে পারি সেগুলো নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক। আমরা আমাদের বাসায়, দোকানে, কারখানায় কোন শিশু শ্রমিক রাখবনা। বাসায় শিশুদের দিয়ে কাজ করানোটা অমানবিক একটা ব্যাপার। বাড়িতে কাজের লোক হিসেবে শিশুদের বহাল করা বাংলাদেশের আইন অনুযায়ি দন্ডনীয় অপরাধ। তবে কোন আশ্রয়হীন শিশুকে যদি আপনি বাড়িতে রাখেনই তার শিক্ষার ব্যবস্থা করুন। তাকে যতটা সম্ভব নিজের সন্তানের মত করে বড় করুন। এই টুকু কাজতো আমরা করতেই পারি? পারিনা?

আপনার বাড়ির কাজের বুয়া, দারোয়ান, অফিসের কেরানি- এদের সন্তানদের খোজ নিন। তারা স্কুলে যাচ্ছে কিনা, পড়াশুনা করছে কিনা খোজ নিন। সম্ভব হলে সাহায্য করুন। আপনার অধীনস্ত এই লোক গুলোকে সচেতন করার কাজটুকু তো আপনি করতেই পারেন, তাই নয় কি?

শিশুরা পবিত্র, খুব সম্ভবত শিশুদের দেখেই ফেরেশতা বা অ্যাঞ্জেল এর ধারণাটা তৈরি হয়েছিল। আপনি খুব টেনশনে আছেন, বিষন্নতায় ভুগছেন, কষ্টে শেষ হয়ে যাচ্ছেন- একটা শিশুকে মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করুন। নতুন একটি জগৎ আবিষ্কার করবেন। হঠাৎ করে এক সময় লক্ষ করবেন আপনিও শিশুটির সাথে সাথে হাসছেন! আপনার দুশ্চিন্তা, টেনশন কোথায় চলে গেছে টেরও পাবেন না! এই শিশুটিই আগামি দিনে বড় হবে।আমাদের জায়গা নিবে, যেমনটা আমরা নিয়েছি আমাদের পিতা মাতার জায়গা। তাই তাদের কে আমরা যেভাবে বড় করব সেভাবেই তৈরি হবে আমাদের ভবিষ্যৎ। ধনী হোক, দরিদ্র হোক, প্রাসাদে থাকুক, বস্তিতে থাকুক, স্বাভাবিক হোক, প্রতিবন্ধী হোক- প্রতিটা শিশুই অসাধারণ।প্রতিটি শিশুই অপার সম্ভাবনাময়। সেই সম্ভাবনাটুকু জাগিয়ে তুলব নাকি নষ্ট করে দেব সেই সিদ্ধান্তটা আমাদের হাতে। কাজেই আপনিই ঠিক করুন- আপনার ভবিষ্যৎ কে কিভাবে দেখবেন? আপনার কাদার তাল টিকে কিভাবে আকৃতি দেবেন?

আর কিছু দিতে পারুন আর নাই পারুন, প্রতিটি শিশুকে তিনটি জিনিস অবশ্যই দিতে হবে- ভালবাসা, ভালবাসা এবং ভালবাসা…

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-