ইনসাইড বাংলাদেশরাজনীতি নাকি জননীতি

ছাত্রলীগের কমিটিতন্ত্র: বলি এবার শিশুরা?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন প্রত্যেক বিভাগে বিভাগে ছাত্রলীগের কমিটি দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়, তখন অল্প কিছু মানুষ সেটার বিরোধীতা করেছিল। বিভাগে কমিটি দেয়ার এই হঠকারী, অযৌক্তিক সিদ্ধান্তের বিরূদ্ধে একটা পোস্ট করেছিলাম আমি সে সময়। একদিন পরে আমার ছাত্রলীগ করা এক বন্ধু একটা স্ক্রিনশট পাঠায় আমাকে, সেখানে দেখলাম ছাত্রলীগের এক নির্বোধ আমি সহ, আমার ঐ পোস্ট যারা যারা শেয়ার করেছে তাদের সকলের ছবি নিয়ে একটা অ্যালবাম বানিয়েছে, আর ক্যাপশনে লিখেছে- “এগুলার কলিজা দাড়িপাল্লায় মাপতে চাই। প্লিজ কেউ আবার বইলেন না ছাত্রলীগ ওজনে ফাঁকি দেয়।”

পরে জানতে পারি ঐ ছেলে আমার এক কী দু বছরের জুনিয়র। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই ‘হুমকি’ পেয়ে, আরো কয়েকজন, যারা কমিটি দেয়ার বিরোধিতা করছিল- তারা পোস্ট ডিলিট করে, ক্ষমা চেয়ে বসে! এই যে ভয়ের সংস্কৃতির বাম্পার ফলন- এটাই ছাত্রলীগের সফলতা অথবা ব্যর্থতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র তার থেকে কয়েক ব্যাচ জুনিয়র এক ফাতরা ছেলের পোস্ট দেখে ক্ষমা চেয়ে বসেছে- এর থেকে লজ্জার আর কী হতে পারে?

সেদিন একটা খবরে দেখলাম- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি দশ জনের ছয় জনই নেতা! অর্থাৎ কোন না কোন কমিটির পদ প্রাপ্ত। এরকম হবার কারণ, প্রতিটা বিভাগে কমিটি দেয়া হয়ে গেছে। এখন এখানে অজস্র নেতা! আমার ফ্রেন্ডলিস্টেই অনেক জন নেতাকে আবিষ্কার করলাম, যারা সৃষ্টিকর্তা এবং বড় ভাইদের ধন্যবাদ জানিয়ে পোস্ট দিয়েছে। সর্বনাশ যা হওয়ার হয়ে গেছে, আমাদের আর কিছু করার নেই। একটা অযৌক্তিক সিদ্ধান্তকে আমাদের মেরুদণ্ডহীন ছাত্রছাত্রীরা মেনে নিয়েছে। পরবর্তীতে যা হবার তাই হবে। তবে আমার আপত্তি অন্য জায়গায়। যারাই কমিটিতে প্রসাদ পেয়ে ধন্য হয়েছেন, তারা প্লিজ নিজেদের কখনো ‘নেতা’ বলে পরিচয় দেবেন না, বা নিজেকে ‘নেতা’ ভাববেন না।

আপনারা ‘নেতা’ নন, একটি সংগঠনের ‘প্রতিনিধি’ মাত্র। নেতা হতে হলে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে আসতে হয়। আপনি যে বিভাগে অমুক তমুক সম্পাদক হয়েছেন, কে বানিয়েছে আপনাকে? দলেরই সিনিয়র ‘ভাই’রা। পাবলিক বা এক্ষেত্রে অন্যান্য ছাত্রছাত্রীদের কাছে আপনাদের কোন গ্রহণযোগ্যতা নেই। সেভাবে চিন্তা করতে গেলে, পুরো ছাত্রলীগে একজনও ‘নেতা’ নেই। পদপ্রাপ্ত সকলেই আসলে তার উচ্চ পর্যায় থেকে মনোনীত প্রতিনিধি!

