মুক্তি নাই। শিল্প থেকে শরীর- মনের ঘরেও চলছে নিয়ন্ত্রণ। দাস থেকে আমাদের উত্তরণ উত্তরাধুনিক দাসত্বে। ভেঙ্গে যাওয়া কোমর আর নত মস্তকে কেউ কেউ চেটে খাচ্ছে রাজকীয় লালা। দুয়েকজন যারাও বেঁচে আছে মানুষের কাতারে তারা বাস্তবতার বুকে ধুকছে কর্পোরেট আগ্রাসনে। মুক্তি তবে কোথায়? অন্ধকারে ডুবতে থাকা রোদের দিকে চেয়ে আর কতদিন চলবে এই বেহায়া বৃত্তি? প্রশ্ন আছে- উত্তর জানা নেই। তবুও প্রশ্ন ছুড়ে দেই যারা মাথা পেতে দেয় শাসকের পায়ে- কেমন আছো ঈশ্বর? কী উত্তর দেবে আগামী প্রজন্মের কাছে?

শেকল ভাঙ্গার ইতিহাস সংস্কৃতির বাহুবলে। শাসকেরা তাই বরাবরই ভয় পায় সংস্কৃতিকে-সংস্কৃতজনকে। ছলেবলে-কৌশলে তাই সংস্কৃতির পথে বিছিয়ে দেওয়া হয় হরেক রকম বাঁধা। তবুও সংস্কৃতিকে রুখতে পারেনি শাসকের যাবতীয় ছলাকলা। আমরা যে স্বাধীন বাংলাদেশের কথা বলি সেখানেও সংস্কৃতির অবদান উল্লেখযোগ্য। কিন্তু অকৃতজ্ঞতার ডামাডোলে শাসকের স্মৃতিতে অনুপস্থিত সেই অবদান। স্বাধীনতা উত্তর ধর্মব্যবসার উত্তরোত্তর উন্নতির বিপরীতে নিম্নগামী হয়েছে সংস্কৃতির পথ। বিস্ময়ে চেয়ে দেখি পতনের যাত্রা। অথচ একটি নিজস্ব সমৃদ্ধ সংস্কৃতি দিয়ে উন্নত জাতি গঠনের পথ সুগম করা যেতো। শাসকগোষ্ঠী কলাগাছ হলেও জাতি হিসেবে আমাদের অবস্থান পথের ধারে ধুকতে থাকা তৃণের মতো- অসংখ্য ক্ষত আর ধুলোর বাহাদুরির ভেতর বেঁচে আছে মৃতপ্রায় স্বপ্নের ছায়া হাতে। চলুন, আপাতত চলচ্চিত্র নিয়ে কথা বলি। যেহেতু আমি দৃশ্যচাষী হবার যুদ্ধে নেমেছি এই উত্তরাধুনিক গণতন্ত্রের দেশে সুতরাং চলচ্চিত্র নিয়ে আমাকে কথা বলতেই হবে। বলা উচিৎও, কারণ যে দৃশগুলোর বুনোন কর্ম চলছে সেগুলো যদি প্রদর্শন করতে না পারি তাহলে এই পথচলা ব্যর্থতার বৃত্তে ডুবে যাবে। শুধু আমার নয়, আমার মতো যারা বৃত্তাবদ্ধ ভাবনা থেকে বের হয়ে নতুন চলচ্চিত্রের স্বপ্ন দেখেন তারাই চরম আশঙ্কার ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বা হারিয়ে যাচ্ছে হতাশার গল্পে। এখানে জেগে আছে কেবল অনিশ্চিত ভোরের প্রত্যাশা।

