প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের লেখা বিখ্যাত দেশাত্মবোধক গান আছে, ‘আমি বাংলায় গান গাই, আমি বাংলার গান গাই।’ তিনি যদি এই ফেসবুকের জমানার মানুষ হতেন, তাহলে নির্ঘাত গানের কথায় কিছু নিশ্চিত পরিবর্তন আনতেন। ‘বাংলা’ শব্দটির জায়গায় সেখানে ঠাঁই পেত একটি ইংরেজি শব্দ, যে শব্দটি হলো ‘ইস্যু’। তখন গানটি দাঁড়াত এমন,

আমি ইস্যুতে কথা কই,
আমি ইস্যুর কথা কই,
আমি ইস্যুতে ভাসি, ইস্যুতে হাসি,
ইস্যুতে জেগে রই।
আমি ইস্যুতে মাতি উল্লাসে,
করি ইস্যুতে হাহাকার,
আমি সব দেখে-শুনে ক্ষেপে গিয়ে করি
ইস্যুতে চিৎকার।

কেউ কি এ পর্যন্ত এসে অবাক হচ্ছেন? বিরক্তিতে ভ্রুকুটি করছেন? ভাবছেন, এত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে পাশ কাটিয়ে আমি কেন হঠাৎ ‘ইস্যু’ নিয়ে এত বাড়াবাড়ি শুরু করলাম! হ্যাঁ, আজ হঠাৎ ‘ইস্যু’ নিয়ে এত কথা বলতে আমার নিজেরও ভালো লাগছে না। বিষণ্ণ, বিপন্ন বোধ করছি। কিন্তু কী করব বলুন, যা দেখছি যা শুনছি, তাতে ‘ইস্যু’ সংক্রান্ত এই আলাপ যে খুবই প্রাসঙ্গিক।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ হেলমেট

একটা সময় ছিল যখন আমাদেরকে বলা হতো ‘মাছে ভাতে বাঙালি’। দুবেলা খাবারের মেন্যুতে ভাত আর মাছ না থাকলে বাঙালির চলতোই না। এখন আর সে-দিন নেই। খাওয়ার সময়ও বাঙালির হাতে মোবাইল থাকে, মোবাইল টিপতে টিপতেই খাওয়ার পর্ব সারে তারা। তাই খাবারের মেন্যুতে যা-খুশি থাকুক, তাতে বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই তাদের। শুধু চাই ফেসবুকে নতুন নতুন মসলাদার ইস্যু। তাহলে ভাত কিংবা রুটি কেন, এমনকি লোহালক্কড়ও অনায়াসে হজম করে ফেলা সম্ভব।

মাত্র দিন দুই আগেই আমরা সবাই মেতে ছিলাম নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে। প্রত্যেকের মুখে একটা কথাই ঘুরে ফিরছিল, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’। আমাদের প্রতিটি স্ট্যাটাস, প্রতিটি কমেন্ট, প্রতিটি ছবির ক্যাপশন, প্রতিটি লাইভের বিষয়বস্তু ছিল একটাই, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’। আমরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে মুখর হয়ে উঠেছিলাম, এ আন্দোলন করতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের হামলার শিকার হওয়ায় উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিলাম, যারা এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার সাথে জড়িত তাদের বিচার দাবি করছিলাম। এমনকি এই ইস্যুতে আমরা সদ্যই অনুষ্ঠিত সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মত আরেকটি মুখরোচক ইস্যুকেও জলাঞ্জলি দিয়েছিলাম।

কিন্তু এতসব করে কী লাভ হলো বলুন, আমাদের যে গোল্ডফিশ মেমোরি। নতুন ইস্যু সামনে এলেই আমরা পুরনো ইস্যুকে বেমালুম ভুলে যাই। তাই সরকার যে সড়ক পরিবহন আইনের খসড়া অনুমোদন দিল, তাতে অসংখ্য অসঙ্গতি থাকলেও আমরা তা নিয়ে উচ্চবাচ্য করলাম না। মাত্র দুইদিন আগেই ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের উপর হামলা হলেও সেটি নিয়ে খুব বেশি চর্চা করলাম না। প্রধানমন্ত্রী যে তার দলের ছাত্র সংগঠনটির আহত কর্মীদের দেখতে হাসপাতালে ছুটে গেলেও সাধারণ আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে ন্যূনতম ভ্রুক্ষেপও করলেন না, এতেও আমাদের বিশেষ কিছু আসল গেল না। পুলিশের সাথে মিশে লুঙ্গি পরা কিংবা মাথায় হেলমেটওয়ালা দুর্বৃত্তরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর হামলা করলেও এ নিয়ে আমরা সর্বোচ্চ ট্রল আর মিম বানিয়েই ক্ষান্ত হলাম, এর বেশি কোন যৌক্তিক সমালোচনার ধার ধারলাম না। স্রেফ বিদেশী গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকারে নিজের মনের কথা তুলে ধরায় রিমান্ডে নেয়া হলো শহিদুল আলমকে, সেটিকেও আমরা খুব একটা পাত্তা দিলাম না।

মোট কথা, অন্য আরও অনেক ইস্যুর মত নিরাপদ সড়কের দাবিতে হওয়া আন্দোলনও ক্রমশই আমাদের বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যেতে লাগল। কারণ এখন তো আর এই ইস্যু নিয়ে মাতামাতি করে বেশি লাইক-কমেন্ট-রিয়্যাকশন পাওয়া যাবে না। বাজারে এসে গেছে নতুন ইস্যু, সেটি নিয়ে মেতে উঠলেই বরং নিজেদেরকে ‘কুল’ প্রমাণ করা যাবে। তাই আমরা বেমালুম ভুলে গেলাম মাত্র দুইদিন আগেই শিক্ষার্থীদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে রাজপথ, শিক্ষার্থীরা আক্রান্ত হয়েছে তাদের নিজেদের ক্যাম্পাসেই। সে-সব ভুলে গিয়ে আমরা মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি শুরু করলাম ওবায়েদুল কাদেরের ‘চ্যালেঞ্জিং টাইমস’ নিয়ে।

ফেসবুকে ঢুকলে নিউজফিডজুড়ে এখন কেবল ‘চ্যালেঞ্জিং টাইমস’-এর ছড়াছড়ি। এসব দেখার পর কে বিশ্বাস করবে, মাত্র দুইদিন আগেই দেশে কী ভীষণ অস্থির, অরাজক পরিবেশ বিরাজমান ছিল! বস্তুতই ‘চ্যালেঞ্জিং টাইমস’ এর স্রোতে গা ভাসিয়ে আমরা ভুলে গেলাম দেশের প্রকৃত দুঃসময়কে। এভাবেই ‘চ্যালেঞ্জিং টাইমস’ এর কাছে হেরে গেল ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’। কিংবা বলা ভালো, নতুন ইস্যুর কাছে হেরে গেল পুরনো ইস্যু। আজ সুকান্ত যদি বেঁচে থাকতেন তো অবশ্যই লিখতেন, ‘এসেছে নতুন ইস্যু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান!’

Comments
Spread the love