এই নেতৃত্বহীন ছাত্রলীগ এখন নজর দিয়েছে স্কুল গুলোর দিকে। স্কুলে নাকি তারা ‘স্কুল কমিটি’ গঠন করবে! এটাকে জায়েজ করার প্রক্রিয়া হিসেবে অনেকে স্কুল পর্যায়ে শিবিরের সক্রিয়তার কথা তুলছে। তো শিবির তো রগ কাটায় পারদর্শী, ছাত্রলীগেরও এখন সেই প্রাক্টিস শুরু করা উচিত বলে মনে করেন আপনারা? শিবিরের স্টাইলটা খেয়াল করেছেন? সেরকম কিছু করছেন না কেন তাহলে? ‘কিশোর কন্ঠ’ এর মত একটা শিশু-কিশোর ম্যাগাজিন প্রকাশ করুন প্রতি মাসে, যেখানে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর কথা থাকবে। শিবিরের মত ফ্রি-তে বিলান সেগুলো স্কুলে স্কুলে। প্রতিটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক প্রতিযোগিতা, প্রদর্শনী, উৎসব করুন। এরজন্য ‘স্কুল কমিটি’ গঠন করা খুব জরুরী?

‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া’ যদি মূল উদ্দেশ্য হয়, সেটা আরো অনেক ভাবেই করা সম্ভব। সব থেকে ভালো হয় যদি আপনারা এই ছেলেমেয়ে গুলোর কাছে উদাহরণ হয়ে উঠতে পারেন। সেটাই তো পারছেন না। বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে তো আপনারাই ধারণ করতে পারেননি। বঙ্গবন্ধু জনগণের প্রতিনিধি হয়ে রাজনীতি করেছেন আজীবন, আদর্শের প্রশ্নে গুরু সোহরাওয়ার্দীর বিরোধীতা করতেও পিছপা হননি। আর আপনারা তেলবাজি, মাস্তানি আর চামচামি করে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ প্রতিষ্ঠা করবেন! হাসালেন মশাই!

অভিভাবকদের দৃষ্টি আকর্ষন করছি। আপনার সন্তান যেন কোনোভাবে এসব কমিটির ফাঁদে না পড়ে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখুন। শিবির বা ছাত্রলীগ যেই হোক, নোংরা রাজনীতির বিষ যেন কেউ আপনার সন্তানের মস্তিষ্কে বপন করতে না পারে। কী বললেন? নেতা বানাবেন সন্তান কে? এইদেশে? এই দেশে নেতা হওয়া সম্ভব বলে আপনি মনে করেন? গণতান্ত্রিক পরিবেশে নেতা হয়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে, রাজতন্ত্রে থাকেনা। এই রাজনীতি করে আপনার সন্তান বড়জোর এলাকার প্রভাবশালী মাস্তান হতে পারবে- এর বেশি কিছু নয়।

সংসদ যখন ঠিক করে দেয় আদালত কী নিয়ে মাথা ঘামাবে, আর কী নিয়ে ঘামাবে না- তখন সেটাতো এক রকম রাজতন্ত্রই। আমি বলি কী, সরাসরি রাজতন্ত্র ঘোষণা করে দিলেই হয়। মানুষজনও তাহলে এটা- ওটা নিয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করবে না। রাজাই তার দরবারে বসে ঠিক করবে কী হবে না হবে, অন্যদের পরামর্শ সে নেবে, কিন্তু সিদ্ধান্ত তারটাই ফাইনাল। বিচার-আচারের জন্য কাজী অবশ্য থাকবে, তবে তারা ঐ চুরি-চামারির মত ছিচকে বিষয়ের বিচার করবে শুধু। রাজার সিদ্ধান্ত নিয়ে টু শব্দটি করতে পারবে না, তাহলে কাজীকে বহিষ্কার করে নির্বাসনে দেয়া হবে। ব্যাপারগুলো আসলে এমনই ঘটছে এখানে। কিন্তু কাগজে কলমে আছে ভিন্ন কথা। তাই মাঝে মধ্যে এদিক সেদিক থেকে চিৎকার ওঠে। কাগজে কলমে লিগালাইজ করে নিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়!

তার আগ পর্যন্ত- কমিটিতন্ত্র জিন্দাবাদ।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close