খেলা ও ধুলা

শত কোটি টাকার কোষাগার এবং বিসিবির নিদারুণ অবহেলা!

চামেলী খাতুন- নামটা শুনলে হয়তো যে কেউ ভ্রু কুঁচকে তাকাবেন। ভাববেন, ইনি আবার কে! তাকে চেনার কথা নয় সবার, আমি নিজেই তার নাম শুনেছি গতকাল। এই ভদ্রমহিলা বাংলাদেশ প্রমীলা দলের ক্রিকেটার সাবেক ক্রিকেটার, প্রায় একযুগ ধরে খেলেছেন জাতীয় দলে। মেয়েদের ক্রিকেটে তো ছেলেদের মতো গ্ল্যামার নেই, তাই বারো বছর জাতীয় দলে সার্ভিস দিয়েও চামেলী খাতুনেরা অচেনাই রয়ে যান সবার কাছে। যাই হোক, চামেলী খাতুন তার খেলোয়াড়ি ভূমিকা নিয়ে আলোচনায় আসেননি, তাকে আলোচনায় এনেছে তার অসুস্থতা, তার সীমাহীন দারিদ্র‍্য। শারিরীকভাবে প্রচণ্ড অসুস্থ সাবেক এই ক্রিকেটার দিন কাটাচ্ছেন চরম অভাবের মধ্যে, প্রবল অনিশ্চয়তায় কাটছে তার সময়। চামেলীর এই দুঃসময়ে তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় দলের দুই তারকা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান এবং মুস্তাফিজুর রহমান। চামেলী খাতুনের চিকিৎসার খরচ বহনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা, করেছেন তার পাশে থাকার অঙ্গীকার।

পায়ের লিগামেন্ট ছিঁড়ে গিয়েছিল আট বছর আগে। সেখান থেকেই মেরুদণ্ডের সমস্যার শুরু। এখন সেটা ছড়িয়ে পড়েছে ডান পায়েও, ধীরে ধীরে অবশ হয়ে চামেলী খাতুনের পা। হাঁটাচলা করতে কারো না কারো সাহায্য নিতে হয়। তার ওপরে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনি। হাজারো অসুস্থতার মধ্যেও আনসার-ভিডিপির চাকুরিটা টিকিয়ে রেখেছেন কোনরকমে, কিন্ত গত তিন-চার মাস ধরে সেখানেও অনিয়মিত তিনি। হাঁটতেই পারছেন না, অফিসে যাবেন কি করে!

রাজশাহী শহরের দরগাপাড়ায় দুই রুমের যে বাড়িটায় চামেলীরা থাকেন, সেটাকে প্রাগৈতিহাসিক যুগের একটা নিদর্শন বললেও ভুল হবে না। হুট করে দেখলে কারো কাছে ‘ভূতের বাড়ি’ মনে হওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়। খুব বেশি আলো ঢোকে না ঘরটায়, সেখানেই অন্ধকারের সঙ্গে বসবাস চামেলী আর তার পরিবারের। ঔষধ কেনার টাকা থাকে না সবসময়, তীর্থের কাকের মতো চেয়ে থাকতে হয় মাস শেষে পাওয়া অল্প পরিমাণ বেতনের দিকে। ডাক্তারেরা জানিয়েছেন, দ্রুত চিকিৎসা না করালে পুরোপুরি অক্ষম হয়ে যেতে পারে চামেলী খাতুনের শরীরের অনেকাংশ। কিন্ত চিকিৎসার জন্যে যে লাখ দশেক টাকা দরকার, সেটা জোগাড় করা তো এই পরিবারের পক্ষে অসম্ভব কল্পনা!

নিজেকে নিয়ে চামেলী ভাবেন না খুব একটা। কিন্ত তার কিছু হলে অসুস্থ মা আর ছোট বোনটা অথৈ পানিতে ভেসে যাবে, তাদের জন্যেই চামেলী বেঁচে থাকতে চান, কর্মক্ষম থাকতে চান। আর সেজন্যেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আবেদন জানিয়েছিলেন ক্রিকেটের অভিভাবক সংস্থা বিসিবির কাছে, তারা যেন তার চিকিৎসার জন্যে কিছু করেন, তার পাশে যেন দাঁড়ান। দেশের জার্সি গায়ে বারোটা বছর খেলেছেন, বিসিবির কাছ থেকে এটুকু পাওয়া তো তার অধিকার!

