আপনি-ই সাংবাদিক

এক স্বপ্নের পথে যাত্রা, চারুকলার পথে যাত্রা

সম্ভবত দেশের সবচেয়ে সুন্দর ক্যাম্পাস। গেইট দিয়ে ভেতরে ঢোকার আগেই দেয়াল পরিপূর্ন দেয়ালচিত্রে, ভেতরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়বে ইজেলের সামনে দাঁড়িয়ে রঙ তুলি নিয়ে অবিরাম খেলায় মত্ত কিছু নবীন শিল্পী। চোখ মেললেই অনিন্দ সুন্দর আর্কিটেকচার আর ভাস্কর্য নজর কেড়ে নেবে। আর একটু ভেতরে গেলেই চোখে পড়বে ভাস্কর্য নির্মাণকারী ভাস্করদের। চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সব শিল্পকর্ম,ভাস্কর্য; গাছপালা পরিপূর্ণ চারিদিকে। গাছপালার ও রয়েছে রকমফের, যেন মনে হয় এমন কোন গাছ নেই যা নেই সেখানে। আর গাছগুলো যেন কে সাজিয়ে গুছিয়ে রোপন করে দিয়েছে, অসাধারন ল্যান্ডস্কেপ আর সৌন্দর্য; শিল্পাচার্যের চারুকলা। শিল্পপ্রেমিক আর শিল্পীদের স্বপ্নের চারণভূমি চারুকলা অনুষদ,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (পূর্ব নাম চারুকলা ইন্সটিটিউট) বাংলাদেশের চারু ও কারুশিল্প পাঠদানের প্রধান শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের হাত ধরে ১৯৪৮ সালে পুরাতন ঢাকার জংশন রোডে ন্যাশনাল মেডিক্যাল স্কুলের একটি বাড়ীতে চারুকলা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যাত্রা শুরু করে যা বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত একটি অনুষদ। প্রতিষ্ঠাকালে চারুকলা ইন্সটিটিউটের নাম ছিল ‘গভর্ণমেন্ট আর্ট ইনস্টিটিউট’। ১৯৬৩ সালে এটিকে প্রথম শ্রেণীর কলেজে উন্নীত করে নামকরণ করা হয় ‘বাংলাদেশ চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়’। ১৯৮৩ সালে এই প্রতিষ্ঠানকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে এনে ‘চারুকলা ইন্সটিটিউট’ নামকরণ করা হয়। সম্প্রতি এটি অনুষদের মর্যাদা লাভ করে, চারুকলা অনুষদ নাম ধারণ করে। ৩টি বিভাগ নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই চারুকলা অনুষদে বর্তমানে নিম্নোক্ত ৮ টি বিভাগ রয়েছে।

-অঙ্কন ও চিত্রায়ণ বিভাগ
-ছাপচিত্র বিভাগ
-ভাস্কর্য বিভাগ
-কারুশিল্প বিভাগ
-গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগ
-প্রাচ্যকলা বিভাগ
-মৃৎশিল্প বিভাগ
-শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগ

