জাত অভিনেতা বলতে যেটা বোঝায়, তিনি সেটাই। নিজেকে নায়ক বা তারকা নয়, নগণ্য একজন অভিনয়শিল্পী ভাবতেই পছন্দ তার। নাটকে নিয়মিত, কিন্ত বড় পর্দায় তার দেখা মেলে দীর্ঘ বিরতির পর। সিনেমায় কাজ করেন খুব বেছে বেছে, কারণ নাটকে অভিনয় করাটা তার কাছে পেশা, আর সিনেমাটা নেশা, সম্মানের জায়গা। এটুকু তিনি নিশ্চিত করতে চান, লোকে যেন তার সিনেমা দেখতে গিয়ে বিরক্ত না হয়। আর সেকারণেই এত বাছাবাছি।

পরিসংখ্যান আর ইতিহাস বলছে, এই বাছাইয়ের ফল কিন্ত শুভ। যে ক’বারই তাকে ছোটপর্দা ছেড়ে বড় পর্দায় কাজ করতে দেখা গেছে, নিজের অভিনয় প্রতিভার সবটুকু সেখানে ঢেলে দিতে পেরেছেন তিনি। ক্যারিয়ারে মোট সিনেমার সংখ্যা মাত্র পাঁচটি, এরমধ্যে সেরা অভিনেতা হিসেবে বাগিয়ে নিয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও। তিনি ‘মনপুরা’র সোনাই, ‘মনের মানুষে’র কালুয়া, ‘টেলিভিশনে’র সোলায়মান, ‘আয়নাবাজী’র আয়না। তিনি আমাদের চঞ্চল চৌধুরী!

পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলায় তার জন্ম, ১৯৭৪ সালে। পরিবারের দেয়া নাম সুচিন্ত চৌধুরী চঞ্চল। তবে নামে চঞ্চল হলেও, ছোটবেলায় বেশ শান্তশিষ্ট স্বভাবের ছিলেন তিনি। ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত মফস্বলেই পড়ালেখা করেছেন, তারপর চলে এলেন জাদুর শহর ঢাকায়। ভর্তি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, বিভাগের নাম চারুকলা। পরিবারে সাংস্কৃতিক আবহটা ছিল, অল্প বয়সে গানবাজনা শিখেছিলেন, কিন্ত পরে আর সেসবে জড়াতে ইচ্ছে হয়নি। ঢাকায় এসে প্রথম মঞ্চনাটক দেখার অভিজ্ঞতা হলো চঞ্চল চৌধুরী নামের সেই ছেলেটার, কৈশর থেকে তখন যৌবনে পদার্পণের প্রহর গুণছিল যে।

অদ্ভুত একটা ভালোলাগায় আক্রান্ত হলেন চঞ্চল চৌধুরী, প্রথম প্রেমে পড়ার মতো একটা অনুভূতি। হ্যাঁ, চঞ্চল প্রেমে পড়লেন, মঞ্চনাটকের প্রেমে, অভিনয়ের প্রেমে হাবুডুবু খেতে লাগলেন তিনি। সেই মুগ্ধতাকে পাশ কাটিয়ে চলা সম্ভব হলো না তার পক্ষে, ১৯৯৬ সালে যোগ দিলেন মামুনুর রশীদের ‘আরণ্যক নাট্যদলে’। দীর্ঘদিন তিনি মঞ্চের ব্যাকস্টেজে কাজ করেছেন, মঞ্চে নিজের অভিনয়প্রতিভা দেখানোর সুযোগ শুরু থেকে পাননি। কিন্ত তাতে তার আক্ষেপ ছিল না একটুও। তিনি মঞ্চের সঙ্গে জড়িত থেকেই খুশী ছিলেন। আরণ্যকের হয়ে তিনি প্রথম অভিনয় করেন ‘কালো দৈত্য’ নাটকে। তারপর সংক্রান্তি, রাঢ়াঙ, শত্রুগণ… তালিকাটা কেবল দীর্ঘ হয়েছে।