সেন্সরবোর্ড নতুন চলচ্চিত্রের বাঁধা হিসেবেই দেখছি। আমাদের দেশের প্রচলিত সেন্সরবোর্ড একজন নির্মাতার হাত-পা-মুখ-চোখ বেঁধে রাখা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো কাজ করছে বলে জানা নেই। চলচ্চিত্র সেন্সরের জন্য যে নীতিমালা প্রচলিত আছে এবং সংশোধিত নীতিমালাতেও থাকছে তা কেবল লুতুপুতু মার্কা গল্পের জন্য সহায়ক। কিন্তু চলচ্চিত্র কী শুধু এই একই ধরণের গল্প বলে যাবে? সকল নির্মাতা কী এই লুতুপুতু মার্কা গল্প নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করবে? না। করবে না। একজন মেরুদণ্ড সম্পন্ন নির্মাতা কখনোই প্রচলিত সেন্সরের দয়া নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করবে না। একজন নির্মাতা চাইবে তার নতুন চিন্তা-চেতনা-ভাবনার নান্দনিক উপস্থাপন। সে রাষ্ট্র-সমাজ-পরিবার-ব্যাক্তি জীবনের ক্ষত-সমস্যা-সম্ভাবনা-পরিবর্তন-বিবর্তন নিয়ে কথা বলবে। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরেও বাংলাদেশে নির্মাতাদের জন্য সেই সুস্থ্য ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়নি। পক্ষান্তরে ঘাড়ে বন্ধুক রেখে বলে দিচ্ছে চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রেসক্রিপশন। নির্লজ্জের মতো রাষ্ট্রের কর্তারা বলে দিচ্ছে আমার শরীরের ক্ষত-দুর্গন্ধের কথা বলবে না। নাকে রুমাল চেপে মেপে নাও চলচ্চিত্র নির্মাণের গল্প! আর এই নাজায়েজ আবদারকে জায়েজ করার জন্য চলচ্চিত্রের মতো শক্তিশালী শিল্পকে বিচার করতে সেন্সরবোর্ডে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে শিল্পজ্ঞান শূন্য আমলাদের। যারা অপরিপক্ব-অপুষ্টিতে আক্রান্ত মগজ নিয়ে ধুয়ে দেয় চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ। আমাকে গল্প ভাবার আগে ভাবতে হয় সেন্সরবোর্ডের কাঁচির কথা। আমি এই বাস্তবতাকে বিভৎস বলতে চাই। আঁতুরঘরে নবজাতক মেরে ফেলার কারখানা বলতে চাই। দ্বিধাহীনভাবে বলতে চাই, নতুন দিনের নতুন চলচ্চিত্রের জন্য সেন্সরবোর্ড প্রথম শত্রু।

রাষ্ট্রকর্তারা মাঝেমাঝে গ্লোবালাইজেশন-ডিজিটালাইজেশনের কথা বলেন। শুনে আরাম পাই। ভালোলাগে। তৃপ্ত হই। ভাবি প্রত্যাশিত ভোর এলো বুঝি। কিন্তু প্রায়োগিক ক্ষেত্রে মুছে যায় সেই স্বপ্নের আয়ু। ভাবতেই অবাক লাগে, যখন বিশ্বায়নের এই যুগে অবাধ তথ্য প্রবাহের ফলে দেশের দর্শকেরা বহির্বিশ্বের সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হয়ে নতুন রুচিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে, তখন দেশের নির্মাতাদের বনসাই হতে বাধ্য করা হচ্ছে। ফলে দর্শক ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে দেশের চলচ্চিত্রকে। ক্রমশ পেছনের দিকে হাঁটছে চলচ্চিত্রের নাজুক বাস্তবতা। শিল্প-সাহিত্যের বিভিন্ন শাখার সমন্বয়ে নির্মিত হয় চলচ্চিত্র। সুতরাং অনস্বীকার্য যে, চলচ্চিত্র একটি দেশের অগ্রযাত্রার অন্যতম প্রধান উপায়। একটি সমৃদ্ধ চলচ্চিত্র একটি সমৃদ্ধ জাতি গঠনে অসামান্য অবদান রাখতে পারে। সুতরাং রাষ্ট্রকর্তাদের ও সংস্কৃতির বৃক্ষদের কাছে অনুরোধ, চলচ্চিত্রের মুক্তির পথ প্রশস্ত করুন। নতুন দিনের সমৃদ্ধ নান্দনিক-সুনির্মিত চলচ্চিত্রের মাধ্যমে গড়ে উঠুক একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্র।

লিখেছেন- শ্যামল শিশির, চলচ্চিত্রকর্মী
shishirshamol@gmail.com

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-