অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ডপিংক এন্ড ব্লু

১০০ বছর বয়সেও এই নারীরা এত ‘সুন্দরী’!

অ্যারিয়ান ক্লেমেট (Arianne Clément), একজন কানাডিয়ান ফটোগ্রাফার। প্রবীণদের নিয়ে কাজ করেন বেশিরভাগ সময়। তার অনেক কাজ আন্তর্জাতিক মহলে স্বীকৃত এবং খুবই আলোচিত। তিনি তার কাজের জন্য বহু পুরস্কার ও সন্মাননায় ভূষিত হয়েছেন বিভিন্ন সময়।

কানাডার কুইবেকের, ১০০ বছর বা তারও বেশি বয়সী কিছু নারীদের নিয়ে আলোচিত এই ফটোগ্রাফার একটি ডকুমেন্টরি তৈরি করেছেন, যা ছাপা হয়েছে দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায়। ডকুমেন্টরির বিষয় হলো, সৌন্দর্য। শতবর্ষী নারীদের কাছে সৌন্দর্য কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ? বয়স, নারীত্ব, মাধূর্য, বাহ্যিক রুপ, ভালোবাসা… এসব নিয়ে তাদের ভাবনা কেমন? সৌন্দর্য ব্যাপারটাকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করেন তারা?  

ডকুমেন্টারিটা বেশ ভালো লেগেছে আমার। মেয়েরা স্বাভাবিকভাবেই সৌন্দর্য সচেতন হয়ে থাকে। বিশেষ করে, অল্প বয়সী মেয়েদের প্রধান ভাবনাই থাকে কীভাবে নিজেদের আরও একটু সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা যায়। কিন্তু বয়সের সাথে সে ভাবনায় ছেদ পড়ে। বৃদ্ধ বয়সে জরা আর জীর্ণতা ভর করে শরীরে। তবু বৃদ্ধারা কি সৌন্দর্য নিয়ে ভাবেন না? তারাও কি চান না নিজেদের আরও একটু পরিপাটি করে অন্যদের সামনে মেলে ধরতে? বৃদ্ধাদের বয়ানেই এসব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন ফটোগ্রাফার অ্যারিয়ান ক্লেমেট এই ডকুমেন্টারিটিতে।

ডকুমেন্টারির প্রথম ছবিটা যেই বৃদ্ধা ভদ্রমহিলার তার নাম, ম্যারি বের্থ পিক্যাটি। তার স্টাইল দেখার মত। তিনি সবসময় মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে পছন্দ করেন এবং এর জন্য যা করেন তাতে তাকে দেখে অনেকেই মজা পেয়ে হেসে গড়িয়ে পড়ে। ভদ্রমহিলা খুবই উৎফুল্ল। তিনি তার চারপাশের সবাইকে মজার গল্প বলে, গান গেয়ে, নেচে মাতিয়ে রাখেন। তার ছবি দেখলেই বুঝবেন তিনি কতোটা মজার মানুষ। কে বলবে তার বয়স হয়েছে ১০৫ বছরেরও বেশি। ফটোগ্রাফার এমন এক মজার মানুষকেই বেছে নিয়েছেন ডকুমেন্টারিটিকে প্রাণ দিতে। শুরু করেছেন তাকে দিয়েই।

অ্যারিয়ান ক্লেমেট এর ডকুমেন্টারি, ‘We are who we are: what these 100-year-old women teach us about beauty’– তে যে বৃদ্ধা মহিলারা মডেল হয়েছেন এবং সৌন্দর্য চিন্তা জানিয়েছেন, তাদের মধ্যে কয়েকজনের কথা তুলে ধরলাম নীচে।

[যে ডকুমেন্টারিটি নিয়ে এই লেখা, তা কানাডার বৃদ্ধাদের নিয়ে করা। সে দেশের সংস্কৃতির সাথে মিল রেখে বানানো। আমাদের সংস্কৃতির সাথে মিল নেই বলে অনেকেরই হয়তো ভালো লাগবে না এই লেখা। ভালো না লাগলে ইগনোর করবেন প্লিজ! বৃদ্ধাদের নিয়ে বাজে মন্তব্য করে নিজেদের মানুষিকতা অন্যদের জানান দেয়ার দরকার নেই।]

ম্যারি বের্থ পিক্যাটি (Marie-Berthe Paquette, 105 years old)