এই আটটি বিভাগ থেকে শিক্ষার্থীরা বি.এফ.এ(ব্যাচেলর অব ফাইন আর্টস) ও এম.এফ.এ (মাস্টার্স অব ফাইন আর্টস) ডিগ্রী অর্জন করে। চারুকলায় মূলত সেসব শিক্ষার্থীরাই ভর্তি হয় যারা স্বপ্ন দেখে শিল্পী হবার, যারা ছবি আঁকতে ভালবাসে, যারা ভালবাসে ভাস্কর্য বানাতে, ডিজাইন করতে, যারা কারুশিল্প নিজে কাজ করে আনন্দ পায়,যারা চারুকলার ইতিহাস নিয়ে পড়তে চায়-জানতে চায়; মোটকথা যারা শিল্পচর্চা করে, শিল্প নিয়ে ভাবে, শিল্পকে ভালবাসে, শিল্পী হবার স্বপ্ন দেখে তারাই চারুকলার পড়ে, তারাই চারুশিক্ষার্থী। কিন্তু এর মাঝে একটা কিন্তু রয়ে যায়, যারা চারুশিল্পী হবার স্বপ্ন দেখে সবাই কি সুযোগ পায় এই প্রাঙ্গণে আসার? এখানকার ছাত্র হবার? না, পায় না কিছু দূর্ভাগা শিল্পী। কয়েকটি কারনে তারা লক্ষ্যচ্যুত হয়। প্রধান কারন আমাদের একঘেয়েমি মানসিকতা। যে কারনে অধিকাংশ শিল্পী শিল্পচর্চা বাদ দিয়ে ডাক্তার,ইঞ্জিনিয়ার,ব্যাংকার,সরকারি চাকুরীজীবী ইত্যাদিতে পরিনত হয় কেবলমাত্র সমাজ,পরিবারের চাপে। এ প্রসঙ্গে একটা ছোট্ট গল্প বলি। গল্প না ঠিক এক বাস্তব ঘটনা। “ছেলেটা ছেলেবেলা থেকেই ছবি আঁকতে ভীষন ভালবাসত। তার বাবা মা কখনোই এসব পছন্দ করতোনা।তারা সর্বদা চাইতো তাদের সন্তান বড় হয়ে ডাক্তার হোক। সেজন্য ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি ছোটবেলা থেকেই অনেক তোরপজোর ছিল আর এসব ছবি আঁকা ছিল নিছক সময় নষ্ট করার এক অজুহাত। তারপরেও সেই পড়াশোনার চাপের ফাঁকেও ছেলেটা ছবি আঁকতো,চেষ্টা করতে ভাল কিছু আঁকার। সেকারনে সে যেমন ক্লাস ফাইভে, এইটে বৃত্তি পেত তেমন নানা ড্রইং প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরষ্কার ও পেত। কিন্তু ছেলেটা বড় হতে থাকে, বুঝতে থাকে অনেক কিছু,জানতে পারে অনেক কিছু। এসএসসি এইচএসসি দুটোতেই গোল্ডেন এ প্লাস পায় সে। এর পর ভর্তি যুদ্ধ। সেই সাথে যুদ্ধ পরিবারের সাথে নিজের সাথে,নিজের স্বপ্নের সাথে। ঢাকায় নিয়ে তার বাবার সাথে যেয়ে ভর্তি হয় মেডিকেল ভর্তি কোচিং। ভর্তিযুদ্ধ। তার স্বপ্ন শিল্পী হবার। মেডিকেলে পড়ার ইচ্ছে তার বিন্দুমাত্রও নেই। এদিকে চারুকলায় পড়তে হলে কি করতে হবে সেটিও তার অজানা। একদিন কোচিং বাদ দিয়ে চলে গেল চারুকলায়। জানতে, দেখতে, বুঝতে।

সেখানে গিয়ে একটা সাইনবোর্ড দেখতে পেল, খসড়া,চারুকলা ভর্তি বিষয়ক কর্মশালা ২০১৩। সেখানে কয়েকটা ফোন নম্বর দেওয়া আছে। ফোন নম্বরগুলো টুকে নিয়ে চলে যায় সে। রাতে সেই নম্বরে ফোন দিয়ে সব জানে। চারুকলায় পড়তে হলে কি যোগ্যতা লাগে,কিভাবে পরীক্ষা হয় সব। আর এই কর্মশালায় ভর্তি হলে চান্স পাওয়া হবে সহজ। কিন্তু সেখানে ভর্তি হতে হতে ৫৬০০ টাকা লাগবে। সেটা তো বাসায় চাইলে পাবে না। আর টাকা যোগার না হলে সে কর্মশালায় পড়তে পারবে না। তাকে সব সময় তার একজন বন্ধু অনুপ্রেরণা দিত, সে কেবল তার বন্ধুই ছিল না ছিল এমন একজন মানুষ যাকে সব বলা যায়, যে সব বোঝে, যে পাশে থাকে । সেই তাকে তার জমানো টাকা থেকে কর্মশালায় ভর্তির টাকাটা দিয়ে দেয়। শুরু হয়ে যায় তার যাত্রা। মেডিকেল কোচিং এর নামে চারুকলা ভর্তি কর্মশালায় যেত রোজ। এভাবেই মেডিকেল এ চান্স না পেয়ে চারুকলায় একদিন চান্স পেয়ে যায় সে। এরপরেও সেখানে ভর্তি হতে পরিবারের বাধা নিষেধ সব অমান্য করে যুদ্ধ করে ভর্তি হয়ে যায় সে। পাশে ছিল তার সেই বন্ধু আর কর্মশালার শিক্ষক, বন্ধু বান্ধব সবাই।”

