অভিজাত গরুর গল্প! | এগিয়ে চলো

Ad

গরুর গল্প শুনতে চান? দাঁড়ান দাঁড়ান! ‘গরু’ শুনেই নাক কুঁচকানো কিংবা মুখ বাঁকানোর দরকার নেই। এ গরু গফুরের মহেষের মত গরীব-দু:খী-হাড় জিড়জিড়ে গরু নয়; এ গরু বরং বলা যায় লাট সাহেবের তিনপা-ওয়ালা অভিজাত পোষা কুকুরটির মত, যার মাসিক বরাদ্দ কিনা পন্ডিতমশায়ের পুরো পরিবারের চেয়েও তিনগুণ বেশী! সেরকমেরই অতি আদরের ভাগ্যবান গরুর গল্প বলি শুনুন।

ভাবুন তো আপনি-আমি মানুষ হয়েও জাতীয় পরিচয়পত্র পেয়েছি কবে? এই তো সেদিন মাত্র। ২০০৮ এর আগে তো জাতীয় পরিচয়পত্র বলেই বাংলাদেশে কিছু ছিল না। আর যে সব ভাগ্যবান গরুদের কথা বলছি, তারা পরিচয়পত্রের অধিকারী হয় জন্মের সাথে সাথে! যে পরিচিতি নাম্বারের থাকে জন্মসাল, জন্মস্থাণ (পড়ুন ফার্ম), পিতামাতা বংশ-কুন্ডলী সমগ্র। আসছে সারা জীবনের জন্য এই নাম্বারখানীতেই জনাব গরু মহাশয়ের জীবনসমগ্রের খুঁটিনাটি সমস্ত তথ্যাবলী রেকর্ড হতে থাকে। খুঁটিনাটি বলতে আক্ষরিক অর্থেই খুঁটিনাটি- জন্মের পর টিকা থেকে শুরু করে, সারা জীবনে কোন কোন খাবার কি পরিমান খেয়েছে তার বিস্তারিত লিস্টি, কবে কয়বার কি অসুখ হয়েছে, তার চিকিৎসাই বা কি ছিল, সারা জীবনে কি পরিমান দুধ দিয়েছে, দুধের কোয়ালিটি গ্রেড, বাচ্চা-কাচ্চার সংখ্যা ও বর্ণনা, মুড-মেজাজ ইত্যাদি সকল তথ্যই জাতীয় ডাটাবেজে ঐ গরু মহাশয়ের পরিচিতি নাম্বারের বিপরীতে রেকর্ড হতে থাকে নিয়মিত!

বলছিলাম ডেনমার্কের গরুদের কথা। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান অঞ্চলের গরু লালন-পালনের অত্যাধুনিক সব পদ্ধতির ব্যাপারে আগে থেকেই কৌতুহল ছিল; তার সাথে যখন চাকরীর সুবাদে ‘DANO’ গুঁড়ো দুধের কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্টের ব্যাপারে পুঙখানুপুংখুভাবে জানাটা জরুরী হয়ে পড়ল, তখন এবারের ডেনমার্ক সফরে গরুর ফার্ম ভিজিট করাটা রীতিমত অবধারিতই ছিল। তবে আমিও বুঝতে পারিনি গরু পালন ব্যাপারটা এরকম হুলুস্থুল ধরণের হতে পারে! এত অত্যাধুনিক!

যেখান ‘ডানো’ ব্রান্ডের মাদার কোম্পানী ‘আরলা ফুডস্’ এর হেড অফিস, সেই অরহুস শহর থেকে সকাল ৮ টায় রওয়া দিলাম ফার্মের উদ্দেশ্যে। শুণ্য ডিগ্রী তাপমাত্রার কাছাকাছি হাড় কাঁপানো শীত বলা চলে। পশমে মোড়া বুটজুতো, কয়েক প্রস্ত জ্যাকেট পরে রীতিমত এস্কিমো সাজ দিয়ে তীব্র শীতের ধুসর আকাশ মোড়া দীগন্ত বিসৃত সবুজের মাঝে ছবির মত নরডিক গ্রামের পর গ্রাম পার হয়ে প্রায় দেড় ঘন্টা গাড়িতে চলা, তারপর এসে পৌঁছালাম ডেনমার্কের উত্তরের গ্রাম ‘ফৌলাম’-এ। পাথর বিছানো চত্বরে গাড়ি পার্ক করলে ফার্মের দায়িত্বরত লোকজন এসে স্বাগত জানালেন। প্রথমেই এক মগ গরম কফির আপ্যায়ন, সাথে টাটকা চীজ। তারপর নিয়ে যাওয়া হলো কোয়ান্টারাইন রুমে। সেখানে রীতিমত বিশেষ ধরণের এ্যাপ্রোন, জুতো পরিয়ে জীবানুনাশক তরল দিয়ে হাত ধোয়ানো হলো। আমার প্রথম ধাক্কাটা লাগল সেখানেই – গরু দেখতে এত কিছু ?!?

