আইপিএলের ইতিহাসের অন্যতম সফল দল তারা। ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক এই টি-২০ টুর্নামেন্টে দুইবার শিরোপা জিতেছে দলটা। একদম শুরু থেকেই অধিনায়কত্বে ছিলেন ভারতের ক্যাপ্টেন কুল মহেন্দ্র সিং ধোনী। হ্যাঁ, চেন্নাই সুপার কিংসের কথাই বলা হচ্ছে। ম্যাচ গড়াপেটার অভিযোগে দুই মৌসুম তারা নিষিদ্ধ ছিল আইপিএলে, সেই নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ফের ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লীগে হাজির হয়েছে তারা, দুই ম্যাচে দুর্দান্ত দুটো জয় দিয়ে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষেও চড়ে বসেছে।

কিন্ত এই সাফল্য আনন্দ হয়ে ধরা দিচ্ছে না চেন্নাইয়ের মানুষের কাছে। বরং আইপিএলের এই আসরটাই তাদের কাছে অদ্ভুত এক বিড়ম্বনার নাম। তারা বরং চাইছে আইপিএল যাতে চেন্নাইতে না হয়, আর এজন্যে গ্যালারী থেকে নিজেদের দলের খেলোয়াড়দের দিকেই ছুঁড়ে মেরেছে জুতো, হুমকি দিয়েছে স্টেডিয়ামে সাপ ছেড়ে দেয়ারও! বিরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হবার আশঙ্কায় চেন্নাইয়ের পরবর্তী হোম ম্যাচগুলো সরিয়ে নেয়া হয়েছে পুনেতে। কিন্ত আইপিএলের প্রতি চেন্নাইবাসীর এমন ক্ষোভের কারণটা কি?

কারণ আর কিছু নয়, পানি। আরেকটু সহজ করে বললে, একটা নদীর পানি নিয়েই তুমুল আন্দোলন চলছে চেন্নাইতে। কাবেরী নামের নদীটা বয়ে গেছে তামিলনাড়ু আর কর্ণাটক- এই দুই প্রদেশের মধ্যে দিয়ে। সেই নদীর জলের সুষ্ঠু বণ্টনের দাবীতেই একত্রিত হয়েছে তামিলনাড়ুবাসী। তারা অনেকদিন ধরেই পানিবঞ্চিত, রাজ্যে পানির তীব্র সংকট বলেও দাবী করা হয়েছে তাদের পক্ষ থেকে। চেন্নাইয়ের সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে ফিল্মস্টার কিংবা রাজনীতিবিদ- সবাই নেমেছেন রাস্তায়, চলছে সভা-সমাবেশ। বছর দেড়েক আগে তো দুই রাজ্যের মানুষ দাঙ্গাই শুরু করেছিল এই নদীর পানিকে কেন্দ্র করে। কিন্ত কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়া আসলে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়, যেহেতু সমস্যাটা দুটো রাজ্যের মধ্যে।

কিন্ত কর্ণাটকে প্রাদেশিক নির্বাচন আসন্ন, এই সময়ে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার সেখানে এমন কোন সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে না, যেটা স্থানীয় বিজেপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে যায়। একারণেই কেন্দ্র চুপ করে আছে এই ব্যাপারে, নির্বাচন হয়ে গেলে তারপর এই বিষয়টা নিয়ে কাজ করবে বলে তামিলনাড়ুর বিজেপি সাংসদেরা ইঙ্গিত দিয়েছেন। কিন্ত কেন্দ্রীয় সরকারের এই নীরবতা মেনে নিতে ঘোর আপত্তি সেখানকার সাধারন নাগরিক আর রাজনীতিবিদদের। আর একারণেই বিক্ষোভের স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠেছে দাউদাউ করে। আন্দোলন চলছে ‘কাবেরী জলবণ্টন ম্যানেজমেন্ট বোর্ড’ গঠনের দাবিতে।

এরমধ্যেই শুরু হয়েছে আইপিএল। সেখানেই আপত্তি জানিয়েছে চেন্নাইয়ের নাগরিকেরা, বিশেষ করে আন্দোলনের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করা মানুষজন। আইপিএলের দামামায় তাদের আন্দোলন ঢাকা পড়ে যেতে পারে, এমনটাই আশঙ্কা তাদের। একারণেই বারবার তারা বিসিসিআইয়ের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে, চেন্নাইয়ের চিদাম্বরম স্টেডিয়ামে যাতে আইপিএলের ম্যাচ আয়োজন করা না হয়। আন্দোলনকারীদের দাবী ছিল, যেখানে মানুষ পানির দাবীতে আন্দোলন করছে, সেখানে ক্রিকেট মাঠের পেছনে পানি অপচয়ের কোন মানেই হয় না। চেন্নাইয়ের হোম ম্যাচগুলো অন্য কোথাও আয়োজনের দাবী তুলেছিল তারা, কিন্ত তাতে সায় দেয়নি বিসিসিআই।