আজ সে চারুকলার ছাত্র। আর সেই ছেলেটি আমি। এতো গেল আমার মত এক দূর্ভাগ্যবশত সৌভাগ্যবান ছেলের গল্প,কিন্তু অনেকেই পরিবারে সপ্ন পূরণে নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দেয়। আরেকদল ভর্তিপরীক্ষায় অংশগ্রহন করার সুযোগ পায়না পূর্ববর্তী রেজাল্ট(এস এস সি, এইচ এস সি) খারাপ হওয়ায় প্রশাসনের কাছে অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবার কারনে। আর আরেকদল হারিয়ে যায় ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে চান্স না পেয়ে এই মহাপ্রতিযোগীতায়। দেখা যায় ছোটবেলা থেকেই অনেকে অসাধারন ভাল ছবি আঁকতে পারলেও তত্ত্বীয় পরীক্ষায় পাশ করতে ব্যর্থ হয়। সে লক্ষ্যে এসকল শিক্ষার্থীদের জন্য একটি কর্মশালা আয়োজিত হয়। আর এই সব বাধা উপেক্ষা করে চান্স পায় গুটিকয়েকশ ছাত্রছাত্রী। আর তাদের সংখ্যা ১৩৫ জন।

এই ১৩৫ টি আসনে ভর্তি হবার জন্য পরীক্ষায় অংশগ্রহনের নূন্যতম যোগ্যতা হিসেবে ধরা হয় (চতুর্থ বিষয় ব্যাতিত) এস,এস,সি ও এইচ,এস,সি GPA এর নূন্যতম যোগফল ৬.৫০ এবং এস,এস,সি ও এইচ,এস,সি তে পৃথক ভাবে GPA (চতুর্থ বিষয় ব্যাতিত) ৩.০০ থাকতে হবে। যেখানে কারিগরি বোর্ড ও মাদ্রাসা বোর্ড খেকে উত্তীর্ণ সকল শিক্ষার্থী অংশগ্রহনের করতে পারবে। এবছরের কোন সিদ্ধান্ত এখনও জানা যায় নি। এছাড়াও জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা অনুষদের ভর্তির ন্যূনতম যোগ্যতা প্রায় কাছাকাছি থাকে।

ছবি- খসড়া

এই অনুষদের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে ১২০ নাম্বারের উপর এবং এস,এস,সি ও এইচ,এস,সি এর ফলাফলের উপর ৮০ নাম্বার (সর্ব মোট ২০০ নাম্বার)। চ- ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা দুই ভাগে অনুষ্টিত হয়। ৬০ নাম্বার থাকে MCQ পরীক্ষা, সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে বাকী ৬০ নাম্বর অঙ্কন পরীক্ষার উপর। ৬০ নাম্বারের MCQ পরীক্ষায় ভাল করতে চাইলে যে কোন শিক্ষার্থীকে চারুকলার ইতিহাস, শিল্পকলার ইতিহাস, বাংলাদেশের স্থাপত্তকলা, সাহিত্য, বাংলাদেশের শিল্পকলা এবং সাম্প্রতিক বিষয়বস্তুর উপর অবশ্যই দক্ষ হতে হবে। এছাড়াও বাংলা, ইংরেজি ও ব্যাকরণ বিষয়েও প্রস্তুতি নিতে হবে সেই সাথে সাধারন জ্ঞান। MCQ এবং অঙ্কনে সমান সমান নাম্বার থাকা সত্ত্বেও অঙ্কনে প্রাপ্ত নাম্বার চারুকলায় ভর্তির ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। অঙ্কন পরীক্ষায় ভাল করতে চাইলে শিক্ষার্থীদের কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করতে হবে। অংকনের রেখার মান, আলোছায়া, পরিপেক্ষিত, কম্পোজিশন, অনুপাত এই বিষয় গুলির উপর নির্ভর করে অংকনের মান যাচায়ের মাধ্যমে নাম্বার দেয়া হয়। সুতরাং এই বিষয়গুলির উপর সুস্পষ্ট ধারণা ব্যাতিরেক অংকন পরীক্ষায় ভাল করা সম্ভব নয়।