যা হোক সব প্রস্তুতি শেষে প্রবেশ করলাম মূল ফার্মের ভেতর। সারি সারি গরু, কি হৃষ্টপুষ্ট, হাসিখুশী! খাচ্ছে-দাচ্ছে বেড়াচ্ছে! খাবারের ব্যপারটা দিয়েই শুরু করি। পুরো ফার্মের জন্য ৬-৭ ধরণের ভিন্ন ভিন্ন খাবার তৈরী করা হয় ৭-৮ ধরণের ভিন্ন ভিন্ন উপাদান দিয়ে । খাবারের পাত্রগুলো আবার কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত ঢাকনা দিয়ে ঢাকা। প্রতিটা গরুর জন্য খাবার নির্ধারন করা আছে। প্রতিটা গরুর কানে ইলেক্ট্রনিক ট্যাগ লাগানো আছে যাতে সেন্সর বসানো। কোন গরু যখন কোন খাবারের পাত্রের সামনে যায়, সে পাত্রে যদি তার জন্য নির্ধারিত খাবার থেকে থাকে, তবে পাত্রের মুখ আপনা থেকেই খুলে যায়, আর যদি সে পাত্রে অন্য খাবার থাকে তবে গরু বাবাজী যখই ধাক্কা ধাক্কি করুক লাভ নেই; পাত্রের মুখ খুলবে না। এমনি ভাবে প্রতিটা পাত্রে সেন্সর লাগানো আছে যার মাধ্যমে কোন নির্দিষ্ট গরু ঠিক কতটুকু খাবার খেয়েছে তা রীতিমত দিন হিসেবে ট্র্যাক হতে থাকে । সেখান থেকে তার খাদ্য উপাদানে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হয়!

‘কিন্ডারগার্টেন’-এ আছে প্রতিটা বাছুরের জন্য আলাদা থাকার কেবিন, যেখানে ছোটবেলা থেকেই তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খাবার-দাবার সহ সকল সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা আছে ! আফটার অল, উচ্চ বংশীয় গরু বলে কথা !

খাবারের ব্যপার-স্যাপার দেখে-শুনে যখন অনেকখানিই অবাক হয়েছি, তখন নিয়ে যাওয়া হলো যে অংশে তার নাম দেখেই চোখ কপালে উঠে গেল ! ‘ওয়েলনেস পার্লার (Wellness Parlor)’ ! সে আবার কি ? গরুর দুধের সবচেয়ে দামী অংশ এর ফ্যাট। এই ফ্যাট থেকেই তৈরী হয় মাখন, পনীর, চীজ সহ আরও বহু রকমের দামী দামী সব খাবার। গবেষনায় দেখা গেছে হাসিখুশী, মুড ভাল এমন গরুর দুধে ফ্যাটের পরিমান সবচেয়ে বেশী থাকে। তাই গরুদের মুড ভাল রাখার জন্য এই ‘ওয়েলনেস পার্লার’ এর ব্যবস্থা! এখানে আছে গরুর জন্য মাসাজের ব্যবস্থা, সাথে তার পছন্দের মিউজিক শোনানো সহ স্টীম বাথেরও ব্যবস্থা। বোঝেন অবস্থা! রীতিমত লাট সাহেবের জীবন!

ইয়ে মানে, ছবি তোলার সুযোগটা মিস করা উচিৎ হবে না একেবারেই!

তবে অবাক হবার সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা তখনও বাকী ছিল, যা ছিল পরের অংশে। ফার্মের এই অংশের নাম ‘প্লেজার-গ্রাউন্ড’। এখানে রাখা হয় বিশেষ উন্নতি প্রজাতির ষাঁড়দের যাদের কাজ ঐ ফার্মের সকল গরুদের ব্রিডিং করা ! ট্রাডিশনাল পদ্ধতি অনুযায়ী এতদিন পর্যন্ত সিরিয়াল অনুযায়ী একেকটা ষাঁড়ের সাথে একেকটা গরু দিয়ে দেয়া হত ব্রিডিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য। কিছুদিন আগে পশুঅধিকার সংগঠনগুলো এ পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি জানায়। তাঁদের ভাষ্য কেন গরুটিকে বাধ্য করা হচ্ছে ঐ ষাঁড়ের সাথেই ডেটিং করতে? ঐ ষাঁড়খানাকে যদি গরুটা পছন্দ না করে, তবে এত রীতিমত গরুটার মানসিক ও শারীরিক নিপীড়নের সামিল ! তাই তো । তবে কি করা ? গরুটাকে তার নিজের সংগী পছন্দ করার সুযোগ দিতে হবে । সুতরাং, এবার গরুটাকে ছেড়ে দেয়া হলো যতগুলো ষাঁড় ফ্রী আছে তাঁদের সবগুলোর মাঝে – যাকে পছন্দ বেছে নাও । রীতিমত ‘সয়ম্বর সভা’ যাকে বলে!