“নিজেকে আজও আমার সুন্দরী মনে হয়। যখন মনে হয় না, তখনও আমি সুন্দরভাবে নিজেকে উপস্থাপন করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করি। আমি আমার চুল পরিপাটি করে রাখতে এবং সুন্দর সুন্দর পোশাক, গহণা ও অন্যান্য আনুষাঙ্গিক জিনিসপত্র পরতে পছন্দ করি। নিজেকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করার দিকে সবসময়ই আমি মনোযোগ দিই। আসলে একারণেই, আমি কেতাদুরস্ত মহিলা হিসেবে সুপরিচিত।”

জিনেথ ব্যালার্ড (Jeannette Ballard, 100 years old)

“স্বাভাবিকভাবেই, নিজেকে দেখতে আমার খুব বিশ্রী মনে হয় এখন। বয়স হবার সাথে সাথে রুপ-লাবণ্য ক্ষয়ে গেছে। নাক এবং কান বড় হয়ে গেছে, চলনভঙ্গি পরিবর্তন হয়েছে, পিঠ কুঁজো হয়েছে। যদিও আমি সুন্দর না, তবু আমি জানি, আমার বয়সী কারো কারো অবস্থা আমার চেয়েও অনেক বেশি খারাপ। এতকিছুর পরও, আমি আমার বেঁচে থাকাটাকে এখনো উপভোগ করি। যদিও ১০০ বছর হওয়ার পর জীবনের আর অল্পই দেখার বাকি থাকে, তবু ভবিষ্যতে কি ঘটবে তা দেখার জন্য আমি আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করি।”

অ্যান ম্যারি প্রোনোভোস্ট (Anne-Marie Pronovost, 100 years old)

“যখন আমি অল্পবয়সী ছিলাম আমার চুল লম্বা ছিল খুব, সুন্দর পা আর শরীরের সুন্দর ভাঁজ ছিল। এখনকার দিনে অল্পবয়সী মেয়েরা, শুকনো দেখাবার জন্য কত কসরত করে, কিন্তু আমি মনে করি ন্যাচারাল যে সৌন্দর্য সেটাই আসল। আমরা নিজেরা যেমন, তেমনই সবসময় সুন্দর এবং সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আমার স্বামী দেখতে খুব সুন্দর ছিল। তার মাথা ভর্তি কোকড়ানো চুল ছিল, আর ছিল একটা ডাকনাম, ‘উইলি দ্য গুড লুকার’। তার জন্য সবসময় সুন্দর পোশাকে থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিলো। যখন সে কাজের প্রয়োজনেও বাইরে যেত, যাওয়ার সময় যে পোশাক পরে যেত, আসার সময় সেটা বেচে দিয়ে নতুন একটা পোশাক কিনে পরে আসত। সে মেয়েদের সাথে ফ্লার্ট করত, খেয়ালখুশিমত চলত। সব মেয়েদেরই প্রেমে পড়ে যেত সে। প্রচুর মদ্যপান করত। তার এতো সৌন্দর্য থাকা সত্ত্বেও, তাকে ক্ষমা করতে পারাটাই ছিল আমার কাছে কঠিন ব্যাপার।”

বউগ্র্যান্ড শ্যাম্পেইন (Beaugrand Champagne)

“যখন অল্পবয়সী ছিলাম, সবার মত আমিও আকর্ষণীয় হতে চাইতাম। চুলের সাজসজ্জা করতাম, মায়ের বানানো সুন্দর সুন্দর পোশাক পরতাম, এবং উঁচু জুতা পরতে গিয়ে হিমশিম খেতাম। তারপরও, আমি কখনো মেকাপ করতাম না। আমার মনে হতো সেটা কৃত্রিম।

আমি আমার স্বামীকে বিয়ে করেছিলাম, তার সৌন্দর্য দেখে। সে খুব সুপুরুষ ছিল। অথচ পরে সেটা নিয়েই অনুশোচনায় ভুগেছি আমি। জীবনসঙ্গী হিসেবে সে ভালো ছিল না, যার কারণে শেষপর্যন্ত আমি তাকে ছেড়ে আসতে বাধ্য হই।

আমি তরুণী মেয়েদের পরামর্শ দিই, নিরর্থক শারীরিক সৌন্দর্যের পিছনে সময় নষ্ট না করে, সেসব সৌন্দর্যের চর্চা করা উচিত যেগুলো তাদের সারা জীবন ঘিরে রাখবে। তোমরা একটা বাগান করা, ছবি আঁকা, গান শোনা বা গাওয়া এসবের পিছনে সময় দাও। আবার, দয়ালু, স্বনির্ভর এবং সুশিক্ষাও খুব জরুরী ব্যাপার- এগুলোরও চর্চা করা উচিত।”