২০১৬ -২০১৭ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বাধিক প্রতিযোগিতা হয় চারুকলা অনুষদ (চ ইউনিট) এ। গত বছর চ ইউনিটে মোট ১৩৫ টি আসনের প্রতি ১টি আসনের বিপরীতে প্রায় ১১৫ জন এর মত আবেদন করেছিল। তাই এখন মোটেও হেলাফেলার নয়, অনেক প্রতিযোগিতা। লক্ষ্য স্থির রেখে দৃঢ় প্রস্তুতি নিতে হয় ভর্তিচ্ছু সকল শিক্ষার্থীদের। চারুকলায় ভর্তিতে আগ্রহী শিক্ষার্থীরা যেন চারুকলার পড়াশোনা সম্পর্কে একটি নূন্যতম ধারণা নিয়ে চারুকলায় ভর্তির সুযোগ পায়, এই উদ্দেশ্য নিয়ে প্রতি বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের চতুর্থ বর্ষের বি,এফ,এ (সম্মান)এর শিক্ষার্থীরা অনুষদের প্রঙ্গনেই একটি কর্মশালার কার্যক্রম শুরু করে। যেখানে বাংলাদেশের যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলায় ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীদের কে সহায়তা প্রদান করা হয়। চারকোল,রঙ্গন, অঙ্কি, খসরা, কুঁড়ি, অক্ষর, কাঠপেন্সিল প্রভৃতি নামে আয়োজিত হয় এই কর্মশালা প্রতি বছর। সে কর্মশালার ক্লাস হয় চারুকলা প্রাঙ্গনে। তবে একটা বিষয় লক্ষ্যনীয় প্রতি বছর অধিকাংশ শিক্ষার্থী চান্স পায় এই কর্মশালা গুলো থেকেই। কিন্তু দুঃখের বিষয় এর মাঝে হারিয়ে যায় প্রকৃত শিল্পপ্রেমি, ভর্তিচ্ছু মেধাবী শিক্ষার্থীরা। কারন তাদের এই পরীক্ষার প্রস্তুতি অসম্পূর্নই থেকে যায়। তাই কর্মশালার প্রতিটি শিক্ষক শিক্ষিকার লক্ষ্য থাকে যেন প্রকৃতমেধাবীরাই এই কর্মশালার শিক্ষার্থী হয় এবং চারুকলায় ভর্তি হবার সুযোগ লাভ করে। ভর্তিচ্ছুদের ১৩৫ জন চতুর্থ বর্ষের চারুশিক্ষার্থীরা রেখা,বৃত্ত,আলো ছায়া সহ ভর্তি সহায়ক সকল ড্রইং সহজে সুন্দরভাবে কিভাবে পারা যায় তা শেখানো এবং তত্ত্বীয় বিষয়ে পাঠদান করে। এবং তাদের হাত ধরেই চারুকলায় আসে নতুন একঝাঁক নবীন শিল্পী।আর প্রতি বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও কর্মশালার আয়োজন রয়েছে। এবারের কর্মশালার নাম ‘জংশন।’ আয়োজন করেছে চারুকলা অনুষদের ২০১৩-১৪ সেশনের ২২তম ব্যাচের নবীন শিল্পীরা। যাদের হাত ধরে আসবে চারুকলা ২৬ তম ব্যাচের নবীন শিল্পীরা। ইতিমধ্যে কার্যক্রম শুরু ও হয়ে গেছে। চারুকলা ভর্তিচ্ছুসহ যেকোন শিল্পপ্রেমি বা যেকেউ অংশ নিতে পারে এই কর্মশালায়, হতে পারে ‘জংশন’ এর যাত্রী । এই কর্মশালার লক্ষ্য প্রকৃত শৈল্পিক মেধাসম্পন্ন শিক্ষার্থিরা যাতে চারুকলায় ভর্তি হবার সুযোগ পায় এই মহাপ্রতিযোগীতাময় ভর্তি পরীক্ষা থেকে। এই কর্মশালা একটি যাত্রা, চারুকলার পথে যাত্রা, শিল্পী হবার পথে যাত্রা, এক স্বপ্নের পথে যাত্রা, সেই স্বপ্নের নাম চারুকলা।

 

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close