চেন্নাই সুপার কিংস, তামিলনাডু, রজনীকান্ত, আইপিএল, কাবেরী নদী

আইপিএল শুরুর আগে, এমনকি শুরু হবার পরেও আন্দোলনকারীদের পক্ষ নিয়ে বিশিষ্টজনের বলেছিলেন, চেন্নাইতে আইপিএল চান না তারা। রজনীকান্ত-কমল হাসানের মতো ফিল্মস্টারেরাও ছিলেন এই তালিকায়, দুজনেই অবশ্য এখন রাজনীতিতে যোগ দিয়েছেন। রজনীকান্ত বলেছিলেন, “চেন্নাইয়ের এখন আইপিএল নিয়ে মাতামাতি করার মতো অবস্থা নেই। আর যদি এখানে খেলা দিতে হয়, তাহলে যেন ক্রিকেটারেরা আমাদের দাবীর সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে কালো ব্যাজ পরে মাঠে নামেন।”

অবশ্য এসবে কর্ণপাত করেনি আইপিএলের আয়োজক কমিটি। চেন্নাই বনাম কলকাতার ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে এখানে। শেষ বলে জয় পেয়েছে চেন্নাই। কিন্ত অঘটন ঘটেছে ম্যাচের মাঝপথে, ফিল্ডিং করার সময় দর্শকদের দুয়ো শুনেছেন চেন্নাইয়ের খেলোয়াড়েরা, ফাফ ডু-প্লেসিকে লক্ষ্য করে তো জুতোও ছুঁড়ে মারা হয়েছে! সেই জুতো হাতে নিয়ে ক্যামেরার চোখে বন্দীও হয়েছেন ডু-প্লেসি। হুমকি এসেছে, পরের ম্যাচে সাপ ছেড়ে দেয়া হবে চিদাম্বরম স্টেডিয়ামে! এর আগে স্টেডিয়ামের সামনে বিক্ষোভ করেছে আন্দোলনকারীরা, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষেও জড়িয়েছে তারা।

চেন্নাইয়ের স্থানীয় রাজনৈতিক দল তামিঝাগা ভঝভুরিমাই কাচির সভাপতি টি ভেলমুরুগান মিডিয়াকে জানিয়েছেন, “২০ তারিখে যদি আইপিএলের চেন্নাই বনাম রাজস্থানের ম্যাচটা এখানে হয়, আমি মাঠে সাপ নিয়ে গিয়ে প্রতিবাদ জানাব। স্টেডিয়ামে সাপ ছেড়ে দেব। এ সিদ্ধান্ত বদলানোর কোনো সুযোগ নেই। আর অবশ্যই এগুলো নির্বিষ সাপ। আমরা কারও ক্ষতি করতে চাই না, সেটা খেলোয়াড় হোক, দর্শক হোক কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ। আমাদের কারো সঙ্গেই শত্রুতা নেই। আমরা শুধু লোকজনকে ভয় দেখিয়ে তাড়াতে চাই। এখানে কোনো ক্রিকেট ম্যাচ আমরা আপাতত চাই না।”

এতদিন আন্দোলনকারীদের পাত্তা না দিলেও, এমন হুমকির পরে টনক নড়েছে বিসিসিআই কিংবা আইপিএলের আয়োজন কমিটির। দ্রুত বৈঠকে বসে আইপিএলে চেন্নাইয়ের পরবর্তী হোম ম্যাচগুলো পুনেতে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আইপিএল চেয়ারম্যান রাজীব শুক্লা জানিয়েছেন, চেন্নাইতে পুলিশ পর্যাপ্ত নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিতে পারছে না, কাজেই খেলোয়াড়দের জীবন নিয়ে ঝুঁকি নেয়ার কোন মানেই হয় না।

২০শে এপ্রিল পুনেতে রাজস্থান রয়্যালসের বিপক্ষে নিজেদের নতুন হোম গ্রাউন্ডে প্রথম ম্যাচটা খেলবে চেন্নাই সুপার কিংস। আইপিএলে ফেরাটা খুব বেশী সুখকর হলো না দলটার জন্যে। নিজেদের দর্শকের সমর্থন ছাড়াই যে এবার খেলতে হবে ধোনীদের!

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-