তবে কিছুদিন পর এটা নিয়েও পশুঅধিকার সংগঠনগুলো আপত্তি জানালো। এবার সমস্যা কি ? বলা হলো এতগুলো ষাঁড়ের মাঝে একা একা বেড়াতে গিয়ে গরুটা না কি মানসিক চাপের সম্মুখিন হচ্ছে! তাছাড়া গরুটা বেছে নিলেও বেছে নেওয়া ষাঁড়টা যদি গরুটাকে পছন্দ না করে ! (যাক এ দুনিয়ায় ছেলেদের মানসিক অবস্থার কথাও কেউ চিন্তা করে তাহলে ! খুশী হলাম !) তবে ‘হ্যাপী ডেটিং’ হবে কি করে ? তাই তো ! তবে সমাধান কি ? এবার পদ্ধতি বেরুলো এক কাজ করলে কেমন হয় ? ব্রীডিং করতে হবে এমন সবগুলো গরুদেরকে সবগুলো ষাঁড়দের সাথে একসাথে মিশতে দিলেই তো হয়। ওরা নিজেরাই পছন্দমত নিজেদের ডেটিং সঙ্গী খুঁজে নেবে। এতে গরু, ষাঁড়, মানসিক স্বাস্থ্য, পছন্দ-অপছন্দ… … … সবকুলই রক্ষা পেল। ফার্মে গরুর সংখ্যা কত হলে একসঙ্গে কত সংখ্যক গরুর জন্য প্লেজার গ্রাউন্ডের ব্যবস্থা করতে হবে তা নিয়ে অরহুস বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত আর পশুসম্পদ ডিপার্টমেন্ট একসাথে স্ট্যাস্টিক্যাল অ্যানালাইসিসসহ আরও নানারকম গবেষনা করে একটা মডেল দাঁড়া করিয়ে দিল সবার জন্য। সুতরাং, সারা ডেনমার্কের সমস্ত ফার্মের ‘প্লেজার গ্রাউন্ড’ নতুন করে তৈরী করা হলো – যেখান একসাথে প্রয়োজনীয় সংখ্যক গরু-ষাঁড় ঘুরে ফিরে একজন আরেকজনকে পছন্দ করার সুযোগ পাবে। রীতিমত পার্টি সেটাপ ! সব দেখে শুনে আমার তখন ভীমড়ি খাবার জোগার আর কি!

গরু গুলো ছোটবেলা থেকেই রীতিমত ট্রেনিং প্রাপ্ত। প্রতিটি গরু প্রতিদিন গড়ে ৩০ কেজি করে দুধ দেয়। বাঁটে দুধ জমলেই ওরা একা একাই হেঁটে হেঁটে রোবটের কাছে গিয়ে হাজির হয়!

সেখান থেকে দেখা হলো রোবট দিয়ে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে দুধ সংগ্রহের পদ্ধতি। কীভাবে সেই দুধ সংরক্ষণ করা হয় আর তারপর ‘আরলা’র নিজস্ব বিশাল বিশাল ট্যাংকার ট্রাকে তাপমাত্রা ও যে কোন ধরণের জীবানু নিয়ন্ত্রণ করে পাঠিয়ে দেয়া হয় ডেইরী ফ্যাক্টরীতে প্রসেসিংয়ের জন্য, যেখান থেকে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ করে বানোনো হয় দুধের নানা ধরণের খাবার আর গুঁড়ো দুধ, যার একটা অংশ বাংলাদেশে আসে ‘DANO (ডানো)’ ব্র্যান্ডের নামে ।

প্রথম বিশ্বের মানুষের উন্নত জীবনযাপনের কথা শুনেছি, দেখেছি । তবে প্রথম বিশ্বের গরুদের জীবনও এমনখানি উন্নত হতে পারে এই ভ্রমণের আগে সে সম্পর্কে খুব বেশী ধারণা ছিল না। এই জন্য ইউরোপীয় গরুর দুধ কিংবা দুগ্ধজাত খাবারের গুণগত মান যে অসাধারণ উন্নতমানের হয় সন্দেহ নেই। তবে এই মান নিশ্চিত করার জন্য প্রতিটা গরুর পেছনে যে পরিমান খরচ করা হয় তা দেখে সেই পন্ডিত মশাই গল্পের শেষ লাইনটাই একটু ভিন্ন ভাবে মনে আসছিল- “তৃতীয় বিশ্বের কয়টি মানব পরিবার প্রথম বিশ্বের একটি গরুর সমান?”

– Galib Bin Mohammad
Marketing Professional

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (3 votes, average: 5.00 out of 5)
Loading...
Ad

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য লেখাগুলো

Ad