সোল্যাঞ্চ রেসিন (Solange Racine, 101 years old)

“অল্প বয়সে, ছেলেমানুষী করার মত অবস্থা ছিল না আমার। আমরা গরীব ছিলাম, একারণে সবসময়ই কাজ করতে হতো। প্রতিদিন ঘরের কাজ করা, বাগান থেকে ফল সংগ্রহ করা, ফসলের মাঠে সাহায্য করা,  বাচ্চাদের যত্ন নেওয়া, রান্না করা। সৌন্দর্য নিয়ে চিন্তা করার সময়ই ছিল না আমাদের।”

“অল্পবয়সে আমি আমার রুপ নিয়ে যতটা চিন্তা করতাম, এখন তার চেয়েও বেশি ভাবি। অপেক্ষাকৃত সুন্দর, সাধাসিধে এবং বিশেষ পোশাক পরতে পছন্দ করি। আমি প্রতিদিন সকালে মেকাপ করি, প্রতিবার খাওয়ার পরে লিপস্টিক লাগাই, এবং প্রতিসপ্তাহেই একবার হেয়ার ড্রেসারের কাছে যাই। আমি খুব বেশি মশলাদার বা মিষ্টি খাবার এড়িয়ে চলি। নিজেকে সুস্থ ও আকর্ষণীয় রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমি গলায় মালা পরতে পছন্দ করি। কিন্তু বয়সের কারণে গলায় মালা পরতে অসুবিধা হয় বলে আজকাল এ শখ ছেড়ে দিয়েছি।”

ইসাবেলা গেন [Isabelle Gagn (left), 103 years old, with her daughter (right)]

“অগোছালো থাকার চেয়ে, ছিমছাম হয়ে থাকতেই আমি পছন্দ করি। কিন্ত যখন আমি অল্পবয়সী ছিলাম, এসব নিয়ে চিন্তাই করতাম না। সৌন্দর্য চিন্তা ছিল অর্থহীন, একধরণের অন্যায় চিন্তা মনে হতো। তখন গুরুত্বপূর্ণ ছিল পরিবার, টেবিলে খাবার দেওয়া, বাচ্চাদের গোসল করিয়ে কাপড় পরানো। আমি ভাগ্যবান, আমার মেয়ে আছে এখন আমার যত্ন করার জন্য। সে ২০ বছর আগে আমাকে তার সংসারে নিয়ে এসেছে, এখনও আমি তার সাথেই আছি। পরিবারই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সৌন্দর্য নয়।”

অ্যালিডা প্রভোস্ট (Alida Provost, 101 years old)

“আমি খুবই যুক্তিবাদী এবং বাস্তববাদী মানুষ। সৌন্দর্য বা শিল্প নিয়ে খুব একটা ভাবি না। আমি খুব দরিদ্র পরিবার থেকে এসেছি। সৌন্দর্যের পেছনে টাকা খরচ করা আমার কাছে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক মনে হয়। আমি প্রয়োজনে নিজের জন্য এবং মেয়ের জন্য শৌখিন কাপড় সেলাই করি। শৌখিনতা বলতে এতটুকু। অবশ্য আমি আমার চুলের যত্ন নিতে পছন্দ করি, সেজন্য অর্থ ব্যয়ও করি।”

ম্যারি ব্যার্থ পিক্যাটি (Marie-Berthe Paquette, 102 years old)

“আমার বাবা ছিলেন একজন চিত্রশিল্পী এবং কারুশিল্পী। তিনি তার শিল্পের প্রতি ভালবাসা আমার সাথে শেয়ার করতেন। আমি বিশ্বাস করি শৈল্পিক সবকিছুই সুন্দর: মঞ্চনাটক, ছবির ফ্রেম, কবিতা, হাতে আঁকা ছবি, ফুল, গান। মানুষের বেলায়- চরিত্র, হাসি, চোখ এগুলোই সৌন্দর্য। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অনুশোচনা, পড়াশোনা না শেখা। পড়াশোনা শিখলে জীবনের অনেক দুয়ার খুলে যায়, না শিখলে জোটে কেবল লজ্জা। অবস্থা যেমনই হোক না কেন, অল্প বয়সী মেয়েদের আমি পড়াশোনা চালিয়ে যাবার পরামর্শ দিব।”

তথ্যসূত্র- দ্য গার্ডিয়ান

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close