চঞ্চল চৌধুরী, মনপুরা, আয়নাবাজি

২০০০ সালে প্রথমবারের মতো টিভি নাটকে অভিনয়ের সুযোগ এলো। নাটকের নাম গ্রাস, পরিচালক ছিলেন ফরিদুর রহমান। সেই থেকে শুরু, বোকাবাক্সে চঞ্চল চৌধুরী যুগের। প্রথম থেকেই যে সফলতা পেয়ে আসছিলেন, ব্যপারটা তেমন নয়। চঞ্চল চৌধুরী লেগে ছিলেন, অভিনয়কে বানিয়েছিলেন তার ধ্যানজ্ঞান। ততদিনে গ্র‍্যাজুয়েশন শেষ হয়ে গেছে। সহপাঠীরা যখন চাকুরী বা বিসিএস নামের সোনার হরিণের পেছনে ছুটছেন, চঞ্চল চৌধুরী তখন নাটকের স্ক্রীপ্ট আত্নস্থ করতে ব্যস্ত।

টিভি পর্দায় দারুণ কিছু কাজ আছে চঞ্চল চৌধুরীর। সালাউদ্দিন লাভলু আর বৃন্দাবন দাসের সঙ্গে মিলে গ্রামীন পটভূমির নাটককে টেলিভিশনে ভীষণ জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন তিনি, আবার দর্শক তার সেই একঘেয়ে গ্রাম্য চরিত্রে দেখতে দেখতে বিরক্তও হয়েছে একটা পর্যায়ে। যে হাড়কিপ্টে দিয়ে তিনি মানুষকে পেট ফাটিয়ে হাসিয়েছেন, সেই চঞ্চল চৌধুরীকেই আবার একই রকম চরিত্রে বারবার অভিনয় করতে দেখে ক্লিশে মনে হয়েছে অনেকটা। চঞ্চল নিজেও স্বীকার করেন ব্যপারটা, নাটক তার কাছে রুটি-রুজির মূল জায়গা। এখান থেকেই তিনি আয় করেন। একারণে কাজ করতেই হয়, মানের সঙ্গে আপোষ করতে হয়।

টিভি নাটকে হাজারটা সমস্যা, বাজেট কম, ভালো গল্প নেই খুব বেশী, একটা ধরণ জনপ্রিয় হয়ে গেলে সেটাকেই বারবার অনুকরণের চেষ্টা করা হয় এখানে, তার ওপরে শিডিউল জটিলতা তো আছেই, একঘন্টার একটা নাটকের শুটিং টেনেহিঁচড়ে দুইদিনে শেষ করে ফেলা হয়! চঞ্চল জানেন সবই, বোঝেন সবকিছু, কিন্ত তিনি একা তো সবকিছু বদলে দিতে পারবেন না। পুরো ব্যপারটাই টিমওয়ার্ক। আর সেকারণেই তালপাতার সেপাই, নিখোঁজ সংবাদ, ভবের হাট, ধান শালিকের গাঁও কিংবা হাড়কিপ্টা’র চঞ্চল চৌধুরীকে এক ঈদে পনেরো-বিশটা নাটকে অভিনয় করতে দেখলে মন খারাপ হওয়া ছাড়া করার কিছুই থাকে না।

তবে ক্ষেত্র বদলে পর্দাটা যখন ছোট থেকে বড় হয়ে যায়, তখন বোধহয় চঞ্চল চৌধুরীর সেরাটা বেরিয়ে আসে। সিনেমাটা তার কাছে প্যাশন, ভালোবাসার আরেক নাম। এখানে তিনি আপোষ করেন না, ছাড় দেন না বিন্দুমাত্রও। না নিজের সাথে, না অন্য কোনকিছুর সাথে। গল্প, চরিত্র, পরিচালক সবকিছু পছন্দ হলে, তার যদি মনে হয় যে এই চরিত্রে দর্শক তাকে পছন্দ করবে, তাহলেই তিনি সেই কাজটায় ‘হ্যাঁ’ বলেন। সিনেমা মানে তার কাছে কমার্শিয়াল বা অফট্র‍্যাক না, সিনেমার অর্থ চঞ্চলের কাছে দুটো- ভালো সিনেমা আর খারাপ সিনেমা। চঞ্চল নিজেকে খারাপ সিনেমা থেকে দূরে রাখতে চান, তার চাওয়া, দর্শকেরা যাতে তাকে দেখে পরিপূর্ণ বিনোদনটা পায়। আর একারণেই একযুগের সিনেমা ক্যারিয়ারে তার অভিনীত চলচ্চিত্রের সংখ্যা মাত্র পাঁচটি!