বিসিবির কানে চামেলীর কান্নার শব্দ পৌঁছায়নি হয়তো। তবে জাতীয় দলের পেসার মুস্তাফিজুর রহমান চামেলীর কথা জানার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সাকিব আল হাসান তো কোচ নাজমুল আবেদীন ফাহিমের কাছে চামেলীর অসুস্থতার কথা শুনে তাকে ফোন দিয়েছেন, পাশে থাকার অভয়বাণী শুনিয়েছেন। এই দুজনের আশ্বাস পেয়ে চামেলীও নতুন করে লড়াইয়ের আশায় বুক বাঁধছেন হয়তো।

সাকিব বা মুস্তাফিজ চামেলী খাতুনের পাশে দাঁড়াচ্ছেন, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন, এটা ভীষণ তৃপ্তিদায়ক একটা খবর। এটা তাদের দায়িত্ব নয়, নিজেদের কর্তব্যের বাইরে গিয়ে জাতীয় দলের একজন সাবেক ক্রিকেটারের পাশে তারা দাঁড়াচ্ছেন, এটা সাধুবাদ পাবার যোগ্য। কিন্ত চামেলীর পাশে যাদের থাকার কথা ছিল, যাদের তার পাশে দাঁড়ানোর কথা ছিল, সেই বিসিবি বা বোর্ডের কর্তাব্যক্তিরা কোথায়? তারা কি গত আট বছরে একবারও চামেলীর খোঁজ নিয়েছেন? জানার চেষ্টা করেছেন কি, সাবেক একজন ক্রিকেটার কি অমানবিক জীবন যাপন করছেন? নাকি রঙিন চশমা পরে অতীতকে ভুলে যাওয়াটাই বিসিবির নীতি?

বাঁহাতি পেসার সৈয়দ রাসেলের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। একটা সময় এমন অবস্থা হয়েছিল, পায়ের অপারেশন করানোর টাকা পর্যন্ত ছিল না জাতীয় দলের সাবেক এই ক্রিকেটারের কাছে। বিসিবির কাছে ধর্ণা দিয়েও লাভ হয়নি। রাসেলের কাছে তখন বিসিবির আর কিছু পাবার নেই, তার পেছনে টাকা খরচ করাটা হয়তো ‘অপচয়’ বলেই ভেবেছিল বোর্ড। মাশরাফি বিন মুর্তজা তখন রাসেলের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে তাকে ভারতে পাঠিয়েছিলেন চিকিৎসার জন্যে। মাশরাফির কোন দরকার ছিল না রাসেলকে টাকা দেয়ার, দায়টা ছিল বিসিবির। অথচ তারাই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল তখন, এখনও সেই একই কাজটাই করছে সংস্থাটি!

এদেশে সাবেক অনেক ক্রিকেটারই মানবেতর জীবনযাপন করছেন, বিশেষ করে প্রমীলা ক্রিকেটারেরা। কারণ সেখানে টাকার ঝনঝনানি নেই। মাশরাফি-সাকিব-মুস্তাফিজ, বা আরও অন্য অনেকেও যদি তাদের সবার পাশে দাঁড়াতে চান, সেটা সম্ভব নয় কোনভাবেই। কুলিয়ে উঠতে পারবেন না তারা। অথচ এই দায়িত্বটা যাদের পালন করার কথা, সেই বিসিবি ভীষণ অদ্ভুত রকমের উদাসীন এসব ব্যাপারে! প্রায়ই পত্রিকায় পড়ি, বিসিবির কোষাগারে নাকি শত শত কোটি টাকা জমা পড়ছে, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফুলে-ফেঁপে উঠছে! জাতীয় দলের সাবেক একজন ক্রিকেটার যদি অর্থকষ্টে ভুগে ধুকে ধুকে মৃত্যুর পথে হাঁটতে থাকে, তখন বিসিবির এই ধন-সম্পদের বাহারকে ফুটো পয়সা ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না…

Comments

Tags

Related Articles