জাতীয় চার নেতার লিস্ট হাতে দিয়ে রিসালদার মোসলেম উদ্দিন বললো, এদেরকে আলাদা করে দিন।

রশিদ আগেই ফোন করে প্রিজনের আইজিকে বলেছিলো মোসলেম উদ্দিনের আসার কথা। আইজি নুরুজ্জামান জেলার আমিনুর রহমানের হাতে লিস্ট দিয়ে বললেন, ‘তাদেরকে আলাদা এক রুমে নিয়ে আসেন।’ পাগলা ঘন্টা বেজেই চলেছে, জেলের নিরাপত্তার জন্য ২০০ বিডিআর, পুলিশ সদস্য ছিল কিন্তু নিয়ম মোতাবেক কেউই এগিয়ে আসলো না। জেলার আমিনুর ও সুবেদার ওয়াহেদ মৃধা চাবি নিয়ে ১ নম্বর রুমের তালা খুলেন, এ সময় তাজউদ্দীন আহমদ জিজ্ঞেস করলেন কি ব্যাপার? তারা বললেন– আর্মি এসেছে।

লিস্টের দুজন তাজউদ্দীন আহমদ ও নজরুল ইসলাম আগে থেকেই ছিলেন ১ নম্বর রুমে, ২ নম্বর রুম থেকে কামরুজ্জামান আর ৩ নম্বর রুম থেকে মনসুর আলীকে ১ নম্বর রুমে আনা হলো। তাজউদ্দীন আহমদ তাঁর তিন সঙ্গীদের কে বললেন, সময় নেই ওযু করে আসেন। চারজনই বাথরুম থেকে ওযু করে এলেন, নামাজ পড়লেন, পানি খেলেন। জেলার ও সুবেদার চৌকি সাজালেন, তারা ভেবেছিলেন আর্মি এসে নেতাদের সাথে কথা বলবেন। চৌকির একপাশে বসলেন, নজরুল ইসলাম, তারপর তাজউদ্দীন আহমদ, কামরুজ্জামান আর এপাশে বসলেন মনসুর আলী। ইতিমধ্যে রিসালদার মোসলেম উদ্দিন বলে ফেলেছে তারা এসেছে এই চার নেতাকে হত্যা করতে, আইজি ডিআইজি এই কথা শুনে অবাক, ফোন করলেন প্রেসিডেন্ট মোশতাকের কাছে। মোশতাক বললো, সে যা বলছে তাই হবে। বিলম্ব দেখে উত্তেজিত হয়ে মোসলেম বললো – শেখ মুজিবকে খতম করতে আমার মাত্র ৩ মিনিট সময় লেগেছিল!

জেলার ও সুবেদার ফিরে এলেন, জানালেন নেতাদেরকে আলাদা করা হয়েছে, সাথে সাথেই ক্যাপ্টেন মোসলেম ও তার দল সেই রুমের দিকে রওয়ানা দিলো। ডিআইজি আব্দুল আওয়াল বাধা দিলেন একটু, মোসলেম তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে বলে আপনি চলে যান, আপনি ভয় পাইছেন। তারপর তারা সোজা চলে গেলো ১ নম্বর রুমের দিকে, জেলার ও সুবেধার তখনো জানেন না যে নেতাদেরকে হত্যা করা হবে, তারা ভেবেছিলেন কথাবার্তা হবে তাই পরিচয় করিয়ে দিতে চাইলেন He is Mr. Mon… পুরো নাম বলতে পারেননি, সাথে সাথে গুলি শুরু হলো। প্রায় ৬০ রাউন্ড গুলি, টেবিলে রাখা কোরআন শরীফ গুলিতে ফুটো হয়ে গিয়েছিল, ছাদ, দেয়াল, ফ্লোর, শিকলে গুলি আর গুলি, স্টেনগান বা এলএমজি দিয়ে গুলি করা হয়।

গুলি করার পর দ্রুত তারা জেলগেট দিয়ে বের হয়ে যায়। রেকর্ড অনুসারে ক্যাপ্টেন মোসলেম ও তার দল এসেছিল ভোর ৪টায়, ওরা বেরিয়েছে ৪টা ৩৫ মিনিটে, এরপর ভোর ৫টা ২৫ মিনিটে নায়েক এ. আলির নেতৃত্বে আরেকটি দল ভিকটিমের মৃত্যু নিশ্চিত করতে আসে, এসে দেখতে পায় তখনো মনসুর আলী সাহেব নাড়াচাড়া করছিলেন। তাকে বেয়োনেট চার্জ করা হয়, পরে ৫টা ৩৫ মিনিটে বের হয়ে যায়। জাতীয় নেতাদের লাশ পরে থাকে ওভাবেই, ৩ তারিখ পুরো দিন শেষ হয়, ৪ তারিখ রাতে এসে লাশ পচে যাচ্ছে দেখে ময়নাতদন্ত শেষে লাশগুলি পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধের সফল এই চার নেতা যারা স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন তারা সেই স্বাধীন দেশেই সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা জেলের মধ্যে খুন হন, খুন হয় বাংলাদেশ…

#জেলহত্যা

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-