চঞ্চল চৌধুরী, মনপুরা, আয়নাবাজি

যাত্রাটা শুরু হয়েছিল ‘রূপকথার গল্প’ দিয়ে, তৌকির আহমেদের হাত ধরে। বেকার যুবকের চরিত্রে সিনেমা জগতে নবাগত চঞ্চল চৌধুরীর সে কি দারুণ অভিনয়! কুড়িয়ে পাওয়া শিশুটার জন্যে তার মায়া ছুঁয়ে গিয়েছিল দর্শককেও। এই সিনেমার জন্যে তিনি মেরিল প্রথম আলো পুরস্কার পেয়েছিলেন সেরা অভিনেতা হিসেবে। তারপর এলো মনপুরা, বাংলা চলিচ্চিত্রের ইতিহাসে সৃষ্টি করলেন গিয়াসউদ্দীন সেলিম। সোনাই আর পরীর ভালোবাসা, তাদের বিচ্ছেদের কষ্ট মানুষ আজও মনে রেখেছে। অশ্লীলতার ছোবল থেকে সদ্য মুক্ত হওয়া সিনেমাজগতে নতুণ প্রাণের সঞ্চার করেছিল মনপুরা, সোনাই চরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন চঞ্চল চৌধুরী।

তারপর একে একে এলো ‘মনের মানুষ’ আর ‘টেলিভিশন’। গৌতম ঘোষের ‘মনের মানুষে’ পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছেন প্রসেনজিত চ্যাটার্জীর সঙ্গে, মোস্তফা সরওয়ার ফারুকীর ‘টেলিভিশনে’ আমার চোখে মোশাররফ করিমকে ছাপিয়ে গেছেন তিনি অভিনয়ে। কিন্ত নিজের সেরাটা তিনি বোধহয় জমিয়ে রেখেছিলেন তখনও, দর্শককে বিশাল একটা ধাক্কা দেয়ার জন্যে।

২০১৬ সালে মুক্তি পেল ‘আয়নাবাজি’। একবিংশ শতাব্দীতে যতোবার বাংলা সিনেমার প্রসঙ্গ আসবে, ততবারই আয়নাবাজির নাম উঠবেই। চঞ্চলময় একটা সিনেমা, অমিতাভ রেজার ডিরেকশনে দেড় ঘন্টার মধ্যে দশ-বারোটা চরিত্রে তাকে দেখে ফেললো দর্শক! এই তিনি আয়না, পরক্ষণেই আবার জেলখাটা আসামী, কয়েক দৃশ্য বাদেই ধর্ষক হয়ে জেলে যাচ্ছেন, মাঝে আবার তাকে প্রেমিক হিসেবে বুড়িগঙ্গার বুকে নৌকায় ভাসতে দেখা যাচ্ছে, আবার তিনি হয়ে যাচ্ছেন রাজনীতিবিদ নিজাম সাঈদ চৌধুরী… চরিত্রের এমন দুর্দান্ত ট্রান্সফরমেশন বাংলা চলচ্চিত্র এর আগে কবে দেখেছে?

সিনেমা হলে সাড়া ফেলে দিলো আয়নাবাজি, তরুণদের মধ্যে অসম্ভব জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল সিনেমাটা। একেকটা চরিত্রে ঢোকার জন্যে চঞ্চলের ডেডিকেশনটা ছিল মারাত্নক পর্যায়ের, একটা চরিত্রে অভিনয়ের জন্যে তিনমাস ভাত না খেয়ে থাকতে হয়েছে, জীবনে তিনি ব্যায়াম করেননি, সেই তাকেই বাসায় ইনস্ট্রাক্টর রেখে জিম করতে হয়েছে একটানা! বাসার লোকজন তার সামনে ভাত খাচ্ছে, শুটিং ইউনিটের লোকজন লাঞ্চে ভাতের লোকমা মুখে তুলছে, আর তিনি সেই সময়ে অসহায়ের মতো তাকিয়ে আছেন তাদের দিকে! একটা দৃশ্যের শুটিং করার জন্যে এমন ত্যাগ আমাদের এখানে চঞ্চল ছাড়া আর কারো পক্ষে করা সম্ভব নয় বোধহয়। আর এসব ত্যাগের ফসল হিসেবেই পেয়েছেন মানুষের অকুণ্ঠ ভালোবাসা। লোকে তো এমনি এমনি কাউকে ভালোবাসে না, সবটাই চঞ্চল চৌধুরী অর্জন করে নিয়েছেন নিজের মেধা, শ্রম আর সাধনার গুণে।

চঞ্চল চৌধুরী, মনপুরা, আয়নাবাজি

সিনেমা বাছাইয়ের ব্যপারে নিজের খুঁতখুঁতে মনোভাবের কথা অকপটেই স্বীকার করেন চঞ্চল চৌধুরী। নাটক মন্দ হলেও সমস্যা নেই, কিন্ত সিনেমার বেলায় শতভাগ পারফেকশন তার চাই-ই চাই। আর একারণেই তিনি জানেন না একটা সিনেমা শেষ হবার কয় বছর বা কয়মাস বাদে আরেকটা সিনেমার কাজ ধরবেন তিনি। সময়টা চার মাস বা চার বছর যেকোন কিছুই হতে পারে। টেলিভিশনের পরে চারবছর যেমন সিনেমায় দেখা যায়নি তাকে। আবার গল্প আর চরিত্র পছন্দ হয়েছে বলে আয়নাবাজি’র কয়েকমাস পরেই কাজ করেছেন ‘দেবী’ সিনেমায়। এরমধ্যে মঞ্চে কাজ করা বন্ধ করেননি। সিনেমার কাজ করতে গিয়ে হয়তো বিরতি পড়েছে, কিন্ত মঞ্চনাটক তার প্রথম ভালোলাগা, প্রথম ভালোবাসা। সেটাকে তিনি ছাড়েন কি করে! পাশাপাশি চারুকলার শিক্ষক হিসেবেও কাজ করেছেন একটি প্রতিষ্ঠানে।

তবে ‘দেবী’তে কাজ করার ব্যপারে দারুণ ভয় কাজ করছিল তার মধ্যে। কিংবদন্তী কথাসাহিত্যিক হূমায়ূন আহমেদের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্রে ‘মিসির আলী’ চরিত্রে অভিনয় করাটা তো চাট্টেখানি কথা নয়। তিনি পারবেন কিনা, এটা নিয়ে সংশয়ে ছিলেন বেশ কিছুদিন। কারন এর আগেও মিসির আলী চরিত্রটাকে ছোট পর্দায় উপস্থাপন করা হয়েছে, বিখ্যাত অভিনেতারাই অভিনয় করেছেন এই চরিত্রে, সেখানে বড় পর্দায় এই মানুষটার চরিত্রে নিজেকে ঢুকিয়ে কি নতুনত্ব আনা সম্ভব, সেটা নিয়েই ভাবনায় ছিলেন তিনি। কিন্ত শেষমেশ নিজেকে চ্যালেঞ্জ করেছেন, নিজের সামর্থ্যকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন তিনি। দেবীর শুটিং শেষ, সেন্সরবোর্ডে জমা দেয়া হয়েছে, হয়তো খুব দ্রুতই মুক্তি পাবে, বড় পর্দায় মিসির আলী রূপী চঞ্চল চৌধুরীর জাদু দেখা যাবে আরও একবার।

আমরা আক্ষেপ করি, আমাদের একজন ডেনিয়েল ডে লুইস নেই, নানা পাটেকার, মনোজ বাজপাই বা ইরফান খান নেই। অথচ আমাদের একজন চঞ্চল চৌধুরী তো আছেন! যিনি তার অভিনীত চরিত্রগুলোর মধ্যে বাস করেন, সেগুলোকে নিজের মধ্যে ধারণ করেন, চঞ্চল নামের শান্তশিষ্ট যুবকটা কখনও সাদাসিধে প্রেমিক সোনাই হয়ে ওঠেন, কখনওবা হয়ে যান ধূর্ত আসামী আয়না! চঞ্চল চৌধুরীকে নিয়ে আমরা গর্ব করতেই পারি।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-